ভিডিওতে তাদের নিখুঁত নাচ কিংবা চোখ ধাঁধানো ডিগবাজি দেখে পুরো বিশ্ব মুগ্ধ। চীনের হিউম্যানয়েড (মানুষের মতো দেখতে) রোবটগুলো এখন বিশ্বজুড়ে এক বড় আকর্ষণ। প্রযুক্তির এই চমৎকার রূপটি এখন আলোড়ন তৈরি করেছে চীনের ভাড়ার বাজারে। তবে এই ব্যবসাই একই সঙ্গে প্রযুক্তিটির আসল সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে দিচ্ছে। রোবটগুলো দেখতে যতটাই আকর্ষণীয় হোক না কেন, বাস্তবে মানুষের বিকল্প হয়ে উঠতে তারা এখনো অনেক দূরে।
হাংঝুর ই-কমার্স লাইভস্ট্রিমার আই লিন গত বছর একটি অনুষ্ঠানে রোবটদের নাচ দেখেন। এতে তিনি নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা খুঁজে পান। তিনি ৩০ হাজার ডলার খরচ করে নিজের প্রথম অ্যান্ড্রয়েড রোবট কেনেন। এরপর শুরু করেন রোবট ভাড়ার ব্যবসা। প্রতিদিন ৩ হাজার ইউয়ান (৪৪৩ ডলার) ভাড়ায় গ্রাহকরা এই রোবট নিতে পারেন। বিভিন্ন প্রদর্শনীতে ভিড় জমাতে বা বিয়ের অনুষ্ঠানের মঞ্চ সাজাতে মানুষ এগুলো ভাড়া করছে।
তবে এই ব্যবসাই প্রযুক্তিটির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছে। কারখানা বা ঘরের কাজে মানুষের জায়গা নিতে এদের এখনো বহু বছর বাকি। আই লিন বলেন, ‘আজকের রোবটগুলো নিজে নিজে কাজ করতে পারে না। এগুলো মূলত বড় আকারের খেলনা।’
তবুও বেইজিং এই প্রযুক্তিতে শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। অর্থনৈতিক মন্দা ও কমতে থাকা কর্মক্ষম জনসংখ্যা সামলাতে চীন একে কৌশলগত প্রযুক্তি হিসেবে দেখছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এটি একটি বড় সুযোগ। বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলির ধারণা, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে ১০০ কোটি হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারে আসতে পারে। এর বাজার হবে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। তবে এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হতে আরও অন্তত এক দশক লাগবে।
বর্তমানে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রোবট ভাড়ার বিজ্ঞাপনে সয়লাব। দেশটিতে এখন ১ লাখ ৫৩ হাজারের বেশি রোবট ভাড়ার ব্যবসা রয়েছে। চীনের অন্যতম প্রধান রোবট নির্মাতা ‘এজিবোট’ গত বছর ‘শেয়ারবোট’ নামে একটি ভাড়া দেওয়ার প্রতিষ্ঠান চালু করে। তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিদিন মাত্র ৩৫০০ ইউয়ানে (৫১৭ ডলার) রোবট ভাড়া করা যায়। চালুর তিন মাসের মধ্যে তারা ৫,৫০০টির বেশি অর্ডার পেয়েছে। তবে ব্যবসায়ী ঝাও জিয়াওহং জানান, রোবটের নতুনত্ব কমে আসায় ভাড়ার দাম কমতে শুরু করেছে। বাজারে একই ধরনের রোবট বেশি চলে আসায় মানুষের মধ্যে ক্লান্তি চলে আসছে।
বাস্তব জগতের কাজের তথ্যের অভাব এই শিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ। রোবট নির্মাতারা শারীরিক কাজের তথ্যের জন্য ঘণ্টায় ১৫০ ডলার পর্যন্ত খরচ করছেন। গবেষণাগারে প্রশিক্ষকরা রিমোট দিয়ে রোবটদের প্যাকেট বাছাই বা ডায়াপার পরিবর্তনের মতো কাজ বারবার শেখাচ্ছেন।
এ ছাড়া হার্ডওয়্যারের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। রোবটের হাতের কার্যক্ষমতা এখনো অনেক কম। যন্ত্রাংশ বেশি হওয়ায় তাপ নিয়ন্ত্রণ করা একটি বড় সমস্যা। এর উৎপাদন খরচ বেশি এবং স্থায়িত্ব কম। চীনের অন্যতম বড় রোবট কোম্পানি ‘ইউবিটেক’ জানিয়েছে, তাদের উন্নত রোবটগুলো নির্দিষ্ট কিছু কাজে মানুষের মাত্র ৮০ শতাংশ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারে।
তবুও চীন স্বয়ংক্রিয় ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী। বেইজিং, সাংহাইয়ের মতো শহরে রোবট এখন কফি বা বিয়ার পরিবেশন করছে। ২০২৩ সালে বেইজিং হিউম্যানয়েড রোবটকে পরবর্তী বড় পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে চীনে ১৪০টির বেশি রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। তারা আনাড়ি হলেও ধীরে ধীরে জনগণের নজরে আসছে।