ব্যাংক খাতের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ কমাতে এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণ বাড়াতে বড় ছাড় (এক্সিট সুবিধা) দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে এখন মন্দ বা খেলাপি ঋণের পুরো টাকা এককালীন পরিশোধ করে দায়মুক্ত হতে পারবেন গ্রাহকরা। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ব্যাংক ঋণের ওপর আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে আগের কঠোর শর্ত শিথিল করা হয়েছে। মূলত ব্যাংকগুলোর আদায় অযোগ্য ঋণ কমিয়ে আনা এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদহার কমাতে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান নতুন করে ৪ শতাংশে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
গত সোমবার (২৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ-সংক্রান্ত আলাদা দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে তা পাঠানো হয়েছে। ব্যাংকাররা বলছেন, নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে যেসব খেলাপি ঋণ অনাদায়ী পর্যায়ে চলে গেছে, ব্যাংক চাইলে সেসব ঋণের আসল অংশটুকু আদায় করে পুরো সুদ মওকুফ করে দিয়ে হলেও সেই ঋণদাতাকে এক্সিট সুবিধা দিতে পারবে। এত দিন আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে ব্যাংকগুলোর পক্ষে এই সুবিধা দেওয়ার সুযোগ ছিল কম।
প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণ এই সুবিধার আওতায় আসবে। তবে এই সুবিধা দিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন লাগবে এবং তা নির্ধারিত হবে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমানো আবশ্যক।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, যেসব ঋণগ্রহীতা বিভিন্ন কারণে আর্থিক সংকটে পড়লেও ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রাখেন এবং ঋণ পরিশোধের আন্তরিকতা রয়েছে, তাদের এককালীন বিশেষ এক্সিট সুবিধা দেওয়া হবে। এতে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমবে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে, যা দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মন্দ বা ক্ষতিকর মানের যেসব ঋণ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে পুনঃতফসিল করা হয়েছে, সেই ঋণ এই প্রজ্ঞাপনের আওতায় বিশেষ এক্সিট সুবিধা পাবে। এ ছাড়া বিশেষ এক্সিট দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষি খাতের স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ এবং সিএমএসএমই খাতের কটেজ, মাইক্রো ও স্মল ঋণকে ব্যাংকগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই বিশেষ নীতিমালার সুবিধা ও নির্দেশনা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে আড়াই বছর আগে বাতিল করে দেওয়া আমানত ও ঋণের গড়ভারিত সুদহারের ব্যবধানসীমার বা স্প্রেডের বিধান ফিরিয়ে আনল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহারের মধ্যে ব্যবধান বা স্প্রেড হতে হবে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ। নতুন নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা ঋণ ছাড়া অন্য সকল ঋণের সঙ্গে আমানত সুদহারের ব্যবধান হবে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ। এর মানে হচ্ছে, ব্যাংকগুলো যে সুদহারে আমানত সংগ্রহ করবে তার গড় সুদ ও ঋণ বিতরণের গড় সুদহারের মধ্যে ব্যবধান হবে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ। যদিও বর্তমানে বেশির ভাগ ব্যাংকের তহবিল খরচই সাড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশের ওপরে।
বর্তমানে দুটি ছাড়া কোনো বেসরকারি ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশের মধ্যে নেই। নতুন নিদের্শনা জারি হওয়ার পর থেকেই কার্যকর করার কথা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০২০ সালে ব্যাংকে ঋণসীমা সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়ার সময় মূলত স্প্রেড অকার্যকর হয়ে যায়। পরবর্তী সময় আন্তর্জাতিক চাপে ধাপে ধাপে ঋণের সুদহার সীমা বাড়াতে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে স্প্রেডসীমা সার্কুলার দিয়ে স্থগিত করা হয়। সবশেষ ২০২৪ সালের মে মাসে ঋণ সুদহার বাজারভিত্তিক করা হলেও কোনো স্প্রেডসীমা ঠিক করে দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন সিদ্ধান্ত দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, অনেক ব্যাংকের আমানতের সুদহারের তুলনায় ঋণের সুদহার অধিক হারে নির্ধারণের ফলে গড়ভারিত অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যবসা-শিল্প প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই অবস্থায় উৎপাদনশীল খাতসহ বিভিন্ন খাতে ঋণের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণের লক্ষ্যে ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তাঋণ ছাড়া অন্যান্য খাতে ঋণ এবং আমানতের গড়ভারিত সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার জন্য আপনাদের নির্দেশনা প্রদান করা হলো। স্প্রেডসীমা ঠিক করে দেওয়ায় ব্যাংকগুলোকে হয় আমানত সুদহার বাড়াতে হবে, নয়তো ঋণ সুদহার কমিয়ে আনতে হবে।