বিশ্বকাপ ফুটবলে শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে গতকাল মুখোমুখি হয়েছিল ইউরোপ ও আফ্রিকার দুই দেশ– নেদারল্যান্ডস ও মরক্কো। আজ (১ জুলাই) আবার দেখা মিলবে ইউরোপ-আফ্রিকার লড়াই। সিয়াটল স্টেডিয়ামে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে বেলজিয়াম ও সেনেগাল। ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ২টায়।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউটে উঠেছে ইউরোপের বেলজিয়াম, আর সেরা তৃতীয় হওয়া দলগুলোর একটি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে আফ্রিকার দেশ সেনেগাল। ম্যাচটি শুধু টিকে থাকার লড়াই নয়। দুই মহাদেশের ফুটবল দর্শনের এক আকর্ষণীয় পরীক্ষাও বটে।
রুডি গার্সিয়ার অধীনে বেলজিয়াম গ্রুপ পর্বে শীর্ষে থাকলেও তাদের পারফরম্যান্স পুরোপুরি মন ভরাতে পারেনি দর্শকদের। প্রথম ম্যাচে মিসরের সঙ্গে ১-১ এবং পরের ম্যাচে ইরানের সঙ্গেও গোলশূন্য ড্রয়ে দলটির সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে কেভিন ডি ব্রুইনা, রোমেলু লুকাকুরা। তিন ম্যাচে দুই ড্র ও এক জয়ে ৫ পয়েন্ট, ৬ গোল এবং মাত্র ২ গোল হজম। পরিসংখ্যান যদিও বেলজিয়ামের শক্তির ইঙ্গিত দেয়, তবে ধারাবাহিকতার ঘাটতি এখনো স্পষ্ট।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে অষ্টম স্থানে থাকা বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ ইতিহাসও সমৃদ্ধ। ২০১৮ সালে তৃতীয় স্থান অর্জন তাদের সেরা সাফল্য। তবে ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার হতাশা এখনো তাদের তাড়া করে। তাই এবার শেষ ষোলো নিশ্চিত করা তাদের জন্য কেবল পরের রাউন্ডে ওঠা নয়, নতুন প্রজন্মের সামর্থ্য প্রমাণেরও মঞ্চ।
অন্যদিকে সেনেগালের বিশ্বকাপ যাত্রা ছিল নাটকীয়। পাপে থিয়াও এর দল শুরুতে টানা দুই ম্যাচে ফ্রান্স ও নরওয়ের কাছে হেরে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু শেষ ম্যাচে ইরাকের বিপক্ষে ৫-০ গোলের দুর্দান্ত জয় শুধু নকআউট নিশ্চিত করেনি, বিশ্বকাপ ইতিহাসেও জায়গা করে দিয়েছে তারা। প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে এক ম্যাচে ৫ গোল করার কীর্তি গড়েছে লায়ন্স অব তেরাঙ্গা।
আফ্রিকার নয়টি দল নকআউটে উঠলেও ইতোমধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা বিদায় নিয়েছে। ফলে সেনেগালের কাঁধে এখন মহাদেশের প্রত্যাশা। ২০০২ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠাই তাদের সেরা অর্জন; এবার সেই ইতিহাস ছুঁয়ে ফেলার স্বপ্ন নিয়েই নামবে তারা। দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ের আরেকটি বিশেষ দিক-এটাই হবে তাদের ইতিহাসের প্রথম সাক্ষাৎ। ফলে ফলাফল যাই হোক, ম্যাচটি ইতোমধ্যেই ঐতিহাসিক গুরুত্ব পাচ্ছে।
দলগত অবস্থার দিকে তাকালে বেলজিয়াম এ ম্যাচে ফেভারিট। তুলনামূলক স্বস্তিতেও তারা। অভিজ্ঞ গোলরক্ষক থিবু কর্তোয়া গোলবারের নিচে থাকছেন। যদিও ডিফেন্ডার জেনো ডেবাস্ট চোটের কারণে অনিশ্চিত। আক্রমণে নজর থাকবে লিন্দ্রো ট্রোসার্ডের দিকে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছেন তিনি। সঙ্গে আছেন কেভিন ডি ব্রুইন, রোমেলু লুকাকু ও অ্যালেক্সিস সায়েলেমেকার্স। তারা যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম। অন্যদিকে সেনেগালের জন্য বড় দুশ্চিন্তার নাম গোলরক্ষক এডুয়ার্ড মেন্ডি। হাঁটুর চোটে তার খেলা অনিশ্চিত। রক্ষণে কালিদু কুলিবালির জায়গা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে আক্রমণে ইসমাইলা সারের গতি এবং সাদিও মানের অভিজ্ঞতা সেনেগালকে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ করে তুলেছে।
সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচ নিয়ে বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া বলেছেন, ‘নকআউট পর্বে ভুলের কোনো সুযোগ নেই। গ্রুপ পর্বে আমরা ভালো খেলতে পারিনি, কিন্তু দল ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছে। সেনেগাল খুবই শক্তিশালী দল। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
দলটির অধিনায়ক কেভিন ডি ব্রুইন বলেন, ‘সেনেগালকে হালকভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। শেষ ম্যাচে তারা পাঁচ গোল করে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।’
সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াউ বলেন, ‘আমরা জানি বেলজিয়াম কতটা মানসম্পন্ন দল। কিন্তু আমরা ভয় পাচ্ছি না। আমরা এই মঞ্চে লড়াই করতে এসেছি। আমরা আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করছি, আমরা মহাদেশকে গর্বিত করতে চাই।’
দলটির অধিনায়ক কুলিবালি বলেন, ‘নক আউট ফেবারিট বলে কিছু নেই। তাদের দলে ১১ খেলোয়াড়, আমাদের দলেও ১১ জন। সুযোগ সব দলই পায়। যারা কাজে লাগাতে পারে তারাই জিতবে।’
কাগজে-কলমে বেলজিয়াম এগিয়ে থাকলেও নকআউট ফুটবলে পূর্বাভাস সবসময় বাস্তব হয় না। সেনেগালের গতি, শক্তি ও লড়াকু মানসিকতা বেলজিয়ানদের জন্য বড় পরীক্ষাই হতে যাচ্ছে। ৯০ মিনিটের এই লড়াইয়ে এক মুহূর্তের ভুলই নির্ধারণ করে দিতে পারে কার বিশ্বকাপ যাত্রা চলবে আর কার স্বপ্ন থেমে যাবে।