জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিজস্ব ওয়েবসাইটে সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) ২০২৩-২৪ করবর্ষের ৫ হাজার ১৪টি কর শনাক্তকরণ নম্বর (ইটিআইএন) প্রকাশ করেছে। এই করদাতাদের বাছাই করা হয়েছে রিটার্ন অডিটের জন্য। এ নিয়ে তিন দফায় ৯২ হাজার ৮৪৯ জন করদাতাকে বাছাই করা হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই সাধারণ ও সীমিত আয়ের মানুষ।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা এনবিআরের এই পদক্ষেপকে ছোট করদাতাদের ওপর একধরনের হয়রানি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নিয়মিত কর দেওয়া চাকরিজীবী ও ছোট ব্যবসায়ীদের এভাবে চেপে ধরা হলে নতুনরা করজালে আসতে আগ্রহ হারাবেন। অথচ বড়মাপের করদাতা ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে আদালতে ৩১ হাজার ৭০০টি মামলা ঝুলে আছে, যার ফলে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া রাজস্ব আদায় থমকে আছে। ফলে বড়দের ছাড় দিয়ে ছোটদের ভোগান্তি বাড়ানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, অল্প আয়ের করদাতাদের বেশির ভাগই চাকরিজীবী বা ছোট ব্যবসায়ী। এসব ব্যক্তি সাধারণত নিয়মিত কর পরিশোধ করেন। চাকরিজীবীদের আয় ব্যাংকে যায়। সেখান থেকে হিসাব করে কর পরিশোধ করে থাকেন। এসব ব্যক্তির জীবনযাত্রার খরচ জোগাড়ে ব্যবস্থা থাকতে হয়। মূল্যস্ফীতির চাপে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। এই করদাতাদের অডিটের নামে হয়রানি করা হলে ভোগান্তি বাড়বে।
এনবিআর সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে গত বছরের জুলাই মাসে ১৫ হাজার ৪৯৪ ব্যক্তি এবং দ্বিতীয় ধাপে গত ২৯ এপ্রিল ৭২ হাজার ৩৪১ ব্যক্তির রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচন করা হয়। সর্বশেষ আরও ৫ হাজারের বেশি করদাতাকে নির্বাচন করা হয়। এনবিআর তদন্ত কর্মকর্তারা রিটার্নে উল্লেখ করা বিভিন্ন তথ্যের সত্যতা যাচাই করছেন। ওই করদাতাদের অনেককে এনবিআরে তলব করা হচ্ছে। তাদের কাছে রিটার্নে উল্লেখ করা বিভিন্ন তথ্যের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করতে বলা হচ্ছে। করদাতারা অনেক ক্ষেত্রে যে তথ্য প্রমাণ জমা দিচ্ছেন তা এনবিআর তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। নতুন করে আবারও তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে বলা হচ্ছে।
ব্যবসায়ী মাজেদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার রিটার্ন অডিটে আনা হয়েছে। আমি গত ১০ বছর নিয়মিত রিটার্ন জমা দিচ্ছি। আমার আয়ের একটি তথ্যও গোপন করিনি। তাহলে আমাকে কেন অডিটে আনা হয়েছে? আমার সমস্যা হচ্ছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের রিটার্নে যেসব কাগজপত্র দেখিয়েছি, তার অনেকটি এখন আমার কাছে নেই। আমার কাছে এনবিআর থেকে রিটার্নে উল্লেখ করা তথ্যের প্রমাণ চাওয়া হলেও সব জমা দিতে পারিনি। এখন আমাকে জোগাড় করতে বলা হয়েছে। কীভাবে কার কাছে পাব তা বুঝতে পারছি না।’
পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্যানুসারে, এনবিনারের বকেয়া করের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বকেয়া করের বেশির ভাগই বড়মাপের করদাতাদের কাছে পাওনা। তাদের বেশির ভাগই মামলা করে রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে আটকে রেখেছেন।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, সাধারণ আয়ের ১০০ জন করদাতার কাছে এনবিআরের যে পাওনা থাকে, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পাওনা থাকে বড় মাপের একজন কর ফাঁকিবাজের কাছে। বড় মাপের এসব করদাতা যুগ যুগ ধরে কর ফাঁকি দিয়ে আসছেন। বারবার তাগাদা দিলেও সামান্য কিছু পরিশোধ করেন। অনেকে আবার বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে একটি টাকাও পরিশোধ করেন না। এদের বেশির ভাগই মামলা করে পুরো রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রাখেন।’ তিনি বলেন, সাধারণ করদাতাদের অডিটের নামে এভাবে হয়রানি করা হলে নতুন করে অনেকে আর করজালে আসতে আগ্রহী হবেন না।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বকেয়া রাজস্বের বেশির ভাগই আদালতে মামলা করে আটকে রাখা হয়েছে। এসব মামলার প্রায় সবই বড় মাপের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে করা হয়েছে। ছোট করদাতারা সাধারণত কর ফাঁকি দেন না। তাই ছোটদের ছাড় দিয়ে মামলা নিষ্পত্তিতে এনবিআরকে জোর দিতে হবে। অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, প্রতি অর্থবছর এনবিআরের আদায়ের ঘাটতি থাকছে। বকেয়া আদায় করতে পারলে এনবিআরের ঘাটতির বেশি আদায় হবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, মামলার বেশির ভাগই বড় করদাতা বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পাওনা রাজস্ব না দিয়েই ব্যবসা-বাণিজ্য চলমান রাখা যায়। আর এই সুযোগ নিয়ে থাকেন অসাধু করদাতারা। এনবিআরের জিজ্ঞাসাবাদ, আপিল ট্রাইব্যুনাল ও হাইকোর্ট পার হয়ে রাজস্ব মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে যেতে এক যুগও লেগে যায়।
এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের আদালতে আয়কর, মূসক ও শুল্কসংক্রান্ত মোট মামলার পরিমাণ ৩১ হাজার ৭০০টি। জড়িত অর্থের পরিমাণ ৯৯ লাখ ৭০০ কোটি টাকা। ৪ হাজার ৭০০ করসংক্রান্ত মামলার বিপরীতে জড়িত অর্থের পরিমাণ অন্তত ৩৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। মূসকের মামলার পরিমাণ ১১ হাজারের বেশি, জড়িত অর্থের পরিমাণ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। শুল্কের মামলার সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। এর মধ্য শুধু চট্টগ্রামেই ১২ হাজার মামলা চলমান। জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান সরকার এই অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে এনবিআরের আয়কর, মূসক ও শুল্ক খাতের জন্য পৃথক তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করে। মামলা নিষ্পত্তির বিষযটি নজরদারি করছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
আদালতে আটকে থাকা রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তিতে গত ২৩ মে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে দিনব্যাপী এনবিআরের টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। এই বৈঠকে টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা আয়কর, মূসক ও শুল্কসংক্রান্ত মামলার বাছাই করা তালিকা উপস্থাপন করেন। এই তালিকায় ২০০ কোটি থেকে তার বেশি আয়ের সব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উচ্চ আদালতের সহযোগিতা চাওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু বড় মাপের করদাতাদের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ের খুব বেশি অগ্রগতি হয় না। সেই ঘুরেফিরে ছোটদের কাছে ছুটে যায় এনবিআর। অতীতের ধারা থেকে যদি বের হয়ে আসা সম্ভব হয়, তবে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে। আদালতে আটকে থাকা মামলা নিষ্পত্তিতে জোর দিতে হবে। তাহলে এনবিআরের ঘাটতি থাকবে না। বরং লক্ষ্যমাত্রার বেশি আদায় হবে।