ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়ার আসনগুলোতে ৯টি রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যেই। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান দুটি দল হিসেবে ভোটারদের কাছে যাচ্ছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ইসলামি দলগুলো ভোটারদের খুব কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে দেশের অন্যতম বড় দল হিসেবে বিএনপির হাতে আবারও ক্ষমতা যাবে বলে আশা করছেন এর নেতারা। নির্বাচনের ইতিহাসে বগুড়ায় বিএনপির আসন বরাবর সব সময় বেশি ছিল আর নেতাদের দাবি, তাদের প্রার্থীরাই ভালো করবেন জেলার সাতটি আসনের সব কটিতে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থীরা বগুড়ার সব আসনেই জয়ী হবেন বলে প্রত্যাশা করছেন।
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। পরের বছর ১৯৭৯ সালে প্রথমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। এ নির্বাচনে বগুড়ার ৭টি আসনের সব কটিতেই জয়ী হয় বিএনপি। এরপর এরশাদ ক্ষমতায় এলে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বগুড়া সদর-৬ আসনে জামায়াত নেতা আব্দুর রহমান ফকির নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮৮ সালের নির্বাচন প্রধান দলগুলো বর্জন করায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন রূপ নেয়। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা শাহাদাতুজ্জামান জয়লাভ করলেও বাকি ৬টি আসনে বিএনপি জয়ী হয়ে তাদের আধিপত্য বজায় রাখে।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ওই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পাশাপাশি ২০০১ সালের ভোটেও বগুড়ার সব কটি আসন পায় বিএনপি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও বগুড়ায় ৩টি আসন পায় বিএনপি। বগুড়া-৬ (সদর) ও বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জয় পান। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করলেও ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ (সদর) আসনে জয়ী হন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বগুড়া-৪ (নন্দীগ্রাম-কাহালু) আসনে মো. মোশাররফ হোসেন। তবে বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে ভোটের আগের দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. রেজাউল করিম বাবলুকে বিএনপি সমর্থন দিলে তিনি জয়লাভ করেন।
সর্বশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের অধীনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যায়নি বিএনপি। এখন বগুড়ার বেশির ভাগ আসনে নির্বাচনে জয়ের এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন বিএনপির নেতারা। বগুড়া-৬ (সদর) আসনে এবার দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বিপুল ভোটে জয়লাভের প্রত্যাশা করছেন।
বগুড়া জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও বগুড়া-৪ (নন্দীগ্রাম-কাহালু) আসনের সাবেক এমপি মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বগুড়া জেলা বিএনপির জন্য একটি তীর্থস্থান। বগুড়ার সব কটি আসনেই বিএনপি এবার জয়লাভ করবে বলে আমরা আশা করছি। পিছিয়ে পড়া বগুড়াকে এগিয়ে নিতে বিএনপিকে সামনে আনতে হবে।’
অন্যদিকে বগুড়ার সব কটি আসন জয়ের ক্ষেত্রে বিগত নির্বাচনগুলোতে বিএনপি থেকে পিছিয়ে থাকলেও সাংগঠনিকভাবে বর্তমানে নিজেদের শক্তিশালী দাবি করে বগুড়া শহর জামায়াতের আমির ও বগুড়া সদর-৬ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আবিদুর রহমান সোহেল বলেন, ‘বিএনপি নেতাদের দাবি এ জেলা তাদের। তবে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বগুড়া সদর আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়ী হন। এ ছাড়া ৮৬ ও ৯১ সালেও বগুড়া সদর ও বগুড়া-২ আসনে জামায়াত জয়লাভ করে। বিভিন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামায়াতের বহু প্রার্থী জয়ী হন। তাই এ জেলা বিএনপির জন্য নির্ধারিত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ৫ জন চেয়ারম্যান, ৯ জন পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান ও ২ জন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান জয়লাভ করেন। বগুড়া পৌরসভার ভোটে ৫ জন কাউন্সিলর জামায়াত থেকে জয়ী হন। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, বগুড়ায় জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাই জামায়াত সব কটি আসনেই বিজয়ী হবে।’
জানা গেছে, বগুড়ায় জামায়াত ও বিএনপি ছাড়াও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কংগ্রেস, গণফোরাম, জাতীয় পার্টি (জাপা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থীরা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়ার ৭টি আসনে ভোট দেবেন ২৯ লাখ ৪১ হাজারের বেশি ভোটার।