একটি উর্বর জমির সবচেয়ে পরিশ্রমী কৃষক কে? অনেকেই হয়তো বলবেন কৃষকই। কিন্তু কৃষকেরও আগে, দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করে এমন এক নীরব কর্মী রয়েছে, যার নাম কেঁচো (Earthworm)। আমরা যাকে অনেক সময় ঘৃণার চোখে দেখি বা তুচ্ছ প্রাণী বলে মনে করি, সেই কেঁচোই প্রকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীব। পৃথিবীর উর্বর মাটি, স্বাস্থ্যকর কৃষি, জৈব বর্জ্যব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কেঁচোর অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, বিখ্যাত বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন একে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Formation of Vegetable Mould through the Action of Worms-এ তিনি দেখিয়েছেন, কেঁচো ছাড়া উর্বর মাটির স্বাভাবিক বিকাশ কল্পনা করা কঠিন। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের জীবনমান এবং অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে সুস্থ ও উর্বর মাটির ওপর। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমরা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম প্রধান সহযোগী কেঁচোর গুরুত্ব সম্পর্কে খুব কমই সচেতন। আধুনিক কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, মাটির জৈব পদার্থের ঘাটতি, শিল্পবর্জ্য এবং পরিবেশদূষণের কারণে দেশের অনেক অঞ্চলে কেঁচোর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। এটি শুধু একটি জীবের সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা নয়; বরং মাটির স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ার একটি নীরব সংকেত।
কেঁচোকে বিজ্ঞানীরা ‘Ecosystem Engineer’ বা বাস্তুতন্ত্রের প্রকৌশলী বলে থাকেন। কারণ তারা মাটির ভেতরে অসংখ্য সুড়ঙ্গ তৈরি করে, যার মাধ্যমে বাতাস সহজে প্রবেশ করে এবং বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে পৌঁছাতে পারে। এতে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে, গাছের শিকড় সহজে বিস্তার লাভ করে এবং মাটির গঠন উন্নত হয়। একটি সুস্থ মাটিতে কেঁচোর উপস্থিতি সেই মাটির জীবন্ত থাকার অন্যতম নির্দেশক।
কেঁচোর আরেকটি অসাধারণ অবদান হলো জৈব সার উৎপাদন। শুকনো পাতা, গাছের অবশিষ্টাংশ, গবাদিপশুর গোবর এবং রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য খেয়ে কেঁচো যে মল ত্যাগ করে, সেটিই ভার্মিকম্পোস্ট নামে পরিচিত। এই প্রাকৃতিক সারে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়ামসহ উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় নানা পুষ্টি উপাদান থাকে। একই সঙ্গে এতে প্রচুর উপকারী অণুজীব থাকে, যা মাটির জীবন্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমে এবং কৃষি উৎপাদন আরও টেকসই হয়।
আজ বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ব্যস্ত, তখন কেঁচোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। স্বাস্থ্যকর মাটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম। কেঁচো মাটিতে জৈব পদার্থের সঞ্চালন এবং মাটির গঠন উন্নত করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কার্বন সংরক্ষণে সহায়তা করে। একই সঙ্গে জৈব বর্জ্যকে দ্রুত পচিয়ে পুনরায় সম্পদে পরিণত করে, যা বর্জ্যব্যবস্থাপনায় একটি পরিবেশবান্ধব সমাধান।
বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জৈববর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্যের একটি বড় অংশ খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হয়, যা দুর্গন্ধ, রোগজীবাণু এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎসে পরিণত হয়। অথচ খুব সহজেই কেঁচোর সাহায্যে এসব জৈববর্জ্যকে উচ্চমানের জৈব সারে রূপান্তর করা সম্ভব। এতে একদিকে পরিবেশদূষণ কমবে, অন্যদিকে কৃষক স্বল্প খরচে মানসম্মত জৈব সার পাবেন।
বাস্তবতা হলো, আমরা এখনো কেঁচোর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারিনি। অধিক ফলনের আশায় অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে আমরা নিজেরাই মাটির জীবন্ত প্রাণকে ধ্বংস করছি। এর ফলে মাটির জৈব পদার্থ কমে যাচ্ছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। একসময় যে জমিতে সামান্য সার দিয়েই ভালো ফলন পাওয়া যেত, এখন সেখানে আগের তুলনায় অনেক বেশি সার প্রয়োগ করতে হচ্ছে। এটি মাটির অবনতিশীল স্বাস্থ্যেরই একটি লক্ষণ।
বর্তমান সময়ে টেকসই কৃষি এবং পুনর্জীবনশীল (Regenerative) কৃষি নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা হচ্ছে। এই কৃষিব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো জীবন্ত মাটি। আর জীবন্ত মাটির অন্যতম প্রধান কর্মী কেঁচো। তাই কৃষি উন্নয়নের পরিকল্পনায় কেঁচো সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করা, কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা, মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করা এবং গ্রাম পর্যায়ে ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের দাবি।
শুধু কৃষক নয়, সাধারণ মানুষও এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বাসাবাড়ির জৈববর্জ্য আলাদা করে ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি করা, অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিপণ্য ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে আমরা প্রত্যেকেই কেঁচো সংরক্ষণে অবদান রাখতে পারি।
আমাদের দেশের অধিকাংশ শিশু প্রথম কেঁচোকে দেখে ঘৃণা করতে শেখে, ভালোবাসতে নয়। বাড়িতে, স্কুলে কিংবা আশপাশের মানুষজন প্রায়ই কেঁচোকে ‘নোংরা’ বা ‘অপ্রীতিকর’ প্রাণী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে প্রাণীটি প্রতিনিয়ত মাটিকে উর্বর করছে, জৈববর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করছে এবং আমাদের খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তি শক্তিশালী করছে, তাকে আমরা যথাযথ গুরুত্ব দিই না।
জাতীয় শিক্ষাক্রমে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা থাকলেও কেঁচোর মতো মাটির উপকারী প্রাণীর পরিবেশগত ও কৃষিগত গুরুত্ব খুব সীমিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা কেঁচোকে একটি বৈজ্ঞানিক সম্পদ হিসেবে নয়, বরং একটি সাধারণ বা বিরক্তিকর প্রাণী হিসেবেই চিনে বড় হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে কেঁচোর ভূমিকা, মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, জৈব সার উৎপাদন এবং টেকসই কৃষির সঙ্গে এর সম্পর্ক আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। শুধু পাঠ্যবই নয়, বিদ্যালয়ভিত্তিক বিজ্ঞান ক্লাব, প্রকৃতি শিক্ষা কার্যক্রম, স্কুল-বাগান এবং ভার্মিকম্পোস্ট প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানোর সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। একটি শিশু যখন বুঝতে শিখবে যে কেঁচো তার প্রতিদিনের খাবার উৎপাদনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তখন সে আর কেঁচোকে ঘৃণা করবে না; বরং প্রকৃতির একজন নীরব সহযোগী হিসেবে মূল্যায়ন করবে।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের কৃষিবিদ, পরিবেশবিদ, নীতিনির্ধারক এবং সচেতন নাগরিক। তাই তাদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং মাটির জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। আমরা যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেঁচোর গুরুত্ব শেখাতে পারি, তবে তারা শুধু একটি প্রাণীকেই রক্ষা করবে না; তারা রক্ষা করবে মাটি, কৃষি, পরিবেশ এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ।
কেঁচো আমাদের চোখে ছোট হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির কাছে তার অবদান বিশাল। পৃথিবীর ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে এই ক্ষুদ্র প্রাণীর গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে। কারণ, মাটি যদি জীবন্ত থাকে, তবে কৃষি টিকে থাকবে; আর সেই জীবন্ত মাটির অন্যতম প্রধান প্রাণ হলো কেঁচো। কেঁচোকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং আমাদের কৃষি, পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত করা। কেঁচোকে অবহেলা করার সময় শেষ। এখন সময় তাকে নতুন করে মূল্যায়ন করার। কারণ, মাটি বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে; আর মাটি বাঁচানোর অন্যতম নায়ক এই ছোট্ট কেঁচো।
লেখক: পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]