ঢাকা ২২ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ক্রাউন প্লাজায় শুরু হচ্ছে গ্র্যান্ড আমেরিকান ফুড ফেস্টিভ্যাল নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য-সহিংসতা প্রতিরোধে সকলের দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি: ডেপুটি স্পিকার পাকুন্দিয়ায় বাস-পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ জনের মৃত্যু চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে নিখোঁজ কলেজ শিক্ষার্থী বাংলাদেশি সিনেমায় যুক্ত হলেন বলিউডের অনুরাগ কাশ্যপ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাদকবিরোধী ভূমিকা নিয়ে নাহিদ ইসলামের সমালোচনা ব্রাজিলের বিদায়ে মেহজাবীনের উল্লাস, মন ভেঙেছে সাফার ফরিদপুরে পৌর রাজস্ব সংগ্রহে পৌরসভার সঙ্গে ইউসিবির চুক্তি শেষ বিশ্বকাপের ঘোষণা রোনালদোর! দক্ষিণ ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানল, ঘরবাড়ি ছেড়েছেন হাজারো মানুষ সৃষ্টিকর্মে চিরকাল বেঁচে থাকবেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক জন-আকাঙ্ক্ষার বাইরে ক্ষমতায় থাকা যায় না উখিয়ায় টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দি ৫০ হাজার মানুষ প্রথম দৃষ্টিতেই ফুটে উঠুক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ব্যালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতে ফিফাকে তীব্র সমালোচনায় সেপ ব্লাটার এনআইডি-সংক্রান্ত জরুরি সেবা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করেছে ইসি এক মাসে ১০০ ধর্ষণ, শিশুর জন্য অনিরাপদ রাষ্ট্র! সিলেটে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত সামাজিক অবক্ষয় সমাজ ও রাষ্ট্রের নীরবতা সোনারগাঁয় ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির উদ্বোধন ফিফার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ উয়েফা টপ টেনে নেই ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির হালান্ড মাশরাফি-রুবেলকে ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড নাহিদ রানার গৌরীপুরে ১০ দিনে ৩ খুন: জনমনে আতঙ্ক অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি চলছে: ইসি মাছউদ King Lear and Three Daughters বিষয়ক Story Writing নিয়ে আলোচনা, ৯ম পর্ব, এইচএসসির ইংরেজি ১ম পত্র চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের ঝুঁকি, বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ চলমান সংকট রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে বিশ্ববাজারে কমেছে স্বর্ণের দাম রাবিতে ১০ লাখ টাকা বৃত্তি দেওয়ার আশ্বাস ভূমিমন্ত্রীর

সামাজিক অবক্ষয় সমাজ ও রাষ্ট্রের নীরবতা

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
সামাজিক অবক্ষয় সমাজ ও রাষ্ট্রের নীরবতা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

সমাজ পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনশীল সমাজে নিত্যনতুন সমস্যা এবং সম্ভাবনা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নদীর মতো প্রবাহমান থাকে। মানুষের জীবনে সমাজের বিকল্প নেই। সমাজ হচ্ছে অস্তিত্ব ও মানুষের বসবাসের যথার্থ রূপকল্প। আমরা যে পৃথিবীতে আছি এবং জীবন-যাপন করছি তার পরিচয়টি সমাজবদ্ধভাবে বসবাসের মাধ্যমে বিকাশিত হয়। সমাজবদ্ধভাবে জীবনযাপন করে মানুষ সমাজকে সমৃদ্ধ করে এবং নিজেও সৌভাগ্যের অধিকারী হয়। তবে সমৃদ্ধ মানবসমাজে সামাজিক অবক্ষয় হলে এবং নীতি-নৈতিকতা বিলীন হয়ে গেলে মানুষ অস্তিত্বসংকটে পড়ে।

আজ ভগ্ন সমাজের ভয়ংকর দিকগুলো নগ্নভাবে আমাদের সামনে উন্মোচিত। ভালোমন্দের মধ্যে বিচারিক ক্ষমতা, বিবেকবুদ্ধি ও চিন্তার স্বাধীনতা থাকার কারণে মানুষকে প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা হয় না। আর এজন্য সৃষ্টির বিস্ময় মানুষের সেবায় পৃথিবীর সবকিছু নিয়োজিত। তবে মানুষের ভয়ংকর ও কুৎসিত রূপ যখন তার নিজ সমাজের সম্মুখে প্রকাশিত হয়, তখন ওই সমাজের মানুষ তাকে চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে উপমা দিয়ে থাকে। কার্যক্ষেত্রে জন্তু-জানোয়ার থেকে আরও বেশি নিকৃষ্ট মনে করে। বর্তমানে নীতিহীনতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র দেখলে যেকোনো বিবেকবান মানুষ ভয়ে শিহরিত হয়ে গায়ের রক্তহিম হয়ে যাবে এবং অন্তরাত্মা কেঁপে উঠবে। 
মাত্র ২০০০ টাকার জন্য ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আয়েশা নামের একটি মেয়ে জোড়া খুন করে। সে জানায়, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে গৃহকর্মীর ব্যাগ থেকে দুই হাজার টাকা চুরি করেছিল। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, দারিদ্র্যের অভিশাপ তাকে পাপের দিকে টেনে এনেছে। অর্থের অভাব সব অনর্থের মূল বললেও অতিরঞ্জিত হবে না। কার্যত রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ করত, হয়তোবা এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত নাও হতে পারত। 

বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল তাদের মেয়ে ডাক্তার হয়ে মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে। কিন্তু বাবা-মায়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে, উল্টো মা-বাবাকেই ঘুমের ওষুধ সেবন করিয়ে নিষ্ঠুরভাবে নিজ হাতে হত্যা করে তাদের একমাত্র সন্তান। বলছি দেশজুড়ে আলোচিত ঘটনা পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে। আদালতের দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৫ সালে বাবা-মাকে হত্যার দায়ে ঐশীকে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। বয়স কম, অতীতে ফৌজদারি অপরাধ না থাকার কারণে এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচার-বিবেচনায় নিয়ে আদালত তার সাজা কমিয়ে দেয়। তবে এখানে বিচারপতির পর্যবেক্ষণে সামাজিক অবক্ষয় ও অধঃপতনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। মা-বাবা দুজনেই চাকরিরত থাকায় তাদের সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেনি। ফলে ঐশী একাকীত্ব ঘোচাতে খারাপ সঙ্গের পাল্লায় পড়ে নেশার জগতে প্রবেশ করে। রায়ে বলা হয়, মা-বাবাই সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষক। সুতরাং, সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত এবং সময় দেওয়া খুবই প্রয়োজন ছিল। মাদকদ্রব্যের সহলভ্যতা না থাকলে হয়তোবা ঐশীও ডাক্তার হয়ে মানবসেবাই করত। 

২৬ জুন, ২০১৯ সালে বরগুনা সরকারি কলেজের কাছে স্ত্রী মিন্নির সামনে তার স্বামী রিফাত শরীফকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। নয়ন বন্ডের নেতৃত্বে ‘বন্ড বাহিনী’ নামের কিশোর গ্যাং এ হত্যায় জড়িত ছিল। আর এই কিশোর গ্যাং মূলত রাজনীতিবিদদের ছত্রছায়ায় বরগুনা জেলায় মাদকসাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। মিন্নি অপরাজনীতি ও মাদকদ্রব্যের ব্যবসার কারণে স্বামী-সংসার হারিয়ে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে। তা না হলে, এখন হয়তোবা স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখেই থাকত। আমাদের দেশে এই জাতীয় ঘটনা অহরহ ঘটছে। সন্তানের হাতে বাব-মা, বাব-মায়ের হাতে সন্তান, স্বামীর হাতে স্ত্রী আবার স্ত্রীর হাতে স্বামী, ভাইয়ের হাতে ভাইসহ লোমহর্ষক খুনের ঘটনা ঘটছে।

সম্প্রতি ২৯ জুন কুমিল্লায় প্রেমিকার হাতে প্রেমিক খুন হয়। ঘটনা যদি এ পর্যন্ত থেমে থাকত তাহলে খুব বেশি আলোচনা হতো না। মাত্র ১৫ বছর বয়সী নাইমা এর আগে একবার গর্ভপাত করেছে। ঘটনার রাতে প্রেমিক ফয়সাল ও তার বন্ধুর সঙ্গে একত্রে রাত্র যাপন করে ফরিদপুরের মেয়ে নাইমা। এখানেই সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা ও গভীর ক্ষত আন্দাজ করে যেকোনো সমাজ সচেতন ব্যক্তি আঁতকে উঠবে। 

পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়ার ফলে একক পরিবারের প্রসার এবং সন্তানের প্রতি অভিভাবকদের উদাসীনতা ভঙ্গুর সমাজের আরেক রূপ বলা যায়। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে স্বামী-স্ত্রীকে, স্ত্রী-স্বামীকে অথবা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সহযোগিতায় একে অপরকে হত্যা করছে। ২০১৪ সালে পরকীয়া প্রেমিকের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় প্রতিবেশী দুই শিশু জসিম ও আরাফাতকে গলা কেটে হত্যা করেছিল কুমিল্লার ইয়াসমিন ও তার চাচিশাশুড়ি মাজেদা বেগম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সপরিবারে হত্যা করা হচ্ছে। সম্প্রতি ইতালিতে বাংলাদেশ কমিউনিটিতে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান সময়ে সন্তান ফেলে অন্যের হাত ধরে চলে যাওয়া এই ভঙ্গুর সমাজ স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়েছে।

সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা কতটা ধ্বংসাত্মক হলে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে প্রথমে ধর্ষণ এবং পরে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হতে পারে। ২০২৪ সালে মাগুরায় আট বছর বয়সী আছিয়াকে রামিসার মতো একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ২৬ সালের মার্চে সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরাকে ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত মাত্র চার মাসে ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে কমপক্ষে ৪৬ শিশু এবং ধর্ষণ-পরবর্তী ও ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে কমপক্ষে ১৭ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক খুনি কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত। মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে শিশু, যুবক এবং বৃদ্ধসহ সমাজের কোনো স্থর রক্ষিত নেই। বিশেষত, শিশু ও যুবসমাজ নেশায় বুঁদ হয়ে আছে।

বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ নেশাগ্রস্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং সরকারি যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ লাখের বেশি। ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় এ সংখ্যা ছিল ৩৬ লাখ। মাদকাসক্তদের বৃহৎ অংশ পুরুষ হলেও নারী ও শিশুর সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আংটাডের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদকের কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৫৯০০ কোটি টাকা পাচার হয়। যা মাদক ক্রয়বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থ পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম অবস্থানে আছে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩২টি সীমান্তবর্তী জেলা রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য চোরাচালানের রুট (পথ) গোল্ডেন ওয়েজ, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট, গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের খুব কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে গত চার দশকে অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রচলিত, অপ্রচলিত এবং বহুল ব্যবহৃত মাদক স্রোতের মতো ভেসে আসছে। দেশের প্রতিটি খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্যসহ অপরাধমূলক প্রায় সব কর্মকাণ্ডে মাদক ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

গণহারে এবং বাছবিচারহীনভাবে দেওয়া এ-প্লাস এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের মূল কারণ। করোনা-পরবর্তী ধ্বংসের মাত্রা আরও ঊর্ধ্বগামী হয়। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী পড়ালেখা পরিহার করে ভিডিও গেম এবং অনলাইনে নেভিগেশনে ব্যস্ত সময় পার করতে থাকে। বর্তমানেও এ ধারা অব্যাহত আছে। ফলে যুবসমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ধৈর্য এবং দেশপ্রেমের অভাব দেখা দিয়েছে। নৈতিক চরিত্রের অবলুপ্তির কারণে সমাজ থেকে শ্রদ্ধা, সৌজন্যবোধ ও শিষ্টাচার হারিয়ে যাচ্ছে। আর বর্তমান সমাজে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা বর্ণিত কারণের ফল মাত্র। মানুষের ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতা থাকলে এ জাতীয় ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে না। সামান্য অর্থের জন্যই অর্থলোভী ও কুচক্রী মহল দেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অবলীলায় ঠেলে দিচ্ছে। আর একটি রাষ্ট্র তখনই ধ্বংস হয়, যখন তার নাগরিকদের নৈতিকতার অধঃপতন ঘটে।

আফ্রো-আমেরিকান মানবাধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র সামাজিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের পতন ও নীতিহীনতার বিস্তার প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন–‘আমাদের সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো খারাপ মানুষের ভয়ংকর আচরণ বা নিষ্ঠুরতা নয় বরং মানুষের ভয়ংকর নীরবতা’। তার মন্তব্য সামাজিক অবক্ষয়ের ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রের নীরবতার বিপক্ষে স্পষ্ট অবস্থান। সততই বিতর্কিত বিষয়গুলো সমাজ ও রাষ্ট্র উপেক্ষা করে নির্ভার পানকৌড়ি হতে পারে না। সুতরাং রাষ্ট্রকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, খুন-ধর্ষণ বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ এবং বতর্মান ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। আর সামজিকভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর (মসজিদ, মন্দির, গির্জা ইত্যাদি) মাধ্যমে মাদক ও সামজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক
[email protected] 

ইনডোর প্লেগ্রাউন্ডগুলোর কাছে একজন মায়ের অনুরোধ

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম
ইনডোর প্লেগ্রাউন্ডগুলোর কাছে একজন মায়ের অনুরোধ
ছবি: সংগৃহীত

অনেক দিন ধরেই বিষয়টা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সময় হচ্ছিল না। গত কয়েক দিন জ্বর, ঠান্ডা, কাশি, গলাব্যথা ও শরীরব্যথা নিয়ে বাসায় বিশ্রামে থাকতে থাকতে ভাবলাম, এবার লিখেই ফেলি।

ঢাকা শহরে এখন বাচ্চাদের জন্য অনেক সুন্দর সুন্দর ইনডোর প্লেগ্রাউন্ড হয়েছে। খেলার মাঠ কমে যাওয়ায় আমরাও বাবা-মা হিসেবে বাচ্চাদের সেখানে নিয়ে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। অফিস শেষে আমারও চেষ্টা থাকে, সপ্তাহে অন্তত দুই-তিন দিন মেয়েকে নিয়ে একটু খেলতে যাওয়ার। কিন্তু একটি বিষয় আমাকে খুব কষ্ট দেয়।

প্রায় সব ইনডোর প্লেগ্রাউন্ডেই ঢুকলেই চোখে পড়ে রঙিন, কার্টুন দিয়ে সাজানো পেস্ট্রি, কেক, ফ্রেঞ্চফ্রাই ও নানা ধরনের জাঙ্কফুড। আবার বাইরে থেকে খাবার নেওয়াও নিষেধ।

সমস্যাটা শুধু খাবার বিক্রি করা নয়- সমস্যা হলো, ছোট্ট বাচ্চারা তো বোঝে না কোনটা স্বাস্থ্যকর আর কোনটা নয়। তারা যা দেখে, সেটাই চাইবে। তখন একজন বাবা-বা মায়ের জন্য ‘না’ বলা খুব কঠিন হয়।

মাসে এক বার বা দুই বার পেস্ট্রি খাওয়ানো এক কথা, কিন্তু যদি সপ্তাহে কয়েকবার সেখানে যেতে হয়, তাহলে কি প্রতিবারই বাচ্চাকে পেস্ট্রি বা জাঙ্কফুড কিনে দিতে হবে?

আমার মনে হয়, ইনডোর প্লেগ্রাউন্ডে অভিভাবকদের জন্য সাধারণ চা বা কফির ব্যবস্থা থাকলেই যথেষ্ট। কিন্তু সেখানে দেখা যায়, এক কাপ কফির দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, আর ছোট্ট একটি পেস্ট্রির দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এই দামগুলো সত্যিই অস্বাভাবিক। আমরা তো সেখানে খেতে যাই না, বাচ্চাদের খেলাতে নিয়ে যাই।

ইতোমধ্যেই দুই ঘণ্টা খেলার জন্য ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা প্রবেশমূল্য দিচ্ছি। এর পর যদি খাবারের জন্যও বাধ্য হয়ে আরও কয়েক শ টাকা খরচ করতে হয়, তাহলে বিষয়টি অনেক পরিবারের জন্য চাপ হয়ে যায়।

আমার অনুরোধ, ব্যবসা অবশ্যই করবেন। লাভও করবেন। কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি করবেন না, যেখানে বাবা-মাকে প্রতিবার বাচ্চার কান্নার কাছে হার মানতে হয়। স্বাস্থ্যকর কিছু স্ন্যাকস রাখতে পারেন, সাধারণ দামের চা-কফি রাখতে পারেন কিংবা বাবা-মাকে বাচ্চার জন্য ছোটখাটো স্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ে আসার অনুমতি দিতে পারেন।

আমরা চাই, আমাদের বাচ্চারা খেলুক, হাসুক, সুস্থ থাকুক। প্রতিবার খেলতে গিয়ে অস্বস্তি ও বাড়তি চাপ নিয়ে যেন ফিরতে না হয়।

আর কোনো বাবা-মায়ের কি একই অভিজ্ঞতা হয়েছে?

লেখক: সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ

আমেরিকা: ২৫০ বছরের স্বাধীনতার আলো, সংগ্রাম আর স্বপ্নের এক অনন্য ইতিহাস

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম
আমেরিকা: ২৫০ বছরের স্বাধীনতার আলো, সংগ্রাম আর স্বপ্নের এক অনন্য ইতিহাস
মোহম্মদ শরীফ

আজ ৪ জুলাই। স্বাধীনতার এমন একদিন, যা শুধু একটি জাতির জন্মদিন নয়; এটি স্বাধীনতার প্রতি মানুষের অদম্য আকাঙ্ক্ষা, গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার এবং সীমাহীন সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

১৭৭৬ সালে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্ণ করবে। আড়াই শতাব্দীর এই পথচলা কখনো সহজ ছিল না। যুদ্ধ, বিভাজন, অর্থনৈতিকসংকট, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং নানা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আজকের আধুনিক, শক্তিশালী ও উদ্ভাবনী আমেরিকার জন্ম হয়েছে।

আমেরিকার প্রকৃত শক্তি তার আকাশচুম্বী ভবন, প্রযুক্তি কিংবা সামরিক সক্ষমতায় নয়–এর প্রকৃত শক্তি তার মানুষ। প্রতিদিন ভোরে কাজে বেরিয়ে পড়া শ্রমিক, রোগীর সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্স, নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বিভোর শিক্ষার্থী, গবেষণাগারে কর্মরত বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষক এবং অসংখ্য নীরব কর্মীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে এই দেশ।

বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা অভিবাসীরা নিজেদের শ্রম, মেধা ও সততার মাধ্যমে আমেরিকাকে সমৃদ্ধ করেছেন। সেই ইতিহাসে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অবদানও অত্যন্ত গর্বের। তারা শুধু নিজেদের পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করছেন না, বরং শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও জনসেবার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

স্বাধীনতা শুধু একটি অধিকার নয়; এটি একটি দায়িত্ব। আইনকে সম্মান করা, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা, কঠোর পরিশ্রম করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরও সুন্দর সমাজ গড়ে তোলাই স্বাধীনতার প্রকৃত চর্চা।

আজ আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি সেই সব নারী-পুরুষকে, যাদের সাহস, আত্মত্যাগ ও দূরদর্শিতা স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে। একই সঙ্গে সম্মান জানাই আজকের সেই সব মানুষকে, যারা প্রতিদিন নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করে আমেরিকার অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছেন।

স্বাধীনতার ২৫০ বছরের এই গৌরবময় অধ্যায় আমাদের একটি শিক্ষা দেয়–যে জাতি পরিশ্রমকে সম্মান করে, আইনের শাসনকে ধারণ করে এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেয়, সেই জাতিই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দেয়।

আজকের এই বিশেষ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী বিশ্বের সব মানুষকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

শুভ স্বাধীনতা দিবস, আমেরিকা।

লেখক: রাষ্ট্রচিন্তক; সিলিকন ভ্যালি, আমেরিকা

ব্যাংক থেকে টাকা তুললেন? প্রতারকদের সুযোগ দেবেন না

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০১:১২ পিএম
ব্যাংক থেকে টাকা তুললেন? প্রতারকদের সুযোগ দেবেন না
রিয়াজুল হক

‎ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট নেই, এরকম মানুষ পাওয়া বেশ দুষ্কর। মেয়াদি আমানত, সঞ্চয়ী আমানত কিংবা চলতি আমানতের মাধ্যমে আমরা ব্যাংকে টাকা জমা রেখে থাকি। আবার বিভিন্ন সময় অনেকের নগদ টাকার প্রয়োজন হয়। তখন জমানো টাকা ব্যাংক থেকে উঠিয়ে নিই। টাকা উঠানোর পর নিরাপত্তাই হতে হবে অগ্রাধিকার। অসাবধানতার জন্য প্রতারকরা সুযোগ পেয়ে যায়। এজন্য আমাদের অবশ্যই কিছু সাবধানতা আমাদের নেওয়া উচিত।

১) ব্যাংক থেকে টাকা উঠানোর সময় নিজের কাউকে সঙ্গে রাখার চেষ্টা করুন। বয়স্ক মানুষ অবশ্যই সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনকে রাখবেন। তবে সঙ্গে কাউকে রাখতে গিয়ে ৭-৮ বছরের নাতি-নাতনিকে নিয়ে যদি ব্যাংকে যান, তবে সঙ্গে না নেওয়াই ভালো, কারণ তখন আপনাকে আপনার সেই অবুঝ নাতি-নাতনির দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে।

২) ক্যাশ কাউন্টার থেকে টাকা নেওয়ার পর প্রয়োজনে কাউন্টারের সামনেই টাকা গুনে নিন। একই টাকা বিভিন্ন জায়গায় বসে গোনার দরকার নেই। এতে আপনার নোটের সংখ্যা বাড়বে কিংবা কমবেও না। ক্যাশ কর্মকর্তারা আপনার সামনেই সাধারণত একবার হাতে টাকা গুনে দেখার পর কাউন্টার মেশিন দিয়ে টাকা চেক করে নেন।

৩) অনেকেই থাকেন টাকা গুনে দেখার পর আবার কাউন্টারে গিয়ে ১০০০ টাকার নোট খুচরা করে দেন, এই নোট পরিবর্তন করে দেন, জাল টাকা কিনা পরীক্ষা করে দেন ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সমস্যা নিয়ে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। টাকা ভাংতি নেওয়ার পর কিংবা অন্যান্য সমস্যা সমাধানের পর আবার টাকা সব টাকা গণনা শুরু করেন। এতে আপনি প্রতারক চক্রের চোখে পড়ে যেতে পারেন। কারণ এই ধরনের প্রতারক দ্বিধাগ্রস্থ কিংবা বয়স্ক মানুষকে বেশি টার্গেট করে।

৪) যতদূর সম্ভব ভিড়ের মধ্যে থাকবেন না। আপনাকে কেউ খেয়াল করছে কিনা কিংবা নিজে থেকে কেউ এসে পরিচিত হতে চাচ্ছে কিনা, লক্ষ্য রাখুন। ঠিক মতো কথার উত্তর না দিলে কে কি মনে করবে, এসব পাত্তা দেবেন না।

৫) ব্যাংকের ভেতর বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে ওঠা থেকে বিরত থাকুন। এই বাতিক কিছু মানুষের মধ্যে দেখা যায়। 

৬) টাকা-পয়সা নিয়ে ব্যাংকের ভিতর সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে থাকার চেষ্টা করুন। এতে আপনার ওপর যারা নজর রাখছেন কিংবা ব্যাংকের ভিতর আপনার সঙ্গে যারা কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে কেউ অপরাধী হলে পরবর্তীতে তাদের সনাক্ত করা সহজ হবে।

৭) যদি প্রয়োজন মনে করে করেন, টাকা উঠানোর পর কিভাবে বাসায়/নির্দিষ্ট স্থানে যাবেন, তবে তার জন্য আগে থেকে পরিবহনের ব্যবস্থা করে রাখতে পারেন।

৮) ব্যাংক থেকে টাকা উঠানোর পর আশেপোশে চা-বিস্কুট, নাস্তা খাওয়া, ঘোরাঘুরি থেকে বিরত থাকুন। সোজা নিজের গন্তব্যে চলে যান। এতে প্রতারক চক্র সহজে আপনাকে টার্গেট করতে পারবে না।

৯) টাকার পরিমাণ বেশি হলে পুলিশি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

‎প্রতারণার যে কত রকম ফের হতে পারে, তার কোনো ইয়াত্তা নেই। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। সহজ সরল মানুষগুলোই বিপদে পড়ে বেশি। কারণ তারা সাবধান থাকেন না। একটা মানিব্যাগ ছিনতাইয়ের জন্য একজন অন্যজনকে খুন, জখম করছে। মানিব্যাগে সর্বোচ্চ কত টাকা থাকতে পারে? ৩ হাজার বা ৫ টাকা। সামান্য এই টাকার জন্য ছিনতাইকারী যখন একজনকে আহত কিংবা হত্যা করে, তখন ব্যাংক থেকে বেশি টাকা নিয়ে যখন আপনি বের হবেন, তখন অবশ্যই সাবধানতা জরুরি।

লেখক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

এইচএসসির আগেই থেমে যাচ্ছে শিক্ষা

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম
এইচএসসির আগেই থেমে যাচ্ছে শিক্ষা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ শিক্ষার্থী। সংখ্যাটি বড়, কিন্তু এর পেছনে আরও বড় একটি সংখ্যা আছে–প্রায় সাড়ে ৫ লাখ। কারণ, দুই বছর আগে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত হয়েছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে এবার ফরম পূরণ করেছে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ। অর্থাৎ নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শেষ ধাপে এসে আর উপস্থিত নেই।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ঝরে পড়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু এই সংখ্যাটি স্বাভাবিক প্রবণতার সীমা অতিক্রম করেছে। গত বছর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। এক বছরের ব্যবধানে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ শতাংশে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এ হার ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৪৪ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ সমস্যাটি কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষা ধারার নয়, এটা সমগ্র মাধ্যমিকোত্তর শিক্ষাব্যবস্থার একটি কাঠামোগত সংকেত।

এই বাস্তবতাকে কেবল ‘পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। কারণ, একজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না মানে সে কেবল একটি পরীক্ষা মিস করছে তাই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ধারাবাহিকতা থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্নটি পরীক্ষা ব্যবস্থার নয়, বরং শিক্ষা ধরে রাখার সক্ষমতার।

শিক্ষা প্রশাসনের কাছে এখনো এই বিপুল সংখ্যক অনুপস্থিতির সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। তবে বিদ্যমান তথ্য কিছু কারণ নির্দেশ করে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের একটি অংশের ওপর পরিচালিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়েছে। অর্থাৎ বাল্যবিবাহ ছিল সবচেয়ে বড় একক কারণ। এটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মাধ্যমিকের পর মেয়েদের শিক্ষার ধারাক্রম ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন এখনো সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষে লিপ্ত।

অর্থনৈতিক কারণও সমানভাবে প্রভাব ফেলেছে। এসএসসি পাসের পর অনেক শিক্ষার্থী শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য একজন তরুণ সদস্যের সম্ভাব্য আয় প্রায়ই উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি লাভের চেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক ব্যয়ের চাপের সময়ে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধি। সরকারি কলেজে টিউশন ফি কম হলেও বাস্তবে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা এখন বই, কোচিং, প্রাইভেট টিউশন, যাতায়াত ও প্রযুক্তি ব্যয়সহ একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা অবৈতনিক হলেও বাস্তবে তা বহু পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মনস্তাত্ত্বিক চাপ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা এখনো উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের প্রধান নির্ধারক। ফলে যারা কাঙ্ক্ষিত ফলের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী নয়, তাদের একটি অংশ পরীক্ষা পেছানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিবও উল্লেখ করেছেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত বছরে পরীক্ষায় অংশ নেয় না এবং পরবর্তী বছর পরীক্ষায় বসার পরিকল্পনা করে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা আংশিক। কারণ, পরীক্ষা স্থগিতকারী শিক্ষার্থীদের কতজন পরবর্তীতে সত্যিই ফিরে আসে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্রটি কারিগরি শিক্ষায়। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলছে। কিন্তু যদি এই ধারার অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগেই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে দক্ষতা উন্নয়ন কৌশলের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে যে জনমিতিক সুবিধা বা demographic dividend-এর সম্ভাবনার কথা বলে, তার পূর্বশর্ত হলো শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণ জনগোষ্ঠী। শ্রমশক্তিতে প্রবেশের আগে বিপুলসংখ্যক তরুণ যদি উচ্চমাধ্যমিক স্তর সম্পন্ন করতে না পারে, তাহলে জনমিতিক সুবিধা প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতায় রূপ নাও নিতে পারে।
নীতিগতভাবে এ সমস্যাকে তিনটি স্তরে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

প্রথমত, নিবন্ধন থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কার্যকর ট্র্যাকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানে শিক্ষার্থী কখন এবং কেন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ডেটা নেই।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা নীতিকে সামাজিক নীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক উপবৃত্তি কর্মসূচি শিক্ষায় ধরে রাখার কৌশলের অংশ হওয়া উচিত।

তৃতীয়ত, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি হিসেবে না দেখে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মজীবনের প্রস্তুতির একটি ধাপ হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। কারণ, যে শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের কাছে প্রাসঙ্গিকতা হারায়, সেই ব্যবস্থায় ঝরে পড়া অনিবার্য হয়ে ওঠে।

সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি তাই কেবল শিক্ষা প্রশাসনের একটি পরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়। এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, শ্রমবাজার, নারী শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় প্রশ্ন।

এই শিক্ষার্থীরা কোথায় গেল, কেন গেল এবং তাদের কতজনকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব–এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে জরুরি কাজ হওয়া উচিত। কারণ, একটি শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য কেবল কতজন পরীক্ষায় অংশ নিল বা কতজন ভালো ফল করল, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত হয় কতজন শিক্ষার্থীকে শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবস্থার ভেতরে ধরে রাখা গেল, তার ওপর।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

কেঁচো: মাটির নীরব শ্রমিক, কৃষির অদৃশ্য নায়ক

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম
কেঁচো: মাটির নীরব শ্রমিক, কৃষির অদৃশ্য নায়ক
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

একটি উর্বর জমির সবচেয়ে পরিশ্রমী কৃষক কে? অনেকেই হয়তো বলবেন কৃষকই। কিন্তু কৃষকেরও আগে, দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করে এমন এক নীরব কর্মী রয়েছে, যার নাম কেঁচো (Earthworm)। আমরা যাকে অনেক সময় ঘৃণার চোখে দেখি বা তুচ্ছ প্রাণী বলে মনে করি, সেই কেঁচোই প্রকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীব। পৃথিবীর উর্বর মাটি, স্বাস্থ্যকর কৃষি, জৈব বর্জ্যব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কেঁচোর অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, বিখ্যাত বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন একে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Formation of Vegetable Mould through the Action of Worms-এ তিনি দেখিয়েছেন, কেঁচো ছাড়া উর্বর মাটির স্বাভাবিক বিকাশ কল্পনা করা কঠিন। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের জীবনমান এবং অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে সুস্থ ও উর্বর মাটির ওপর। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমরা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম প্রধান সহযোগী কেঁচোর গুরুত্ব সম্পর্কে খুব কমই সচেতন। আধুনিক কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, মাটির জৈব পদার্থের ঘাটতি, শিল্পবর্জ্য এবং পরিবেশদূষণের কারণে দেশের অনেক অঞ্চলে কেঁচোর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। এটি শুধু একটি জীবের সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা নয়; বরং মাটির স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ার একটি নীরব সংকেত।

কেঁচোকে বিজ্ঞানীরা ‘Ecosystem Engineer’ বা বাস্তুতন্ত্রের প্রকৌশলী বলে থাকেন। কারণ তারা মাটির ভেতরে অসংখ্য সুড়ঙ্গ তৈরি করে, যার মাধ্যমে বাতাস সহজে প্রবেশ করে এবং বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে পৌঁছাতে পারে। এতে মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে, গাছের শিকড় সহজে বিস্তার লাভ করে এবং মাটির গঠন উন্নত হয়। একটি সুস্থ মাটিতে কেঁচোর উপস্থিতি সেই মাটির জীবন্ত থাকার অন্যতম নির্দেশক।

কেঁচোর আরেকটি অসাধারণ অবদান হলো জৈব সার উৎপাদন। শুকনো পাতা, গাছের অবশিষ্টাংশ, গবাদিপশুর গোবর এবং রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য খেয়ে কেঁচো যে মল ত্যাগ করে, সেটিই ভার্মিকম্পোস্ট নামে পরিচিত। এই প্রাকৃতিক সারে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়ামসহ উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় নানা পুষ্টি উপাদান থাকে। একই সঙ্গে এতে প্রচুর উপকারী অণুজীব থাকে, যা মাটির জীবন্ত পরিবেশ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমে এবং কৃষি উৎপাদন আরও টেকসই হয়।

আজ বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ব্যস্ত, তখন কেঁচোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। স্বাস্থ্যকর মাটি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম। কেঁচো মাটিতে জৈব পদার্থের সঞ্চালন এবং মাটির গঠন উন্নত করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কার্বন সংরক্ষণে সহায়তা করে। একই সঙ্গে জৈব বর্জ্যকে দ্রুত পচিয়ে পুনরায় সম্পদে পরিণত করে, যা বর্জ্যব্যবস্থাপনায় একটি পরিবেশবান্ধব সমাধান।

বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জৈববর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্যের একটি বড় অংশ খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হয়, যা দুর্গন্ধ, রোগজীবাণু এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎসে পরিণত হয়। অথচ খুব সহজেই কেঁচোর সাহায্যে এসব জৈববর্জ্যকে উচ্চমানের জৈব সারে রূপান্তর করা সম্ভব। এতে একদিকে পরিবেশদূষণ কমবে, অন্যদিকে কৃষক স্বল্প খরচে মানসম্মত জৈব সার পাবেন।

বাস্তবতা হলো, আমরা এখনো কেঁচোর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারিনি। অধিক ফলনের আশায় অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে আমরা নিজেরাই মাটির জীবন্ত প্রাণকে ধ্বংস করছি। এর ফলে মাটির জৈব পদার্থ কমে যাচ্ছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। একসময় যে জমিতে সামান্য সার দিয়েই ভালো ফলন পাওয়া যেত, এখন সেখানে আগের তুলনায় অনেক বেশি সার প্রয়োগ করতে হচ্ছে। এটি মাটির অবনতিশীল স্বাস্থ্যেরই একটি লক্ষণ।

বর্তমান সময়ে টেকসই কৃষি এবং পুনর্জীবনশীল (Regenerative) কৃষি নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা হচ্ছে। এই কৃষিব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো জীবন্ত মাটি। আর জীবন্ত মাটির অন্যতম প্রধান কর্মী কেঁচো। তাই কৃষি উন্নয়নের পরিকল্পনায় কেঁচো সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করা, কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা, মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করা এবং গ্রাম পর্যায়ে ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের দাবি।

শুধু কৃষক নয়, সাধারণ মানুষও এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বাসাবাড়ির জৈববর্জ্য আলাদা করে ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি করা, অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিপণ্য ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে আমরা প্রত্যেকেই কেঁচো সংরক্ষণে অবদান রাখতে পারি।

আমাদের দেশের অধিকাংশ শিশু প্রথম কেঁচোকে দেখে ঘৃণা করতে শেখে, ভালোবাসতে নয়। বাড়িতে, স্কুলে কিংবা আশপাশের মানুষজন প্রায়ই কেঁচোকে ‘নোংরা’ বা ‘অপ্রীতিকর’ প্রাণী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে প্রাণীটি প্রতিনিয়ত মাটিকে উর্বর করছে, জৈববর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করছে এবং আমাদের খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তি শক্তিশালী করছে, তাকে আমরা যথাযথ গুরুত্ব দিই না।

জাতীয় শিক্ষাক্রমে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা থাকলেও কেঁচোর মতো মাটির উপকারী প্রাণীর পরিবেশগত ও কৃষিগত গুরুত্ব খুব সীমিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা কেঁচোকে একটি বৈজ্ঞানিক সম্পদ হিসেবে নয়, বরং একটি সাধারণ বা বিরক্তিকর প্রাণী হিসেবেই চিনে বড় হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে কেঁচোর ভূমিকা, মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, জৈব সার উৎপাদন এবং টেকসই কৃষির সঙ্গে এর সম্পর্ক আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। শুধু পাঠ্যবই নয়, বিদ্যালয়ভিত্তিক বিজ্ঞান ক্লাব, প্রকৃতি শিক্ষা কার্যক্রম, স্কুল-বাগান এবং ভার্মিকম্পোস্ট প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানোর সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। একটি শিশু যখন বুঝতে শিখবে যে কেঁচো তার প্রতিদিনের খাবার উৎপাদনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তখন সে আর কেঁচোকে ঘৃণা করবে না; বরং প্রকৃতির একজন নীরব সহযোগী হিসেবে মূল্যায়ন করবে।

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের কৃষিবিদ, পরিবেশবিদ, নীতিনির্ধারক এবং সচেতন নাগরিক। তাই তাদের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং মাটির জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। আমরা যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেঁচোর গুরুত্ব শেখাতে পারি, তবে তারা শুধু একটি প্রাণীকেই রক্ষা করবে না; তারা রক্ষা করবে মাটি, কৃষি, পরিবেশ এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ।

কেঁচো আমাদের চোখে ছোট হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতির কাছে তার অবদান বিশাল। পৃথিবীর ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে এই ক্ষুদ্র প্রাণীর গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে। কারণ, মাটি যদি জীবন্ত থাকে, তবে কৃষি টিকে থাকবে; আর সেই জীবন্ত মাটির অন্যতম প্রধান প্রাণ হলো কেঁচো। কেঁচোকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; বরং আমাদের কৃষি, পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত করা। কেঁচোকে অবহেলা করার সময় শেষ। এখন সময় তাকে নতুন করে মূল্যায়ন করার। কারণ, মাটি বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে; আর মাটি বাঁচানোর অন্যতম নায়ক এই ছোট্ট কেঁচো।

লেখক: পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]