সমাজ পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনশীল সমাজে নিত্যনতুন সমস্যা এবং সম্ভাবনা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নদীর মতো প্রবাহমান থাকে। মানুষের জীবনে সমাজের বিকল্প নেই। সমাজ হচ্ছে অস্তিত্ব ও মানুষের বসবাসের যথার্থ রূপকল্প। আমরা যে পৃথিবীতে আছি এবং জীবন-যাপন করছি তার পরিচয়টি সমাজবদ্ধভাবে বসবাসের মাধ্যমে বিকাশিত হয়। সমাজবদ্ধভাবে জীবনযাপন করে মানুষ সমাজকে সমৃদ্ধ করে এবং নিজেও সৌভাগ্যের অধিকারী হয়। তবে সমৃদ্ধ মানবসমাজে সামাজিক অবক্ষয় হলে এবং নীতি-নৈতিকতা বিলীন হয়ে গেলে মানুষ অস্তিত্বসংকটে পড়ে।
আজ ভগ্ন সমাজের ভয়ংকর দিকগুলো নগ্নভাবে আমাদের সামনে উন্মোচিত। ভালোমন্দের মধ্যে বিচারিক ক্ষমতা, বিবেকবুদ্ধি ও চিন্তার স্বাধীনতা থাকার কারণে মানুষকে প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা হয় না। আর এজন্য সৃষ্টির বিস্ময় মানুষের সেবায় পৃথিবীর সবকিছু নিয়োজিত। তবে মানুষের ভয়ংকর ও কুৎসিত রূপ যখন তার নিজ সমাজের সম্মুখে প্রকাশিত হয়, তখন ওই সমাজের মানুষ তাকে চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে উপমা দিয়ে থাকে। কার্যক্ষেত্রে জন্তু-জানোয়ার থেকে আরও বেশি নিকৃষ্ট মনে করে। বর্তমানে নীতিহীনতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র দেখলে যেকোনো বিবেকবান মানুষ ভয়ে শিহরিত হয়ে গায়ের রক্তহিম হয়ে যাবে এবং অন্তরাত্মা কেঁপে উঠবে।
মাত্র ২০০০ টাকার জন্য ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আয়েশা নামের একটি মেয়ে জোড়া খুন করে। সে জানায়, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে গৃহকর্মীর ব্যাগ থেকে দুই হাজার টাকা চুরি করেছিল। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, দারিদ্র্যের অভিশাপ তাকে পাপের দিকে টেনে এনেছে। অর্থের অভাব সব অনর্থের মূল বললেও অতিরঞ্জিত হবে না। কার্যত রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ করত, হয়তোবা এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত নাও হতে পারত।
বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল তাদের মেয়ে ডাক্তার হয়ে মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে। কিন্তু বাবা-মায়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে, উল্টো মা-বাবাকেই ঘুমের ওষুধ সেবন করিয়ে নিষ্ঠুরভাবে নিজ হাতে হত্যা করে তাদের একমাত্র সন্তান। বলছি দেশজুড়ে আলোচিত ঘটনা পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে। আদালতের দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৫ সালে বাবা-মাকে হত্যার দায়ে ঐশীকে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। বয়স কম, অতীতে ফৌজদারি অপরাধ না থাকার কারণে এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচার-বিবেচনায় নিয়ে আদালত তার সাজা কমিয়ে দেয়। তবে এখানে বিচারপতির পর্যবেক্ষণে সামাজিক অবক্ষয় ও অধঃপতনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। মা-বাবা দুজনেই চাকরিরত থাকায় তাদের সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেনি। ফলে ঐশী একাকীত্ব ঘোচাতে খারাপ সঙ্গের পাল্লায় পড়ে নেশার জগতে প্রবেশ করে। রায়ে বলা হয়, মা-বাবাই সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষক। সুতরাং, সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত এবং সময় দেওয়া খুবই প্রয়োজন ছিল। মাদকদ্রব্যের সহলভ্যতা না থাকলে হয়তোবা ঐশীও ডাক্তার হয়ে মানবসেবাই করত।
২৬ জুন, ২০১৯ সালে বরগুনা সরকারি কলেজের কাছে স্ত্রী মিন্নির সামনে তার স্বামী রিফাত শরীফকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। নয়ন বন্ডের নেতৃত্বে ‘বন্ড বাহিনী’ নামের কিশোর গ্যাং এ হত্যায় জড়িত ছিল। আর এই কিশোর গ্যাং মূলত রাজনীতিবিদদের ছত্রছায়ায় বরগুনা জেলায় মাদকসাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। মিন্নি অপরাজনীতি ও মাদকদ্রব্যের ব্যবসার কারণে স্বামী-সংসার হারিয়ে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে। তা না হলে, এখন হয়তোবা স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখেই থাকত। আমাদের দেশে এই জাতীয় ঘটনা অহরহ ঘটছে। সন্তানের হাতে বাব-মা, বাব-মায়ের হাতে সন্তান, স্বামীর হাতে স্ত্রী আবার স্ত্রীর হাতে স্বামী, ভাইয়ের হাতে ভাইসহ লোমহর্ষক খুনের ঘটনা ঘটছে।
সম্প্রতি ২৯ জুন কুমিল্লায় প্রেমিকার হাতে প্রেমিক খুন হয়। ঘটনা যদি এ পর্যন্ত থেমে থাকত তাহলে খুব বেশি আলোচনা হতো না। মাত্র ১৫ বছর বয়সী নাইমা এর আগে একবার গর্ভপাত করেছে। ঘটনার রাতে প্রেমিক ফয়সাল ও তার বন্ধুর সঙ্গে একত্রে রাত্র যাপন করে ফরিদপুরের মেয়ে নাইমা। এখানেই সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা ও গভীর ক্ষত আন্দাজ করে যেকোনো সমাজ সচেতন ব্যক্তি আঁতকে উঠবে।
পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়ার ফলে একক পরিবারের প্রসার এবং সন্তানের প্রতি অভিভাবকদের উদাসীনতা ভঙ্গুর সমাজের আরেক রূপ বলা যায়। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে স্বামী-স্ত্রীকে, স্ত্রী-স্বামীকে অথবা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সহযোগিতায় একে অপরকে হত্যা করছে। ২০১৪ সালে পরকীয়া প্রেমিকের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় প্রতিবেশী দুই শিশু জসিম ও আরাফাতকে গলা কেটে হত্যা করেছিল কুমিল্লার ইয়াসমিন ও তার চাচিশাশুড়ি মাজেদা বেগম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সপরিবারে হত্যা করা হচ্ছে। সম্প্রতি ইতালিতে বাংলাদেশ কমিউনিটিতে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান সময়ে সন্তান ফেলে অন্যের হাত ধরে চলে যাওয়া এই ভঙ্গুর সমাজ স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়েছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা কতটা ধ্বংসাত্মক হলে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে প্রথমে ধর্ষণ এবং পরে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হতে পারে। ২০২৪ সালে মাগুরায় আট বছর বয়সী আছিয়াকে রামিসার মতো একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ২৬ সালের মার্চে সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরাকে ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত মাত্র চার মাসে ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে কমপক্ষে ৪৬ শিশু এবং ধর্ষণ-পরবর্তী ও ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে কমপক্ষে ১৭ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক খুনি কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত। মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে শিশু, যুবক এবং বৃদ্ধসহ সমাজের কোনো স্থর রক্ষিত নেই। বিশেষত, শিশু ও যুবসমাজ নেশায় বুঁদ হয়ে আছে।
বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ নেশাগ্রস্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং সরকারি যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ লাখের বেশি। ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় এ সংখ্যা ছিল ৩৬ লাখ। মাদকাসক্তদের বৃহৎ অংশ পুরুষ হলেও নারী ও শিশুর সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আংটাডের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদকের কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৫৯০০ কোটি টাকা পাচার হয়। যা মাদক ক্রয়বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থ পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম অবস্থানে আছে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩২টি সীমান্তবর্তী জেলা রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য চোরাচালানের রুট (পথ) গোল্ডেন ওয়েজ, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট, গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের খুব কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে গত চার দশকে অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রচলিত, অপ্রচলিত এবং বহুল ব্যবহৃত মাদক স্রোতের মতো ভেসে আসছে। দেশের প্রতিটি খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্যসহ অপরাধমূলক প্রায় সব কর্মকাণ্ডে মাদক ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
গণহারে এবং বাছবিচারহীনভাবে দেওয়া এ-প্লাস এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের মূল কারণ। করোনা-পরবর্তী ধ্বংসের মাত্রা আরও ঊর্ধ্বগামী হয়। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী পড়ালেখা পরিহার করে ভিডিও গেম এবং অনলাইনে নেভিগেশনে ব্যস্ত সময় পার করতে থাকে। বর্তমানেও এ ধারা অব্যাহত আছে। ফলে যুবসমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ধৈর্য এবং দেশপ্রেমের অভাব দেখা দিয়েছে। নৈতিক চরিত্রের অবলুপ্তির কারণে সমাজ থেকে শ্রদ্ধা, সৌজন্যবোধ ও শিষ্টাচার হারিয়ে যাচ্ছে। আর বর্তমান সমাজে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা বর্ণিত কারণের ফল মাত্র। মানুষের ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতা থাকলে এ জাতীয় ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে না। সামান্য অর্থের জন্যই অর্থলোভী ও কুচক্রী মহল দেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অবলীলায় ঠেলে দিচ্ছে। আর একটি রাষ্ট্র তখনই ধ্বংস হয়, যখন তার নাগরিকদের নৈতিকতার অধঃপতন ঘটে।
আফ্রো-আমেরিকান মানবাধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র সামাজিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের পতন ও নীতিহীনতার বিস্তার প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন–‘আমাদের সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো খারাপ মানুষের ভয়ংকর আচরণ বা নিষ্ঠুরতা নয় বরং মানুষের ভয়ংকর নীরবতা’। তার মন্তব্য সামাজিক অবক্ষয়ের ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রের নীরবতার বিপক্ষে স্পষ্ট অবস্থান। সততই বিতর্কিত বিষয়গুলো সমাজ ও রাষ্ট্র উপেক্ষা করে নির্ভার পানকৌড়ি হতে পারে না। সুতরাং রাষ্ট্রকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, খুন-ধর্ষণ বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ এবং বতর্মান ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। আর সামজিকভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর (মসজিদ, মন্দির, গির্জা ইত্যাদি) মাধ্যমে মাদক ও সামজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।
লেখক: কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক
[email protected]