দক্ষিণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এতে হাজারো মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হয়েছে।
সোমবার (৬ জুলাই) দাবানলের ভয়াবহতা আগের চেয়েও বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে বিখ্যাত ট্যুর দ্য ফ্রান্স সাইকেল প্রতিযোগিতার একটি ধাপে দর্শক প্রবেশও নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ।
পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স ও গ্রিসে কয়েক শত দমকলকর্মী দাবানল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। এসব আগুনে ১৯ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমি পুড়ে গেছে। এর আয়তন নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের দ্বিগুণেরও বেশি।
এরই মধ্যে আবারও তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, অঞ্চলের কয়েকটি স্থানে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। সম্প্রতি রেকর্ড ভাঙা তাপপ্রবাহের ধাক্কা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি এই অঞ্চল।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পেরপিনিয়াঁ শহরের কাছে দুর্গম এলাকায় ছড়িয়ে পড়া ‘বিশাল’ দাবানল নিয়ন্ত্রণে ৭০০ দমকলকর্মী এবং বিশেষায়িত বিমান কাজ করছে। এ ঘটনায় ১০ হাজারের বেশি স্থানীয় বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রবল বাতাস, তীব্র গরম এবং অস্বাভাবিক শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে রবিবার ভোরের পর থেকে আগুনের বিস্তার প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। এতে ৪ হাজার ৬০০ হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে। আহত হয়েছেন একজন দমকলকর্মী ও একজন স্থানীয় বাসিন্দা।
নিজের পদবি প্রকাশে অনিচ্ছুক ত্রেভিয়াখ গ্রামের ৫৩ বছর বয়সী বাসিন্দা পাত্রিস বলেন, ‘আগুন বাড়িঘর থেকে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে চলে আসে। এত দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়বে, তা কল্পনাও করিনি। পরিস্থিতি আতঙ্কের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।’
৩০ বছর বয়সী শার্লট পিনিওল বলেন, রবিবার ভোরে যাদের প্রথমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তিনি তাদের একজন।
তিনি বলেন, ‘রাত সাড়ে ১০টার দিকে ধোঁয়া দেখতে পাই। এরপর ধীরে ধীরে তা আমাদের আরও কাছে চলে আসে। রাত ১টার দিকে সিটি হলের একজন এসে দরজায় কড়া নেড়ে আমাদের চলে যেতে বলেন।’
গত জুনের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের পরপরই এই দাবানল দেখা দিল। এটি ছিল ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপপ্রবাহ। এতে অতিরিক্ত কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিজ্ঞানীদের সংগঠন ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন জানায়, জলবায়ু পরিবর্তন না হলে এমন তাপপ্রবাহ ‘প্রায় অসম্ভব’ ছিল।
আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষ বলছে, এ বছরের গ্রীষ্মকালীন দাবানলের মৌসুম স্বাভাবিক সময়ের এক মাস আগেই শুরু হয়েছে।
ফরাসি ফায়ার সার্ভিসের কর্নেল এরিক বেলজিওইনো বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন এখন বাস্তবতা। আমরা এর পরিণতি ভোগ করছি। অথচ জুলাই মাসের শুরুই মাত্র।’
পিরেনিজ পর্বতমালার কাছে দাবানল এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দাবানলের বিরুদ্ধে লড়াই করা সদস্যদের জন্য মৌসুমটি দীর্ঘ হবে। আপনারা আমাদের সহযোগিতা করুন।’
এদিকে, ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ জানায়, সোমবার পিরেনিজ অঞ্চলে অনুষ্ঠিত ট্যুর দ্য ফ্রান্স সাইকেল প্রতিযোগিতার তৃতীয় ধাপ দর্শক ছাড়া আয়োজন করা হবে।
প্রতিযোগিতার এ ধাপে সাইক্লিস্টরা সোমবার স্পেন থেকে ফ্রান্সে প্রবেশ করবেন। আঞ্চলিক প্রিফেক্ট পিয়ের রেনো দ্য লা মোথ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফ্রান্সের অংশে শুধু প্রতিযোগী সাইক্লিস্ট এবং প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহন চলাচল করবে।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে রেসের পথ কিংবা গন্তব্যস্থলের কাছে না যাওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। অর্থাৎ, দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, অন্তত ফ্রান্সের অংশে এবার ট্যুর দ্য ফ্রান্স দর্শকশূন্যভাবেই অনুষ্ঠিত হবে।’
অপরদিকে, গ্রিসে সপ্তাহের শেষে উত্তরাঞ্চলীয় থেসালোনিকিতে বনাঞ্চলের আগুন ছড়িয়ে পড়ে দু’টি কারখানায়। এতে আশপাশের এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পাশাপাশি বাসিন্দাদের জানালা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোস্তা ব্রাভা উপকূলের কাছে লাগা আগুন দুই দিনে ২ হাজার ২০০ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়িয়ে দিয়েছে। দমকল বাহিনী জানায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আগুনের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা স্থানের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ আরও কঠিন হবে।
পর্তুগালে জরুরি সেবা বিভাগ জানায়, দেশটির উত্তরাঞ্চলে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর বন ও ঝোপঝাড় ধ্বংস করা দাবানলের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে।
এ ছাড়া ক্রোয়েশিয়ার হভার দ্বীপ ও আলবেনিয়ার তালে এলাকায় বড় ধরণের দাবানলে কয়েক শত হেক্টর বন, আঙুরখেত ও ঝোপঝাড় পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পর্তুগাল, স্পেন ও দক্ষিণ ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে আগামী কয়েক দিনের জন্য তাপপ্রবাহ সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা জানান, সোমবার শুরু হওয়া নতুন তাপপ্রবাহ উত্তর দিকে ছড়িয়ে পড়বে এবং আগামী সপ্তাহের শেষ দিক পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। সূত্র: এএফপি
নাঈম/