দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তাদের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’-এর নাম পরিবর্তন করে আবার ‘প্যাসিফিক কমান্ড’ করেছে। পেন্টাগনের দাবি, এটি কেবল আগের নামেই ফিরে যাওয়া। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিবর্তন কেবল নামের নয়; বরং এটি ওয়াশিংটনের বৃহত্তর কৌশলগত অগ্রাধিকারেরও একটি বার্তা।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কমান্ডটির নামের সঙ্গে ‘ইন্দো’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বোঝাতে চেয়েছিল, চীন তার প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ভারত হচ্ছে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অংশীদার। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলেছিলেন, নাম পরিবর্তনটি ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সংযোগের স্বীকৃতি।
ভারতের সংসদ সদস্য শশী থারুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন, ‘কোয়াডের কফিনে আরেকটি পেরেক?’
দক্ষিণ এশিয়ায় বদলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি
যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে এমন একটি যুগ থেকে বেরিয়ে আসছে, যখন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মাধ্যমে আঞ্চলিক নীতি পরিচালনার প্রবণতা ছিল। পাকিস্তানকে নিরাপত্তা-সংকট, বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্র এবং নেপালকে ভারতের নিরাপত্তাবলয়ের অংশ হিসেবেই দেখা হতো। ছোট দেশগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র বলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক জোরদার করছে। এসব দেশকে সক্ষমতা ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন স্বাধীন অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি স্নায়ুযুদ্ধের ধাঁচের জোট রাজনীতি নয়। বরং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে এমন অংশীদারত্ব গড়ে তোলা, যেখানে পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতা করা হবে, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী চীন, রাশিয়া, ভারত বা অন্য দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব হবে।
ভারতের ভূমিকা নিয়ে নতুন হিসাব
ভারতের কিছু কৌশলবিশারদ মনে করছেন, এ পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিকভাবে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে। ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে ভারতের অগ্রগতি ভবিষ্যতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারে। চীনের উত্থানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ওয়াশিংটন ভারতের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে না।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে
পাকিস্তানকে পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্ক এখন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির পাকিস্তানকে উপসাগরীয় পুঁজি, মার্কিন প্রযুক্তি এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনীতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
তামা, স্বর্ণসহ বিপুল খনিজ সম্পদ পাকিস্তানকে চীনের সরবরাহব্যবস্থার সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১৯ শতাংশ শুল্কহার এবং বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার মতো কূটনৈতিক সুবিধা পেয়েছে।
অন্যদিকে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের তীরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এটি উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র হওয়ার পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও অস্থিতিশীল মায়ানমারের কাছাকাছি হওয়ায় ওয়াশিংটনের আগ্রহ বাড়ছে।
বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিয়োগ, জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়াতে পারে, একই সঙ্গে চীনের কাছ থেকে সরঞ্জাম কেনা এবং ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যও চালিয়ে যেতে পারে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং মায়ানমারে নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র ভূমিকা নিলে ঢাকায় তাদের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
নতুন বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়া
অতীতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছিল ওয়াশিংটন। চীনের ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় অংশীদারত্ব ও নির্ভরতার সীমারেখা মুছে ফেলেছিল।
‘প্যাসিফিক কমান্ড’ নাম পুনর্বহাল সেই যুগের সমাপ্তি হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। বরং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এখন আরও বাস্তববাদী ও স্বার্থভিত্তিক হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়া এখন এমন এক ভূ-রাজনৈতিক পরিসরে পরিণত হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি দেশ নিজ নিজ স্বার্থে ভিন্ন ভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে। পাকিস্তান নিরাপত্তা ও খনিজ সম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করছে, একই সঙ্গে চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখছে। বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ালেও অন্য অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে।
‘ইন্দো’ শব্দটি বাদ দেওয়ার মাধ্যমে পেন্টাগন কেবল এমন একটি বাস্তবতাকেই স্বীকৃতি দিয়েছে, যা ইতোমধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে দৃশ্যমান। এখন এই অঞ্চলকে এখন একাধিক স্বাধীন শক্তির সমন্বয়ে গঠিত বহুমাত্রিক ভূ-রাজনৈতিক পরিসর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরা