৩ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এর মধ্যে চীন ঋণ হিসেবে দিয়েছে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তার পরও গুলশান, বনানী, বসুন্ধরা, ভাটারা, বাড্ডা, বারিধারা এলাকার বর্জ্য নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন বা স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণরূপে তৈরি হয়নি। ফলে প্ল্যান্টটি পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। সক্ষমতার অর্ধেক বর্জ্য পরিশোধন হচ্ছে।
লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আয় হচ্ছে না। তারপরও ২০২৭ সাল থেকে এই ঋণের কিস্তি টানতে হবে। এ ছাড়া বর্জ্যশোধনের নির্গত ধোঁয়া থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সম্ভাব্যতা যাচাই করার পরও পরিকল্পনায় ত্রুটি থেকে গেছে। আড়াই বছর আগে কাজ শেষ হলেও পরিবহনপুলে জমা হয়নি জিপগাড়ি, পিকআপ ও মোটরসাইকেল। দাশেরকান্দি পয়োশোধনাগার প্রকল্পটির এই হচ্ছে বাস্তব চিত্র। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম পয়োশোধনাগার ও দেশের প্রথম আধুনিক বড় আকারের শোধনাগার। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার মাত্র এক-চতুর্থাংশ বর্জ্য পরিশোধন করতে পারছে। রাজধানীর পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ঢাকা ওয়াসার মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে দাশেরকান্দি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ২৫ আগস্টে প্রকল্পটি অনুমোদন পায় একনেক সভায়।
২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়ন করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন খরচ ধরা হয় ৩ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের ঋণ ধরা হয় ২ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে খরচ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ হয়নি। দুই বার সংশোধন করে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। খরচও বাড়ানো হয় ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। পরে খরচ ধরা হয় ৩ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা।
প্রকল্পের প্রধান প্রধান কাজ ধরা হয় ৭৪ কোটি টাকা খরচ করে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট একটি, ট্রাংক স্যুয়ারেজ লাইন প্রায় ১০ কিলোমিটার ও স্যুয়ারেজ লিফটিং স্টেশন একটি। লক্ষ্য ছিল ঢাকা মহানগরীর জন্য পরিবেশসম্মত ও টেকসই পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জনসম্পদের দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং ঢাকা শহরের গুলশান, বারিধারা, কুড়িল, সংসদ ভবন এলাকা, ফার্মগেট, আফতাব নগর, হাতিরঝিল এলাকার সৃষ্ট পয়োবর্জ্য পরিশোধন করে বালু নদীতে নিষ্কাশিত করার মাধ্যমে পানি ও পরিবেশ দূষণ রোধ করা। এ ছাড়া সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ফেজ-১ ফেজ-২-এর ইনটেক পয়েন্টে শীতলক্ষ্যা নদীর পানির দূষণ কমানো।
এসব কাজ করার জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতের জন্য ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা খরচ করে একটি ডাবল কেবিন পিকআপ, একটি জিপ গাড়ি ও ৫টি মোটরসাইকেল কেনা হয়। আড়াই বছর আগে কাজ শেষ হয়েছে। তার পরও পরিবহন পুলে জমা দেয়নি এসব গাড়ি। ঢাকা ওয়াসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। পরামর্শকদের পেছনে খরচ করা হয় ২৫ কোটি টাকা। এভাবে বিভিন্ন খাতে ৩ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে শোধনাগার নির্মাণ শেষ হলেও প্রয়োজনীয় বর্জ্য সেখানে পৌঁছাচ্ছে না।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্ল্যান্টটির নকশাগত সক্ষমতা দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন লিটার (এমএলডি) বা ৬০ কোটি লিটার বর্জ্য পরিশোধনের। কিন্তু স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক অসম্পূর্ণ থাকায় বর্ষাকালে ৪৮০ এমএলডি ও শুষ্ক মৌসুমে এটি মাত্র ৩০০ এমএলডি সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বিপুল বিনিয়োগের পরও কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রত্যাশিত রাজস্বও অর্জিত হচ্ছে না। অথচ ২০২৭ সাল থেকে এই ঋণের কিস্তি দেওয়া শুরু হবে। অথচ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আয় হচ্ছে না। ফলে এই প্রকল্পটি ঋণের বোঝাস্বরূপ। প্রকল্প চালুর আগেই বর্জ্য সংগ্রহের লাইন তৈরি করা দরকার ছিল।
ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আগে থেকেই জানত। তারপরও নেটওয়ার্ক তৈরি না করে প্ল্যান্ট নির্মাণের কাজ শেষ করে, যা পরিকল্পনার বড় ধরনের অসংগতি। দীর্ঘ ৯ বছরে ৭৪টি অডিট আপত্তি তোলা হলেও মাত্র ২০টির নিষ্পত্তি হয়েছে। এখনো ৫৪টি আপত্তি অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। কাজের মান দেখভাল করার জন্য বছরে ৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) সভা করার কথা। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ২০ শতাংশ পিআইসি ও ১১ শতাংশ পিএসসি সভা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রামপুরা-বাড্ডা এলাকার পয়োলিফটিং স্টেশন ও দাশেরকান্দি প্ল্যান্টে কঠিন বর্জ্য পৃথক করে সংরক্ষণের যে ব্যবস্থা রয়েছে তার একটি অংশ অকেজো অবস্থায় থাকায় সেবাদান ব্যাহত হচ্ছে। হাতিরঝিল খালের পানির মান আগের তুলনায় উন্নত হলেও গুলশান-১ গুদারাঘাট এলাকা এখনো দুর্গন্ধের জন্য চলাচল কষ্টকর হচ্ছে। প্রথম প্রকল্প পরিচালক ছিলেন প্রকৌশলী মো. মোহসিন আলী মিয়া ও পরে প্রকৌশলী মো. মমতাজুর রহমান।
হাতিরঝিল উত্তর ও দক্ষিণ পাশের বিদ্যমান ১১টি স্পেশাল স্যুয়ারেজ ডাইভার্সন স্ট্রাকচার (এসএসডিএস) এর মাধ্যমে সংযুক্ত এলাকার পয়োবর্জ্য সরাসরি রামপুরা খালের মাধ্যমে বালু হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে নিষ্কাশনের পরিবর্তে এই প্ল্যান্টে শোধন করা হচ্ছে। ফলে বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি দূষণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
দুর্নীতিসংশ্লিষ্টদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) করার পরও পরিকল্পনায় ত্রুটি থেকে গেছে। ফলে এত টাকা খরচ করেও প্রকল্পটি প্রত্যাশিত কাজে আসছে না। ঘোড়ার আগে গাড়ি কেনা হয়েছে। এখানে দুর্নীতি হয়েছে। আসলে প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই যথাযথভাবে হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রকল্পের সঙ্গে যারাই
সংশ্লিষ্ট তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। তা না হলে অন্যরা আবার এভাবে অর্থের অপচয় করবেন।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আলমগীর হাছিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা একটা টেকনিক্যাল প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তাদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য নিতে সময় লাগবে।’