অফিস থেকে ছুটি নিয়ে কেউ ছিলেন ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে। আর কেউ ছিলেন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। কেউ ছিলেন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালের বিছানায়। কোনো কিছুতেই মন গলেনি ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের। কোনো ধরনের কারণ দর্শানো নোটিশ ছাড়াই ঢালাওভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. আবদুল মুমিন খবরের কাগজকে জানান, তিনি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ওমরাহ পালনের উদ্দেশে সৌদি আরব যান। দেশের বাইরে যাওয়ার পর হঠাৎ করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ২৩ সেপ্টেম্বর পরীক্ষার নোটিশ জারি করে। সবাইকে ২৭ সেপ্টেম্বরের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু তিনি সে সময় দেশে না থাকায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তিনি ওমরাহ পালন শেষে আসেন ৫ অক্টোবর এবং পরদিন অর্থাৎ ৬ অক্টোবর ফের কর্মস্থলে যোগ দেন। কিন্তু কোনো ধরনের কারণ দর্শানো ছাড়াই তাকে ৯ অক্টোবর চাকরিচ্যুত করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। অথচ কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, যারা পরীক্ষায় বসবেন এবং পাস করবেন তাদের চাকরি থাকবে। তবে কর্তৃপক্ষ তাকে পরীক্ষায় বসার সুযোগটুকুও দেয়নি।
রুমা আকতার নামে ইসলামী ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, তিনি মাইজদী শাখায় কর্মকর্তা পদে ২০১৯ সালে যোগ দেন। চাকরিচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন। গত বছরের ৫ অক্টোবর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। অথচ তার আগে তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন। তার ছুটি অনুমোদন হয় ২৩ সেপ্টেম্বর। ছুটি থেকে এসে তিনি জানতে পারেন তার চাকরি নেই। ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আজ ৯টা মাস আমার চাকরিটা নেই। অথচ ছুটিতে যাওয়ার আগে অনাগত সন্তান নিয়ে কত কিছুই না ভেবেছিলাম। তার জন্য কত কিছু করব। অথচ আমার বাচ্চা পৃথিবীতে আসার পর আমার চাকরি গেল। এখন বাচ্চার অতীব জরুরি চাহিদাগুলোও মেটাতে হিমশিম খাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘আমি আমার চাকরি ফেরত চাই। আমি কারও কাছে করুণা চাই না।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে আমার প্রশ্ন–কেন আমাকে চাকরিচ্যুত করা হলো? একজন কর্মকর্তা হিসেবে আজ আমি পরিবার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছি। আমার বাচ্চার খরচ চালাতে পারছি না। আমরা কি অবৈধ–এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিয়োগপত্র দিয়েছে বলেই তো যোগ দিতে পেরেছি। সুনামের সঙ্গে কাজ করেছি। এখন আমার সংসার কে চালাবে? আমি আমার ন্যায্য অধিকার ফেরত চাই।
আরেক ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুল জব্বার খবরের কাগজকে বলেন, তিনি ২০১৯ সালে ইসলামী ব্যাংকে যোগ দেন। সব ঠিকঠাক চলছিল। অফিসে সুনামের সঙ্গে কাজ করছিলেন। ২৪ সালের ২৪ নভেম্বর অফিসে যাওয়ার সময় তিনি মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন। সেই গাড়িতে তার স্ত্রীও ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী দুইজনই গুরুতর আহত হন। ওই দুর্ঘটনায় তাদের গাড়িতে থাকা এক আত্মীয় মারা যান। তার দুই পা ভেঙে যায়। মাথা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে মারাত্মক জখম হয়। এখনো তিনি এবং তার স্ত্রী ক্রাচে ভর দেওয়া ছাড়া হাঁটতে পারেন না। এরই মধ্যে তার কাছে চিঠি এসেছে চাকরিচ্যুতির। এর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তাদের দুজনের চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে তারা একপ্রকার নিঃস্ব এখন। বর্তমানে তার নিজের চিকিৎসা চালানোর সক্ষমতাও নেই। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে আছেন। চাকরিটাও চলে গেল। অন্য কোনো খাত থেকে উপার্জন নেই। মানবিক বিবেচনাটুকুও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ করেনি। অথচ তারা সবকিছু জানে। জেনেশুনে এমন অমানবিক সিদ্ধান্ত তারা বাস্তবায়ন করেছে।
চাকরিচ্যুত ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্ল্যাটফর্ম চিটাগাং অ্যালায়েন্সের মুখপাত্র ও আহ্বায়ক মোহাম্মদ মোক্তার রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, অসুস্থতা, ওমরাহ পালনসহ নানা কারণে অফিস থেকে ছুটি নেওয়া আরও অনেকেই আছেন, যারা জানতেন না তাদের চাকরি চলে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের অনেককে ছুটি থেকে এসে চাকরিতে যোগদানের সুযোগও দেয়নি। কেউ কেউ যোগদানের কয়েকদিনের মধ্যে চাকরি হারিয়েছেন। যা অমানবিক।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।