‘বাবলা ফুলে নাক-ছাবি তার,
গায় শাড়ি নীল অপরাজিতার,
চলেছি সেই অজানিতার
উদাস পরশ পেতে।’
কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘অ-কেজোর গান’-এর পঙ্ক্তিগুলো শুধু একটি ফুলের সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতির প্রতি কবির গভীর মুগ্ধতার প্রকাশ। সেই একই মুগ্ধতা যেন আজও পথিকের মনে দোলা দেয়। খুলনা থেকে মোংলার পথে যেতে যেতে রাস্তার ধারে হলুদ বাবলা ফুলে সেজে থাকা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো কবির সেই ‘উদাস পরশ’ আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। নজরুলের কল্পনার সেই বাবলা ফুল যেন বাস্তবের প্রকৃতিতেই আমাকে থামতে বাধ্য করল। দৃশ্যটা যেন কোনো জলরঙে আঁকা ছবি। রাস্তার ধারে বাবলা গাছগুলোর ডালপালায় যেন হলুদ হীরা মানিক জ্বলছে। প্রবল বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সে রূপের আধার। তেঁতুল পাতার মতো চিরল চিরল পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ফোটা ছোট্ট ছোট্ট কদমের মতো গোল গোল তুলির মতো ফুল, বাতাসে দুলে যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে পথিক ও মৌমাছিদের। গাছের ব্যাকগ্রাউন্ডে মাছের ঘের, দূরে গ্রামীণ বনভূমির কালচে-সবুজ প্রান্তরেখা। সে রেখা থেকে উঠে গেলে মেঘমাখা পাখিওড়া নীলাভ আকাশ।
মাছের ঘের পাহারা দেওয়ার জন্য সেখানে থাকা একটা ছোট্ট মাচান ঘর, জলে তার ছায়া পড়েছে। এ দৃশ্য যেকোনো শিল্পীর কাছেই মনোমুগ্ধকর, ইজেল আর রঙতুলি নিয়ে বসে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হতেই পারে। মন ভরে সে দৃশ্য ও বাবলা ফুলের ছবি তুললাম। কিছু ছবি বাতাসের ধাক্কায় ডি-ফোকাসড হয়ে গেল। কিছুই করার নেই। সে কারণেই তার মধ্যেও যেন আমি এক প্রকৃতির সুমধুর সুরধ্বনি শুনতে পেলাম–বাবলা পাতায় তানপুরার তানের মতো বাতাসের শন শন শোঁ শোঁ সেই উচ্চাঙ্গ সংগীতের সুর। প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে শিল্পী, আলোকচিত্রী, সংগীতজ্ঞ থাকবে আর কবি থাকবে না, তা কী করে হয়? কবি কাজী নজরুল ইসলামও যেন বাবলা ফুলের সে আহ্বান শুনতে পেয়েছিলেন, উদাস হয়েছিলেন সে আমন্ত্রণে। বাবলা ফুলের সে সৌন্দর্যে হয়তো কোনো গ্রাম্য তরুণীও সেদিন মুগ্ধ হয়ে আবদার করেছিলেন কবির কাছে–‘কুস্মী রঙ শাড়ি, চুড়ি বেলোয়ারি/ কিনে দে হাট থেকে, এনে দে মাঠ থেকে/ বাবলা ফুল, আমের মুকুল, নৈলে রাঁধব না, বাঁধব না চুল\’ বাবলা ফুলকে না পেলে তার কেমন অভিমান হতে পারে তা অনুমান করা যায় নজরুলের এ গানে।
গ্রামের বনজঙ্গলে, রাস্তার ধারে, বাঁধের উপরে গ্রীষ্মের শেষ থেকে শরৎ পর্যন্তই বাবলা ফুলের এ শোভা দেখা যায়। শহরে এ শোভা বিরল। বাবলা ফুলের শুধু কি শোভাই আছে? প্রাচীন শাস্ত্র অথর্ববেদে বাবলার নাম বর্ব্বুর। সে গাছটি সম্পর্কে একটি সুক্তে বলা হয়েছে–‘বর্ব্বুর পৃথিবীর রস শোষণ করেই জন্মগ্রহণ করছে। অর্থাৎ মরুস্থলেও সে জন্মগ্রহণ করে। একে জলসেচ দিতে হয় না। এর রস পৃথিবীর জঠরাগ্নিকেও শোষণ করে। অত্যগ্নি তাপ ও বহুঋতুর আবির্ভাবেও স্তব্ধতা প্রাপ্ত হয়ে রস পান করে।’ জলসেচ না, এর নিজের রসই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। খরা, শৈত্য, উষ্ণতা, লবণাক্ততা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা–সব প্রতিকূলতাকে জয় করে সে টিকে থাকে। কি বরেন্দ্রভূমি, কি মরুভূমি, কি উপকূলে নদীর পাড়, সব জায়গাতেই বাবলা যেন এক সর্বংসহা বৃক্ষ।
আবার আত্মরক্ষায়ও বাবলা ওস্তাদ। চারা গাছগুলো যাতে ছাগল-গরু মুড়ে খেতে না পারে, সেজন্য খুব বেশি কাঁটা গজায়। কাঁটাগুলো আলপিনের মতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাবলার কাঁটা আলপিনের মতো ব্যবহৃত হতো বলে শোনা যায়। এ গাছের অনেক ঔষধি গুণও আছে। বাবলার পঞ্চাঙ্গ (মূলের ছাল, গাছের ছাল, পাতা, ফুল ও ফল) একসঙ্গে নিয়ে তা আটগুণ পানিতে সিদ্ধ করে গলা পিচের মতো ঘনসার তৈরি করা হয় যা দাঁতের মাড়ি ফোলা, মচকা ব্যথা, প্রবল কাশি, প্রদর ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। কাঠ খুব শক্ত, তাই লাঙল আর গরুর গাড়ির চাকাও তৈরি করা হয় বাবলা কাঠ দিয়ে। এ গাছ যে বন্ধ্যা মাটিতে জন্মে, গাছের গুণে ধীরে ধীরে সে মাটিও উর্বর হয়ে ওঠে।
বাবলা একটি বহুবর্ষজীবী দ্রুত বর্ধনশীল চিরসবুজ প্রকৃতির বৃক্ষ। গাছ ৫ থেকে ২০ মিটার লম্বা হয়। প্রচুর ডালপালা হয় ও তরুণ গাছের ডালপালা তীক্ষ্ণ কাঁটায় ভরা, বয়স্ক গাছের কাণ্ডে কাঁটা থাকে না। বাকল ধূসর ও অমসৃণ, কাঠ শক্ত। চিরুনির দাঁতের মতো পত্রকগুলো পত্রদণ্ডের দুপাশে সাজানো থাকে, ঘনভাবে পাতাগুলো থাকে। বসন্তে নতুন পাতা গজায় ও গ্রীষ্ম থেকে হেমন্ত পর্যন্ত ফুল ফোটে। গোলাকার ছোট্ট বলের মতো পুষ্পমঞ্জরিতে অসংখ্য ফুল ফোটে, রং হলুদ। ফল শিমের মতো, খোসার রং ধূসর-সাদা, রোমশ। ফলের ভেতর বীজ থাকে। বীজ থেকে চারা হয়। বাবলার ইংরেজি নাম থর্ন মাইমোসা ও ইজিপশিয়ান একাশিয়া। ইংরেজিতে একে কেউ কেউ বাবুলও বলেন। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Vachellia nilotica (পূর্ব নাম Acacia arabica, Acacia nilotica) ও গোত্র ফ্যাবেসি।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ