ঢাকা ২০ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
মায়ানমারে বিমান হামলার আতঙ্কে টেকনাফ সীমান্তের মানুষ ঢাকার বাতাস আজ ‘সহনীয়’, দূষণের শীর্ষে কিনশাসা সহজ প্রতিপক্ষ বলা সমালোচকদের জবাব দিলেন স্কালোনি জুলাই শহিদদের স্মরণে আজ বিশেষ সভায় থাকবেন প্রধানমন্ত্রী কেপ ভার্দেকে প্রশংসায় ভাসালেন মেসি আদালতের রায়ে বদলে গেল চট্টগ্রাম-৪ এর রাজনৈতিক সমীকরণ তিব্বতের পতাকা নিয়ে জাতিসংঘের সামনে আত্মহত্যা বাড়ছে জমি নিবন্ধনের খরচ ভারতে ইনস্টাগ্রামে শিশু যৌন নির্যাতনের বিজ্ঞাপন অভিজ্ঞতার ঢাল, গতির তলোয়ার ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়ে যে বার্তা দিলেন মিশরের কোচ ইসলামী ব্যাংক: ছুটি থেকে এসে জানতে পারেন চাকরি নেই আরাগচি-গালিবাফকেও হত্যা করতে চেয়েছিল ইসরায়েল কষ্টার্জিত জয়ে আত্মসমালোচনায় মেসি চট্টগ্রামে রাজস্ব আদায়ে শীর্ষে জ্বালানি-গাড়ি আমদানি অপ্রতিরোধ্য ফ্রান্সের সামনে প্যারাগুয়ে মেসির আরও একটি নতুন ইতিহাস উদাস করা বাবলা ফুল ৪ জুলাই: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলে গ্রাহক ভোগান্তি ৪ জুলাই: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল কেপ ভার্দেকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা, মৌলভীবাজারে উল্লাস কানাডার ভরসা জোনাথন ডেভিড শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত, ম্যাচ কবে-কখন? ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে কানাডা, মরক্কোর চোখ আরও দূরে ৪ জুলাই  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি নাটকীয় ম্যাচে কেপ ভার্দেকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা অবিশ্বাস্য গোলে আবারও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সমতায় কেপ ভার্দে অতিরিক্ত সময়ে গড়াল আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দে ম্যাচ ভিএআর: আশীর্বাদ না অভিশাপ?

উদাস করা বাবলা ফুল

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
উদাস করা বাবলা ফুল
বাগেরহাটের মোংলার কাছে পথের ধারে ফোটা বাবলা ফুল। ছবি: লেখক

‘বাবলা ফুলে নাক-ছাবি তার,
গায় শাড়ি নীল অপরাজিতার,
চলেছি সেই অজানিতার
উদাস পরশ পেতে।’

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘অ-কেজোর গান’-এর পঙ্‌ক্তিগুলো শুধু একটি ফুলের সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতির প্রতি কবির গভীর মুগ্ধতার প্রকাশ। সেই একই মুগ্ধতা যেন আজও পথিকের মনে দোলা দেয়। খুলনা থেকে মোংলার পথে যেতে যেতে রাস্তার ধারে হলুদ বাবলা ফুলে সেজে থাকা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো কবির সেই ‘উদাস পরশ’ আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। নজরুলের কল্পনার সেই বাবলা ফুল যেন বাস্তবের প্রকৃতিতেই আমাকে থামতে বাধ্য করল। দৃশ্যটা যেন কোনো জলরঙে আঁকা ছবি। রাস্তার ধারে বাবলা গাছগুলোর ডালপালায় যেন হলুদ হীরা মানিক জ্বলছে। প্রবল বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সে রূপের আধার। তেঁতুল পাতার মতো চিরল চিরল পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ফোটা ছোট্ট ছোট্ট কদমের মতো গোল গোল তুলির মতো ফুল, বাতাসে দুলে যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে পথিক ও মৌমাছিদের। গাছের ব্যাকগ্রাউন্ডে মাছের ঘের, দূরে গ্রামীণ বনভূমির কালচে-সবুজ প্রান্তরেখা। সে রেখা থেকে উঠে গেলে মেঘমাখা পাখিওড়া নীলাভ আকাশ।

মাছের ঘের পাহারা দেওয়ার জন্য সেখানে থাকা একটা ছোট্ট মাচান ঘর, জলে তার ছায়া পড়েছে। এ দৃশ্য যেকোনো শিল্পীর কাছেই মনোমুগ্ধকর, ইজেল আর রঙতুলি নিয়ে বসে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হতেই পারে। মন ভরে সে দৃশ্য ও বাবলা ফুলের ছবি তুললাম। কিছু ছবি বাতাসের ধাক্কায় ডি-ফোকাসড হয়ে গেল। কিছুই করার নেই। সে কারণেই তার মধ্যেও যেন আমি এক প্রকৃতির সুমধুর সুরধ্বনি শুনতে পেলাম–বাবলা পাতায় তানপুরার তানের মতো বাতাসের শন শন শোঁ শোঁ সেই উচ্চাঙ্গ সংগীতের সুর। প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে শিল্পী, আলোকচিত্রী, সংগীতজ্ঞ থাকবে আর কবি থাকবে না, তা কী করে হয়? কবি কাজী নজরুল ইসলামও যেন বাবলা ফুলের সে আহ্বান শুনতে পেয়েছিলেন, উদাস হয়েছিলেন সে আমন্ত্রণে। বাবলা ফুলের সে সৌন্দর্যে হয়তো কোনো গ্রাম্য তরুণীও সেদিন মুগ্ধ হয়ে আবদার করেছিলেন কবির কাছে–‘কুস্মী রঙ শাড়ি, চুড়ি বেলোয়ারি/ কিনে দে হাট থেকে, এনে দে মাঠ থেকে/ বাবলা ফুল, আমের মুকুল, নৈলে রাঁধব না, বাঁধব না চুল\’ বাবলা ফুলকে না পেলে তার কেমন অভিমান হতে পারে তা অনুমান করা যায় নজরুলের এ গানে।

গ্রামের বনজঙ্গলে, রাস্তার ধারে, বাঁধের উপরে গ্রীষ্মের শেষ থেকে শরৎ পর্যন্তই বাবলা ফুলের এ শোভা দেখা যায়। শহরে এ শোভা বিরল। বাবলা ফুলের শুধু কি শোভাই আছে? প্রাচীন শাস্ত্র অথর্ববেদে বাবলার নাম বর্ব্বুর। সে গাছটি সম্পর্কে একটি সুক্তে বলা হয়েছে–‘বর্ব্বুর পৃথিবীর রস শোষণ করেই জন্মগ্রহণ করছে। অর্থাৎ মরুস্থলেও সে জন্মগ্রহণ করে। একে জলসেচ দিতে হয় না। এর রস পৃথিবীর জঠরাগ্নিকেও শোষণ করে। অত্যগ্নি তাপ ও বহুঋতুর আবির্ভাবেও স্তব্ধতা প্রাপ্ত হয়ে রস পান করে।’ জলসেচ না, এর নিজের রসই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। খরা, শৈত্য, উষ্ণতা, লবণাক্ততা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা–সব প্রতিকূলতাকে জয় করে সে টিকে থাকে। কি বরেন্দ্রভূমি, কি মরুভূমি, কি উপকূলে নদীর পাড়, সব জায়গাতেই বাবলা যেন এক সর্বংসহা বৃক্ষ। 

আবার আত্মরক্ষায়ও বাবলা ওস্তাদ। চারা গাছগুলো যাতে ছাগল-গরু মুড়ে খেতে না পারে, সেজন্য খুব বেশি কাঁটা গজায়। কাঁটাগুলো আলপিনের মতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাবলার কাঁটা আলপিনের মতো ব্যবহৃত হতো বলে শোনা যায়। এ গাছের অনেক ঔষধি গুণও আছে। বাবলার পঞ্চাঙ্গ (মূলের ছাল, গাছের ছাল, পাতা, ফুল ও ফল) একসঙ্গে নিয়ে তা আটগুণ পানিতে সিদ্ধ করে গলা পিচের মতো ঘনসার তৈরি করা হয় যা দাঁতের মাড়ি ফোলা, মচকা ব্যথা, প্রবল কাশি, প্রদর ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। কাঠ খুব শক্ত, তাই লাঙল আর গরুর গাড়ির চাকাও তৈরি করা হয় বাবলা কাঠ দিয়ে। এ গাছ যে বন্ধ্যা মাটিতে জন্মে, গাছের গুণে ধীরে ধীরে সে মাটিও উর্বর হয়ে ওঠে।

বাবলা একটি বহুবর্ষজীবী দ্রুত বর্ধনশীল চিরসবুজ প্রকৃতির বৃক্ষ। গাছ ৫ থেকে ২০ মিটার লম্বা হয়। প্রচুর ডালপালা হয় ও তরুণ গাছের ডালপালা তীক্ষ্ণ কাঁটায় ভরা, বয়স্ক গাছের কাণ্ডে কাঁটা থাকে না। বাকল ধূসর ও অমসৃণ, কাঠ শক্ত। চিরুনির দাঁতের মতো পত্রকগুলো পত্রদণ্ডের দুপাশে সাজানো থাকে, ঘনভাবে পাতাগুলো থাকে। বসন্তে নতুন পাতা গজায় ও গ্রীষ্ম থেকে হেমন্ত পর্যন্ত ফুল ফোটে। গোলাকার ছোট্ট বলের মতো পুষ্পমঞ্জরিতে অসংখ্য ফুল ফোটে, রং হলুদ। ফল শিমের মতো, খোসার রং ধূসর-সাদা, রোমশ। ফলের ভেতর বীজ থাকে। বীজ থেকে চারা হয়। বাবলার ইংরেজি নাম থর্ন মাইমোসা ও ইজিপশিয়ান একাশিয়া। ইংরেজিতে একে কেউ কেউ বাবুলও বলেন। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Vachellia nilotica (পূর্ব নাম Acacia arabica, Acacia nilotica) ও গোত্র ফ্যাবেসি।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ 

সুচালো মাথা ব্যাঙের কথা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:২১ এএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪০ এএম
সুচালো মাথা ব্যাঙের কথা
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কাঁঠালকান্দি এলাকায় দেখা সুচালো মাথা ব্যাঙ –ছবি লেখক

দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। সকালের দিকে আমিসহ চারজনের একটি দল বিরল ও দুর্লভ পাখি ও প্রাণীর সন্ধানে ঢাকা থেকে বাসে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার উদ্দেশে রওনা দিই। দুপুরের দিকে আমরা শ্রীমঙ্গল বাসস্টেশনে পৌঁছায়। এরপর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আদমপুর বাজারে এসে নামলাম। সেখানে সবজি ও ডিমের তরকারি দিয়ে পেট ভরে ধোঁয়া ওঠা ভাত খেলাম। গ্রামীণ বাজারে এর চেয়ে ভালো খাবার পাওয়া দুষ্কর। খাওয়া শেষে আরেকটি অটোরিকশায় করে কমলগঞ্জের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ওই বনের কাউয়ারগলা এলাকায় এসে নামলাম। কাউয়ারগলার টিলার ওপর বন বিভাগের ছোট্ট একটি রেস্ট হাউসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। তবে এখানে রান্নার কোনো ব্যবস্থা নেই, বাবুর্চিও নেই। তাই খাবার-দাবারের ব্যবস্থা হয়েছে স্থানীয় গাইড কাইয়ুমের বাসায়। 

খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলটা রেস্ট হাউসের পাশের গ্রামে কাটালাম। স্থানীয়দের সঙ্গে কথাবার্তা বললাম। ওদের সঙ্গে চা-নাশতা খেলাম। কিছু পাখি ও ফড়িংয়ের ছবিও তুললাম। রাতে রেস্ট হাউস থেকে বের হয়ে কাইয়ুমের বাসায় ডিনারের উদ্দেশে যাচ্ছিলাম। এ সময় ধানখেত থেকে বিভিন্ন ধরনের ডাক বা শব্দ ভেসে আসছিল। শব্দের উৎসের দিকে টর্চের আলো ফেলতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! নানা প্রজাতির ব্যাঙের যেন মেলা বসেছে! অন্তত চার প্রজাতির ব্যাঙের ছবি তুললাম।

৮ সেপ্টেম্বরের পুরোটা দিন আদমপুর বনের বিভিন্ন অংশে ঘুরে ২৫ প্রজাতির পাখি-প্রাণী-প্রজাপতি-কীটপতঙ্গের ছবি তুললাম। তৃতীয় অর্থাৎ শেষ দিন খুব সকালে রাজকান্দির পাশের কাঁঠালকান্দির উদ্দেশে রওনা হলাম। সকাল পৌনে ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রাজকান্দি ও কাঁঠালকান্দির অন্তত ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে হেঁটে ৩০ প্রজাতির পাখি-প্রাণীর ছবি তুললাম। দুপুর ১টা ৩২ মিনিটে কাঁঠালকান্দির একটি ছড়ায় হঠাৎ সরু মাথার ছিপছিপে এক ব্যাঙের দেখা পেলাম। মিশ্র চিরসবুজ বনের এই ব্যাঙটিকে বহুদিন ধরে খুঁজছিলাম। লাউয়াছড়া, কাপ্তাই, সাতছড়ি বা রেমা-কালেঙ্গার বনে অনেক খুঁজেও তাকে পাচ্ছিলাম না। তবে কাঁঠালকান্দিতে তার দেখা পেলাম। ক্যামেরায় মাত্র সাতটি ক্লিক করতেই সে একটি গর্তের ভেতর ঢুকে গেল। আমরা তাই সামনের দিকে পা বাড়ালাম। 

কাঁঠালকান্দিতে দেখা এই ব্যাঙটি এ দেশের এক বিরল প্রাণী সুচালো মাথা ব্যাঙ। এটি সরু মাথা ব্যাঙ, আসামের পানা ব্যাঙ বা সোনালি পাহাড়ি ব্যাঙ নামেও পরিচিত। মিশ্র চিরসবুজ পাহাড়ি বনের ব্যাঙটির ইংরেজি নাম Pointed-headed Frog, Pointed-nose Frog, Assam Hills Frog, Boulenger’s Frog বা High Altitude Frog। র‌্যানিডি (Ranidae) গোত্রের ব্যাঙটির বৈজ্ঞানিক নাম Clinotarsus alticola (ক্লিনোটারসাস অ্যালটিকোলা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মায়ানমার ও থাইল্যান্ডে এর দেখা মেলে। 

সরু মাথা ব্যাঙের আকার মাঝারি। দেহের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ২ থেকে ৫ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার। দেহ লম্বাটে ও ছিপছিপে। মাথা লম্বাটে ও নাক চোখা। চামড়া মোটামুটি মসৃণ। দেহের ওপরের রং হলদে বা সোনালি হলুদ, প্রায়ই তাতে কিছু গাঢ় দাগ থাকে। দেহতলের রং সাদাটে থেকে গাঢ় বাদামি। পা লম্বা ও ছিপছিপে। পায়ের আঙুল পুরোপুরি পাতার সঙ্গে যুক্ত। 

এরা মূলত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সিলেট বিভাগ) ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রাম বিভাগ) বাসিন্দা। পাহাড়ি জলাধারের পাশে বা পাহাড়ের ঢালে মাটিতে বাস করে। নিশাচর এ প্রাণীটি সচরাচর দিনের বেলা পাথরের নিচে বা গাছের গুঁড়ির ভেতর লুকিয়ে থাকে। সচরাচর একাকী দেখা যায়। কীটপতঙ্গ এদের প্রধান খাদ্য। তৃণলতা বা ঝোপের ওপর বসে থাকতে দেখা যায়।

সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর এদের প্রজননকাল। স্ত্রী ব্যাঙ আবদ্ধ পানিতে ডিম ছাড়ে। ডিম ফুটে লেজযুক্ত ব্যাঙাচি বের হতে এক থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। এ সময় এরা মাছের মতো ফুলকার সাহায্যে শ্বাসকার্য চালায়। প্রায় ১৪ সপ্তাহে রূপান্তরের মাধ্যমে সামনের ও পেছনের পা গজায় এবং ফুসফুস তৈরি হয়। একসময় ব্যাঙাচির লেজ খসে পড়ে এবং সে পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙে পরিণত হয়। এরা তিন থেকে ছয় বছর পর্যন্ত বাঁচে। 

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

নকশাদার উল্কি গান্ধিপোকা

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৫ এএম
নকশাদার উল্কি গান্ধিপোকা
চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায় সম্প্রতি দেখা উল্কি গান্ধিপোকা। ছবি: লেখক

চট্টগ্রাম শহরে এসে খানিকটা খোলা জায়গায় এক ঝোপঝাড়ের ভেতর একটি নকশাদার বা নকশা করা পোকার দেখা পাব, তা ভাবিনি। এ বছরের ৩ আষাঢ় সকালবেলা হাঁটতে গিয়ে চকবাজার এলাকায় হজরত ভোলা শাহ (র.) মাজার প্রাঙ্গণের ছোট পুকুরটার পাড়ে বুনোবেগুন কাকমাছি গাছের পাতায় পোকাটি দেখলাম।

পোকাটির ডানার রং ফ্যাকাশে লাল, এর মধ্যে কালো নকশাদার দাগ আছে। দাগগুলো দেখতে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি স্টার ওয়ার্সের ভিলেন ডার্থ মৌলের মুখের উল্কির মতো। সে কারণেই এ পোকার ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ডার্থ মৌল বাগ। দুই বঙ্গে এর কোনো বাংলা নাম খুঁজে পেলাম না। তাই ইংরেজি নামের সঙ্গে মিল বা তাৎপর্য বজায় রেখে এর বাংলা নামকরণ করা যেতে পারে ‘উল্কি গান্ধি’। 

পোকাটি প্রকৃত গান্ধি বা বাগজাতীয় পোকা, যারা বীজ থেকে রস চুষে খায়। এ জন্য কোনো কোনো দেশে এটি বীজের গান্ধিপোকা নামেও পরিচিত। হেমিপ্টেরা বর্গের এ পোকাটির প্রজাতিগত নাম Spilostethus hospes ও গোত্র লাইগেইডি। এ পোকা মূলত এশিয়া, ওশেনিয়া ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়ায় কখনো কখনো এ পোকাকে মিল্কউইড বাগ বলা হয়। কেননা সে দেশে এরা মিল্কউইড গাছের বীজ থেকে দুধ চুষে খায়। তবে আমেরিকায় প্রায় একই রকম দেখতে আরেক প্রজাতির মিল্কউইড বাগ দেখা যায়, যাকে বলে বড় মিল্কউইড বাগ। সেটি ভিন্ন প্রজাতির, কিন্তু এ দুটি পোকাই এক গোত্রের ও খাওয়ার ধরন একই।

পোকাটি বেশ ছোট বা মাঝারি আকারের, তবে উজ্জ্বল রঙের কারণে সহজে চোখে পড়ে। এরা ১০ থেকে ১৩ মিলিমিটার লম্বা হয়। সামনের ডানা ও মাথার রং ফ্যাকাশে কমলা বা লাল। এদের পা ছয়টি, শুঁড় দুটি এবং চোখ দুটি কালো। চোখ দুটির ঠিক পেছনেই থাকে প্রায় ত্রিকোণাকৃতির দুটি কালো দাগ। সেই দাগ দুটির প্রান্তদ্বয় গ্রীবায় ত্রিকোণাকৃতি স্কুটেলামের ওপর যুক্ত করেছে আরেকটি ত্রিকোণ দাগ। ত্রিকোণাকৃতি স্কুটেলামের মতো চাকতিই অন্য সব পোকার মধ্য থেকে সব গান্ধিপোকাকে আলাদাভাবে চেনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তার নিচে দুপাশের দুটি ডানায় তেরছা করে আছে দুটি ফ্যাকাশে চওড়া ব্যান্ডের মতো কালো দাগ ও দুটি গাঢ় কালো ফোটা। ডানার পেছন অংশ কালো। পেটের তলে সব খণ্ডেই রয়েছে আড়াআড়ি কালো দাগ বা ডোরা চিহ্ন। চোখ বড় ও গোলাকার। এদের পিঠের লাল-কালো নকশা সম্ভবত শিকারিদের সতর্কবার্তা দেয় যে তারা বিষাক্ত। আর তাদের কাছে এলে শিকারিরা ধরাশায়ী হবে। তবে লিঙ্গ, পরিবেশ ও খাদ্য ইত্যাদি কারণে এদের নকশা ও রঙের কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।

এর শুঁড় চারটি খণ্ডাংশবিশিষ্ট। এদের মুখগহ্বরে একটি ছিদ্রকারী চঞ্চু থাকে, যা দিয়ে তারা উদ্ভিদের রস চুষে খায়। এরা সাধারণত বর্ধনশীল অপরিপক্ব বীজের দুধরস খেতে বেশি পছন্দ করে। এর ফলে বীজ পুষ্ট হতে পারে না, নষ্ট হয়ে যায়। এদের বিভিন্ন ঘাস, নটেশাক ও ডাঁটার বীজ থেকে এদের রস চুষে খেতে দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় কস্টিক ভাইন, রেড-হেডেড কটন বুশ, সোয়ান প্ল্যান্ট ইত্যাদি গাছ থেকে এদের রস চুষে খাওয়ার কথা জানা গেছে। এরা শুধু বীজ না–পাতা, কাণ্ড, ফল ইত্যাদি থেকেও রস চুষে খায়। এর ফলে সেসব গাছের জীবনীশক্তি ও উৎপাদনশীলতা কমে যায়। 

মজার ব্যাপার হলো, এরা পাতায় বসে মিলনের জন্য সঙ্গীকে ডাকতে এক অদ্ভুত আচরণ করে, যা আমরা দেখতে পাই না। এরা পাতার মাধ্যমে কম্পন তৈরি করে নিজের প্রজাতির অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। মিলনের পর স্ত্রী পোকা পাতার ওপর গুচ্ছাকারে ডিম পাড়ে। তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।

বাচ্চাদের দেখতেও বড়দের মতো দেখায়, তবে ওদের ডানা ও জনন অঙ্গ থাকে না। বাচ্চা অবস্থায় ওরা তিন থেকে চার সপ্তাহ কাটায় এবং বড়দের মতোই গাছ, পাতা, ফলের রস খেয়ে বাঁচে। কয়েক দফায় খোলস বদলের পর ছানারা সাবালক হয়। প্রাপ্তবয়স্ক হলে ওদের খোলস শক্ত হয়, পাখা হয়, উড়তে পারে এবং প্রজননের জন্য সঙ্গীকে আহ্বান জানায়। প্রাপ্তবয়স্ক উল্কি গান্ধি ৩০ থেকে ৬০ দিন বাঁচে। তবে এদের জীবনে এক ট্র্যাজেডি আছে। প্রকৃতিতে পুরুষের চেয়ে মেয়ে পোকাই বেশি দেখা যায়। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা বেশ মজার এক তথ্য পেয়েছেন। 

গবেষণায় তারা দেখেছেন, পোকাদের জগতে এই একটিমাত্র জনগোষ্ঠীর পোকার পুরুষদের হত্যা করে একটি এন্ডোসিমবায়োটিক বা অন্তঃমিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া। এ কারণেই মেয়ে পোকার সংখ্যা বেড়ে যায়। সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এদের বেশি দেখা যায়।

বুনো উদ্ভিদ বেগুনি হুড়হুড়ে

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৮ এএম
বুনো উদ্ভিদ বেগুনি হুড়হুড়ে
ছবি: ময়মনসিংহ আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের পেছনে দেখা বেগুনি হুড়হুড়ে

বেগুনি হুড়হুড়ে আমাদের চারপাশের চেনা প্রকৃতির এক সুপরিচিত কিন্তু অবহেলিত আগাছাজাতীয় উদ্ভিদ। রাস্তার পাশে, পরিত্যক্ত জমিতে কিংবা ফসলের খেতের আইলে ছোট ছোট বেগুনি ফুলের এ গাছটি প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে। অবহেলায় বেড়ে উঠলেও এই গাছের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণাগুণ।

বেগুনি হুড়হুড়ের বৈজ্ঞানিক নাম Cleome rutidosperma, এটি Cleomaceae পরিবারের উদ্ভিদ। এটি ইংরেজিতে Blue Capparid, Fringed Spiderflower, Purple Cleome নামে পরিচিত। বেগুনি হুড়হুড়ে ক্রান্তীয় আফ্রিকা অঞ্চলের আদি উদ্ভিদ হলেও এটি বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বেগুনি হুড়হুড়ের ছবিটি গত ১৩ জুন ময়মনসিংহ আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের পেছন থেকে তুলেছি। 

বেগুনি হুড়হুড়ে একটি একবর্ষজীবী, খাড়া বা কিছুটা শায়িত ভেষজ উদ্ভিদ। উদ্ভিদটি সাধারণত ১৫ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার (প্রায় ১ থেকে ২.৫ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর কাণ্ড নরম, সবুজ এবং বহু শাখাবিশিষ্ট। কাণ্ডের গায়ে সূক্ষ্ম লোম এবং ছোট ছোট নরম কাঁটা বা খাঁজ দেখা যায়, যা একে খসখসে ভাব দেয়। এর পাতাগুলো যৌগিক এবং ত্রিপত্রক (Trifoliate)। অর্থাৎ একটি বোঁটায় তিনটি করে ছোট পাতা বা ফলক থাকে। পাতাগুলোর আকৃতি ডিম্বাকার বা ল্যান্সের মতো (Lanceolate)। পাতার কিনারা মসৃণ বা সামান্য খাঁজকাটা হতে পারে এবং পাতার উপরিভাগ ও নিচের পিঠে হালকা লোম থাকে।

এই উদ্ভিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর ফুল। ফুলগুলো আকারে বেশ ছোট এবং এর রং হালকা বেগুনি থেকে নীলচে-বেগুনি হয়ে থাকে। প্রতিটি ফুলে ৪টি পাপড়ি থাকে, যা ওপরের দিকে ডানা মেলার মতো করে সাজানো থাকে।

ফুল থেকে ৪টি দীর্ঘ পুংকেশর বাইরের দিকে বের হয়ে থাকে, যা দেখতে কিছুটা মাকড়সার পায়ের মতো দেখায়। এই কারণেই একে ‘স্পাইডার ফ্লাওয়ার’ বলা হয়। সাধারণত সারা বছরই, বিশেষ করে বর্ষাকালের ভ্যাপসা গরমে এই গাছে ফুল ফুটতে দেখা যায়। ফুল ফোটার পর গাছে সরু, লম্বাটে এবং ক্যাপসুল আকৃতির ফল (Pod) হয়। ফলগুলো দেখতে অনেকটা ছোট সর্ষের ছড়ার মতো। ফল পরিপক্ব হলে ফেটে যায় এবং ভেতর থেকে অসংখ্য ছোট, কালচে-বাদামি বা কালো রঙের বীজ ছিটকে বের হয়। এই বীজের গায়ে সূক্ষ্ম দাগ বা খাঁজ (Ridges) থাকে।

আগাছা হিসেবে গণ্য হলেও লোকজ চিকিৎসায় বেগুনি হুড়হুড়ের ব্যবহার রয়েছে। এর পাতার রস কান পাকা রোগ, কানের ব্যথা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশের বাতের ব্যথা উপশমে ব্যবহার করা হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনয়েড ও ফেনোলিকের উপাদান রয়েছে, যা শক্তিশালী অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এর পাতার নির্যাসে ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী (Antibacterial) গুণাগুণও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এর পাতার রস জৈব বালাইনাশক হিসেবে কিছু ক্ষতিকারক পোকা দমনে ব্যবহার করা যায়।

প্রকৃতির বুকে কোনো সৃষ্টিই বৃথা নয়–বেগুনি হুড়হুড়ে তার অন্যতম বড় প্রমাণ। পথের পাশে এই অতি সাধারণ গাছটি যেমন তার হালকা বেগুনি ফুলের হাসিতে আমাদের চারপাশকে সুন্দর করে তোলে, তেমনি এর ভেতরের ঔষধি গুণ মানব কল্যাণে ভূমিকা রাখে। একে স্রেফ আগাছা না ভেবে এর গুণাগুণ সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ওরে শুভ্রবসনা রজনীগন্ধা

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৯:০৮ এএম
ওরে শুভ্রবসনা রজনীগন্ধা
রমনা উদ্যানে ফোটা রজনীগন্ধা ফুল –ছবি লেখক

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটা বিরহের গানে রজনীগন্ধার রিক্ত রূপের মধ্যে যেন ফুটে উঠেছে এক প্রচণ্ড হাহাকার, শুভ্রতার আড়ালে থাকা নীল কষ্ট- ‘ওরে শুভ্রবসনা রজনীগন্ধা বনের বিধবা মেয়ে,/ হারানো কাহারে খুঁজিস নিশীথ-আকাশের পানে চেয়ে।’

রজনীগন্ধা ফুলকে কবি নজরুল তুলনা করেছেন বনের বিধবা মেয়ে হিসেবে যে আসলে সাথিহীন, নিরন্তর তার ফুটে ওঠা হয়তো কোনো সাথির খোঁজে। রমনা উদ্যানের নার্সারির ভেতরে গিয়েও দেখলাম রজনীগন্ধার সেই নিঃসঙ্গতাকে। দক্ষিণপূর্ব কোণে এক ফালি বেডে কয়েক সারি রজনীগন্ধা ফুলের গাছ। তবে সেখানে কোনো গাছে ফুল নেই, শুধু একটা গাছের মাঝখান থেকে পাতা ডিঙিয়ে যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে এক ডাটি ফুল। গ্রীষ্মের এক সকালে রজনীগন্ধা ফুলের সেই একটি মঞ্জরিকে দেখেই মনে হলো- ‘চাহিছে আকাশ আনত-নয়ন সুন্দর তব চোখে,/ রজনী-গন্ধা তব মুখে চেয়ে বিকালে কানন-লোকে।’ নজরুলের এ কথাগুলো ব্যক্ত হয়েছে তার প্রার্থনা কবিতায়। কিন্তু সে কবিতাটি কোনো গ্রন্থেই নেই, (অপ্রকাশিত)।

রাতে ফোটে আর গন্ধটাও তার তীব্র, মনমাতানো সৌরভ আর প্রস্ফুটন কালের বিবেচনায় ওর নাম রাখা হয়েছে রজনীগন্ধা। রাতে সে ফুল চোখে না দেখলেও বোঝা যায় যে, বাগানে রজনীগন্ধা ফুল ফুটেছে। সেটি কবি নজরুল ইসলাম বেশ কয়েকবারই টের পেয়েছিলেন। শিউলিমালা গল্পে মুখার্জীর সঙ্গে দাবা খেলতে বসেছিলেন যে ঘরটাতে সে বাড়ির বর্ণনা দিতে গিয়েও তিনি রজনীগন্ধাকে টেনে এনেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘লেক-রোডের পাশে ছবির মতো বাড়িটি। শিউলির সাথে রজনীগন্ধার গন্ধ-মেশা হাওয়া মাঝে মাঝে হলঘরটাকে উদাস-মদির করে তুলছলি!’ আর তাতে যে তাদের দাবাখেলার ব্যাঘাত ঘটছিল সে কথা বলতেও তিনি ভোলেননি। ফুলের গন্ধের এমনই ক্ষমতা!

রজনীগন্ধা একটি কন্দজাতীয় বহুবর্ষজীবী বীরুৎ শ্রেণির গাছ। মাটির নিচে থাকা কন্দ বা পেঁয়াজের মতো মোথা থেকে এর গাছ জন্মে। পাতা সরু ও লম্বা। পাতাগুলো গোড়া থেকে চারদিকে ফোয়ারার জলধারার মতো ছড়িয়ে থাকে। পাতা ৩০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার লম্বা, কিছুটা স্থূল বা পুরু, ফিকে সবুজ। পাতাগুলোর মাঝ থেকে লম্বা একটি ডাটি বা কাঠির মতো শক্ত পুষ্পমঞ্জরির শীষে কয়েকটা ফুল পর্যায়ক্রমে পার্শ্বীয়ভাবে ফোটে। প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার লম্বা মঞ্জরিদণ্ডের মাথায় ২৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার স্থানজুড়ে ছোট ছোট কলিকার মতো ফুল সারিবদ্ধভাবে ফোটে। মঞ্জরিদণ্ডের নিচের ফুলগুলো আগে ফোটে ও ধীরে ধীরে ওপরের কুঁড়িগুলো ফোটে। ফুল ছোট কলিকার মতো, সুগন্ধযুক্ত, ধবধবে সাদা রঙের। লম্বা সবুজ ডাঁটায় ৬০টি পর্যন্ত ফুল ফুটতে পারে। 

সাদা মোমের মতো নলাকার ফুলের পাপড়ি মুখের কাছে প্রসারিত ও ছয়টি খণ্ডে বিভক্ত। পুষ্পনলের মধ্যে থাকে ছয়টি পুরুষকেশর ও তিন-ভাগযুক্ত একটি গর্ভমুণ্ড। এসব হলো সেসব ফুলের কথা যেগুলোর পাপড়ি থাকে এক স্তরে। বহুস্তরী পাপড়ির ডবল রজনীগন্ধা ফুলও আছে। সেসব জাতের ফুল বড়, কিন্তু ফুলের ঘ্রাণ কম, যা এ দেশে ‘ভুট্টা রজনীগন্ধা’ নামে পরিচিত। সম্প্রতি উদ্ভিদ প্রজননবিদদের কল্যাণে গোলাপি ও কমলা ফুলের রজনীগন্ধার জাত এ দেশে এসেছে। শোনা গেছে, অন্য দেশে নাকি লাল, হলুদ ও সবুজ রঙের রজনীগন্ধা ফুলও আছে। এবার বোধহয় রজনীগন্ধার বিধবা পরিচয় ঘুচবে। এ দেশে এখন যশোরের একটি বেসরকারি সংস্থা বাণিজ্যিকভাবে এসব জাত চাষের জন্য নিয়ে এসেছে বলে জানা গেছে। সাদা ফুলের সিঙ্গেল ও ডবল জাতের রজনীগন্ধা এখন দেশের অনেক স্থানেই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে।

কলিকার মতো নলাকার ফুল আর গোলাপের মতোই সুগন্ধ। তাই রজনীগন্ধার ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে টিউবরোজ। তবে উদ্ভিদতাত্ত্বিকরা বলেন, এ গাছের মাটির নিচে থাকা স্ফীত টিউব বা কন্দ থেকে এ ফুল জন্মে বলেই এর নাম হয়েছে টিউবরোজ। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Polianthes tuberosa ও গোত্র অ্যাসপ্যারাগাসি। রজনীগন্ধা মধ্য ও দক্ষিণ মেক্সিকোর গাছ। ১৭ শতক থেকে রজনীগন্ধা ফুল সুগন্ধী দ্রব্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তৎকালীন ফরাসি রানিও সে সুগন্ধী ব্যবহার করতেন।

নজরুলের বেশ কয়েকটি গান, কবিতা ও গল্পে রজনীগন্ধা ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রায় সবক্ষেত্রেই এ ফুলকে তিনি প্রতীক করেছেন মানুষের ব্যথার সঙ্গে। ব্যথার দান বইয়ে ঘুমের ঘোরে গল্পটিতেও সে দৃশ্যকল্পটি এক অপার্থিব ঐন্দ্রজালিক মোহ তৈরি করে- ‘মদি খোশবুর মাদকতায় মলিকা-মালতীর মঞ্জুল মঞ্জরিমালা মলয় মারুতকে মাতিয়ে তুলেছিল উগ্র রজনীগন্ধার উদাস সুবাস অব্যক্ত অজানা একটা শোক-শঙ্কায় বক্ষ ভরে তুলেছিল।’ 

আইরিশ কবি অস্কার ওয়াইল্ড ১৮৮৫ সালে এক পত্রে লিখেছিলেন- ‘এটা শুনে আমি অত্যন্ত মর্মাহত যে, রজনীগন্ধা ফুলকে দলা-পাকানো ফুল বলে নামকরণ করা হয়েছে। এটি মোটেও দলা-পাকানো নয়, আর যদি তা হতোও, কোনো কবির এতটা হৃদয়হীন হওয়া উচতি নয় যে, তিনি এমন কথা বলবেন। এখন থেকে প্রতিটি শব্দের দুটি ব্যুৎপত্তি থাকা আবশ্যক–একটি কবির জন্য এবং অন্যটি বিজ্ঞানীর জন্য।’

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

বর্ষার জলমোরগ

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০৮:২৭ এএম
বর্ষার জলমোরগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরের চরইল বিলের ধানখেতের ওপর উড়ন্ত পুরুষ জলমোরগ। ছবি: লেখক

২৯ জুন ২০১৮ সালের ঘটনা। অতি বিরল সোনাজঙ্ঘা (Painted Stork), খুন্তে বক (Eurasian Spoonbill) ও মাঝারি পানকৌড়ির (Indian Cormorant) ছবি তোলার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভারত সীমান্তবর্তী রহনপুরের চরইল বিলে এসেছি। পুরো সকালটা অরুণ মাঝির নৌকায় চড়ে বিলের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে বিরল পাখিগুলোর ছবি তুললাম। এরপর রহনপুর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক মাশওয়ারুল হক জিকেন ভাইয়ের মাছের খামার কাম আম বাগানে দুপুরের খাবারের আতিথ্য গ্রহণ করলাম। পেটপুরে মজাদার খাবার খেয়ে আবারও অরুণ মাঝির নৌকায় চড়ে বিলে নামলাম। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে অপেক্ষায় আছি নতুন বা বিচিত্র কোনো পাখির দেখা পাই কি না। এমন সময় ধানখেতের ভেতর থেকে মাথায় লাল শিরস্ত্রাণযুক্ত একটি পাখি উড়াল দিল। সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার শাটার গর্জে উঠল। খানিকটা পথ উড়ে পাখিটি মাটিতে নেমে মুহূর্তের মধ্যেই ঝোপের ভেতর যেন হাওয়া হয়ে গেল। যদিও বেশ দূর থেকে ক্লিক করলাম, কিন্তু ছবি একেবারে খারাপ হলো না। ত্রিশ বছর আগে বাগেরহাট জেলার ফকিরহাটের সাতশৈয়া গ্রামে প্রথম এই প্রজাতির একটি স্ত্রী পাখির ছবি তুলেছিলাম। ছেলেবেলায় আব্বার কাছে শুনেছিলাম এই পাখিকে পোষ মানিয়ে একই প্রজাতির বুনো পাখি ধরা হতো। গ্রামের অনেকেই এ কাজ করতেন। তবে বন্যপ্রাণী আইনে বুনো পাখি ধরা ও পোষা নিষিদ্ধ। 

রহনপুরের চরইল বিলের ধানখেতে হাওয়া হয়ে যাওয়া পাখিটি আর কেউ নয়, এ দেশের এক দুর্লভ আবাসিক পাখি জলমোরগ। এগুলো কোড়া বা বন কোড়া নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Watercock বা Kora। র‌্যালিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম গ্যালিক্রেক্স সিনেরিয়া। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন এবং ফিলিপিন্সসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই পাখিটির দেখা মিলে।  

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও স্ত্রী জলমোরগের দেহের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৪২-৪৩ ও ৩৬ সেন্টিমিটার। ওজন যথাক্রমে ৩০০-৬৫০ ও ২০০-৪৩৪ গ্রাম। পুরুষ ও স্ত্রী পাখির পালকের রং একনজরে বাদামি। দেহের উপরটায় গাঢ় বাদামির ওপর হলদে রঙের ছোপ দেখা যায়। দেহের নিচের অংশে হলদের ওপর সরু বাদামি ডোরা থাকে। মাথার চাঁদি কালচে-বাদামি। কপালের সামনের ত্রিকোণাকার বর্মটি হলদে। চোখ ও চঞ্চু হলদে। লেজ খাটো ও আঙুল লম্বা। পা ও আঙুলের রং সবুজাভ। কিন্তু প্রজননকালে পুরুষের পালকের রং ধূসরাভ-কালো হয়ে যায়। দেহের উপরটায় ধূসর ও হলদে ছিট-ছোপ দেখা যায়। কপালে দেখা দেয় লাল টুকটুকে খাড়া বর্ম। চোখ ও চঞ্চুর রং হয় লালচে। পা ও আঙুল হয় সবুজাভ-লালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে বড়গুলোর মতোই; তবে দেহতল লালচে-পীত। 

জলমোরগ হাওর, বিল, নলবন, জলাভূমি, প্লাবিত ধানখেত বা ঘাসবনে বিচরণ করে। অতি লাজুক পাখিটি দিবাচর হলেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কারণ এরা লুকিয়ে লুকিয়ে চলাফেরা করে। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। ভোরবেলা ও গোধূলিলগ্ন ছাড়াও বাদলা দিনে বেশ সক্রিয় থাকে। পানিতে ভাসমান আগাছায় বা ধানখেতে হেঁটে হেঁটে জলজ উদ্ভিদের বীজ ও গোড়া, ধান, খোলকজাতীয় প্রাণী, কীটপতঙ্গ, ছোট মাছ ইত্যাদি খায়। ‘উটুম্ব-উটুম্ব-উটুম্ব...’ স্বরে ডাকে।

আষাঢ় অর্থাৎ জুন থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় পুরুষ পাখি নিজের সীমানা রক্ষা করতে অন্য পুরুষের সঙ্গে মারামারিও করতে পারে। নলবন, ভাসমান ধানগাছ বা জলাভূমির ঝোপঝাড়ে ধানগাছ বা ঘাস দিয়ে গোলাকার বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৫-৬টি। রং হলদে বা লালচে-বাদামি ছিটছোপসহ সাদা, ফ্যাকাশে বা ইট লাল। স্ত্রী একাই ডিমে তা দেয়। ডিম ফুটে ছানা বেরোতে ২৩ দিন সময় লাগে। ছানারা বাসা থেকে নেমে যখন মায়ের পেছন পেছন হেঁটে যায়, তখন দেখতে বেশ লাগে। আয়ুষ্কাল কমবেশি পাঁচ বছর। 

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর