বিশ্বকাপ ফুটবলের শেষ ষোলোর মঞ্চে শনিবার (৪ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের এনআরজি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে মরক্কো ও কানাডা। ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে বিভোর কানাডা, অন্যদিকে ২০২২ বিশ্বকাপের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে আরও একবার গভীর পথচলার প্রত্যয়ে মরক্কো। সব মিলিয়ে জমে উঠেছে শেষ ষোলোর এই লড়াই।
কানাডার জন্য এবারের বিশ্বকাপ ইতোমধ্যেই স্মরণীয়। প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে উঠে এসে তারা অর্জন করেছে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ নকআউট জয়। শেষ বত্রিশের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে জেসি মার্শের দল। ম্যাচের অধিকাংশ সময় দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস এবং রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় আটকে ছিল কানাডা। তবে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে মিডফিল্ডার স্টিফেন ইউস্তাকিউও দূরপাল্লার নিখুঁত শটে জয়সূচক গোল করে কানাডাকে উল্লাসে ভাসান।
পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথমার্ধেই কানাডা প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে ১০০টিরও বেশি চাপ তৈরি করেছিল। ২০১০ সালের পর বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে সর্বোচ্চ সংখ্যক চাপ। আক্রমণাত্মক প্রেসিং, দ্রুত ট্রানজিশন এবং অবিরাম চাপ সৃষ্টি; এই তিন অস্ত্রই কানাডার প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি টানা ছয় ম্যাচে গোল করার ধারাও আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে দলটির।
তবে মরক্কোর সামনে কানাডার অতীত রেকর্ড মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। দুই দলের আগের চার দেখায় কানাডা জিতেছে মাত্র একবার, হেরেছে তিনবার। বিশেষ করে ২০২২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে মরক্কোর কাছে ২-১ গোলে হারের স্মৃতি এখনো তাজা। সেই ম্যাচে মরক্কোর ডিফেন্ডার নায়েফ আগুয়ের্ড-এর আত্মঘাতী গোলই ছিল কানাডার একমাত্র সান্ত্বনা।
অন্যদিকে মরক্কো আবারও প্রমাণ করছে, ২০২২ সালের সেমিফাইনালে ওঠা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। শেষ বত্রিশে নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে হারিয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছে অ্যাটলাস লায়ন্সরা। নির্ধারিত ১২০ মিনিটে গোলশূন্য থাকার পর পেনাল্টিতে ডাচদের হারায় তারা।
ডাচদের বিপক্ষে মরক্কোর বল দখল ও পাসিং ছিল চোখে পড়ার মতো। পুরো ম্যাচে তারা ৮০১টি সফল পাস দিয়েছে। ডাটা সংরক্ষণ শুরুর পর বিশ্বকাপে স্পেন ছাড়া আর কোনো দল এক ম্যাচে ৮০০-এর বেশি পাস করতে পারেনি। এই পরিসংখ্যানই বোঝায়, আফ্রিকার প্রতিনিধিরা এখন শুধু কাউন্টার অ্যাটাকনির্ভর দল নয়; বল নিয়ন্ত্রণেও তারা সমান দক্ষ।
মরক্কোর আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে তাদের সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতা। গত বছর আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে সেনেগালের কাছে হারের পর টানা ৯ ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে তারা। বিশ্বকাপ নকআউটের দুটি আলাদা আসরে ম্যাচ জেতা প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবেও ইতিহাস গড়েছে মরক্কো।
দলীয় খবরেও দুই শিবিরে রয়েছে বাড়তি আগ্রহ। কানাডার সবচেয়ে বড় আলোচনার নাম আলফনসো ডেভিস। বায়ার্ন মিউনিখের এ তারকা দীর্ঘ বিরতির পর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন। কোচ হেসে মার্শচ জানিয়েছেন, মরক্কোর বিপক্ষে তাকে শুরুর একাদশেও দেখা যেতে পারে। যদিও বাঁ প্রান্তে রিচি লারইয়ার খেলার সম্ভাবনাই বেশি। আক্রমণে জোনাথন ডেভিডের সঙ্গী কে হবেন, তা নিয়েও ভাবনায় কোচিং স্টাফ।
মরক্কো শিবিরেও সামান্য দুশ্চিন্তা ছিল সেন্টার-ব্যাক চাদি রিয়াদকে নিয়ে। নেদারল্যান্ডস ম্যাচে চোট পেয়ে উঠলেও তিনি দ্রুত পূর্ণ অনুশীলনে ফিরেছেন। ফলে কোচ মোহামেদ ওয়াহবি প্রায় পূর্ণশক্তির দলই পাচ্ছেন। বিশেষ নজরে থাকবেন ইসমায়েল সাইবারি।
কানাডার কোচ হেসে মার্শচ বলেন, আমরা ইতিহাস গড়েছি কিন্তু এখানে থামতে চাই না। খেলোয়াড়রা প্রমাণ করেছে তারা বড় মঞ্চে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। মরক্কো দুর্দান্ত দল, তবে আমরা বিশ্বাস করি তাদের হারানো সম্ভব।
দলটির অধিনায়ক স্টিফেন ইউস্তাকিউও বলেন, ‘মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচটি শুধু নকআউট ম্যাচ নয়। এটি আমাদের জন্য আরও একবার প্রমাণ করার সুযোগ।’ মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি বলেন, কানাডা শক্তিশালী দল। তারা অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য শেষ ষোলো নয়, আরও দূরে।
মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি বলেন, ‘প্রতিটি নকআউট ফাইনালের মতো। আমরা জানি আফ্রিকার কোটি সমর্থক আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এই সমর্থন আমাদের ভালো খেলতে সহায়তা করবে।’
ম্যাচটির লড়াই তাই দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের। কানাডা খেলবে উচ্চ-তীব্রতার প্রেসিং ও দ্রুত আক্রমণে, আর মরক্কো চাইবে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে সুযোগ তৈরি করতে। ইতিহাস, পরিসংখ্যান ও অভিজ্ঞতায় মরক্কো কিছুটা এগিয়ে থাকলেও কানাডার নির্ভীক ফুটবল তাদের বড় চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে হিউস্টনের রাতটি হতে যাচ্ছে দারুণ উত্তেজনার। মরক্কো কি আফ্রিকার স্বপ্ন আরও দূরে নিয়ে যাবে, নাকি কানাডা লিখবে নতুন রূপকথা- সেই উত্তর মিলবে শেষ ষোলোর এই বহুল প্রতীক্ষিত মহারণে।