মাঠের সবুজ ঘাসে বুটের গতি আর গ্যালারির গগনবিদারী চিৎকার—ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই টানটান উত্তেজনা। কিন্তু এই মাঠের লড়াইয়ের বাইরেও কখনো কখনো এমন কিছু মানবিক ও আধ্যাত্মিক গল্প তৈরি হয়, যা সীমানা পেরিয়ে ছুঁয়ে যায় কোটি মানুষের হৃদয়। চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন ও মুসলিম উম্মাহ সাক্ষী হলো এমনই এক অভূতপূর্ব ঘটনার। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের তারকা ফরোয়ার্ড টেটে ইয়ঙ্গি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। আর এই যাত্রায় তার সঙ্গী হয়েছেন বিশ্বখ্যাত ইসলামিক স্কলার মুফতি মেঙ্ক।
বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াডে ডাক পাওয়ার ঠিক আগের কথা। নিজের শহর এডিলেইডের একটি মসজিদে জুময়ার নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলেন টেটে ইয়ঙ্গি। সেখানেই আকস্মিকভাবে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রিয় ইসলামিক দাঈ মুফতি মেঙ্ক। নামাজ শেষে মুফতি মেঙ্কের সাথে কুশল বিনিময় ও করমর্দন করার সময় তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। মুফতি মেঙ্ক যখন মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, শাহাদাহ পাঠ করা হয়েছে কি না?—ইয়ঙ্গি আর মুহূর্তকালও দ্বিধা করেননি। পরম শ্রদ্ধায় মুফতি মেঙ্কের হাত ধরে কালিমা শাহাদাহ পাঠ করে জীবনের এক নতুন ও পবিত্রময় অধ্যায়ের সূচনা করেন এই উদীয়মান ফুটবলার।
পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ২৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার জানান, ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি কোনো আকস্মিক আবেগ বা হঠকারী সিদ্ধান্ত ছিল না। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি ইসলামের জীবনবিধান, অনুশাসন ও সৌন্দর্যের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হচ্ছিলেন। মসজিদে মুফতি মেঙ্কের সাথে সেই দেখা হওয়াটা যেন তার ভেতরের সুপ্ত ইচ্ছাকেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক ঐশ্বরিক উসিলা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ধর্মীয় জীবনের এই নতুন আলো যেন টেটে ইয়ঙ্গির মাঠের পারফরম্যান্সকেও আরও সমৃদ্ধ করেছে। ১.৯৭ মিটার উচ্চতার এই দীর্ঘকায় ফরোয়ার্ড বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দলের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বিশ্বকাপের মূল আসরে নামার ঠিক আগে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে অভিষেক হয় তার। আর অভিষেক ম্যাচেই দুর্দান্ত এক গোল করে দলের ড্র নিশ্চিত করে নিজের আগমনী বার্তা জানান দেন জাপানি ক্লাব 'মাচিদা জেলভিয়া'-তে খেলা এই ফুটবলার।
চলমান বিশ্বকাপেও জাতীয় দলের কোচ টনি পপোভিকের আস্থার প্রতিদান দিয়ে চলেছেন তিনি। গ্রুপ পর্বের কঠিন লড়াইয়ে তুর্কীর বিপক্ষে ২৪ মিনিট এবং প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ৭ মিনিট মাঠে থেকে দলের আক্রমণে দারুণ ধার দেখিয়েছেন তিনি। গতি আর নিখুঁত ড্রিবলিং দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রাখতে ও দলের জয়ে ভূমিকা রাখতে তিনি এখন মরিয়া।
নিজের নতুন ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে ভীষণ গর্বিত ও উছ্বসিত টেটে ইয়ঙ্গি। তিনি বিশ্বাস করেন, ইসলাম তাকে মানসিক শান্তি ও জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। বিশ্বমঞ্চের এই বিশাল প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে নিজের সততা, খেলোয়াড়সুলভ আচরণ ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর সামনে ইসলামের প্রকৃত, শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর রূপ ফুটিয়ে তুলতে চান এই অজি তারকা।
ক্রীড়াবিদদের ব্যক্তিগত জীবন ও বিশ্বাসের রূপান্তর সবসময়ই ভক্তদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। টেটে ইয়ঙ্গির এই আধ্যাত্মিক রূপান্তরও ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে এক নতুন পজিটিভ বার্তার জন্ম দিয়েছে, যা চলমান বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা এক অফ-ফিল্ড গল্প হিসেবে টিকে থাকবে বহুদিন।
