উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স যে রূপে হাজির হয়েছে, তাতে দলটিকে অপ্রতিরোধ্য বলতে দ্বিধা করছে না কেউই। ২০১৮ বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রফি ঘরে তোলা দলটি ২০২২-এ আর্জেন্টিনার কাছে শিরোপা হারায়। তবে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে সেদিন রূপকথার মতো লড়াই উপহার দিয়েছিল ফরাসিরা।
বলা যায়, সে দিনের সেই না পারাটা যেন আরও তেঁতে তুলেছে দলটিকে। ফলে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলেদের ধার বেড়ে আরও দ্বিগুণ হয়েছে। এই দলটাকে আদৌ কেউ থামাতে পারবে কি না, এমন প্রশ্নে তাই অনেকেই ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে দিচ্ছেন। এমন আবহের মাঝেই শেষ ষোলোর লড়াইয়ে দুইবারের চ্যাম্পিয়নদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে প্যারাগুয়ে।
ফিলাডেলফিয়ায় যে ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ৩টায়।
গ্রুপ পর্বের তিনটি ও রাউন্ড অব বত্রিশের একটি মিলিয়ে এখন পর্যন্ত নিজেদের চার ম্যাচই দাপটের সঙ্গে জিতেছে ফ্রান্স। সেনেগালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে আসর শুরুর পর ইরাককে ৩-০ ও নরওয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দেয়। এরপর শেষ বত্রিশে সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে জায়গা করে নেয় শেষ ষোলোতে। চার ম্যাচেই দলটির গোল ১৩টি; বিপরীতে হজম করেছে মাত্র ২ গোল।
দলটির অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে এবারও দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছেন। ৪ ম্যাচে ৬ গোল করে আরও একবার গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তিনি। ব্যালন ডি’অর জয়ী উসমান দেম্বেলে শুরুর দিকে ভুগলেও পরে নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন। এবারের বিশ্বকাপের আগে ফ্রান্সের জার্সিতে মেজর কোনো টুর্নামেন্টে গোল ছিল না তার।
অথচ এখন তার নামের পাশে ৪ ম্যাচে ৪ গোল, সঙ্গে অ্যাসিস্ট ২টি। এই দুজনের সঙ্গে মাইকেল ওলিসে, ব্রাদলে বারকোলাদের নিয়ে এক দুর্ধর্ষ আক্রমণভাগ গড়ে উঠেছে ফরাসি দলে। যারা প্রতি ম্যাচে মাঠজুড়ে জাদুর প্রদর্শনী দেখিয়ে যাচ্ছেন। ফ্রান্সের এই আক্রমণভাগকে অনেকে ১৯৭০ সালের কিংবদন্তি ব্রাজিল দলের সঙ্গেও তুলনা করা শুরু করেছেন।
তবে প্যারাগুয়ে শেষ বত্রিশে চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে বিদায় করে এই মঞ্চে এসেছে। ফলে দলটিকে হালকাভাবে নেওয়ার উপায় নেই। বিশ্বকাপের মঞ্চে সবশেষ ১৯৯৮ সালে প্যারাগুয়ের মুখোমুখি হয়েছিল ফরাসিরা। সেবার ১-০ গোলে জয় পাওয়া ফ্রান্স পরবর্তীতে প্রথমবারের মতো শিরোপা ঘরে তুলে। সেই সময় ফ্রান্সের অধিনায়ক ছিলেন যিনি, সেই দেশম এখন দলটির ডাগআউট সামলাচ্ছেন।
অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার পাশাপাশি কোচ হিসেবেও যিনি বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। ফিলাডেলফিয়ায় পৌঁছে সেই দেশম প্রতিপক্ষ নিয়ে বলেছেন, ‘প্যারাগুয়েকে যা অর্জন করেছে (জার্মানিকে হারানো), সেটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলো যেমন হয়, তারা তেমনই একটা দল। বল দখলের ডুয়েলে শক্তিশালী, ভীষণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং তাদের দলে দারুণ মানসম্পন্ন খেলোয়াড় আছে। কোনো দলই ভাগ্যের জোরে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় পৌঁছায় না।’
প্যারাগুয়ে তাদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৪-১ গোলে হেরে। তবে এরপর তুরস্ককে ১-০ গোলে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় তারা। পরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ড্র করে তৃতীয়সেরা দলগুলোর একটি হিসেবে নকআউটে উঠে আসে। এরপর জার্মানির বিপক্ষে তাদের টাইব্রেকারের ওই ৪ (১)-৩ (১) গোলের রোমাঞ্চকর জয়। যে ম্যাচে নায়ক ছিলেন দলটির গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। আজ এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের সামনে বড় বাধা হতে পারেন তিনিই।
তবে ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ে, দুই দলের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ফিলাডেলফিয়ার আবহাওয়া। ম্যাচের দিন যুক্তরাষ্ট্রের এই শহরের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। এর সঙ্গে আবার ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাসও রয়েছে। চলতি বিশ্বকাপে ফ্রান্স ইতোমধ্যেই ফিলাডেলফিয়ায় খেলেছে। গ্রুপ পর্বে ইরাকের বিপক্ষে তাদের ৩-০ জয়ের ম্যাচটি বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল। আজ তেমন কিছু হলে দুদলের জন্যই কঠিন হবে। কারণ নকআউট ম্যাচ হওয়ায় খেলা অতিরিক্ত সময়েও গড়াতে পারে বা পেনাল্টি পর্যন্তও যেতে পারে।
বিশ্বকাপে দুদলের সর্বশেষ লড়াইটিও অতিরিক্ত সময়ে গিয়েছিল। সেই ম্যাচ জয়ের মুহূর্তটিকে ফরাসি জাতীয় দলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে ধরা হয়। কে জানে, প্যারাগুয়ে না আবার প্রতিশোধের আগুন জ্বালায়!