বিশ্বকাপ ফুটবলের নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই আলাদা নাটক, আলাদা উত্তেজনা। শেষ ষোলোর এমনই এক মহারণে মরক্কো মুখোমুখি হচ্ছে কানাডার। উত্তর আমেরিকার মাটিতে ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে বিভোর দুই দল- একদিকে প্রথমবার নকআউট জয় পাওয়া কানাডা, অন্যদিকে ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো। তবে এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে উঠে আসছে এক নাম- আশরাফ হাকিমি।
মরক্কোর অধিনায়ক হাকিমি কেবল একজন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় নন; তিনি আধুনিক ফুটবলের পূর্ণাঙ্গ প্রতীক। গতি, শক্তি, আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষমতা এবং ম্যাচের গতি বদলে দেওয়ার দক্ষতায় তিনি প্রতিপক্ষের জন্য এক বড় হুমকি। জাতীয় দলের হয়ে ইতোমধ্যে ৯৬ ম্যাচ খেলেছেন এই ডিফেন্ডার, যা বর্তমান মরক্কো দলে সর্বোচ্চ অভিজ্ঞতার প্রমাণ। রক্ষণভাগে খেলেও ১১ গোল করেছেন- সংখ্যাটি জানিয়ে দেয়, সুযোগ পেলে আক্রমণেও কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেন তিনি।
হাকিমির সবচেয়ে বড় শক্তি তার বহুমাত্রিকতা। ডান প্রান্তে ডিফেন্স সামলানোর পাশাপাশি মুহূর্তেই ওভারল্যাপ করে আক্রমণে উঠে যেতে পারেন। তার ক্রস, কাট-ব্যাক কিংবা বক্সের বাইরে থেকে শট- সবই প্রতিপক্ষের রক্ষণে অস্বস্তি তৈরি করে। কানাডার বিপক্ষে এই গুণই হতে পারে মরক্কোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
বিশেষ করে কানাডার আক্রমণাত্মক প্রেসিং ফুটবলের বিপক্ষে হাকিমির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কোচ হেসে মার্শচের দল প্রতিপক্ষের অর্ধে দ্রুত চাপ তৈরি করে খেলে। শেষ বত্রিশে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথমার্ধেই তারা ১০০টির বেশি ফাইনাল-থার্ড প্রেসার তৈরি করেছিল। সেই চাপ ভাঙতে মরক্কোর প্রয়োজন হবে দ্রুত পাসিং এবং ফ্ল্যাঙ্ক ব্যবহার- যেখানে হাকিমি হতে পারেন মূল চালিকাশক্তি।
২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর রূপকথার অন্যতম স্থপতিও ছিলেন এই ডিফেন্ডার। আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ওঠার পথে তার নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও লড়াকু মানসিকতা দলকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। চার বছর পরও সেই আগুন নিভে যায়নি। বরং অধিনায়কত্বের ভার তাকে আরও পরিণত করেছে।
মরক্কো এবারও দারুণ ছন্দে আছে। শেষ বত্রিশে শক্তিশালী নেদারল্যান্ডসকে বিদায় করেছে। হারিয়েছে টাইব্রেকারে। অ্যাটলাস লায়ন্সরা পুরো ম্যাচে ৮০১টি সফল পাস সম্পন্ন করে তারা বল নিয়ন্ত্রণে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বও দেখিয়েছে। এই দলে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের মিশেল থাকলেও সংকটময় মুহূর্তে সবার চোখ যায় হাকিমির দিকে।
অন্যদিকে কানাডাও কম ভয়ংকর নয়। বিশেষ করে কাউন্টার অ্যাটাকে তাদের গতি ম্যাচের রং বদলে দিতে পারে। তাই হাকিমির জন্য কাজটা সহজ হবে না; তাকে একদিকে ডিফেন্স সামলাতে হবে, অন্যদিকে আক্রমণের ভারও নিতে হবে।
ফুটবলে কিছু খেলোয়াড় থাকেন, যাদের উপস্থিতি পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে ম্যাচের আবহ বদলে দেয়। আশরাফ হাকিমি ঠিক তেমনই একজন। তিনি গোল করতে পারেন, গোল বানাতে পারেন, আবার বিপদের সময় শেষ রক্ষাকবচও হতে পারেন।
হিউস্টনের রাত তাই শুধু মরক্কো বনাম কানাডার লড়াই নয়; এটি অনেকটাই হাকিমির নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও প্রভাবেরও পরীক্ষা। শেষ বাঁশি বাজার পর প্রশ্ন একটাই-কানাডার স্বপ্ন কি থামিয়ে দেবেন মরক্কোর অধিনায়ক, নাকি নতুন ইতিহাস লিখবে ম্যাপল লিফের দল?