সরকার এলাকাভেদে ফ্ল্যাট ও প্লটের প্রকৃত বিক্রয় মূল্য ও মৌজা মূল্যের মধ্যে ব্যবধান কমানোর উদ্যোগ দিয়েছে। এজন্য ফ্ল্যাট ও প্লট বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বিশেষ টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি চলতি অর্থ বছরের শুরু থেকে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
- মৌজা মূল্য ও প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান কমাতে সরকার টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
- বাজারমূল্যে নিবন্ধন হলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, তবে ক্রেতার খরচও বাড়বে।
- ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, বাড়তি নিবন্ধন ব্যয়ে আবাসন খাতে ক্রেতা কমবে।
সূত্র আরও জানায়, বিভিন্ন এলাকার ফ্ল্যাট ও প্লটের জন্য সরকার নির্ধারিত মৌজা মূল্যও ভিন্ন। এসব সম্পদের বিক্রয় মূল্য হিসেবে মৌজা মূল্য দলিলে উল্লেখ করা হয়। মৌজা মূল্যের ওপর হিসাব কষে কর আদায় হয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে এসব সম্পদের প্রকৃত বিক্রয় দাম মৌজা মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি।
নিবন্ধন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জমি নিবন্ধন থেকে সরকার বছরে সাত হাজার থেকে আট হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। বাজারমূল্য অনুযায়ী নিবন্ধন করা হলে এ খাত থেকে সরকারের আয় বেড়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি হবে। রাজস্ব আদায় করতেই সরকার নতুন এই পদক্ষেপ নিয়েছে। রাজস্ব খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, নতুন এই উদ্যোগ কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়বে।
তবে আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বাজার দর অনুযায়ী ফ্ল্যাট ও প্লট বেচাকেনা হয়। মৌজা মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি থাকে প্রকৃত বিক্রয় মূল্য। প্রকৃত বিক্রয় মূল্যের হিসাবে কর আদায় করা হলে নিবন্ধন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। আবাসন খাতে ক্রেতা কমবে। সামগ্রিকভাবে আবাসন খাতের ব্যবসায়ে ধস নামবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, জমি ও ফ্ল্যাটের মৌজা মূল্য এবং প্রকৃত বাজার মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দূর করতে সরকার কাজ করছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে মৌজা রেট প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম নির্ধারিত থাকে, যা পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। সারা দেশে মৌজাভিত্তিক জরিপ পরিচালনা করে সম্পত্তির সঠিক মান বা রিয়েল ভ্যালু নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জমি ও ফ্ল্যাটের মৌজা মূল্য বাজারমূল্যের কাছাকাছি আনার জন্য সরকার সম্পত্তি নিবন্ধনের করহার যৌক্তিকীকরণের পদক্ষেপ নিয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, কর ফাঁকি দিতে ক্রেতা-বিক্রেতারা দলিলে কম মূল্য (মৌজা রেট) দেখান। এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেট। প্রকৃত বিক্রয় মূল্য এবং মৌজা মূল্য এক থাকলে মৌজা মূল্য অনুযায়ী কর কম দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। এতে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়লেও আবাসন খাতের ক্রেতাদের খরচ বাড়বে। এতে খরচের কারণে অনেকে সম্পত্তি কেনা কমিয়ে দিতে পারেন। ফলে আবাসন খাতের ব্যবসায়ে ধস নামার আশঙ্কা থাকছে।
আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূইয়া খবরের কাগজকে বলেন, আবাসন ব্যবসা শহরকেন্দ্রিক। এখানে সাধারণত মৌজা মূল্য থেকে প্রকৃত বিক্রয় মূল্য অনেক বেশি। সরকার রাজস্ব আদায় বাড়াতে গিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। মৌজা মূল্য উল্লেখ করে কর দেওয়া হয়। প্রকৃত বিক্রয় মূল্য দলিলে উল্লেখ করতে আইন করা হলে ক্রেতার খরচ বাড়বে। এতে অনেকে ফ্ল্যাট ও প্লট কেনা কমিয়ে দেবে। ফলে আবাসন ব্যবসায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কেনাবেচা মূল্যের তুলনায় দলিল মূল্য কম হওয়ায় সরকারের রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে। বিক্রেতার বিপুল পরিমাণ অর্থ অপ্রদর্শিত বা অবৈধ আয়ে রূপান্তর হচ্ছে।
চলতি অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মৌজা মূল্য অনুযায়ী দলিল মূল্য লেখার সুযোগ দেওয়া হলেও প্রকৃত বিক্রয় মূল্য রিটার্নে উল্লেখ করতে আইনে বিধান আনা হয়। এ ক্ষেত্রে যে বাড়তি অর্থ লেনদেন হয়, তার ওপর বর্ধিত হারে কর ধার্য করা হয়। তবে নৈতিকতার প্রশ্নে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আপত্তির মুখে বাজেট চূড়ান্তকালে তা বাতিল করা হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৌজা দর মানে হচ্ছে সর্বনিম্ন দর অর্থাৎ মৌজা দরের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে কেউ জমি কেনাবেচা করতে পারবে না। মৌজা দর নির্ধারণের কাজটি হয় ‘সর্বনিম্ন বাজারমূল্য বিধিমালা’ অনুযায়ী। বিধিমালা অনুযায়ী বাজারমূল্য নির্ধারণ করে একটি কমিটি। কমিটির মাধ্যমে দুই বছর পরপর বাজারমূল্য হালনাগাদ করার কথা আছে। এ ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ে (২২ মাস) দলিলে উল্লেখ করা দামের গড় করে নতুন দর নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। পরে এর ভিত্তিতে মৌজা দর চূড়ান্ত করে ভূমি নিবন্ধন অধিদপ্তর।
নিবন্ধন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার গুলশান সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ের অধীন মৌজা আছে ১৪টি। এই ১৪ মৌজায় ৮ ধরনের জমি আছে। মৌজা দর অনুযায়ী ধরনভেদে এই এলাকার ১ শতাংশ জমির দাম ১ লাখ থেকে ৫৮ লাখ টাকা এবং এর থেকে কিছু বেশি।
অথচ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গুলশানের কোথাও কোটি টাকার নিচে ১ শতাংশ জমি কেনাবেচা হয় না। ধানমন্ডি এলাকার মৌজা দর অনুযায়ী ১ শতাংশ জমির দাম ৪৩ লাখ ৯৩ হাজার ৩০০ টাকা এবং এর থেকে কিছু বেশি। কিন্তু বাস্তবে ধানমন্ডির কোথাও এ দামে জমি বেচাকেনা হয় না। আরও বেশি দামে বেচাকেনা হয়।
বর্তমানে জমির ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ডিউটি দেড় শতাংশ, নিবন্ধন মাশুল, স্থানীয় সরকার কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), উৎসে করসহ ১২ থেকে ১৪ শতাংশ।
আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে নিবন্ধন ফি অনেক বেশি। এর সঙ্গে মৌজা মূল্যের পরিবর্তে প্রকৃত দর অনুযায়ী কর আরোপ হলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে।