ফ্রান্সের আক্রমণভাগ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। অনেকের মতে, দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটির আক্রমণভাগই এই মুহূর্তে বিশ্বসেরা। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসেকে নিয়ে এক ভয়ঙ্কর আক্রমণ ত্রয়ী গড়ে তুলেছেন কোচ দিদিয়ের দেশম। যেকোনো দলের জন্যই এই ত্রয়ীকে সামলানো দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছে। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে এবার যাদের রুখে দেওয়ার দায়িত্ব পড়ছে অরল্যান্ডো গিলের কাঁধে।
প্যারাগুয়ের এই গোলরক্ষক সপ্তাহখানেক আগেও খুব একটা আলোচনায় ছিলেন না। তবে রাউন্ড অব বত্রিশে বলতে গেলে একা জার্মানির স্বপ্নযাত্রা থামিয়ে দিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে এসেছেন। মাঠের নৈপুণ্যের পাশাপাশি তার জীবনযুদ্ধের গল্পও হৃদয় ছুঁয়ে গেছে অনেকের। ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার এই গোলরক্ষকের সামনে সুযোগ, নিজের সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের বিচ্ছুরণ আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার। কে জানে, চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানির পর দুবারের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে থামিয়ে দিতে পারলে হয়তো ইতিহাসে অমরত্বও পেয়ে যেতে পারেন তিনি!
ফিলাডেলফিয়ায় বাংলাদেশ সময় আজ (৪ জুলাই) রাত ৩টায় মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও প্যারাগুয়ে। নিশ্চিতভাবেই ফেবারিট হিসেবে মাঠে নামবে ১৯৯৮ ও ২০১৮ আসরের চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু নকআউট ম্যাচে তো জয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে মাঠে নামা যায় না। সেটা হলে জার্মানিকে কি আর শেষ ষোলোতেই থামতে হয়! টাইব্রেকারে দুটি শট রুখে দিয়ে সেদিন নায়ক বনে যান প্যারাগুয়ে গোলরক্ষক। হ্যাঁ, ওই ম্যাচটা তাকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে ঠিক। তবে গ্রপ পর্বে অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের বিপক্ষেও তার পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৪-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করলেও অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের বিপক্ষে ড্র করে নকআউটে জায়গা করে নেয় প্যারাগুয়ে।
আর নকআউটের প্রথম ম্যাচে জার্মানি বধের গল্প লিখেছে দলটি। সেই ম্যাচের পর জানা যায়, সন্তানের চিকিৎসা খরচ মেটাতে একসময় নিজের ক্রীড়া সামগ্রী বিক্রি করে দিতে হয়েছিল গিলকে। সেই সামগ্রীগুলোর একটি ছিল প্যারাগুয়ে অনূর্ধ্ব-২০ দলের জার্সি। জার্সিটা প্রায় ৩৩ ডলারে কিনে নেন গিলের বন্ধু পেদ্রো সুয়ারেস। ফ্রান্সকে হারাতে পারলে ওই জার্সিটি বিনামূল্যে গিলকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
অবশ্য গিল বা তার বন্ধু পেদ্রোও বেশ ভালোভাবেই জানেন, এই স্বপ্ন পূরণে তাদের ঠিক কেমন চ্যালেঞ্জ জয় করতে হবে। ফ্রান্স দলে এমবাপ্পে-দেম্বেলে-ওলিসে নিয়ে গড়া ত্রয়ী তো আছেই, এর বাইরেও ভয় ধরানো খেলোয়াড় আছে অনেক। ব্র্যাডলি বারকোলার কথাই ধরা যাক। ওই আক্রমণ ত্রয়ীর পাশে থেকেও যিনি স্বমহীমায় উজ্জ্বল। লেফট উইং দিয়ে নিয়মিত প্রতিপক্ষের রক্ষণে কাঁপন ধরাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত চার ম্যাচ খেলে ২টি গোলের পাশাপাশি একটি অ্যাসিস্টও করেছেন তিনি।
২০২২ বিশ্বকাপে রোমাঞ্চ আর নাটকীয়তায় ভরা ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হেরে শিরোপা হারিয়েছিল ফ্রান্স। তবে সেই ফাইনাল যেখানে শেষ করেছিল দলটি, এবারের আসর যেন শুরু করেছে ঠিক সেখান থেকেই। ফলে এবারের আসরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নিখুঁত দলটির নাম ফ্রান্স।
সব মিলিয়ে ফিলাডেলফিয়ার এই ম্যাচটা শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি একদিকে ফ্রান্সের তারকাখচিত আক্রমণভাগের দাপট, অন্যদিকে অরল্যান্ডো গিলের মতো এক উঠতি তারকার স্বপ্নময় লড়াইয়ের মঞ্চ। বড় মঞ্চে সুপারস্টারদের দিকেই চোখ বেশি থাকে। অভিজ্ঞতার কারণে তারা এগিয়েও থাকেন সবদিক থেকে। তবে এটাও সত্য- ফুটবলে কখনো কখনো একক নায়কই পাল্টে দিতে পারে পুরো গল্পের মোড়। তাই এমবাপ্পে-দেম্বেলে-ওলিসের ঝড় সামলাতে গিলের এই রাত শুধু পরীক্ষার নয়, হতে পারে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ।
ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষায়–শেষ পর্যন্ত তারকাদের জৌলুস জিতে যায়, নাকি জন্ম নেয় নতুন কোনো অবিশ্বাস্য গল্পের।