২০২৫ সালের ‘গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স’ অনুসারে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ পুনরুত্থানের মুখে পড়েছে। দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪ হাজার ২০৪ জনে দাঁড়িয়েছে। যেটি আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। এ মৃত্যুর ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী চারটি গোষ্ঠী- ইসলামিক স্টেট (আইএস), জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (জেএনআইএম), টিটিপি ও আল-শাবাব। ১০ বছর আগে এই চার গোষ্ঠীর দায় ছিল ৪০ শতাংশেরও কম।
আইএস এখনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক হিসেবে রয়ে গেছে। গোষ্ঠীটি ও এর সহযোগীরা ২৩টি দেশে সক্রিয়। যদিও ২০২৪ সালে তাদের হাতে নিহতের সংখ্যা ১০ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০৫ জনে। অন্যদিকে টিটিপি মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি বাড়িয়েছে, ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে।
পাকিস্তানে সন্ত্রাসের বিস্তার
পাকিস্তান ২০২৪ সালে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে প্রাণহানির দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। ওই বছর সন্ত্রাসে নিহতের সংখ্যা ৪৫ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৮১ জনে পৌঁছায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের ঢেউ বাড়ছে। ২০২১ সালের পর থেকে দেশটিতে হামলার সংখ্যা পাঁচ গুণ বেড়েছে।
টিটিপির উত্থানই এই প্রবণতার মূল কারণ। আফগান তালেবানের আদর্শে অনুপ্রাণিত এই গোষ্ঠী পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে টিটিপির হামলায় প্রাণহানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
২০২৪ সালে টিটিপি ৪৮২টি হামলা চালায়, যেখানে নিহত হন ৫৫৮ জন। এটি ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ। সংগঠনটি এখন বিশ্বের তৃতীয় সবচেয়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত। এই হামলার ৯৬ শতাংশ ঘটেছে আফগান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে। সেখানে ২০২৩ সালের তুলনায় হামলার সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬২টিতে, যেখানে নিহত হন ৫৪৫ জন।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি ঘটে এক সেনা ফাঁড়িতে, যেখানে টিটিপি জঙ্গিরা ১৬ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে। এটি ছিল তাদের এক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হওয়ার প্রতিশোধ।
প্রতিবেদন জানায়, টিটিপির ৫১ শতাংশ হামলা পুলিশের বিরুদ্ধে, ১৬ শতাংশ সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে এবং ১৬ শতাংশ বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে। সশস্ত্র আক্রমণ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কৌশল, যা মোট হামলার দুই-তৃতীয়াংশ এবং মৃত্যুর ৭২ শতাংশের জন্য দায়ী। বোমা হামলার সংখ্যাও তিন গুণ বেড়েছে।
টিটিপির লক্ষ্য ও কার্যক্রম
২০০৭ সালে গঠিত টিটিপি আফগান তালেবানের মতোই আদর্শে বিশ্বাসী। তাদের লক্ষ্য পাকিস্তান সরকারকে উৎখাত করে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা করা। গোষ্ঠীটি পাকিস্তান-আফগান সীমান্ত অঞ্চলে সক্রিয়। বিভিন্ন ছোট ইসলামপন্থি দলকে অন্তর্ভুক্ত করে।
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে টিটিপির সবচেয়ে নৃশংস হামলায় পেশোয়ারের এক স্কুলে ১৪১ জন নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই শিশু। এরপর পাকিস্তান সরকার সন্ত্রাস দমন পরিকল্পনা হিসেবে ‘ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান’ (ন্যাপ) চালু করে।
২০২৪ সালের জুনে ‘অপারেশন আজম-ই-ইস্তেহকাম’ শুরু হয়, যাতে জঙ্গি ও বিদ্রোহী নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়। তবে আফগানিস্তানের পাকটিকা প্রদেশে এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ উঠেছে।
সরাসরি কোনো ভূখণ্ডের দখল না থাকলেও টিটিপি উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রভাব বজায় রেখেছে। পাহাড়ি এলাকা ব্যবহার করে তারা সহজেই সীমান্ত পারাপার ও ঘাঁটি বদল করতে পারে।
সরকারের অবস্থান
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সরকার ‘কোনো অবস্থাতেই টিটিপির সঙ্গে আলোচনা করবে না।’ ইসলামাবাদ কেবল আফগান তালেবানের সঙ্গে আলোচনা চালাবে, কারণ টিটিপি আফগান মাটিতেই আশ্রয় নিচ্ছে।
সম্প্রতি সীমান্তে এক সপ্তাহের সংঘর্ষের পর কাতারের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ও আফগান তালেবান যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছে। আসিফ জানান, দোহায় তালেবান প্রতিনিধিদল প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা পাকিস্তানি জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে রাখবে। তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি টেকানো নির্ভর করবে তালেবানদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার ওপর।’ খসড়া চুক্তিতে মাত্র চারটি ধারা রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত দীর্ঘ সংস্করণকে ‘বানোয়াট’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে তুরস্কে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন নিয়ে আরও আলোচনা হবে বলে তিনি জানান।
বিপরীত বাস্তবতায় পাকিস্তান নিজের ফাঁদে
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান এখন নিজের তৈরি জালে আটকে পড়েছে। আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণের স্বপ্নে দেশটি যে সন্ত্রাসবাদকে বছরের পর বছর লালন করেছে, সেটিই এখন তার জন্য অভিশাপ হয়ে ফিরে এসেছে।
নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তান যেসব তালেবান নেতাকে গড়ে তুলেছিল, তারাই এখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরছে। আফগান যোদ্ধারা পাকিস্তানি সৈন্যদের পোশাক ‘ট্রফি’ হিসেবে প্রদর্শন করছে। যেটি ইসলামাবাদের জন্য এক গভীর অপমানের প্রতীক।
তালেবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তান এখন আফগান শরণার্থীদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। ঘরবাড়ি ভাঙা, স্কুলে নিষেধাজ্ঞা আর শারীরিক নির্যাতনের খবর প্রতিদিন বাড়ছে। অথচ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নীরবতা চোখে পড়ার মতো। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিস্থিতি ‘কাব্যিক ন্যায়বিচার’-এর মতো। যে দেশ দশকের পর দশক ধরে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে অস্ত্র করেছে, এখন সেই একই আগুনে নিজেই পুড়ছে।
ওসামা বিন লাদেন থেকে শুরু করে দাউদ ইব্রাহিম- দুজনই পাকিস্তানের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছিলেন। আজ সেই দেশই বিশ্বের সবচেয়ে সন্ত্রাসপ্রবণ অঞ্চলের একটি।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, নৈতিক হিসাবের প্রতীকও। রাজনৈতিক লাভের জন্য চরমপন্থাকে আশ্রয় দেওয়ার যে পরিণতি হতে পারে, পাকিস্তান তার জীবন্ত উদাহরণ। বিশ্লেষকদের মতে, ‘যে দেশ ঘৃণা ও সন্ত্রাসের বীজ বপন করে, এক দিন সে নিজেই তার ফল ভোগ করে’। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও সেটিই এখন বাস্তব। সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, ভোলান্ট মিডিয়া ও দ্য হ্যানস ইন্ডিয়া।