একদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, অন্যদিকে প্রি-পেইড ও ডিজিটাল বিদ্যুৎ মিটারে অস্বাভাবিক বিল কেটে নেওয়ার অভিযোগ। বিদ্যুৎ-সংকটের এই দ্বিমুখী চাপে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন গ্রাহকরা। কয়েক মাস ধরে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, মে ও জুন মাসে বিলের নামে গ্রাহকের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় আগের মতো থাকলেও বিল বেড়েছে দ্বিগুণ, কোথাও কোথাও তিন গুণ পর্যন্ত। অনেকের ভাষায়, এটি বিদ্যুৎ বিল নয়, বিলের নামে প্রকাশ্য ‘ডাকাতি’।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী থেকে বিভাগীয় শহর, জেলা থেকে উপজেলা–দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অতিরিক্ত বিলের প্রতিবাদে কোথাও মানববন্ধন, কোথাও সড়ক অবরোধ, আবার কোথাও বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ও বিদ্যুৎ ভবনের সামনে বিক্ষোভ হয়েছে।
অন্যদিকে শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি লোডশেডিং হওয়ায় বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। গ্রাহকদের প্রশ্ন, যখন কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎই পাওয়া যাচ্ছে না, তখন অস্বাভাবিক বিলের বোঝা কেন?
গ্রাহকরা জানিয়েছেন, আগে ১ হাজার টাকার রিচার্জে ১৫ থেকে ২০ দিন বিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলেও এখন সেই টাকা তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ বাড়িতে নতুন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র যোগ হয়নি বা বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরনেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রি-পেইড মিটারে ভুতুড়ে বিল আসছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ২২ জুন ৫ হাজার টাকা রিচার্জ করি। কিন্তু ডিপিডিসির পক্ষ থেকে রেজিস্ট্রার্ড মোবাইল নাম্বারে টাকা জমা দেওয়ার কোনো মেসেজ আসেনি। অন্যদিকে মাত্র আট দিনের মাথায় ১ জুলাই ৫ হাজার ৯৯২ টাকা বিল বকেয়া দেখিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।’
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আজিজ বলেন, ‘আগে মাসিক বিদ্যুৎ খরচ মোটামুটি নির্দিষ্ট ছিল। এখন কয়েক হাজার টাকা রিচার্জ করার পরও কয়েক দিনের মধ্যেই ব্যালেন্স শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাস্তব ব্যবহারের সঙ্গে এই বিলের কোনো মিল পাচ্ছি না।’
শুধু বিলের পরিমাণ নয়, রিচার্জের পর কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও অন্য খাতে অর্থ কেটে নেওয়া হলেও তার স্বচ্ছ হিসাব অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় না। ফলে প্রকৃত বিদ্যুৎ বিল ও অতিরিক্ত চার্জের পরিমাণ সম্পর্কে তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহক রিচার্জের তথ্য ও মিটারের ছবি প্রকাশ করে অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগ তুলছেন। অনেকের দাবি, আগে যেখানে মাসে এক থেকে দেড় হাজার টাকায় বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা যেত, এখন একই ব্যবহারে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন অভিযোগ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ডিজিটাল মিটারের সফটওয়্যার, কনফিগারেশন, ওভার-রিডিং কিংবা বিলিং ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করা জরুরি। তাদের মতে, ডিজিটাল ব্যবস্থায় যদি অনিয়ম ঘটে থাকে, তবে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি ডি রহমতউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, আগে অনিয়ম হতো ম্যানুয়ালি, এখন হচ্ছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। যদি মিটারের প্রোগ্রামিংয়ে ভুল থাকে বা ওভার-রিডিং হয়, তাহলে এর দায় কে নেবে? এখন পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনার জন্য কাউকে জবাবদিহি করতে দেখা যায়নি।
সারা দেশে বিদ্যুৎ বিলের নামে ‘ডাকাতি’র ঘটনায় গ্রাহকদের ক্ষোভ প্রকাশের পর বিদ্যুৎ বিভাগও বিষয়টি নিয়ে তৎপর হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ ও চলমান লোডশেডিং পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় অস্বাভাবিক বিলের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলসংক্রান্ত অভিযোগ নিরসনে বিতরণ সংস্থার সঙ্গে সরাসরি বা হটলাইনে যোগাযোগের জন্য গ্রাহকদের অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এ ক্ষেত্রে হটলাইন নাম্বারগুলো হলো–বিদ্যুৎ বিভাগের কেন্দ্রীয় সেবা-১৬৯৯৯, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কল সেন্টার-১৬২০০, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (পবিবো) কল সেন্টার-১৬৮৯৯, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) কল সেন্টার-১৬১১৬, ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) কল সেন্টার-১৬১২০, নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (নেসকো) কল সেন্টার-১৬৬০৩, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) কল সেন্টার-১৬১১৭।
এদিকে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল ও লোডশোডিং প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গণমাধ্যমে কথা বলেন। গতকাল যশোর সার্কিট হাউসে জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, ‘এই তপ্ত গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সার্ভিস নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ বিভাগ কাজ করছে। কয়েক জায়গায় বিদ্যুৎ বিল নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে, আমরা প্রতিটি বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ সেন্টার করেছি। সেখানে যোগাযোগ করে সমাধান করার নির্দেশ দিয়েছি। জনগণকে সেবা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের আরও আন্তরিক হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
তবে রাষ্ট্রীয় সংস্থায় দুর্নীতি বন্ধ না হলে জনগণের সঙ্গে এসব প্রতারণা চলতে থাকবে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তার মতে, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির অভাবের ফল।
শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ না করলে শুধু গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত মূল্য চাপিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। যারা অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও ভোক্তার ক্ষতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পুরো খাতে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
এদিকে খবরের কাগজের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যেও জনদুর্ভোগের চিত্র ফুটে উঠেছে।
পাবনা প্রতিনিধি জানান, মিটার রিডিং না দেখেই জুন মাসে মনগড়া ও ‘ভুতুড়ে’ অতিরিক্ত বিল ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতাধীন কাশীনাথপুর জোনাল ও সাঁথিয়া সাব-জোনাল অফিসের বিরুদ্ধে। হঠাৎ করে বিদ্যুৎ বিল দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ হয়ে যাওয়ায় চরম ক্ষোভ ও বিপাকে পড়েছেন বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলার শত শত সাধারণ গ্রাহক। ভুক্তভোগীদের দাবি, কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তৈরি করা এই অস্বাভাবিক বিলের বোঝা তাদের ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২, কাশীনাথপুর জোনাল অফিসের আওতায় গ্রাহক সংখ্যা ৪ লাখ ৩২ হাজার ৮২৩ জন। এই গ্রাহকদের একটি বড় অংশই চলতি মাসের বিল হাতে পেয়ে হতবাক হয়ে গেছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যুতের দাম বাড়লেও বিলের অঙ্ক যেভাবে লাফিয়ে বেড়েছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। যেখানে আগে একটি পরিবারের মাসিক বিদ্যুৎ বিল আসত ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, সেখানে চলতি জুনে তাদের বিল গুনতে হচ্ছে ১ থেকে ২ হাজার টাকা।
ফজলুল হক নামে এক ভুক্তভোগী গ্রাহক তার বিলের কাগজ দেখিয়ে বলেন, ‘গত মে মাসে আমার বিদ্যুৎ বিল ছিল ৬৪৬ টাকা এবং ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ৬০ ইউনিট। অথচ জুন মাসে এসে সেই বিল দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৭২ টাকা আর ব্যবহারের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১১০ ইউনিট। আমাদের এলাকার প্রায় প্রতিটি ঘরের বিল এই মাসে দ্বিগুণ করে দেওয়া হয়েছে।’
বিদ্যুৎ বিলের এই ভুতুড়ে কাণ্ড ও গ্রাহক হয়রানির বিষয়ে জানতে চাইলে পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর কাশীনাথপুর জোনাল অফিসের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আহমেদ শাহ আল জাবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে তিনি মৌখিকভাবে জানান, যদি কোনো গ্রাহক অতিরিক্ত বা ভুল বিলের কাগজ নিয়ে অফিসে লিখিত অভিযোগ করেন, তবে সেটি তদন্তসাপেক্ষে সংশোধন বা সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায় তীব্র লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পল্লী বিদ্যুতের এক কর্মীকে তুলে নিয়ে মারধর করেন এলাকাবাসী। গাজীপুর, সাতক্ষীরা, জামালপুর, টাঙ্গাইলসহ কয়েকটি উপজেলায় দুই মাস ধরে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও, ভাঙচুর ও মানববন্ধন হয়েছে কয়েক দফা। কয়েক দিন ধরে এমন চিত্র দেখা গেছে।