নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে দীর্ঘদিনের শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা চালু করার মাধ্যমে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের টানাপড়েন কমার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। তবে ঢাকার পক্ষ থেকে চীনের বিনিয়োগের চেষ্টা এবং সেই সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ সামলানোর বিষয়টি এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চীনের কাছ থেকে বিনিয়োগ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকাকে অত্যন্ত বিচক্ষণ ও সতর্ক হতে হবে। গতকাল শুক্রবার হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এক প্রতিবেদনে এ সতর্কবাতা তুলে ধরেছে।
গত রবিবার থেকে ভারত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা আবেদন নেওয়া শুরু করেছে। আন্দোলনের জেরে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এই সেবা প্রায় দুই বছর বন্ধ ছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এর পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি হতে থাকে। তবে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এখনও কিছুটা কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করে রেখেছে।
সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনা করে গত মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে মন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ভারতের ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরধা দত্ত বলেন, কেবল পর্যটন ভিসা চালু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে সীমান্ত বাণিজ্যসহ অন্যান্য বিষয়গুলোও স্বাভাবিক হবে। এটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক দিক।
গত বছর দিল্লি একটি ট্রানজিট সুবিধা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য ভারতের স্থলবন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে অন্যান্য বাজারে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তবে বাংলাদেশের নতুন প্রশাসন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ভারতের সঙ্গেও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ করতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত মাসে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং দেশের ভেতরে চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ আনা। অধ্যাপক শ্রীরধা দত্ত জানান, বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট যেমন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে সেটাই এখন বাংলাদেশ সরকারের মূল লক্ষ্য।
চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করেন। এ ছাড়া চীন মায়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে, যা বেইজিংকে সরাসরি বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশাধিকার দেবে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযোগকারী সরু অংশ 'চিকেনস নেক'-এর কাছাকাছি মোংলা বন্দর ও প্রস্তাবিত করিডোরের মতো প্রকল্পে চীনের এই অংশগ্রহণকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দিল্লি। লন্ডনের লেখক প্রিয়জিৎ দেব সরকার মনে করেন, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ভারতের অস্বস্তি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ হয়ত এই বিনিয়োগের দিকে এগিয়ে যাবে। তবে ঢাকাকে খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে, যাতে দুই দেশের বিনিয়োগ একে অপরকে বাধাগ্রস্ত না করে। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে ভারতের সঙ্গে সাপ্লাই চেইন ও যাতায়াত সহজ, যা বাংলাদেশের বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী।
এদিকে ভারতের অশোকা ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয় চন্দ্র বলেন, মায়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে চীন-বাংলাদেশ করিডোরটি এখনই বাস্তবায়ন হওয়া কঠিন। এটি বর্তমানে একটি রাজনৈতিক বার্তা মাত্র। তবে এর কৌশলগত প্রভাব ভারতের ওপর পড়বে। চীনের এমন প্রভাব ঠেকাতে ভারতকে আরও ভালো অর্থনৈতিক প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ভারতকে বাংলাদেশের জন্য সহজ বাণিজ্য শর্ত, সস্তা ট্রানজিট এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামোর সুবিধা দিতে হবে। তবে পর্যটন ভিসা চালু হওয়াটা দুই দেশের বরফ গলার প্রথম বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
সাউথ চায়না মনিং পোস্ট/এসএন