স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সচল করার লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গতকাল বুধবার কাতারের রাজধানী দোহায় দেশ দুটির মধ্যে এই পরোক্ষ ‘কারিগরি বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনা সম্পর্কে সরাসরি অবগত একটি সূত্র এবং ইরানের একজন কর্মকর্তা রয়র্টাসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
দোহায় চলমান এই আলোচনা সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। তিনি বলেন, ‘তাদের মধ্যে খুব ভালো বৈঠক হয়েছে। দেখা যাক কী হয়।’
তবে দোহায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে এখন কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, সেটি স্পষ্ট করেননি। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। তিনি জানান, দোহায় তার দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার রয়েছেন।
গত মাসে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির ওপর ভিত্তি করে এই আলোচনা চলছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা বন্ধ করাই ছিল ওই চুক্তির মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা।
তবে ইরানের উচ্চপর্যায়ের দুটি সূত্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় তেহরান। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী বা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের ক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে তারা বদ্ধপরিকর।
হরমুজ প্রণালী ও অবরুদ্ধ তহবিলের ওপর নজর
ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে শুরু হওয়া এই আলোচনা গতকালও অব্যাহত ছিল।
আলোচনা সম্পর্কে অবগত সূত্রটি জানিয়েছে, এই বৈঠকগুলো মূলত প্রধান মধ্যস্থতাকারী এবং বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন সেশনে বিভক্ত করে সাজানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আলোচনার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরির জন্য কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তবে তারা মূল বৈঠকে অংশ নেন নাই।
এই আলোচনায় অংশ নিতে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল দোহায় পৌঁছেছে। এই দলে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। তারা কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদের সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা নেই বলে তেহরান জানিয়েছে।
ইরান ইতোমধ্যে তাদের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো স্পষ্ট করেছে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনা চুক্তি চূড়ান্ত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবরুদ্ধ থাকা ৬০০ কোটি ডলারের ইরানি তহবিল অবমুক্ত করা। ইরানি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, চলতি দফার আলোচনা মূলত এই দুটি বিষয়ের ওপরই কেন্দ্রীভূত থাকবে।
এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর পাল্টা হামলা চালিয়েছিল ইরান। এই সংঘাতের ফলে প্রধানত ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই অন্তর্বর্তী চুক্তিতে লেবাননে ইসরায়েল এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত বন্ধের বিধানও রাখা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ইসরায়েল এবং লেবানন সরকারের মধ্যে একটি পৃথক আলোচনার পথকে সমর্থন দিয়ে আসছে। তবে হিজবুল্লাহ এই চুক্তিটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশ্লেষকরাও সতর্ক করে বলেছেন, এই চুক্তি দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের দখলদারত্বকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। আলোচনা সম্পর্কে অবগত সূত্রটি জানিয়েছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে অত্যন্ত নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা চলেছে। সূত্র: রয়টার্স