পশ্চিম ঘানার উত্তাল সমুদ্রে জাল ফেলতেই উঠে এল এক অদ্ভুত প্রাণী। দেখতে অর্ধেক হাঙ্গর আর অর্ধেক শাপলা পাতার মতো চ্যাপ্টা। এটি আসলে ‘গিটারফিশ’। ডাইনোসর যুগ থেকে পৃথিবীতে টিকে থাকা এই প্রাণীকে বলা হয় ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’। ডাইনোসর যুগের জুরাসিক মহাসাগরে এদের পূর্বপুরুষরা সাঁতার কাটত। তবে আজ এই অনন্য মাছটি বিলুপ্তির পথে।
এশিয়ার বাজারে বিলাসবহুল স্যুপ তৈরির জন্য গিটারফিশের পাখনার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এক জোড়া পাখনা বিক্রি হয় শত শত ডলারে। এই বহু মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য মাছটিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে ঘানার সমুদ্রে এখন নতুন আশা জেগেছে। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ড. ইসাহ সেইদু এই মাছ শিকারিদেরই এখন এদের রক্ষক হিসেবে গড়ে তুলছেন।
বিলুপ্তির মুখে ‘রাইনো রে’
গিটারফিশ আসলে হাঙ্গর নয়। এরা একধরনের ‘রাইনো রে’। বিশ্বজুড়ে এই দলের ৬৮টি প্রজাতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আজ বিপন্ন। ঘানায় বড় আকারের রাইনো রে ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন শুধু চারটি গিটারফিশ প্রজাতি টিকে আছে। এগুলো হলো কমন, হোয়াইট-স্পটেড, ব্ল্যাকচিন ও স্পাইনব্যাক গিটারফিশ। ড. সেইদু এই চার প্রজাতি রক্ষায় কাজ করছেন।
গিটারফিশ অগভীর পানিতে বাস করে। এদের বৃদ্ধি ঘটে খুব ধীরে এবং এরা কম বাচ্চা দেয়। ফলে অতিরিক্ত শিকারের কারণে এরা দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এরা সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খল ধরে রাখে। এদের সরিয়ে নিলে পুরো সমুদ্রের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে।
একসময় খাবারের জন্য এই মাছ ধরা হতো। কিন্তু এখন পাখনার ব্যবসার লোভে এদের লক্ষ্য করা হচ্ছে। এর আরেকটি কারণ হলো ঘানার সমুদ্রে অন্যান্য মাছ ফুরিয়ে যাওয়া। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি ট্রলার ঘানার সমুদ্রে অবৈধভাবে মাছ ধরা শুরু করেছে। যার ৯০ শতাংশের মালিক চীনা করপোরেশন। তারা নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে ছোট মাছও ধরছে। ফলে স্থানীয় জেলেরা চরম সংকটে পড়েছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি ও গিটারফিশ শিকারের দিকে ঝুঁকছেন।
পাখনার আন্তর্জাতিক চাহিদা
ঘানায় গিটারফিশের শুধু দেহ ও লেজ রান্না করা হয়। কিন্তু এর পাখনাগুলো শুকিয়ে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। বেশির ভাগ পাখনা চীনের বাজারে পৌঁছায়। হাঙ্গরের পাখনার স্যুপে বিশেষ টেক্সচারের জন্য এগুলো প্রতি কেজি শত শত ডলারে বিক্রি হয়। এই বিলাসবহুল খাবারের কারণে বছরে প্রায় ১০ কোটি হাঙ্গর ও অসংখ্য গিটারফিশ মারা যাচ্ছে।
বর্তমানে এই বাণিজ্য আন্তর্জাতিক আইন (সিআইটিইএস) অ্যাপেন্ডিকস-২-এর অধীনে নিয়ন্ত্রিত। ড. সেইদুরের লক্ষ্য একে অ্যাপেন্ডিকস-১-এ নিয়ে যাওয়া, যা এই প্রজাতির বাণিজ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করবে।
জেলে জীববিজ্ঞানী মডেল ও বিকল্প কর্মসংস্থান
ড. সেইদু জানতেন জেলেদের জীবিকা এই মাছের ওপর নির্ভরশীল। তাই ২০১৮ সাল থেকে তিনি জেলেদের কাছে টানার কাজ শুরু করেন। তিনি গড়ে তোলেন ‘জেলে জীববিজ্ঞানী মডেল’।
তার অলাভজনক সংস্থা ‘অ্যাকুয়ালাইফ কনজারভেন্সি’ জেলেদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়। এখন জেলেরা জালে গিটারফিশ আটকালে তা অক্ষত অবস্থায় সমুদ্রে ছেড়ে দেন। তারা মাছের পরিমাপ নেন এবং তথ্য সংগ্রহ করেন। এই তথ্য দিয়ে ঘানার প্রথম স্থানীয় সামুদ্রিক এলাকা তৈরি করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের সাবান তৈরি ও ভোজ্য শামুক চাষ শেখানো হচ্ছে। ফলে জেলেরা সমুদ্রের ওপর কম নির্ভরশীল হচ্ছেন। কেউ কেউ এখন আগের চেয়েও বেশি আয় করছেন।
নতুন আশা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
এখন পর্যন্ত ২০০ জন জেলে গিটারফিশ ধরা বন্ধ করেছেন। দুটি এলাকা ডিনামাইট ও বিষ প্রয়োগের মতো ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি নিষিদ্ধ করেছে। এই কাজের জন্য ড. সেইদু সম্প্রতি সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার ‘হুইটলি অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন।
ড. সেইদুর মতে, গিটারফিশকে বাঁচাতে হলে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা ও তহবিল প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘যাদের জীবন এর ওপর নির্ভর করে, আমাদের অবশ্যই তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে।’ বর্তমানে তিনি পরবর্তী প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যা আফ্রিকার সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন আশা জোগাচ্ছে। সূত্র: সিএনএন