পেটের সবচেয়ে সাধারণ অথচ অবহেলিত সমস্যা হলো ‘স্টমাক আলসার’ বা পাকস্থলীর ক্ষত। আমাদের পেটের ভেতরে যে অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যাসিড থাকে, তা থেকে পাকস্থলীকে রক্ষা করার জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক স্তর থাকে। কোনো কারণে যখন এই স্তরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অ্যাসিড সরাসরি পাকস্থলীর দেয়ালে আঘাত করে, তখন সেখানে এক ধরনের খোলা ক্ষত বা ঘা তৈরি হয়। একেই চিকিৎসাশাস্ত্রে পেটের আলসার বা গ্যাস্ট্রিক আলসার বলা হয়। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এই সমস্যায় ভোগেন। সাধারণ মনে হলেও সঠিক সময়ে এর চিকিৎসা না করালে এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
আলসারের লক্ষণ
পাকস্থলীর আলসার হলে সাধারণত বুকের ঠিক নিচে, পেটের ওপরের দিকে মাঝখানে বা কিছুটা বাম পাশে এক ধরনের তীব্র জ্বালাপোড়া বা কামড়ানোর মতো ব্যথা অনুভূত হয়। এ ছাড়া আরও কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা যায়–
হজমে সমস্যা ও পেট ফাঁপা: খাওয়ার ঠিক পরপরই পেট অতিরিক্ত ভরা মনে হওয়া, গ্যাস বা পেট ফোলার সমস্যা।
অম্বল বা বুক জ্বালা: টক ঢেকুর ওঠা এবং বুক ও গলায় অ্যাসিড রিফ্লাক্সের অনুভূতি।
বমি বমি ভাব: অনেকের ক্ষেত্রে সকালের দিকে বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।
নীরব আলসার: কিছু মানুষের আলসার থাকলেও কোনো বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশ পায় না। হঠাৎ করে রক্তক্ষরণ বা পেটে তীব্র ছিদ্র না হওয়া পর্যন্ত তারা বুঝতেও পারেন না যে ভেতরে কোনো জটিলতা তৈরি হয়েছে।

কেন হয় এই আলসার?
অনেকের ধারণা, কেবল ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার খেলেই আলসার হয়, যা আসলে একটি বড় ভুল ধারণা। ঝাল খাবার আলসারের ব্যথা বাড়াতে পারে, কিন্তু আলসার তৈরি করে না। প্রায় ৯৯ শতাংশ আলসারের জন্য মূলত দুটি কারণ দায়ী–
এইচ. পাইলোরি (H. pylori) ব্যাকটেরিয়া: এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ ব্যাকটেরিয়া, যা মানুষের পাকস্থলীতে বংশবৃদ্ধি করে এবং পাকস্থলীর সুরক্ষাকারী স্তরটিকে ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলে।
ব্যথানাশক ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হরহামেশা আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন বা এসপিরিনের মতো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস পাকস্থলীর দেয়ালকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত ধূমপান, মদ্যপান এবং তীব্র মানসিক চাপ (যেমন- বড় কোনো অস্ত্রোপচার বা দুর্ঘটনা) আলসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
রোগ নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসা
যদি আপনার আলসারের লক্ষণ থাকে, তবে চিকিৎসক সাধারণত একটি অ্যান্ডোস্কোপি পরীক্ষার পরামর্শ দেন। এই পরীক্ষায় একটি ছোট ক্যামেরাযুক্ত নল মুখের ভেতর দিয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করিয়ে সরাসরি ক্ষতটি দেখা হয় এবং প্রয়োজনে ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষার জন্য সামান্য টিস্যু নেওয়া হয়।
চিকিৎসা পদ্ধতি
অ্যান্টিবায়োটিক: এইচ. পাইলোরি ব্যাকটেরিয়া ধরা পড়লে তা দূর করতে চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট মেয়াদের অ্যান্টিবায়োটিক দেন।
অ্যাসিড কমানোর ওষুধ: কিছু ওষুধ পেটের অ্যাসিড উৎপাদন কমিয়ে ক্ষত শুকিয়ে যেতে সাহায্য করে।
পাকস্থলীর দেয়াল রক্ষাকারী ওষুধ: সুক্রালফেটের মতো কিছু ওষুধ ক্ষতের ওপর একটি প্রলেপ তৈরি করে, যাতে অ্যাসিড সরাসরি সেখানে লাগতে না পারে।
কখন হাসপাতালে যাবেন
আলসার থেকে যদি ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হয়, তবে রোগীর শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা চরম দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। যদি মল কালো রঙের হয়, বমির সঙ্গে কফির দানার মতো রক্ত আসে কিংবা পেটে হঠাৎ তীব্র, সহ্যাতীত ব্যথা শুরু হয়–তবে দেরি না করে রোগীকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে হবে। কারণ এটি পাকস্থলী ফুটো হয়ে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে।
লেখক: চিকিৎসক, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ



