অনেকেরই দেখা যায় বসা বা শোয়া থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে বা শরীর কেমন যেন দুর্বল লাগে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় ওর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন (Orthostatic Hypotension) বা পোস্টুরাল হাইপোটেনশন।
সহজ কথায়, শোয়া বা বসা অবস্থা থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে যদি রক্তচাপ আচমকা কমে যায়, তবে তাকে ওর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন বলে। রক্তচাপ পরিমাপের ক্ষেত্রে যদি উপরের রিডিং (সিস্টোলিক) ২০ mm Hg-এর বেশি এবং নিচের রিডিং (ডায়াস্টোলিক) ১০ mm Hg-এর বেশি নেমে যায়, তখন একে এই রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সাধারণত ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ, দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় শয্যাশায়ী রোগী, সদ্য মা হওয়া নারী এবং দ্রুত বেড়ে উঠছে এমন কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। এই রক্তচাপ নেমে যাওয়ার ঘটনাটি এবং এর তীব্রতা সকালের দিকে সবচেয়ে বেশি হয়, কারণ ঘুম থেকে ওঠার পর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের রক্তচাপ সর্বনিম্ন থাকে।
লক্ষণসমূহ: শরীর কী সংকেত দেয়?
এই সমস্যার প্রধান লক্ষণ হলো উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে মাথা ঘোরা বা মাথা হালকা লাগা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে। তবে বসে পড়লে বা শুয়ে পড়লে আবার ভালো বোধ হয়। অন্যান্য লক্ষণগুলো হলো —
◉ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা।
◉ বুক, কাঁধ বা ঘাড়ে ব্যথা।
◉ মানসিক বিভ্রান্তি বা সিদ্ধান্তহীনতা।
◉ অতিরিক্ত ক্লান্তি, দুর্বলতা বা মাথাব্যথা।
◉ বুক ধড়ফড় করা, বমি বমি ভাব এবং শরীর ঘেমে যাওয়া।
কেন এমন হয়?
আমরা যখন শুয়ে বা বসে থাকি, তখন পা থেকে রক্ত সহজেই হৃদপিণ্ডে ফিরে আসে। কিন্তু হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়ালে মহাকর্ষ বলের কারণে শরীরের প্রায় এক কাপ সমপরিমাণ রক্ত নিচের দিকে (পা ও পেটের অংশে) নেমে যায়। আমাদের শরীর যদি দ্রুত রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে সাময়িকভাবে এই সমস্যা হয়। এর মূল কারণগুলো হলো —
◉ হৃদযন্ত্রের সমস্যা: হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিওর বা হৃদস্পন্দনের অনিয়ম (Arrhythmia)-এর কারণে হার্ট পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে পারে না।
◉ নিউরোলজিক্যাল সমস্যা: পার্কিনসন্স বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগের কারণে শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র ঠিকমতো কাজ করে না, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বাধা দেয়।
◉ রক্তের পরিমাণ কমে যাওয়া: ডিহাইড্রেশন বা শরীরে পানির ঘাটতি (বমি, ডায়রিয়া বা অতিরিক্ত প্রস্রাবের ওষুধের কারণে), অ্যানিমিয়া (রক্তস্বল্পতা) বা কোনো আঘাতের কারণে শরীরে রক্তের পরিমাণ কমে গেলে এটি হয়।
◉ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্ণতা বা ক্যানসারের কিছু ওষুধের কারণেও এমন হতে পারে।
◉ দীর্ঘদিন নড়াচড়া না করা: অসুস্থতা বা গর্ভাবস্থায় দীর্ঘদিন বিছানায় শুয়ে থাকলে এই ঝুঁকি বাড়ে।

রোগ নির্ণয় ও পরীক্ষা
চিকিৎসকেরা সাধারণত রোগীকে শুইয়ে, বসিয়ে এবং দাঁড় করিয়ে—তিনটি ভিন্ন অবস্থানে রক্তচাপ মেপে এই রোগটি নিশ্চিত করেন। এছাড়া অন্তর্নিহিত কারণ খোঁজার জন্য কিছু পরীক্ষা করা হতে পারে —
◉ রক্তস্বল্পতা বা ডায়াবেটিস পরীক্ষার জন্য রক্ত পরীক্ষা।
◉ হার্টের অবস্থা বুঝতে ইসিজি (EKG) এবং ইকোকার্ডিওগ্রাম।
◉ একটি বিশেষ চলন্ত টেবিলে শুইয়ে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন মাপার জন্য ‘টিল্ট টেবিলে টেস্ট’ (Tilt table test)।
জটিলতা
মাথা ঘুরে বা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলে হাড় ভেঙে যাওয়া বা মাথায় মারাত্মক আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া রক্তচাপ দীর্ঘদিন খুব বেশি কম থাকলে স্ট্রোক বা হার্টের ক্ষতি হতে পারে।
সুস্থ থাকার সহজ উপায় ও চিকিৎসা
এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি —
◉ ধীরে ধীরে উঠুন: বসা বা শোয়া থেকে একবারে ঝটকা দিয়ে না উঠে, একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে দাঁড়ান। দাঁড়ানোর সময় পাশে শক্ত কিছু ধরে রাখুন।
◉ পর্যাপ্ত পানি ও হালকা খাবার: প্রচুর পানি পান করুন। অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট বা ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন এবং অ্যালকোহল বর্জন করুন।
◉ বালিশের ব্যবহার: ঘুমানোর সময় মাথার নিচে বাড়তি বালিশ ব্যবহার করে মাথা একটু উঁচুতে রাখুন।
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করা বা গরম স্থানে বেশিক্ষণ থাকা এড়িয়ে চলুন, কারণ গরমে এই সমস্যা বাড়ে।
◉ মাংসপেশীর ব্যায়াম: দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হলে পায়ের পাতা নাড়াচাড়া করুন। দাঁড়ানোর আগে হাতের মুঠো শক্ত ও আলগা করার মতো হালকা ব্যায়াম (Isometric exercise) করতে পারেন।
◉ বিশেষ পোশাক: চিকিৎসকের পরামর্শে পায়ে কম্প্রেশন স্টকিংস (Compression stockings) বা পেটে বিশেষ ইলাস্টিক বেল্ট পরতে পারেন, যা রক্তপ্রবাহ সচল রাখে।
◉ যদি কোনো নির্দিষ্ট ওষুধের কারণে এমন হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধের ডোজ পরিবর্তন করতে হবে।
সূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, আমেরিকা।


