লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়া বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে এখন এমএএসএলডি (Metabolic dysfunction-associated steatotic liver disease) বলা হয়, যা আগে ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ (এনএএফএলডি) নামে পরিচিত ছিল। অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যায় যারা ভুগছেন, তাদের জন্য এই রোগটি বড় উদ্বেগের কারণ।
রোগটি আসলে কী?
সহজ কথায়, যখন লিভারে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চর্বি জমতে শুরু করে, তখনই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। এটি সাধারণ চর্বি জমা (Steatosis) থেকে শুরু করে লিভারের মারাত্মক প্রদাহ বা এমএএসএইচ (Metabolic dysfunction-associated steatohepatitis) পর্যন্ত হতে পারে। এমএএসএইচ হলে লিভার ফুলে যায় এবং কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে লিভার সিরোসিস বা ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
লক্ষ্মণগুলো চিনবেন কীভাবে?
ফ্যাটি লিভারের বড় সমস্যা হলো, শুরুর দিকে এর কোনো বিশেষ উপসর্গ থাকে না। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে পারে–
অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অবসাদ বোধ করা।
পেটের ডানদিকের উপরিভাগে অস্বস্তি বা ব্যথা।
শরীর ম্যাজম্যাজ করা বা অসুস্থ বোধ করা।
অবস্থা যখন গুরুতর হয় (যেমন সিরোসিস), তখন হাত-পা ফুলে যাওয়া, পেটে পানি আসা (Ascites), জন্ডিস, ত্বকে চুলকানি এবং শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
কেন হয় এই রোগ?
বিশেষজ্ঞরা এখনো নিশ্চিত নন কেন কিছু মানুষের লিভারে চর্বি জমে আর অন্যদের জমে না। তবে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে–
অতিরিক্ত ওজন বা মেদভুঁড়ি।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিস।
রক্তে উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড।
বংশগতি বা জেনেটিক্স।
এ ছাড়া ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের এবং যাদের বিপাকীয় সিনড্রোম আছে, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগ জটিল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
লিভার যখন অকেজো হয়
যদি সময়মতো চিকিৎসা করা না হয়, তবে লিভারে স্থায়ী ক্ষত বা ফাইব্রোসিস তৈরি হয়। এই ক্ষত ছড়িয়ে পড়লে লিভার শক্ত হয়ে যায়, যাকে সিরোসিস বলে। এর ফলে লিভার ফেইলিউর হতে পারে এবং এমনকি জীবন বাঁচাতে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রয়োজন হতে পারে।
প্রতিকার ও প্রতিরোধে করণীয়
সুসংবাদ হলো, জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের মাধ্যমে এই রোগ প্রতিরোধ, এমনকি রিভার্স (পুরোনো অবস্থায় ফেরানো) করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যকর খাবার: প্রচুর ফলমূল, শাকসবজি ও হোল গ্রেইন (আস্ত দানা শস্য) খান।
চিনি ও পানীয় বর্জন: চিনিযুক্ত পানীয়, সোডা এবং প্যাকেটজাত জুস এড়িয়ে চলুন।
ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের বাড়তি ওজন কমান। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে ওজন কমানো লিভারের জন্য ভালো।
শারীরিক পরিশ্রম: সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন নিয়মিত ব্যায়াম বা দ্রুত হাঁটার অভ্যাস করুন।
অ্যালকোহল পরিহার: লিভারের সুরক্ষায় মদ্যপান থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন।
লিভার শরীরের শক্তির কেন্দ্র। সঠিক খাদ্যাভ্যাস আর সচেতনতাই পারে লিভারকে সুস্থ ও চনমনে রাখতে। তাই আজই সচেতন হোন।


