সহজ ভাষায় বলতে গেলে, হেপাটাইটিস হলো আমাদের লিভার বা যকৃতের প্রদাহ (Inflammation)। কোনো সংক্রমণ বা আঘাতের বিপরীতে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই হলো প্রদাহ। যখন কোনো কারণে আমাদের লিভার ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্রমিত হয়, তখন সেখানে প্রদাহের সৃষ্টি হয়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে হেপাটাইটিস নামে পরিচিত।
এই রোগটি কখনো হঠাৎ দেখা দিয়ে ৬ মাসের মধ্যে সেরে যায়, একে বলা হয় অ্যাকিউট (Acute) বা তীব্র হেপাটাইটিস। আবার কখনো এটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয় এবং আস্তে আস্তে লিভারকে ধ্বংস করতে থাকে, একে বলা হয় ক্রনিক (Chronic) বা দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস।
হেপাটাইটিসের বিভিন্ন প্রকারভেদ
হেপাটাইটিস প্রধানত তিন ধরনের হতে পারে —
◉ ভাইরাল হেপাটাইটিস: এটি সবচেয়ে সাধারণ রূপ। বিভিন্ন ভাইরাসের আক্রমণে এই রোগ হয়, যেমন— হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই।
◉ টক্সিক বা বিষাক্ত হেপাটাইটিস: অতিরিক্ত অ্যালকোহল (মদ) সেবন, বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শ কিংবা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে লিভারের যে ক্ষতি হয়, তা-ই টক্সিক হেপাটাইটিস।
◉ অটোইমিউন হেপাটাইটিস: এটি একটি বিরল রোগ। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) ভুলবশত নিজের লিভারের কোষগুলোকেই শত্রু ভেবে আক্রমণ করে বসে।
রোগটির লক্ষণসমূহ কী কী?
হেপাটাইটিস অত্যন্ত চতুর একটি রোগ। অনেক সময় প্রাথমিক অবস্থায় এর কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না। তবে রোগটি দেখা দিলে সাধারণত যেসব লক্ষণ প্রকাশ পায় —
• ঘন ঘন ডায়রিয়া ও প্রচণ্ড ক্লান্তি বা অবসাদ।
• শরীর দুর্বল লাগা এবং অস্বস্তি বোধ হওয়া।
• ভাইরাল ইনফেকশন হলে জ্বর আসা।
• বমি বমি ভাব বা ক্ষুধামন্দা।
• পেটের ডানদিকের ওপরের অংশে ব্যথা হওয়া।
যদি রোগটি দীর্ঘস্থায়ী (ক্রনিক) রূপ নেয় এবং লিভারের বেশি ক্ষতি করে, তবে নিচের জটিল লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে —
• জন্ডিস (ত্বক ও চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া)।
• প্রস্রাবের রঙ গাঢ় বা ডার্ক হওয়া এবং পায়খানার রঙ ফ্যাকাসে হওয়া।
• ত্বক চুলকানো (Pruritus)।
লিভারের মারাত্মক ক্ষতির কারণে মস্তিস্কে প্রভাব পড়া, যার ফলে স্মৃতিভ্রম, দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব (Hepatic Encephalopathy) হতে পারে।
কেন হয় এই রোগ?
হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ হলো ভাইরাস। তবে এটি কীভাবে ছড়ায়, তা ভাইরাসের ধরনের ওপর নির্ভর করে —
১. দূষিত খাদ্য ও পানি: হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ সাধারণত দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়, যাকে আমরা সাধারণ ভাষায় ফুড পয়জনিং-ও বলে থাকি।
২. রক্ত ও শারীরিক তরল: হেপাটাইটিস ‘বি’, ‘সি’ এবং ‘ডি’ ছড়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা শরীরের অন্যান্য তরলের মাধ্যমে। যেমন— আক্রান্ত ব্যক্তির সুই বা সিরিঞ্জ ব্যবহার করলে এবং অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে। এছাড়া আক্রান্ত মায়ের শরীর থেকে সন্তান জন্মের সময়ও হেপাটাইটিস ‘বি’ ছড়াতে পারে।
অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণ —
ভাইরাস ছাড়াও বেশ কিছু শারীরিক অবস্থার কারণে হেপাটাইটিস হতে পারে। যেমন— লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা (MASLD), পিত্তথলির সমস্যা (Cholestasis), অতিরিক্ত আয়রন বা তামা জমে যাওয়ার মতো বিরল জিনগত রোগ (Hemochromatosis ও Wilson Disease), এবং কিছু বিশেষ ভাইরাসের (যেমন- CMV, Epstein-Barr) সংক্রমণ।
লিভারের মারাত্মক জটিলতা
হেপাটাইটিসকে অবহেলা করলে তা শরীরের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে —
• সিরোসিস (Cirrhosis): দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের কারণে লিভার ক্ষতবিক্ষত হয়ে শুকিয়ে যায় এবং তার কার্যক্ষমতা হারায়।
• লিভার ক্যান্সার: গবেষণায় দেখা গেছে, লিভার ক্যান্সারের প্রায় অর্ধেক ঘটনার পেছনে রয়েছে হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসের কারণে হওয়া লিভার সিরোসিস।
• লিভার ফেইলিওর: যখন লিভার সম্পূর্ণ কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
• পোর্টাল হাইপারটেনশন: সিরোসিসের কারণে লিভারের প্রধান রক্তনালীতে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়া।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
লক্ষণ দেখে চিকিৎসকেরা শারীরিক পরীক্ষা, লিভার ফাংশন টেস্ট (Blood Test), ইমেজিন টেস্ট (যেমন— লিভার স্ক্যান বা ইলাস্টোগ্রাফি) এবং প্রয়োজনে লিভার বায়োপসির মাধ্যমে রোগটি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করেন।
যেহেতু হেপাটাইটিসের কারণ ভিন্ন ভিন্ন, তাই এর চিকিৎসায় কোনো একক পদ্ধতি নেই —
• জীবনযাত্রার পরিবর্তন: পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং পুরোপুরি অ্যালকোহল বর্জন করলে হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং অ্যাকিউট হেপাটাইটিস ‘বি’ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
• অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ: ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘বি’ এর জন্য আজীবন ওষুধ খেতে হতে পারে, যা ভাইরাস ছড়ানো ও জটিলতা কমায়। অন্যদিকে, আধুনিক ‘ডাইরেক্ট-অ্যাক্টিং অ্যান্টিভাইরাল’ (DAA) ওষুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘সি’ এখন পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব।
• লিভার প্রতিস্থাপন (Transplant): লিভার যদি একেবারেই অকেজো বা ফেইলিওর হয়ে যায়, তবে শেষ চিকিৎসা হিসেবে লিভার প্রতিস্থাপন করতে হয়।
প্রতিরোধের সহজ উপায়
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। হেপাটাইটিস থেকে দূরে থাকতে এই নিয়মগুলো মেনে চলুন —
• টিকা নিন: হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘বি’ এর অত্যন্ত কার্যকর ভ্যাকসিন বা টিকা রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আজই টিকা নিন।
• স্বাস্থ্যবিধি মানুন: টয়লেট ব্যবহারের পর এবং খাবার তৈরি বা খাওয়ার আগে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। বাইরের খোলা বা দূষিত পানি ও খাবার পরিহার করুন।
• সচেতনতা: যেকোনো ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য বা অতিরিক্ত ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকুন। ইনজেকশন নেওয়ার সময় সবসময় নতুন সিরিঞ্জ ব্যবহার নিশ্চিত করুন।
লিভার আমাদের শরীরের পাওয়ার হাউজ। সামান্য সচেতনতাই পারে এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটিকে হেপাটাইটিসের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে। সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন!


