গত বছর উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এইচএসসি ও সমমান) নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। এবার এটি বেড়ে হয়েছে ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার হার এভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে কিছু বিষয়কে সামনে আনছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর মধ্যে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর অনেক শিক্ষার্থীকে ক্লাসে-পড়ার টেবিলে ফেরাতে না পারাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। এ ছাড়া শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বেড়ে যাওয়াকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন তারা। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের কারণে মেয়ে শিক্ষার্থীরা এবং শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ায় ছেলে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ার কারণকেও সামনে আনছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব বিষয়ে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাইকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন, লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দল্টা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিতের সঙ্গে দৈনিক খবরের কাগজের কথা হয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, বিশেষ করে করোনা-পরবর্তী সময়কে ধরে একটা গবেষণা হওয়া দরকার। গবেষণাটি হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা। গবেষণা হতে হবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে নয়। এই গবেষণার জন্য যথেষ্ট বাজেটও থাকা উচিত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, প্রস্তুতির সংকটের কারণে অনেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেনি। প্রস্তুতির সংকটের কারণ হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা অসাধারণ কাজ করেছে, তারা গণ-অভ্যুত্থান সফল করেছে। কিন্তু অভুত্থান শেষে তাদের সবাইকে ক্লাসে-পড়ার টেবিলে পাঠানো দরকার ছিল। কিন্তু সবাইকে পাঠানো গেছে, তা নয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের মনস্তাত্ত্বিক গ্যাপ বেড়ে গিয়েছিল, সেটা পূরণ হয়নি। রাস্তার ট্রাফিক ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ঠিক করা সরকারের দায়িত্ব, শিক্ষার্থীদের না। আন্দোলনের পর তাদের দিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করানোর চেয়ে তাদের ক্লাসে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল তখন, কিন্তু তখন এটা করা হয়নি।
শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অশোভন আচরণ করার খবর আসছিল তখন। কিন্তু এর জন্য শিক্ষার্থীদের এককভাবে দায়ী করা উচিত হবে না, তারা ভিকটিম। শিক্ষকদেরও মনে রাখা উচিত, শিক্ষকতা স্রেফ একটা চাকরি নয়, ব্রত। তবে নির্বাচনের পর এখন অবস্থার উন্নতি হচ্ছে, আশা করি এই সমস্যা কেটে যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের সীমাহীন ক্ষতি হয়ে গেছে, এই ক্ষতিপূরণে সীমাহীন অঙ্গীকার দরকার।
ঢাবির সাইকোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, পরীক্ষা তো গায়ের জোরে হয় না। পরীক্ষা দিতে হয় পড়াশোনা করে। পরীক্ষার একটা প্রস্তুতি আছে, প্রস্তুতি নিতে হয়। আন্দোলনের পর শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের অশোভন আচরণের খবর আসছিল। তাই বলে শিক্ষকরা পড়াননি, ক্লাসে যাননি, তা তো না। শিক্ষকরা পড়িয়েছেন, ক্লাস নিয়েছেন; কিন্তু অনেক ছাত্র ঠিকমতো ক্লাসে যায়নি, পড়েনি। তাই প্রস্তুতি নিতে পারেনি, পরীক্ষায়ও বসতে পারেনি। কেবল আন্দোলনের পর না, করোনার পর থেকেই যেনতেনভাবে পড়ে পাস করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, সেটিও এই অবস্থার জন্য একটা কারণ।
তবে ঝরে পড়ার কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক কারণকে প্রধান করে দেখতে রাজি নন লক্ষ্মীপুর জেলার দল্টা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, অভিভাবকদের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাবোধ বেড়ে গেছে। এখন সম্পন্ন ঘরের মেয়েদেরও বিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে চাইছেন অভিভাবকরা। ছেলে অসৎ সঙ্গে পড়ে অসামাজিক বা বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে কি না, এই টেনশনে অবস্থাসম্পন্ন অভিভাবকরাও সন্তানকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত বলেন, ‘আন্দোলনের পর ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আমিও ছিলাম। কিন্তু সেটা সপ্তাহ থেকে ১০ দিন করেছি। কিন্তু এর বেশি সময় ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসের বাইরে রাখা ঠিক হয়নি। তখন একটা গ্রুপ এটি করিয়েছে। তারা পরে নতুন দল গঠন করেছে।’
প্রসঙ্গত, গতকাল শুরু হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দুই বছর আগে (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। যাদের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে পাবলিক পরীক্ষায় ফরম পূরণ করার পরও পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থী বাড়ছে। যেমন গত বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনে মোট ১৯ হাজার ৭৫৯ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। এর আগের বছর প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিল ১৫ হাজার ২০৩ পরীক্ষার্থী।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এ বছর এই বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেনি।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কেন এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে গেল বা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না, তার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে পারেনি শিক্ষা বিভাগ।
অবশ্য গত বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের করা একটি বিশ্লেষণে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। ওই বছর ঢাকা বোর্ডের অধীনে ৬ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৩৫০ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ বাল্যবিবাহই ছিল অনুপস্থিতির প্রধান কারণ। এ ছাড়া পরীক্ষার প্রস্তুতির অভাব ও দারিদ্র্যও উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উঠে আসে।
এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাতেও দেখা গেছে, দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেও তাদের মধ্যে ২৩ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে পাবলিক পরীক্ষায় ফরম পূরণ করার পরও পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থী বাড়ছে। যেমন ২০২৫ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনে মোট ১৯ হাজার ৭৫৯ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। এর আগের বছর প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিল ১৫ হাজার ২০৩ পরীক্ষার্থী।
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে। বাকি ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৮৪ জন ফরম পূরণ করেনি। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৩৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। এক বছরে হারটি প্রায় ৬ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম প্রথম বর্ষে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধন করেছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ৭৮ হাজার ২৬৯ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে। ৬১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেনি, যা মোট নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর ৪৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় একাদশ শ্রেণিতে (ভোকেশনাল) নিবন্ধন করেছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪২ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে মাত্র ৭৫ হাজার ১৯৭ জন পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে। অপরদিকে ৯০ হাজার ৩৪৫ জন ফরম পূরণ করেনি। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৫৪ দশমিক ৫৮ শতাংশই এবার পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ।