দেশের উত্তর-পশ্চিমে পদ্মার চরাঞ্চলে রক্তাক্ত আধিপত্যের লড়াই কোনো ভাবেই থামছেই না। বহু আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ অভিযান চালিয়ে এসব চরাঞ্চলকে সন্ত্রাসমুক্ত ঘোষণা করে। তবে বর্তমান চিত্র ভিন্ন। গত আট মাসে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের মূলে রয়েছে বালুমহাল, চরের জমি, ফসল কাটা ও নদীপথে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লড়াই। সহিংসতা না থামায় প্রতিনিয়ত চরম নিরাপত্তাহীনতা আর আতঙ্কে দিন কাটছে চরবাসীর।
গত শুক্রবার পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ও ভাঁড়ারা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী জোতকাকুরিয়া কলাবাগান চরে অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মঞ্জু শেখ। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চলছিল। শুক্রবার দুপুরে উভয় পক্ষ নদীতে অবস্থান নিলে সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে গোলাগুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন মঞ্জু শেখ।
এর আগে ১৬ জুন নাটোরের লালপুর উপজেলার রাইটার চরের কাছে যাত্রীবাহী নৌকায় সশস্ত্র হামলায় সাহাবুল ইসলাম নিহত হন। আহত হন আরও একজন। ৯ জুন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চর জজিরায় বালুমহালের ব্যবস্থাপক আজিজুল হাকিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৮ মে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাসখালী চরে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন স্বপন ব্যাপারী। হামলাকারীরা তার মরদেহও ট্রলারে তুলে নিয়ে যায়।
এরও আগে ৩ জানুয়ারি বাঘার পলাশী-ফতেপুর করালি নওশারার চরে নিজ বাড়িতে ঢুকে সোহেল রানাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত বছরের ২৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের চৌদ্দহাজার চরে খড় কাটাকে কেন্দ্র করে গোলাগুলিতে নিহত হন আমান মণ্ডল ও নাজমুল হোসেন। পরদিন একই ঘটনার জেরে হবিরচর থেকে লিটন হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আধিপত্যের সংঘাতের ধারাবাহিকতা।
রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মো. শাহজাহান বলেন, পদ্মার চরাঞ্চলের সহিংসতার প্রধান কারণ বালু উত্তোলন, চরের জমির নিয়ন্ত্রণ ও নদীপথে চাঁদাবাজি। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে লিজ নেওয়া বালুমহালের নির্ধারিত সীমানা মানা হয় না। আবার প্রশাসন সীমানা নির্ধারণ করে দিলেও প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ তা মেনে নিতে চায় না। এসব বিরোধই শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপরাধ চক্রগুলো পদ্মার দুই পাড়েই সক্রিয়। একদিকে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা; অন্যদিকে কুষ্টিয়াকে কেন্দ্র করে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
চরের কয়েকটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এলাকায় পুলিশি নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ায় নতুন নতুন সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রামবাসীর অভিযোগ, এখন দিনের বেলাতেই অস্ত্রধারীরা স্পিডবোটে নদীপথে টহল দেয়। সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ঘর থেকে বের হতে ভয় পান। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি চরের বাসিন্দা বলেন, ‘প্রায়ই গুলির শব্দ শুনি। কারও বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস নেই।’
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বছরের ২৮ নভেম্বর নাটোর ও পাবনায় ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ নামে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই অভিযানে অন্তত ৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এরপরও অপরাধ কমেনি। সম্প্রতি পাবনার ঈশ্বরদীর লক্ষীকুণ্ডা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য চরে অভিযান চালাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন বলে জানান ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান।
তিনি বলেন, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই চরে অবস্থান করেন না। তারা দূরের শহরে বসেই স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। তা ছাড়া বহু জেলার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত দুর্গম চরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধীদের বড় সুবিধা দিচ্ছে। পুলিশ পৌঁছানোর আগেই তারা অন্য জেলায় পালিয়ে যায়।’
ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাঘা উপজেলার চরাঞ্চলে একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই আরেকটি সমন্বিত যৌথ অভিযানও পরিচালনা করা হবে।