বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রেন চলাচলের সূচি থাকলেও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, তীব্র জনবলসংকট এবং যান্ত্রিক অচলাবস্থার কারণে পরিষেবাব্যবস্থা এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ও ট্রেন ক্রু–চালক, সহকারী চালক ও গার্ডের অভাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৬০০ ট্রেন বাতিল বা আংশিক চলাচল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে কেবল যাত্রী ভোগান্তিই বাড়ছে না, রাজস্ব আয়েও পড়েছে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব। এই পরিস্থিতিতে কারখানা আধুনিকায়নের মাধ্যমে রেলব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে ২৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে বেশ কয়েকটি প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে রেলওয়ে।
রেলওয়ের তথ্য বলছে, লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ (বগি) সংকটে প্রায়ই বিভিন্ন রুটের ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়। জানা গেছে, ২০২০ সাল থেকে লোকোমোটিভ ও জনবল সংকটের অজুহাতে ধারাবাহিকভাবে ১৬টি মেইল ও কমিউটার এবং ছয়টি লোকাল ট্রেন স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এসব ট্রেন বন্ধ থাকায় সাধারণ যাত্রী ও নিম্ন আয়ের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে তারা সড়কপথে যাতায়াত করছেন। যার ফলে সড়কপথের ওপর চাপ বেড়েছে এবং দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকিও বহু গুণ বেড়েছে।
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ট্রেন সংকটের কারণে আন্তনগর ট্রেনগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির ট্রেন বন্ধের ফলে স্থানীয়দের আন্দোলন ও জনপ্রতিনিধিদের চাপে আন্তনগর ট্রেনগুলোকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রাবিরতি দিতে বাধ্য হতে হচ্ছে। এতে দীর্ঘপথের যাত্রীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না এবং আন্তনগর ট্রেনের সেবার মান সাধারণ লোকাল ট্রেনের পর্যায়ে নেমে আসছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৬২টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের মধ্যে ৬৯ শতাংশেরই অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। ১ হাজার ২৬৭টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচের মধ্যে ৪৩ শতাংশের অবস্থাও একই। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অদূরদর্শিতার কারণেই এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
রেলের আধুনিকায়নে লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংগ্রহে মহাপরিকল্পনা
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে একযোগে একাধিক মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। চীন, দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) মতো দাতা সংস্থার অর্থায়নে আধুনিক লোকোমোটিভ, ক্যারেজ সংগ্রহ এবং কারখানা আধুনিকায়নের মাধ্যমে রেলব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেলের এসব রোলিং স্টক কেনাকাটায় ২৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকার প্রাক্কলন ব্যয়ে বেশ কয়েকটি প্রকল্পও শুরু করতে যাচ্ছে রেলওয়ে।
চীনের অনুদানে রেলওয়ের জন্য ২০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ করা হবে। এ প্রকল্পে প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের তহবিল থেকে ৪৪ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সহায়তার জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ৫৯১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। চীনের সরাসরি অনুদানে এই লোকোমোটিভগুলো শিগগিরই এসে পৌঁছাবে। জানা গেছে, এই লোকোমোটিভগুলোর ক্ষমতা কেমন হবে তার ওপর নির্ভর করবে চীনা প্রকল্প থেকে আরও কোনো রোলিং স্টক কেনা হবে কি না। কারণ চীনা লোকো ও ক্যারেজের নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ফুরানোর আগে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর আগে চীনা লোকো ও ক্যারেজ নিয়ে অসন্তুষ্টি রয়েছে রেলের প্রকৌশল বিভাগে। তাই রেলওয়ে এবার সতর্ক।
অন্য এক প্রকল্পের আওতায় ২০০টি মিটারগেজ ক্যারেজ, ২টি ব্রডগেজ ও ২টি মিটারগেজ রিলিফ ক্রেন, ৪টি আন্ডারফ্লোর হুইল লেদ কেনা হবে। আন্ডারফ্লোর হুইল লেদ হলো একটি বিশেষায়িত যন্ত্র, যা দিয়ে চাকাগুলোকে ট্রেন থেকে আলাদা না করেই নিখুঁত ও মসৃণ আকারে মেরামত করা যায়। এ কেনাকাটায় ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ২৪২ কোটি টাকা আসবে সরকারের তহবিল থেকে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এই প্রকল্পে ২ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা ঋণসহায়তা দেবে বলে জানা গেছে।
আরেকটি প্রকল্পে ৩ হাজার ৯৭০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৬০টি ব্রডগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ সংগ্রহ করার পরিকল্পনা নিয়েছে রেলওয়ে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) খসড়ায় বলা হয়েছে, ১৫৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং বাকি ২ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ ফান্ড থেকে ঋণসহায়তা পাওয়া যাবে।
এই প্রকল্পের আওতায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৪০টি ব্রডগেজ স্লিপার কার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৭০টি ব্রডগেজ চেয়ার কার, ১১০টি ব্রডগেজ শোভন চেয়ার কার, প্রার্থনা কক্ষ ও খাবার গাড়িসহ ২০টি ব্রডগেজ শোভন চেয়ার কার, লাগেজ ভ্যান ও গার্ড ব্রেকসহ ২০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্রডগেজ পাওয়ার কার কেনাকাটার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭৭০ টাকা। এ প্রকল্পে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা ঋণসহায়তা দেবে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সংযোজন সুবিধাসহ আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ করার আরও একটি প্রকল্প রয়েছে রেলওয়ের পাইপলাইনে। এ প্রকল্পের প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা থেকে ৩ হাজার ২৬৪ কোটি ঋণসহায়তা চাইবে রেল। এই প্রকল্পের আওতায় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিদ্যমান অবকাঠামো আধুনিকায়নের পাশাপাশি ২৫টি ক্যারেজ অ্যাসেম্বলির সংস্থান, লোকোশেডের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে রেলওয়ের। এ প্রকল্পেও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর ঋণসহায়তা চাইবে রেলওয়ে।
দিনাজপুরের পার্বতীপুরের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা বা কেলোকায় জেনারেল ওভারহোলিং (জিওএইচ) স্টেশন স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা। প্রকল্পে ২ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা ঋণসহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছে ঋণসহায়তা পায়।
এ বছর ২০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে রেলওয়ের। ৬৪০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ৫১২ কোটি টাকা অনুদান দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
৩ হাজার ৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৬টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ প্রকল্পে চীন বা দক্ষিণ কোরিয়ার ২ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা ঋণসহায়তা থেকে পাওয়ার প্রত্যাশা করছে সরকার।
আরেকটি প্রকল্পে ২৬০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ কেনার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এতে প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ ফান্ড থেকে ১ হাজার ৭৫১ কোটি ঋণসহায়তা পাওয়া যাবে বলে আশ্বাস মিলেছে। ইডিসিএফ অর্থায়নে আরও ৩০০ মিটারগেজ ক্যারেজ আনার পরিকল্পনা করছে রেলওয়ে।
রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন জানান, এ বছর এডিবির অর্থায়নে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ কেনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এআইআইবির অর্থায়নে ২০০টি ব্রডগেজ ক্যারেজ কেনার পরিকল্পনা সম্পন্ন হয়েছে। চলতি মাসে ২০টি ক্যারেজ চলে আসবে বলে প্রত্যাশা করছে রেল।
রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, রেলওয়ের মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে রূপান্তরের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি। তাই ২০৫০ সালের আগে পুরো রেল নেটওয়ার্ক রূপান্তর করা সম্ভব নয়। তাই মিটারগেজ ট্রেন সচল রাখতে নতুন লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ফকির মো. মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রামসহ প্রধান করিডরগুলোর অনেক অংশ এখনো মিটারগেজে রয়েছে। টঙ্গী থেকে আখাউড়াসহ বিভিন্ন রুটের ডুয়েল বা ব্রডগেজ রূপান্তর করতে আগামী অন্তত ১০ বছর সময় প্রয়োজন। সব মিলিয়ে ২০৫০ সালের আগে পুরোপুরি মিটারগেজ রূপান্তর সম্ভব নয়। তাই ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের মিটারগেজ লোকোমোটিভ প্রয়োজন।’
রেলওয়ে বর্তমানে তীব্র লোকোমোটিভ সংকটে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন ১১০টি লোকোমোটিভ প্রয়োজন হলেও আছে মাত্র ৭০টির মতো। এর মধ্যে অনেকটিই পুরোনো। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার দ্রুত লোকোমোটিভ সংগ্রহের ওপর জোর দিয়েছে।’
চীনের কাছ থেকে ২০টি লোকোমোটিভ অনুদান হিসেবে পাওয়ার বিষয়ে রেলওয়ের আগ্রহের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চীনের কাছ থেকে এই অনুদান পাওয়া গেলে আমাদের লোকোমোটিভ সংকট দ্রুত কাটবে। তারা এটি বিনা পয়সায় দিয়ে যদি পাঁচ বছর রক্ষণাবেক্ষণ করে, তবে তা আমাদের জন্য সুবিধাজনক।’
ভবিষ্যতে লোকোমোটিভ কেনার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর রেলওয়ে নির্ভরশীল নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যারা যোগ্য এবং সাশ্রয়ী হবে, তাদের কাছ থেকেই রোলিং স্টক বা ইঞ্জিন সংগ্রহ করা হবে বলে জানান তিনি।