ঢাকা ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
কৌতুকপ্রিয়তা আর সমাজ-নিরীক্ষণ প্রতিবন্ধীদের জন্য ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালু করবে সরকার: সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী গ্রামে আমাদের বিশেষ আকর্ষণ ছিল পদ্মার নৌকাভ্রমণ খামেনির মরদেহ নেওয়া হয়েছে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় ৬.২ মাত্রার ভূমিকম্পে কাঁপল ইন্দোনেশিয়া দেশে বন্যা হতে পারে জুলাই-আগস্টে: এফএফডব্লিউসি ‘আত্মতুষ্টি আপনাকে শেষ করে দিতে পারে’, অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে দেওয়ার পর স্পেন কোচ রস্তায় ফেলে যাওয়া বৃদ্ধের দায়িত্ব নিলেন প্রতিমন্ত্রী টুকু বাজেটের প্রভাবে স্থিতিশীল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম রংপুরে ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী বাবা-ছেলে নিহত ফরিদপুরে একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের জন্ম, দুই জনের মৃত্যু ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, আশায় দীপ্যমান শেষ ষোলোতে সুইজারল্যান্ডের প্রতিপক্ষ কে? হাতিয়ায় নারীসহ যুবদল নেতা আটক, পদ থেকে বহিষ্কার ৮৮ বছরের খরা কাটিয়ে শেষ ষোলোতে সুইজারল্যান্ড বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ২য় পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র একদিনের ব্যবধানে বাড়ল স্বর্ণ ও রুপার দাম মাদারীপুরে শিক্ষকের ওপর হামলা, পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের সব বিভাগে বৃষ্টির পূর্বাভাস বিশ্বকাপের মঞ্চেই বিদায় বলবেন রোনালদো! ছুটির দিনে ঢাকার বাতাস ‘সহনীয়’ এইচএসসিতে ঝরে পড়া বাড়ার দায় কার? লালমনিরহাটে ৪ দিন পর্যন্ত অন্ধকারে ২২ হাজার গ্রাহক মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া-মিসর: দুই দলেরই ইতিহাস গড়ার হাতছানি নবিজি (সা.) যাদের অভিশাপ দিয়েছেন নির্ধারিত ৬০ পণ্যে বাজেটের সুবিধা পাচ্ছেন না ক্রেতারা বিস্ফোরণে কাঁপছে টেকনাফ সীমান্ত খামেনির জানাজায় যোগ দেবে ৯০ দেশের প্রতিনিধি রূপকথা নাকি রাজত্ব লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর মানববন্ধন

আলাউদ্দিন আল আজাদ পুনর্পাঠ ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, আশায় দীপ্যমান

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১১:৩০ এএম
ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, আশায় দীপ্যমান
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

শুধুই কথাসাহিত্য নয়, অবলীলায় পারঙ্গমতায় বিচরণ করেছেন কবিতায়, নাটকে, বৈদগ্ধ প্রবন্ধে আলাউদ্দিন আল আজাদ সর্বত্র পদচারী, সব্যসাচী হলেও তার প্রধান পরিচয় তিনি কথাসাহিত্যিক তার গল্প, বিশেষ করে উপন্যাসগুলো তার সময়কালে উত্তুঙ্গ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয় জীবনদর্শনের আলোকে জীবনকে পর্যবেক্ষণ করা এবং তা সাহিত্যে তুলে আনার বিরল ক্ষমতা পারঙ্গমতা দেখাতে তিনি সক্ষম হয়েছেন...

বাংলাদেশের সাহিত্য, বিশেষ করে কথাসাহিত্যের দিকে ফিরে তাকাই, তখনই আলো ঝলমল উজ্জ্বল বন্দরটিকে দেখতে পাই, শুনতে পাই দক্ষ নাবিকদের কলস্বর তাদেরই একজন আলাউদ্দিন আল আজাদ তার সময়কালের সবচেয়ে সফল জনপ্রিয় বহুমাত্রিক সাহিত্যিক শুধুই কথাসাহিত্য নন, অবলীলায় পারঙ্গমতায় বিচরণ করেছেন কবিতায়, নাটকে, বৈদগ্ধ প্রবন্ধেও আর সাহিত্যের গণ্ডির বাইরে শিক্ষকতায় প্রশাসনিক দক্ষতায় রেখেছেন সৃজনশীলতার সুবিন্যস্ত স্বাক্ষর

কথাসাহিত্যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও তার গল্প-উপন্যাস মনোরঞ্জক উপাদান-বিলাসে মগ্ন ছিল না; প্রতিটি লেখা ছিল সমাজ বাস্তবতার সুতীক্ষ্ণ চিত্রায়ন, সামন্ততান্ত্রিক পুঁজি বিকাশমান সমাজের শোষণ প্রক্রিয়া, শোষিতের হাহাকার রুখে দাঁড়ানো সংগ্রামের কাহিনি সংগ্রাম লড়াইয়ের প্রক্রিয়াতেই জেগে ওঠে বেঁচে থাকার আশাবাদ, রোমান্টিক বলয়, জীবনের স্বপ্ন

আলাউদ্দিন আল আজাদের এই জীবনবোধ গড়ে উঠেছে তার জন্ম বেড়ে ওঠার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের উত্থান-পূর্ব জনপদের মানুষদের জীবনযাপন, সামাজিক ভাঙচুর, অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি অব্যাহত দ্বন্দ্বমুখরতা সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আত্মপরিচয়ের সন্ধান তার চৈতন্য কলমকে শাণিত করে তুলেছে বিশ্বসাহিত্য পাঠ, বিশেষ করে মার্কস-এঙ্গেলসের পঠন-পাঠন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনের উত্থান তার চিন্তার জগৎকে উদ্দীপ্ত করে তুলেছে

আলাউদ্দিন আল আজাদ জন্মগ্রহণ করেন ঢাকার কাছেই নরসিংদীতে রায়পুরা থানার রামনগর গ্রামে, নিম্ন মধ্যবিত্ত এক পরিবারে মে, ১৯৩২- জন্মের দেড় বছরের মধ্যেই মা আমেনা খাতুন মারা যান বাবা গাজী আব্দুস সোবহান মারা যান তার দশ বছর বয়সে তখন থেকেই তার জীবন সংগ্রামের সূত্রপাত নিজের মেধা যোগ্যতা নিয়ে শুরু হয় তার পথ চলা, নিজেকে গড়ে তোলারও লড়াই অসাধারণ মেধাবী তিনি জীবনযুদ্ধে হাজারো প্রতিকূল পরিবেশেও মানেননি পরাভব তার পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল এত বিরূপতার মাঝেও ঢাকা বিশ্ববিদালয়ে বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক (অনার্স) স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া তিনি ঈশ্বরগুপ্তের জীবন সাহিত্য নিয়ে অভিসন্দর্ভ লিখে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন

আলাউদ্দিন আল আজাদ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সেই সময়টায় উন্মাতাল দেশ শুরু হয় ভাষা আন্দোলনরাষ্ট্রভাষা বাংলা চাইদাবিতে ঢাকা শহরসহ বাংলাভাষাভাষী সমগ্র জনপদ উন্মাতাল হয়ে ওঠে তখন নূরুল আমিনের সরকার ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র-জনতার মিছিলে সরকারি বাহিনী সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে শহিদ করে এতে সারা অঞ্চলে বিক্ষোভ আরও বেড়ে যায় এই মিছিল বিক্ষোভে আলাউদ্দিন আল আজাদ সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন

২৩ ফেব্রুয়ারিতে শহিদদের স্মরণে মেডিকেল কলেজের সামনে শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে এই কাজ সম্পন্ন হয় এই শহিদ মিনারটি সেই সময়ই প্রাথমিকভাবে উদ্বোধন করানো হয় শহিদ সফিউরের বাবাকে দিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন দৈনিক আজাদের সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন এই শহিদ মিনারটিকে সহ্য করতে পারেনি পাকিস্তানি সরকার সেদিনই এই মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়

আলাউদ্দিন আল আজাদ তখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকেন তৎকালীম ইকবাল হলে (বর্তমানে শহিদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) সেদিনই তিনি একটি দুর্ধর্ষ কবিতা লেখেন: স্মৃতি স্তম্ভ

ভাষা আন্দোলন নিয়ে লিখিত কবিতা গানগুলোর মধ্যে প্রথম কয়েকটির মধ্যে এটি অন্যতম কবিতা মুখে মুখে ফেরে: ‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছ তোমরা? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো/ চার কোটি পরিবার/ খাড়া রয়েছি তো!/ যে ভিত কখনো কোনো রাজন্য/ পারেনি ভাঙতে’...

এই কবিতার প্রতিটি ছত্রে বজ্রনির্ঘোষ, শাসকের প্রতি হুংকার, কিষান, কামার-কুমার, জেলে সর্বস্তরের জনতার জাগৃতির আহ্বান: ‘হীরের মুকুট নীল পরোয়ানা খোলো তলোয়ার/ খুরের ঝটিকা ধুলায় চূর্ণ যে পদপ্রান্তে/ যারা বুনি ধান/ গুণ টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাঁপর চালাই/ সকল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য/ ইটের মিনার/ ভেঙেছে ভাঙুক ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার/ আমরা জাগরী/ চার কোটি পরিবার’...

আলাউদ্দিন আল আজাদ কবিতায়, নাটকে গানে প্রবন্ধেসর্বত্র পদচারী, সব্যসাচী হলেও তার প্রধান পরিচয় তিনি কথাসাহিত্যিক তার গল্প, বিশেষ করে উপন্যাসগুলো তার সময়কালে উত্তুঙ্গ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয় জনপ্রিয়তা মানেই তরল মনে করার কারণ নেই জীবনদর্শনের আলোকে জীবনকে পর্যবেক্ষণ করা এবং তা সাহিত্যে তুলে আনার বিরল ক্ষমতা পারঙ্গমতা দেখাতে তিনি সক্ষম হয়েছেন

মাত্র আঠারো বছর বয়সে লেখা প্রকাশিত প্রথম গল্পের বইজেগে আছি মাধ্যমেই তিনি পাঠক সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন তারক্ষুধা আশা’, ‘তেত্রিশ নম্বর তৈলচিত্রসহ কয়েকটি উপন্যাস চিরকালীন পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যাবে

তার পাঠকনন্দিত উপন্যাস গল্পের অন্য বইগুলো হলো: কর্ণফুলও, শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন, খসড়া কাগজ, শ্যাম ছায়ার সংবাদ, জ্যোৎস্নার অজানা জীবন, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, স্বাগতম ভালোবাসা, অপর যোদ্ধারা, পুরানা পল্টন, অন্তরীক্ষে বৃক্ষরাজি, প্রিয় প্রিন্স, ক্যাম্পাস, অনূদিত অন্ধকার, স্বপ্নশীলা, কালো জ্যোৎস্নায় চন্দ্রমল্লিকা, বিশৃঙ্খলা, ধানকন্যা, মৃগনাভি, অন্ধকার সিঁড়ি, উজান তরঙ্গ, যখন সৈকতে, আমার রক্ত স্বপ্ন আমার

কবিতা: মানচিত্র, ভোরের নদীর মোহনায় জাগরণ, সূর্য জ্বালার সোপান, লেলিহান পাণ্ডুলিপি, নিখোঁজ সনেটগুচ্ছ, আমি যখন আসবো, এ্যাসেস অ্যান্ড স্পার্কস, সাজগর, চোখ, শ্রেষ্ঠ কবিতা

নাটক: নরকে লাল গোলাপ, ইহুদির মেয়ে, মরক্কোর জাদুকর, ধন্যবাদ, মায়াবী প্রহর, সংবাদ শেষাংশ

প্রবন্ধ: শিল্পীর সাধনা, সাহিত্যের আগন্তুক ঋতু, ফেরারি ডায়েরি, রবীন্দ্র ক্ল্যাসিক আবিষ্কার, নজরুল গবেষণা, মায়াকভস্কি নজরুল, সাহিত্যে সমালোচনা, অজিতকুমার গুহ, মুজফফর আহমদ, হামিদুর রহমান, রশিদ চৌধুরী

আজীবন নিয়োজিত ছিলেন সাহিত্যে শিক্ষাব্রতে দেশের শীর্ষ দুটি কলেজঢাকা কলেজ জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, সচিবের দায়িত্বে কিছুদিন মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসে সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ইউনেস্কো পুরস্কার, একুশে পদক এবং মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার

২০০৯ সালের জুলাই তিনি পরলোকগমন করেন আজ এই দিনে এই মহান সাহিত্যিকের প্রতি তার উত্তরপুরুষের শ্রদ্ধা প্রণতি

কৌতুকপ্রিয়তা আর সমাজ-নিরীক্ষণ

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:২৪ পিএম
কৌতুকপ্রিয়তা আর সমাজ-নিরীক্ষণ
বই

গল্প থেকে ছোটগল্প হয়ে উঠার দীর্ঘ জার্নি রবীন্দ্রনাথে পরিণতি লাভ করেগল্পগুচ্ছবাংলা ছোটগল্পের নির্দেশিকা পুস্তক বলা যেতে পারে

১২৯১ থেকে ১২৯৭ পর্যন্তরবীন্দ্রনাথের ‌‘দেনা পাওনা’ (১২৯৮, হিতবাদী) প্রকাশের আগ পর্যন্ত ছোট আকারে গল্প রচনার ঝোঁক দেখা যায়’ (‘শত বর্ষের বাঙলা ছোটগল্প: একটি রূপ-রেখা’/ উজ্জ্বলকুমার মজুমদার, সাপ্তাহিক দেশ, কলকাতা)

রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী জনপ্রিয় গল্পকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সাধারণভাবে কৌতুক রসসৃষ্টির জন্যই তিনি পাঠকের অনেক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন সাধারণত প্রভাতকুমারের গল্পে দেখি, প্রথম দিকে গল্পটিকে ধীর গতিতে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে শেষের দিকে এমন একটি পরিস্থিতির চমক সৃষ্টি করেন যাতে গল্পের পরিণাম তৃপ্তিদায়ক হয় আলোচ্য গ্রন্থপিঁপড়া কাসেম’-এর লেখক সালাহ উদ্দিন পাঠান এমন করেই গল্প বলেন এবং সাজান উপযুক্ত বয়ানের সমর্থনে তারকিছুই করার ছিল নাএবংরাত-পাহারাথেকে সামান্য উদ্ধৃতি

‘‘দর্শনার্থীদের একজন বলে ওঠেন, ‘লোকটি কী মারা গেছে নাকি বেঁচে আছে এটা তো বোঝাই যাচ্ছে না

পাশের একজন বলে, ‘এত বোঝার দরকার নাই, নিজের চিন্তা করেন, আর এখান থেকে আপনি বুঝতেও পারবেন না নিষ্প্রাণ দেহকে আপনি কীভাবে ধরে নেবেন সেটাই হচ্ছে আসল কথা

পেছনের একজন বলল, ‘ভাইজান আপনে যাই কন না ক্যা, আমার মনে অয় উনি মারাই গেছেন

উপস্থিত আরেকজন ধমকের স্বরে বলে, ‘ মিয়া বেশি বেশি কথা কও ক্যা? তুমি কি গণক নাকি?’

দেহেন মিয়া ভাই, আমার মামু বেটা যহন মারাত্মক এক্সিডেন্ট কইরা এইরহম আইসিইউতে আছিলো তহনো তো ডাক্তারের কোনো গ্যারান্টি দিবার পারে নাই কথা বলেই লোকটি হু হু করে কেঁদে ওঠে লনের শেষ মাথার ওয়ার্ডবয় জোরসে ধমক দিয়ে উঠলে লোকজনের শোরগোলের আওয়াজ কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়

গল্পের আরম্ভ, যেমন–‘শনি মঙ্গলেরমঙ্গলই হবে বোধহয়যোগাযোগ হলে তেলেনাপোতা আপনারাও একদিন আবিষ্কার করতে পারেন অর্থাৎ কাজেকর্মে মানুষের ভিড়ে হাঁফিয়ে ওঠার পর যদি হঠাৎ দুদিনের জন্য ছুটি পাওয়া যায়আর যদি কেউ এসে ফুসলানি দেয় যে, কোনো এক আশ্চর্য সরোবরেপৃথিবীর সবচেয়ে সরলতম মাছেরা এখনো তাদের জলজীবনের প্রথম বড়শিতে হৃদয়বিদ্ধ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে, আর জীবনে কখনো কয়েকটা পুঁটি ছাড়া অন্য কিছু জল থেকে টেনে তোলার সৌভাগ্য যদি আপনার না হয়ে থাকে, তা হলে হঠাৎ একদিন তেলেনাপোতা আপনিও আবিষ্কার করতে পারেন

তেলেনাপোতা আবিষ্কার করতে হলে একদিন বিকেলবেলার পড়ন্ত রোদে জিনিসে মানুষে ঠাসাঠাসি একটা বাসে গিয়ে আপনাকে উঠতে হবে, তার পর রাস্তার ঝাঁকানির সঙ্গে মানুষের গুঁতো খেতে খেতে ভাদ্রের গরমে ঘামে, ধুলো চটচটে শরীর নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক বাদে রাস্তার মাঝখানে নেমে পড়তে হবে আচমকা

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়েরতারিণী মাঝি’, ‘ডাইনীবিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়েরপুঁইমাচাবাংলা ছোটগল্পের পরিবর্তনের ধারায় অগ্রগণ্য বিবেচনা করা যায় অন্যদিকে সমাজ-বিশ্লেষণে এবং প্রলেতারিয়েত শ্রেণির চরিত্র-চিত্রণে পারদর্শী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তারপ্রাগৈতিহাসিক’ ‘ফসিলগল্পে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন

 পিঁপড়া কাসেমগল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কাসেম, একজন পিঁপড়ার ডিম বিক্রেতা কোর্ট এলাকার ফুটপাতে পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করা তার পেশা এবং রুজিরোজগারের প্রধান উৎস গ্রামে পরিবার-পরিজন রেখে নগরে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে তার জীবনচক্র ঠিক রাখে কাসেম কিন্তু বিষয়টি শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ, পেশাকেন্দ্রিক যোগাযোগ নেট দিয়ে প্রান্তিক জনের লোকাচার সংস্কৃতিতে আলোক প্রক্ষেপণকাসেম চরিত্রটিতে বিশিষ্টতা এনে দিয়েছে এভাবে কাসেম, ‘পিঁপড়া কাসেম’- পরিচিতি পেয়ে যায় যার অনুষঙ্গ আদিবাসী সুবেশ চিসিম, মাজার সংস্কৃতির জয়নাল এবং বাউল শিল্পী রেশমা আক্তার

পিঁপড়া কাসেমগল্পের সূচনা, মধ্যভাগ সমাপ্তি অংশের স্তরে স্তরে লেখকের কৌতুকপ্রিয়তা আর সমাজ-নিরীক্ষণ গল্পটির প্রধান বৈশিষ্ট্য

পিঁপড়া কাসেমগল্প থেকে কিছু উদ্ধৃতি

‘‘গভীরভাবে আবুল কাসেমকে অবলোকন করতে গিয় খেয়াল করি; ওর শরীরের বিভিন্ন জায়গার চামড়া ওঠা বোঝা যাচ্ছে: এই লোকটি ভীষণ পোড়-খাওয়া মানুষ খাটাখাটুনির আর অভাবে বয়সের তুলনায় বয়স্ক লোক বলে ভ্রম হয় তাকে আমার ধারণ জন্মেছে: আবুল কাসেম বয়সে আমার থেকে কিছুটা ছোটই হবে” (‘পিঁপড়া কাসেম, পৃষ্ঠা-৮২)

যাত্রাহীন বিরতি’, ‘ফলাফল অনিশ্চিত’, ‘কী আর করাদণ্ডবিধির বেস্টনিকে কত প্রাঞ্জল ভাষায় মুক্ত করা যায়এসবের মনঃসমীক্ষণ আশ্রিত তিনটি গল্প

স্মর্তব্য, অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায়মামলার ফলরচনা করে বাঙালি পাঠকের মনে স্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিয়েছেন

মামলার ফল’-এর গতিপ্রকৃতির সঙ্গে এখনকার সমাজ, কোর্টকাচারি আইনি লড়াই অনেক ব্যয়বহুল ফলাফল অনিশ্চিতের

গল্পকার সালাহ উদ্দিন পাঠান তার আইন পেশায় নিষ্ঠাবান হয়ে এখান থেকে ঘটনা উপাদান সংগ্রহ করে সৃজনকল্পনায় সন্নিষ্ঠ থেকেছেন

আলোচ্য গল্প তিনটি আর্থ-সামাজিক পারিবারিক-ত্রিভুজ: মাজহার হোসেন, স্ত্রী আফসানা বেগম একমাত্র সন্তান আবীরকে কেন্দ্র করে

চমৎকার এক সকালের বর্ণনা টেনেযাত্রাহীন বিরতিগল্পটির সূচনা-ভাগ যেমন

বৃষ্টিস্নাত সকালে দরোজা খুলতেই দমকা হিমেল হাওয়া চোখে-মুখে এসে ঝাপটা মারে এতে শরীরে একধরনের প্রশান্তি লাগলেও আফসানা বেগমের মনে কোনো আরামের ছোঁয়া লাগে না বলা যায় আর এখন যে সময় তাতে তো মুহূর্তটাকে কোনোভাবেই সকাল বলা যায় না সূর্যের আলোর ছটা কিরণ ছড়ালে সকাল ধরা যায় কীভাবে!’ (‘যাত্রাহীন বিরতি’, পৃষ্ঠা-২১)

সালাহ উদ্দিন পাঠানের তিনটি আইনবিষয়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া গল্পের সঙ্গে শরৎচন্দ্রেরমামলার ফলগল্পের পাঠ পর্যালোচনায় আমরা এখনকার মামলা-মোকদ্দমা জর্জরিত সামাজিক গল্পের ভিন্ন প্রকৃতির পাঠ পাই যা সমাজ পরিবর্তন বিবর্তনেরযোগ-বিয়োগহিসেবে ধরে নিতে পারি

বলা যায়, কার্যবিধি ধারা এর প্রয়োগ পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে কিন্তু মানবমনের রহস্য এবং অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ এবং এর স্বরূপ কী, পরিধি আইনি ব্যাখ্যা কী, কেমন? আদিম প্রবৃত্তিটির সাহিত্য পরিধি, রূপায়ণ, এর ভবিষ্যৎ দেখার প্রত্যাশা রাখা হলো

লোকটা আসলে জীবন্মৃত’, ‘একটি মৃত্যুর যন্ত্রণা’, ‘যাত্রাহীন বিরতি’, ‘আবেগী সময়’, ‘কিছুই করার ছিল না’, ‘রাত-পাহারা’, ‘ফলাফল অনিশ্চিত’, ‘কী আর করা’, ‘মৃত্তিকা ব্রহ্মপুত্রের কাছে এসেছিল’, ‘সহে না যাতনা’, ‘কিছুই না’, ‘পিঁপড়া কাসেম’, ‘লাল সূর্য’, ‘সবুজ ঘাসের গালিচা’, ‘তুমি তো সেইএসব নিয়ে মোট ১৪টি গল্প-সমাবেশে সালাহ উদ্দিন পাঠানেরপিঁপড়া কাসেমগ্রন্থ

পূর্বে বর্ণিত বিষয়বস্তুর গল্প ছাড়াও রোমান্টিক, মনস্তাত্ত্বিক, মুক্তিযুদ্ধ পারিবারিক আবহের আরও কিছু গল্প আলোচ্য গ্রন্থে স্থান পেয়েছে

গ্রামে আমাদের বিশেষ আকর্ষণ ছিল পদ্মার নৌকাভ্রমণ

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ১২:১৯ পিএম
গ্রামে আমাদের বিশেষ আকর্ষণ ছিল পদ্মার নৌকাভ্রমণ
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ঊনবিংশ পর্ব

দেশবরেণ্য লেখক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশের একজন অভিভাবক, বাঙালির বাতিঘর এই শিক্ষাগুরু সবার স্যার। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যেমন অনন্য অবদান রেখেছেন, তেমনি সাহিত্য সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। সেই ছোটবেলায় তার লেখালেখিতে হাতে খড়ি। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি নিয়মিতই লিখছেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, অবসর গ্রহণের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। চব্বিশ বছর ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন। এক শ বাইশ গ্রন্থের রচয়িতা। লেখালেখির জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

আমি ঘুরে ঘুরে সব দেখছিলাম। রাতের বেলা হলেও আব্বা আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতাই দিয়েছিলেন, কারণ তিনি তো জানতেন আমি হারিয়ে যাব না, আমার দৌড় ডেকের এ প্রান্ত-ও প্রান্ত। আলখেল্লা-পরিহিতের নাটকীয় ওয়াজ শোনার জন্য ছোটখাটো একটা ভিড় জমেছিল ঠিকই, কৌতূহল ছিল, কিন্তু আমার মনে হয়নি যে শ্রোতারা তার বক্তৃতায় উদ্বেলিত হচ্ছিলেন। তাদের ভাবনায় যা থাকার কথা তা-ই ছিল। সেটা হলো মুক্তি। যে মুক্তির বিষয়ে পরে পরিষ্কারভাবে বুঝেছি। মুক্তি কেবল ব্রিটিশের শাসন থেকে নয়, জমিদারের উৎপীড়ন এবং মহাজনের পীড়ন থেকেও। অনেকেই ভাবছিলেন হয়তো যে স্বাধীনতা তাদের জীবিকার জন্য নতুন সুযোগ এনে দেবে। 

ভাগ্যকূলের স্টিমার ঘাট থেকে নেমে নৌকায় চেপে খাল বেয়ে নানাবাড়িতে পৌঁছে দেখি কলকাতা থেকে ইতোমধ্যে কেউ কেউ এসে গেছেন। সপরিবারে অবশ্য শুধু আমরাই; নানাবাড়িতে আসা পুরুষরা সবাই তখন ছিলেন তরুণ ও অবিবাহিত। আর আগে থেকেই সপরিবারে যাদের গ্রামে বসবাস তারা ব্যস্ত হলেন অতিথিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে। আমার মাকে দেখে মনে হলো অনেক কাল পরে তিনি পরিপূর্ণ একটা অবস্থান ফিরে পেয়েছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে পিতা-মাতা, ভাইবোনের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন, পরিচিত বাড়িঘর তার জন্য জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যে ঘরটিতে আমার জন্ম সেটি দেখলেন এবং দেখালেন, বেশ একটা আবেগের সঙ্গেই। ওই ঘরে প্রবেশের সময় তার আনন্দপূর্ণ মুখায়বের বিভা এত বছর পরেও আমি দেখতে পাই। মায়ের তিন ভাইয়ের সবাই এসেছেন। বোঝা যাচ্ছিল তার জন্য সবচেয়ে খুশির ঘটনা ছিল আমাদের মেজ খালার সঙ্গে তার মিলিত হওয়া। আমার মা বলতেন, এবং জানতেন যে, নদীতে নদীতে দেখা হয়, কিন্তু বোনে বোনে দেখা হয় না। বোনের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত মিলন মাকে স্বাভাবিক সত্তা ফেরত পাবার ব্যাপারে নিশ্চয়ই সহায়তা দিয়েছিল।

মায়ের এই মেজ বোন অর্থাৎ আমার মেজো খালা ছিলেন বলতে গেলে বাড়ির কর্তা। তিনি তখন আমার মায়ের একমাত্র জীবিত বোন। আমাদের বড় খালা মারা গেছেন বিয়ের অল্প পরেই, প্রথম ও একমাত্র কন্যাটিকে রেখে। বড় খালার শিশু সন্তানটিকে ৪-৫ বছর মেজো খালাই লালন-পালন করেন। তার পরে অবশ্য মেয়েটি তার বাবার কাছেই থেকেছে। কিন্তু তার বাবাও হঠাৎ করেই মারা যান, আমরা যখন নানাবাড়িতে এসে উঠেছি সেই সময়েই। টেলিগ্রাম এসেছিল। তাতে মৃত্যুসংবাদ ছিল না, তবে যে সংবাদ ছিল তাতে বোঝা যাচ্ছিল ঢাকায় গিয়ে আমাদের খালাত বোনটি তার পিতাকে আর দেখতে পাবে না। দেখতে সে পায়ওনি। আমাদের ওই বোনটি তার খালাকেই মা বলে ডাকত। খালাও সেভাবেই তাকে আদর করতেন, যত্ন নিতেন। মেজো খালা নিজে নিঃসন্তান ছিলেন। 

মেজো খালার বিয়ে হয়েছিল কাছেরই এক গ্রামে, অবস্থাপন্ন পরিবারে। তার স্বামী শিল্পরসিক ছিলেন। গানবাজনা পছন্দ করতেন। খালার জন্য বাড়িতেই গান শেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমার ওই খালু দীর্ঘজীবন লাভ করেননি। বিয়ের কয়েক বছর পরেই তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এবং অসুস্থ অবস্থাতেই মারা যান। মেয়ের স্বামীর অসুখের খবর জেনে নানাবাড়ির লোকেরা মেজো খালাকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। আসার সময় খালাম্মা আর কী কী সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন জানি না, তবে একটি হারমোনিয়াম এবং একটি গ্রামোফোন ও প্রচুর রেকর্ড যে এনেছিলেন তার প্রমাণ তো নানাবাড়িতে গিয়ে আমরা বেশ ভালোভাবেই পেলাম। খালাকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করতে আমরা দেখিনি, তবে আমাদের যাওয়ার আগে ও পরে বাড়ির ছোটদের তিনি যে গান শেখাতেন সে খবর পেয়েছি। খালার নিজের ঘরে ওই হারমোনিয়াম ও গ্রামোফোনটি সুরক্ষিত ছিল। গ্রামোফোনের পাশে অর্ধবৃত্তাকারে বসে সে কালের নামকরা গায়ক-গায়িকাদের ভালো ভালো সব গান যে শুনেছি তার পর সুর ও ধ্বনি অস্পষ্ট হতে হতেও একেবারে যে মিলিয়ে গেছে তা বলতে পারি না। গ্রামোফোনকে আমরা বলতাম কলের গান। এবং কলের ভেতর থেকে কী করে অমন গান বের হয় সেটা ছিল আমাদের জন্য মস্ত বড় একটা কৌতূহলের ব্যাপার।

নানাবাড়িতে কয়েক শরিক ছিলেন, এদের আলাদা আলাদা ঘরদুয়ার ছিল; কিন্তু উঠান ছিল একটাই। আমরা ছেলেমেয়েরা অবাধে বিচরণ করতাম। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়াতে কোনো নিষেধ ছিল না, অবিকল সেই রকমের ব্যবস্থা যেমনটা ছিল দাদাবাড়িতে; দুই শরিকের ঘরগুলোর বেলাতে। প্রাচীরের তো প্রশ্নই ওঠে না, বেড়াও ছিল না কোনো প্রকারের। তবে সিঁধ কেটে চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে শুনেছি। 

নানাবাড়িতে তখন প্রবাসে থাকা সবাই চলে এসেছেন। যেন মিলনমেলা একটা। কিন্তু অদৃশ্য একটা প্রাচীর ছিল বৈকি। সেটা হলো যারা সরকারি চাকরিতে ছিলেন এবং যারা কাজ করতেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে। সেটা তখন বুঝিনি, পরে বুঝেছি। পার্টিশনের প্রতিফলে ওটাও একটা পার্টিশন হয়ে উঠেছিল; নীরবে, আপনজনের ভেতরেই। নানান দিক থেকেই দেশভাগের ব্যাপারটা ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর এক ঘটনা। 

মানচিত্রের ওপর দাগ টেনে দিয়ে দু-টুকরো করা হয়েছিল দেশটিকে, মানুষের শোবারঘর গোয়ালঘর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল–একটা এদিকে অপরটা ওদিকে। বিভাজনের সে ঘটনা যে সরকারি আর বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রেও পুনরুৎপাদিত হয়েছিল সেটা কম মর্মান্তিক ঘটনা ছিল না। সরকারি চাকুরেরা জানতেন নানা অসুবিধার মধ্যেও তাদের একটা কিছু বন্দোবস্ত হবে, হয়তো ছোটখাটো প্রমোশনও পেয়ে যেতে পারেন; বেসরকারিরা কেবল যে অনিশ্চয়তা তা নয়, হা-করা বেকারত্বই দেখতে পাচ্ছিলেন তাদের সামনে। অথচ সেটা যে মুখ খুলে অন্যদের বলবেন তা নিয়েও সংকোচ ছিল। বিশেষত এ কারণে যে প্রায় ২০০ বছর পরে দেশ স্বাধীন হয়েছে, এতে তো সবারই উৎফুল্ল হওয়ার কথা; তার মধ্যে ব্যক্তিগত বিপদের বিষয় তোলাটা ছন্দপতন বৈকি। 

আমার মায়ের মনে হয় আমার প্রতি কিছুটা পক্ষপাতিত্ব ছিল। তার একটা কারণ আমি তার প্রথম সন্তান। দ্বিতীয় কারণ হয়তো আমার নিজের স্বভাব। অপরের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেলামেশার ব্যাপারে আমার ভেতরে একটা সংকোচ ছিল; যে জন্য আমি মায়ের আশপাশে ঘোরাফেরাটা অন্যদের তুলনায় একটু বেশিই করতাম। বই পড়ার ব্যাপারে আমার আগ্রহটা মা জানতেন। নানাবাড়িতে শরিক পরিবারের একজন ছিলেন মুকুল ভাই (আলিমুর রহমান খান, এখন প্রয়াত)। বয়সে আমার চেয়ে বড়, গ্রামেই থাকতেন, ছাত্র তখনো স্কুলেরই। মা তাকে ডেকে বলেছিলেন যে, তার ছেলেটি তো বই পড়তে ভালোবাসে, বইটই পাওয়া যায় কি না দেখতে। ফলে দুটি বই পেয়েছিলাম পড়বার জন্য। একটি কবি গোলাম মোস্তফার। সন্ধ্যাবিষয়ক তার কবিতার দুটি পঙ্‌ক্তি মনে পড়ে, ‘সন্ধ্যারানী গো সন্ধ্যারানী/ তোমার আমার গোপন মিলন কেউ জানে না আমরা জানি।’ 

চলবে...

চিন্তাভাবনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বাবা চাকুরিতে আসলেন পূর্ববঙ্গে: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১০:৪১ এএম
চিন্তাভাবনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বাবা চাকুরিতে আসলেন পূর্ববঙ্গে: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

অষ্টাদশ পর্ব

ঢাকা তো একটা মফস্বল শহর বৈ নয়, ঢাকায় গিয়ে কোথায় বাসা পাওয়া যাবে, কেমন হবে থাকার ব্যবস্থা, এসব নিয়ে তারা যে আলোচনা করবেন এমন অবস্থাও রইল না। কারণ সবাই ছিলেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং অনেকেরই ঢাকার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক বলতে কিছুই ছিল না। কলকাতায় কিন্তু কেউ কেউ ভালো অবস্থাতেই ছিলেন। কারও ছিল ব্যবসায়, কারও পেশাগত প্রতিষ্ঠা, কেউ কেউ বসবাসের জন্য বাড়ি পর্যন্ত তৈরি করেছেন, আরেক অংশ তেমন সচ্ছল না হলেও গুছিয়ে বসেছিলেন। তারা কেউই এ চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলতে পারলেন না যে, তাদের উদ্বাস্তু হয়েই প্রস্থান করতে হবে। মুসলমানদের স্বতন্ত্র বাসস্থান বলতে অবিভক্ত ভারতের কোন কোন এলাকা বোঝাবে মুসলিম লীগের নেতারা সেটা কখনোই স্পষ্ট করে বলেননি, হতে পারে বলতে সাহসও পাননি। তবে একটা প্রচার তো ছিল, বিশেষ করে প্রভাবশালী আজাদ পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয় স্তম্ভের ওপরে যে মানচিত্রটা ছাপত, তদনুযায়ী, বাংলা ও আসামের পুরোটা নিয়েই গঠিত হবে পূর্ব বাংলা। তেমনটা না ঘটায় সার্বিকভাবে হতাশ হওয়ার কারণ ঘটেছিল অবশ্যই। দেশের স্বাধীনতা যে দেশের মানুষের জন্য এমন উল্লাসহীন হবে সেটা কে কবে ভেবেছিল!

এক কথায় বলতে গেলে, উদ্বাস্তুদশায় কলকাতা ছেড়ে যেতে হতে পারে এটা ছিল কল্পনাতীত। মধ্য-কলকাতার মার্কুইস লেনে নিজেদের বাড়িতে থাকতেন আমাদের এক আত্মীয়-পরিবার। ছুটির দিনে সেখানে অন্যরাও যেতেন, বেশ একটা আনন্দের ঘটনা ঘটত। বাড়িটা ছোটই ছিল, তবু নিজেদের তো। এখন তারা কোথায় গিয়ে পড়বেন এ দুর্ভাবনায় বাড়ির হাসিখুশি ভাবটা মিলিয়ে গেল। কলকাতা শহর ইতোমধ্যেই হিন্দু এলাকা-মুসলমান এলাকায় ভাগ হয়ে গিয়েছিল, হিন্দুপাড়ায় যে মুসলমানরা বংশানুক্রমে বসবাস করতেন দাঙ্গার ধাক্কায় তারা উৎপাটিত হয়ে পড়েছিলেন, দাঙ্গার পরে শান্ত অবস্থা দেখে যারা ফেরত গেছেন। কলকাতা ভারতের দখলে চলে যাবে দেখে তারা পড়লেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। কারও কারও চেষ্টা দাঁড়াল বসতবাড়ি বিক্রি করে দিয়ে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার; সবাই সফল হলেন না, যারা হলেন তারাও দাম পেলেন না উপযুক্ত। ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দাদের সঙ্গে যারা বাড়ি বদলের ব্যবস্থা করতে পারলেন তারা মনে করলেন কপাল ভালো; আর যারা তখনো কলকাতা শহরে পাড়া-ছাড়া হয়ে পড়েছিলেন, তারা ভয় পাওয়া শুরু করলেন বসতবাড়িতে আর ফেরত যাওয়া হবে না ভেবে। 

সবচেয়ে করুণ অবস্থাটা সৃষ্টি হলো কলকাতার উর্দুভাষী বাসিন্দাদের জন্য। আমরা নিজেরাও তেমন একটা ঘটনার সাক্ষী হয়ে গেলাম। খিদিরপুরে আমাদের বাসার যিনি বাড়িওয়ালা তাকে আমরা হাজি সাহেব বলতাম; তারা ওই শহরের অনেককালের বাসিন্দা, পাকিস্তান দাবির পক্ষে তাদের ভেতরে লড়কে লেঙ্গে মনোভাব সংক্রমিত হওয়ার কথা। হয়তো হয়েছিলও। এখন যখন পাকিস্তান একেবারে দোরগোড়ায় এসে হাজির হয়েছে, তখন তারা আবিষ্কার করলেন যে, তারা রয়ে যাবেন পাকিস্তানের বাইরে। তাদের আশা পরিণত হলো আতঙ্কে। আমরা ওই বাসা ছেড়ে চলে এলাম, কিন্তু বাড়িওয়ালাদের অবস্থাটা কেমন দাঁড়াল সেটা আর জানা হয়নি। তবে বেশ কয়েক বছর পরে আমার মেজো ভাই বলেছে, ঢাকায় সে হাজি সাহেবের একমাত্র নাতিকে দেখেছে ট্যাক্সি চালাতে। দূর থেকেই দেখেছে, কাছে গিয়ে বিড়ম্বিত করেনি। বেচারারা স্বপ্ন দেখেছিলেন পাকিস্তানের, আন্দোলনের মুখে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দাঙ্গায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখলেন স্বাধীন পাকিস্তান চলে গেল তাদের নাগালের বাইরে। 

 

২.
চিন্তাভাবনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আব্বা খবর আনলেন যে, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে যারা অপশন দেবেন পূর্ববঙ্গে তারা চাকরি পাবেন। আব্বা যে অপশন দেবেন সেটা ছিল নিশ্চিত। এর মধ্যে ঢাকায় যেসব আত্মীয়স্বজন ছিলেন তাদের কাছে আব্বার পত্রযোগাযোগ শুরু না করার কথা নয়। নিশ্চয়ই সেটা তিনি করেছিলেন। আগস্ট মাসের ১ কী ২ তারিখে আমরা রওনা হলাম ঢাকা অভিমুখে। নেওয়ার মতো খাট-পালঙ চেয়ার-টেবিল যা ছিল তা শিয়ালদহ রেলস্টেশনে ঢাকার উদ্দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল আগেই, আমরা রওনা হলাম একটি ট্যাক্সি ও একটি ট্রাকযোগে। ট্রাকে কাপড়-জামা থালাবাসনসহ অন্য যেসব জিনিসপত্র ছিল সেগুলো গুনে গুনে তোলা হলো; আব্বা লিস্ট করে রাখলেন। মালপত্রের ভেতর বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল বড় এক বস্তা চাল, এবং ছোট একটিতে ডাল। চাল-ডালের ওই সংগ্রহ সঙ্গে নেওয়াটা যে যথার্থ বিচক্ষণতার কাজ ছিল গন্তব্যে পৌঁছার পরে সেটা বুঝতে খুব একটা বিলম্ব ঘটেনি। শিয়ালদহ যাওয়ার পথে ট্রাকটি যাবে আগে আগে, পাহারাদারের মতো, পেছনে ট্যাক্সি–এই রকমের আয়োজন। ট্রাকের সামনে ছোট মামা বসলেন। তিনি তো যাবেনই, আর আমরা যাচ্ছি তো নানাবাড়িতেই। ড্রাইভারের পাশে তার আসন। মামার বাঁয়ে আমি। অন্যরা সবাই গাদাগাদি করে ট্যাক্সিতে। শঙ্কা ছিল পথে হামলা হতে পারে; রায়টের রেশ তো তখনো মুছে যায়নি। তেমন কিছু অবশ্য ঘটেনি। ভিড় ঠেলে ট্রেনে ওঠার পর আমার শুধু এটুকুই মনে আছে আমাদের কামরায় দু-তিনজন যাত্রী নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন হিন্দুস্থান-পাকিস্তান নিয়ে নয়, তাদের ব্যবসার লাভ-লোকসান নিয়ে। কাপড়-জামা দেখে বোঝা যাচ্ছিল তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের; কলকাতায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন পণ্য বেচাকেনা উপলক্ষে। অনুপস্থিত একজন কোনো ফাঁকে তাদের চেয়ে বেশি মুনাফা করে ফেলেছে এটাই মনে হচ্ছিল তাদের জন্য বিশেষ রকমের দুশ্চিন্তার বিষয়; দেশ যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে সে ঘটনা তাদের মোটেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেনি। তারা যে নিরুদ্বিগ্ন তা নন, উদ্বেগ ব্যবসা নিয়ে। 

ট্রেনে আব্বাকে অস্থির দেখিনি, তবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত যে ছিলেন সেটা নিশ্চিত। নতুন রাষ্ট্রে তাদের অফিস ঢাকায় বসবে, নাকি অন্যত্র; থাকার ব্যবস্থা কেমন ও কী ভাবে হবে, সন্তানদের পড়াশোনার হালটা কেমন দাড়াবে, এসব চিন্তা তো থাকবারই কথা; আশু চিন্তাটা ছিল ট্রেনের যাত্রা শেষে গোয়ালন্দের স্টিমারে সবার ঠিক মতো ওঠা নিয়ে। মালপত্র খোয়া যেতে পারে, সেগুলো বহন করার জন্য অদম্য উৎসাহী শ্রমিকরা টানাটানি শুরু করবে করুক; কিন্তু সেগুলো নিয়ে তারা যাতে অদৃশ্য না হয়ে যায় সেদিকে চোখ রাখা চাই। উদ্বেগের জন্য বিষয়ের কোনো অভাব ঘটার কথা নয়। তবে বড় একটা ভরসা ছোট মামা। তিনি তখন অবিবাহিত টগবগে যুবক, চাকরি করতেন রাইটার্স বিল্ডিং-এ, তার অফিস যে ঢাকাতেই থাকবে সেটা জানতে পেরেছেন, এবং আমরা যাচ্ছিও তাদের বাড়িতেই। 

স্টিমারে ঠিকঠাক উঠে, এবং জায়গা করে নিয়ে আনন্দ না পেলেও সবাই স্বস্তি পেলেন। আয়োজনের অতসব ঘনঘটার ভেতরে হয়তো প্রথমবারের মতো পুরোপুরি স্বস্তি। 

গঙ্গার ধারে ছিলাম, গঙ্গা এখন ভিন্নদেশের নদী, আমরা চলেছি আমাদের নিজেদের নদী পদ্মা দিয়ে। স্টিমারে ফার্স্ট সেকেন্ড ইন্টার থার্ড–এসব শ্রেণিবিভাজন ছিল, কিন্তু যাত্রীদের চলাফেরা দেখে মনে হচ্ছিল সবাই সমান হয়ে গেছেন। অভিন্ন নয়, ভিন্ন ভিন্ন ঘাটেই তারা নামবেন, গন্তব্য বিভিন্ন; কিন্তু সবার যাত্রা একই দিকে–স্বাধীনতা অভিমুখে, এরকমের একটা বোধ এগারো বছরের যে কিশোর তখন আমি, সেই কিশোরের মনে দোল খাচ্ছিল। বাইরে বাতাস, ওপরে খোলা আকাশ, স্টিমার চলেছে তর তর করে, রাতের অন্ধকার ভেঙে ফেলে, সার্চ লাইটের তীব্র আলো জ্বালিয়ে। 
দোতলার প্রশস্ত ডেকের এক কোনে কে একজন আসর জমিয়ে বক্তৃতা করছিলেন। তার পরনে মস্ত এক আলখেল্লা, কালো কাপড়ের। মাথায় সুবিন্যস্ত পাগড়ি। হাতে বোধ করি একটি ছড়িও ছিল। মোটাতাজা চেহারা। ভাবলে এখন মনে হয় তিনি বক্তৃতা নয়, ওয়াজ করছিলেন। ছোট মামার অভিজ্ঞতা ছিল স্টিমার ভ্রমণের। স্টিমারে লোকটিকে তিনি আগেও দেখেছেন। মামা তাকে জানতেন পাথর ও তাবিজ বিক্রেতা হিসেবে। কিন্তু সে রাত্রে লোকটি যে অমন বাঙ্ময় হয়ে উঠেছিলেন সেটা তার পাথর ও তাবিজের অব্যর্থ গুণাবলি বর্ণনার জন্য নয়, বোঝা যাচ্ছিল তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রে ধর্মের চর্চা কতটা এবং কীভাবে হওয়া চাই সে বিষয়েই সবাইকে বিনামূল্যে জ্ঞান সরবরাহ করছেন। তার সুর, ভাষা, দেহভঙ্গি–কোনো কিছুই এই খবরটা জানাতে কুণ্ঠিত ছিল না যে, পাকিস্তান আসছে এই খোশ খবরে তিনি উদ্দীপ্ত। এখন বুঝতে পারি নতুন রাষ্ট্রে ধর্মের চর্চা যত বাড়বে তার ব্যবসা যে ততই লকলকিয়ে উঠবে, এই দিব্যজ্ঞানই ছিল তার ওয়াজের ওজস্বিতার অন্তর্নিহিত অনুপ্রেরণা। তার গলার আওয়াজ ওঠানামা করছিল, এবং তিনি উত্তেজিত ছিলেন। হতে পারে পাথর ও তাবিজের তুলনায় বড় কোনো ব্যবসার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছিলেন চোখের সামনে। চলবে... 

শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়ন

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১০:০৮ এএম
শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়ন
বই

শান্তি ও সংঘাত মানবসমাজের এক অনিবার্য বাস্তবতা। আর এ বাস্তবতাকে অনুধাবন করার অন্যতম একাডেমিক গ্রন্থ হলো ‌‘শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়ন’। এই বইয়ে শান্তি ও সংঘাতকে কেবল যুদ্ধ ও সহিংসতার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়; বরং সামাজিক কাঠামো, ক্ষমতার সম্পর্ক, রাজনীতি এবং ন্যায়বিচারের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। শান্তি গবেষণার ক্লাসিক তত্ত্ব থেকে শুরু করে সমসাময়িক বিশ্ব ও বাংলাদেশের বাস্তব উদাহরণ সবকিছুই সহজ, প্রাঞ্জল ও একাডেমিক ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়নের ধারণাগত ভিত্তি, সংঘাতের ধরন ও উৎস, সংঘাত ব্যবস্থাপনা কৌশল, শান্তি, শিক্ষা এবং উন্নয়ন ও মানব নিরাপত্তার সঙ্গে শান্তির সম্পর্কবিষয়ক স্পষ্ট ধারণা লাভ করা যাবে। বাংলাদেশে শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়ন বিষয়ে এটি প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা বই। বইটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য হিসেবে গণ্য।

 

GRAND CORRUPTION

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১০:০৬ এএম
GRAND CORRUPTION
বই

বইটি আধিপত্য বিষয়ে নজরুলের চিন্তাভাবনার একটি অন্বেষণ। নজরুলের দৃষ্টিতে আধিপত্য কীভাবে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক, জাতিগত, ধর্মীয়, বাগাড়ম্বরপূর্ণ, সামরিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের পাশাপাশি পরিবেশগত রূপে নিজেকে প্রকাশ করে, যার প্রতিটিই অধঃপতনের আন্তঃসংযুক্ত রূপ এবং পরিশেষে সমাজের সবচেয়ে অবমাননাকর দুর্নীতির জন্ম দেয়। বইটি সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের, যার মধ্যে আধিপত্যের আগে অপমানিত ভুক্তভোগীরাও অন্তর্ভুক্ত, তাদের দ্বারা পরিচালিত একটি সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে সামাজিক মুক্তির একটি পথও নির্দেশ করে। এ বিপ্লবের মাধ্যমে যে পরিবর্তনগুলো ঘটবে, তার মধ্যদিয়ে মানবীয় মহত্ত্বের পুনরুত্থানও ঘটবে। বইটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বকে এই প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব নজরুলের কাজের সঙ্গে পরিচয় করানো। যিনি সব ধরনের আধিপত্য থেকে মুক্তির জন্য অটলভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন।