শুধুই কথাসাহিত্য নয়, অবলীলায় পারঙ্গমতায় বিচরণ করেছেন কবিতায়, নাটকে, বৈদগ্ধ প্রবন্ধে। আলাউদ্দিন আল আজাদ সর্বত্র পদচারী, সব্যসাচী হলেও তার প্রধান পরিচয় তিনি কথাসাহিত্যিক। তার গল্প, বিশেষ করে উপন্যাসগুলো তার সময়কালে উত্তুঙ্গ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়। জীবনদর্শনের আলোকে জীবনকে পর্যবেক্ষণ করা এবং তা সাহিত্যে তুলে আনার বিরল ক্ষমতা ও পারঙ্গমতা দেখাতে তিনি সক্ষম হয়েছেন।...
বাংলাদেশের সাহিত্য, বিশেষ করে কথাসাহিত্যের দিকে ফিরে তাকাই, তখনই আলো ঝলমল উজ্জ্বল বন্দরটিকে দেখতে পাই, শুনতে পাই দক্ষ নাবিকদের কলস্বর। তাদেরই একজন আলাউদ্দিন আল আজাদ। তার সময়কালের সবচেয়ে সফল জনপ্রিয় বহুমাত্রিক সাহিত্যিক। শুধুই কথাসাহিত্য নন, অবলীলায় পারঙ্গমতায় বিচরণ করেছেন কবিতায়, নাটকে, বৈদগ্ধ প্রবন্ধেও। আর সাহিত্যের গণ্ডির বাইরে শিক্ষকতায় ও প্রশাসনিক দক্ষতায় রেখেছেন সৃজনশীলতার সুবিন্যস্ত স্বাক্ষর।
কথাসাহিত্যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও তার গল্প-উপন্যাস মনোরঞ্জক উপাদান-বিলাসে মগ্ন ছিল না; প্রতিটি লেখা ছিল সমাজ বাস্তবতার সুতীক্ষ্ণ চিত্রায়ন, সামন্ততান্ত্রিক ও পুঁজি বিকাশমান সমাজের শোষণ প্রক্রিয়া, শোষিতের হাহাকার ও রুখে দাঁড়ানো সংগ্রামের কাহিনি। সংগ্রাম ও লড়াইয়ের প্রক্রিয়াতেই জেগে ওঠে বেঁচে থাকার আশাবাদ, রোমান্টিক বলয়, জীবনের স্বপ্ন।
আলাউদ্দিন আল আজাদের এই জীবনবোধ গড়ে উঠেছে তার জন্ম ও বেড়ে ওঠার মধ্যদিয়ে। বাংলাদেশের উত্থান-পূর্ব এ জনপদের মানুষদের জীবনযাপন, সামাজিক ভাঙচুর, অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি অব্যাহত দ্বন্দ্বমুখরতা ও সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আত্মপরিচয়ের সন্ধান তার চৈতন্য ও কলমকে শাণিত করে তুলেছে। বিশ্বসাহিত্য পাঠ, বিশেষ করে মার্কস-এঙ্গেলসের পঠন-পাঠন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের উত্থান তার চিন্তার জগৎকে উদ্দীপ্ত করে তুলেছে।
আলাউদ্দিন আল আজাদ জন্মগ্রহণ করেন ঢাকার কাছেই নরসিংদীতে রায়পুরা থানার রামনগর গ্রামে, নিম্ন মধ্যবিত্ত এক পরিবারে। ৬ মে, ১৯৩২-এ। জন্মের দেড় বছরের মধ্যেই মা আমেনা খাতুন মারা যান। বাবা গাজী আব্দুস সোবহান মারা যান তার দশ বছর বয়সে। তখন থেকেই তার জীবন সংগ্রামের সূত্রপাত। নিজের মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে শুরু হয় তার পথ চলা, নিজেকে গড়ে তোলারও লড়াই। অসাধারণ মেধাবী তিনি। জীবনযুদ্ধে হাজারো প্রতিকূল পরিবেশেও মানেননি পরাভব। তার পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল এত বিরূপতার মাঝেও ঢাকা বিশ্ববিদালয়ে বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া। তিনি ঈশ্বরগুপ্তের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে অভিসন্দর্ভ লিখে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন।
আলাউদ্দিন আল আজাদ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সেই সময়টায় উন্মাতাল দেশ। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে ঢাকা শহরসহ বাংলাভাষাভাষী সমগ্র জনপদ উন্মাতাল হয়ে ওঠে। তখন নূরুল আমিনের সরকার। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র-জনতার মিছিলে সরকারি বাহিনী সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে শহিদ করে। এতে সারা অঞ্চলে বিক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। এই মিছিল ও বিক্ষোভে আলাউদ্দিন আল আজাদ সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।
২৩ ফেব্রুয়ারিতে শহিদদের স্মরণে মেডিকেল কলেজের সামনে শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে এই কাজ সম্পন্ন হয়। এই শহিদ মিনারটি সেই সময়ই প্রাথমিকভাবে উদ্বোধন করানো হয় শহিদ সফিউরের বাবাকে দিয়ে। ২৬ ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন দৈনিক আজাদের সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। এই শহিদ মিনারটিকে সহ্য করতে পারেনি পাকিস্তানি সরকার। সেদিনই এই মিনার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
আলাউদ্দিন আল আজাদ তখন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। থাকেন তৎকালীম ইকবাল হলে (বর্তমানে শহিদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। সেদিনই তিনি একটি দুর্ধর্ষ কবিতা লেখেন: স্মৃতি স্তম্ভ।
ভাষা আন্দোলন নিয়ে লিখিত কবিতা ও গানগুলোর মধ্যে প্রথম কয়েকটির মধ্যে এটি অন্যতম। এ কবিতা মুখে মুখে ফেরে: ‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছ তোমরা? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো/ চার কোটি পরিবার/ খাড়া রয়েছি তো!/ যে ভিত কখনো কোনো রাজন্য/ পারেনি ভাঙতে।’...
এই কবিতার প্রতিটি ছত্রে বজ্রনির্ঘোষ, শাসকের প্রতি হুংকার, কিষান, কামার-কুমার, জেলে সর্বস্তরের জনতার জাগৃতির আহ্বান: ‘হীরের মুকুট নীল পরোয়ানা খোলো তলোয়ার/ খুরের ঝটিকা ধুলায় চূর্ণ যে পদপ্রান্তে/ যারা বুনি ধান/ গুণ টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাঁপর চালাই/ সকল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য।/ ইটের মিনার/ ভেঙেছে ভাঙুক। ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার/ আমরা জাগরী/ চার কোটি পরিবার।’...
আলাউদ্দিন আল আজাদ কবিতায়, নাটকে গানে প্রবন্ধে–সর্বত্র পদচারী, সব্যসাচী হলেও তার প্রধান পরিচয় তিনি কথাসাহিত্যিক। তার গল্প, বিশেষ করে উপন্যাসগুলো তার সময়কালে উত্তুঙ্গ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়। জনপ্রিয়তা মানেই তরল মনে করার কারণ নেই। জীবনদর্শনের আলোকে জীবনকে পর্যবেক্ষণ করা এবং তা সাহিত্যে তুলে আনার বিরল ক্ষমতা ও পারঙ্গমতা দেখাতে তিনি সক্ষম হয়েছেন।
মাত্র আঠারো বছর বয়সে লেখা ও প্রকাশিত প্রথম গল্পের বই ‘জেগে আছি’র মাধ্যমেই তিনি পাঠক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। তার ‘ক্ষুধা ও আশা’, ‘তেত্রিশ নম্বর তৈলচিত্র’সহ কয়েকটি উপন্যাস চিরকালীন পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যাবে।
তার পাঠকনন্দিত উপন্যাস ও গল্পের অন্য বইগুলো হলো: কর্ণফুলও, শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন, খসড়া কাগজ, শ্যাম ছায়ার সংবাদ, জ্যোৎস্নার অজানা জীবন, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, স্বাগতম ভালোবাসা, অপর যোদ্ধারা, পুরানা পল্টন, অন্তরীক্ষে বৃক্ষরাজি, প্রিয় প্রিন্স, ক্যাম্পাস, অনূদিত অন্ধকার, স্বপ্নশীলা, কালো জ্যোৎস্নায় চন্দ্রমল্লিকা, বিশৃঙ্খলা, ধানকন্যা, মৃগনাভি, অন্ধকার সিঁড়ি, উজান তরঙ্গ, যখন সৈকতে, আমার রক্ত স্বপ্ন আমার।
কবিতা: মানচিত্র, ভোরের নদীর মোহনায় জাগরণ, সূর্য জ্বালার সোপান, লেলিহান পাণ্ডুলিপি, নিখোঁজ সনেটগুচ্ছ, আমি যখন আসবো, এ্যাসেস অ্যান্ড স্পার্কস, সাজগর, চোখ, শ্রেষ্ঠ কবিতা।
নাটক: নরকে লাল গোলাপ, ইহুদির মেয়ে, মরক্কোর জাদুকর, ধন্যবাদ, মায়াবী প্রহর, সংবাদ শেষাংশ।
প্রবন্ধ: শিল্পীর সাধনা, সাহিত্যের আগন্তুক ঋতু, ফেরারি ডায়েরি, রবীন্দ্র ক্ল্যাসিক আবিষ্কার, নজরুল গবেষণা, মায়াকভস্কি ও নজরুল, সাহিত্যে সমালোচনা, অজিতকুমার গুহ, মুজফফর আহমদ, হামিদুর রহমান, রশিদ চৌধুরী।
আজীবন নিয়োজিত ছিলেন সাহিত্যে শিক্ষাব্রতে। দেশের শীর্ষ দুটি কলেজ–ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, সচিবের দায়িত্বে। কিছুদিন মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসে সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ইউনেস্কো পুরস্কার, একুশে পদক এবং মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার।
২০০৯ সালের ৩ জুলাই তিনি পরলোকগমন করেন। আজ এই দিনে এই মহান সাহিত্যিকের প্রতি তার উত্তরপুরুষের শ্রদ্ধা ও প্রণতি।