ঢাকা ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
দেম্বেলের দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকে ৩-১ গোলে এগিয়ে ফ্রান্স ঝড় নয়, কলম্বিয়াই পর্তুগালের আসল পরীক্ষা ৩২ মিনিটেই দেম্বেলের হ্যাটট্রিক রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করবেন হাকিমি সংবাদপত্র এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ইসমাইল আর নেই সবাইকে সতর্ক করেছিলেন, রক্ষা হলো না নিজের জীবন ভারতকে টি-টোয়েন্টি শেখাল আয়ারল্যান্ড নরওয়ের শুরুর একাদশে নেই হালান্ডসহ ১০ জন, ফ্রান্সের একাদশেও পরিবর্তন কেপ ভার্দে-সৌদি আরব ম্যাচে বাঁশি বাজাবেন ফরাসি রেফারি লেতেক্সিয়ে এক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় মা ও তিন মেয়ে, অশ্রুসিক্ত হোমনা বিশ্বকাপের নকআউটে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ কে হবে, জানাল এআই মাগুরায় মহররম উপলক্ষে পথচারীদের মাঝে পানি বিতরণ মেসিদের দেশে ফুটবল একাডেমিতে শিশু নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ পাবনায় বালু উত্তোলন নিয়ে সংঘর্ষ, গুলিতে বিএনপি কর্মী নিহত পূর্ব শত্রুতার জেরে কলেজছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা কালীগঞ্জে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের দাবিতে মানববন্ধন চার বছর পর ফিরেই উইম্বলডনে সেরেনা উইলিয়ামস চাঁদপুরে নদীতে গোসল করতে নেমে শিক্ষার্থীর মৃত্যু শিমুলিয়ায় নীল-সাদা জোয়ার, বল পায়ে রাষ্ট্রদূত জিতলেই আর্জেন্টিনার হাফ সেঞ্চুরি সোনা লুকালেন কোমরে, সীমান্তেই ধরা অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় চ্যাম্পিয়ন মাগুরা ফুটবল দলকে সংবর্ধনা বেইজিংয়ের ১০৯ তলা ভবনে বিমান বিধ্বস্ত নরওয়ের বিপক্ষে সালিবাকে ছাড়াই খেলবে ফ্রান্স ভারতে তাজিয়া মিছিলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত ৩ ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৫৮৯, আহত প্রায় ৩ হাজার রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গান, কবিতা ও স্মৃতিচারণে কামাল লোহানীর জন্মবার্ষিকী উদযাপন অভিষেক হলো না বৈভব সূর্যবংশীর, কারণ জানালেন কোচ ও অধিনায়ক গ্রেপ্তার সাবেক এমপি আশিকা রিমান্ডে

আল মুজাহিদীর চিরন্তন আখ্যান শব্দের শরীরে অবিনাশী আত্মা

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৯:৪২ এএম
শব্দের শরীরে অবিনাশী আত্মা
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

সময় কি কখনো থেমে থাকে? হয়তো না। কিন্তু কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যখন মনে হয় মহাকালের ঘড়িটি বুঝি এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ২০২৬ সালের ১৯ জুন, যখন মধ্যাহ্নের প্রখরতা কাটিয়ে আকাশ কিছুটা নুয়ে পড়ছিল, ঠিক দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে বাংলার সাহিত্যাকাশে এক দীর্ঘস্থায়ী ছায়া নেমে এল। আল মুজাহিদী চলে গেলেন। এই প্রস্থান কি কেবল একজন রক্ত-মাংসের মানুষের বিদায়? না, এ যেন এক জীবন্ত মহাফেজখানার কপাট চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাওয়া। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি হয়তো সাধারণ এক বর্ষা-দুপুরের আর্দ্রতা নিয়ে এসেছিল, কিন্তু শব্দপ্রেমীদের হৃদয়ে তা এক গভীর ক্ষত হয়ে খোদাই হয়ে রইল।

আল মুজাহিদী নামটি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন একজন মানুষ, যিনি শব্দের শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে জানতেন। তার প্রয়াণ কেবল একটি ব্যক্তিগত মৃত্যু নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। গোধূলির আলো ম্লান হওয়ার আগেই যেন এক মহাপ্রাণের সূর্য অস্তমিত হলো। মহাকালের রথচক্র যখন সভ্যতার ধূলিকণা মাড়িয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যায়, তখন কিছু মানুষ কেবল সেই ধুলোতেই মিশে যান না; বরং তারা রেখে যান এমন কিছু নাক্ষত্রিক চিহ্ন, যা অনাগত শতাব্দীকেও পথ দেখায়। মুজাহিদী ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাবানদের একজন, যিনি শব্দের সূক্ষ্ম বুননে আকাশ আর মাটিকে এক আশ্চর্য মায়ার সুতায় গেঁথেছিলেন।

তিনি একাধারে ছিলেন শব্দশিল্পী, মননশীল সাংবাদিক, আর শিশুদের জন্য এক চিরন্তন স্বপ্নবাজ জাদুকর। 

একজন প্রকৃত কবির কাজ কী? কেবল কি ছন্দ মেলানো? মুজাহিদীয় দর্শনে কবিতা ছিল এক ধরনের আত্মানুসন্ধান। তিনি যখন লিখতেন, তখন মনে হতো তিনি যেন মাটির খুব কাছ থেকে উঠে আসা কোনো আদিম সুরকে আধুনিকতার মোড়কে তুলে আনছেন। সেই উত্তাল সময়ে অনেক কবিই যখন কেবল রাজনৈতিক স্লোগানকে কবিতা বানাতে ব্যস্ত, মুজাহিদী তখন মানুষের অন্তর্গত হাহাকার আর আধ্যাত্মিক সংকটের চিত্র আঁকছিলেন। তার কাছে রাজনীতি আর কবিতা ছিল একে অপরের পরিপূরক–একটি অধিকারের কথা বলে, অন্যটি সেই অধিকারের নৈতিক ভিত্তি গড়ে দেয়।

তার কাব্যসাহিত্যের অন্যতম স্তম্ভ হলো ‘মৃত্তিকা ও মহাকাশ’। এই দুটি শব্দই যেন তার সমগ্র জীবনদর্শনের সারকথা। এখানে মাটি মানে কেবল এই চরাচর পৃথিবী নয়, বরং তা হলো মানুষের নশ্বর শরীরের প্রতীক যে শরীর ধুলো থেকে জন্মে আবার ধুলোতেই বিলীন হয়। আর মহাকাশ? সে তো অসীমতার হাতছানি, যেখানে মানুষের অবিনাশী আত্মা খুঁজে পায় তার পরম ঠিকানা। 

দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার সময়ের যে রৈখিক গতির কথা বলেছিলেন, মুজাহিদী তাকে এক বৃত্তাকার ও শাশ্বত সত্তা হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছেন। তার কবিতার চরণে চরণে এই হাহাকার ছিল যে মানুষ কেন কেবল মাটির মায়ায় বন্দি হয়ে তার ডানা দুটোকে ভুলে যায়? কবির ভাষায় বলতে গেলে, মানুষের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আসলে নক্ষত্রের কান্নারই এক একটি বিচ্ছিন্ন অংশ। এই যে ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের দিকে উত্তরণ, এই যে নিজের অস্তিত্বকে মহাবিশ্বের বিশালতার সঙ্গে যুক্ত করা এটাই তো তার দর্শনের মূল সুর। তিনি বিশ্বাস করতেন, আমরা কেবল মাটির মানুষ নই, আমরা নক্ষত্রের সন্তান।

আল মুজাহিদী মানেই ছিল ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর সেই সোনালি দিনগুলোর ঘ্রাণ। দীর্ঘ কয়েক দশক তিনি এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন। এই ভূমিকাটি তার কাছে কেবল একটি জীবিকা বা পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি সাহিত্যিক প্রজন্ম গড়ে তোলার এক মহান ব্রত। 

কত শত উদীয়মান লেখক যে তার স্নেহের স্পর্শে আর শাসনের কঠোরতায় আজ সাহিত্যের মূল আঙিনায় সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছেন, তার হিসাব মেলা ভার। আজকের দিনে যখন সাংবাদিকতা কেবল ‘ক্লিক’ আর ‘ভিউ’-এর ইঁদুর দৌড়ে ক্লান্ত, যখন সংবাদের সত্যতা গৌণ হয়ে পড়ছে, তখন মুজাহিদীয় সেই সম্পাদনার ধ্রুপদী মানদণ্ড আমাদের বারবার লজ্জিত করে। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, খবরের কাগজের পাতায়ও সাহিত্যের স্থান হতে পারে অতি পবিত্র, যা মানুষের রুচি আর চিন্তা জগৎকে আমূল বদলে দিতে পারে।

তিনি চলে গেছেন সেই রহস্যময় পথে, যে পথের শেষে অনন্তের আহ্বান থাকে। তিনি তো সেই চিরন্তন যাত্রী ছিলেন, যার যাত্রা শুরু হয়েছিল নক্ষত্রের আলোয় আর শেষ হলো এক স্বর্গীয় মহাসংগীতের মূর্ছনায়। বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি এক ধ্রুবতারা হয়ে থাকবেন, যা অন্ধকার ও মেঘাচ্ছন্ন দিনেও আমাদের পথের দিশা দেখাবে। তার প্রয়াণ আমাদের হৃদয়ে এক গভীর হাহাকার রেখে গেলেও তার শব্দরাজি আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি জোগাবে।

আল মুজাহিদী কোনো মৃত সত্তা নন; তিনি তার প্রতিটি ছন্দে, প্রতিটি বাক্যে এবং প্রতিটি দর্শনে আমাদের মধ্যেই আছেন। তিনি বেঁচে থাকবেন প্রতিটি ভোরের সূর্যোদয়ে, প্রতিটি শিশুর হাসিতে এবং প্রতিটি প্রতিবাদী মানুষের বজ্রমুষ্টিতে। মহাকালের বাতায়নে তার শব্দের কারুকাজ চিরকাল অমলিন থাকবে। তিনি শিখিয়ে গেছেন মানুষ মরে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া শুভবোধ আর সৃজনশীলতা সময়কে জয় করে টিকে থাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী। আজ এই শোকাতুর দিনে আমাদের একটাই প্রার্থনা তার সেই আলোকিত আত্মা যেন অনন্ত প্রশান্তি লাভ করে। বিদায় হে শব্দের জাদুকর, তোমার যাত্রা হোক নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রলোকে।

চিন্তাভাবনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বাবা চাকুরিতে আসলেন পূর্ববঙ্গে: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১০:৪১ এএম
চিন্তাভাবনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বাবা চাকুরিতে আসলেন পূর্ববঙ্গে: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

অষ্টাদশ পর্ব

ঢাকা তো একটা মফস্বল শহর বৈ নয়, ঢাকায় গিয়ে কোথায় বাসা পাওয়া যাবে, কেমন হবে থাকার ব্যবস্থা, এসব নিয়ে তারা যে আলোচনা করবেন এমন অবস্থাও রইল না। কারণ সবাই ছিলেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং অনেকেরই ঢাকার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক বলতে কিছুই ছিল না। কলকাতায় কিন্তু কেউ কেউ ভালো অবস্থাতেই ছিলেন। কারও ছিল ব্যবসায়, কারও পেশাগত প্রতিষ্ঠা, কেউ কেউ বসবাসের জন্য বাড়ি পর্যন্ত তৈরি করেছেন, আরেক অংশ তেমন সচ্ছল না হলেও গুছিয়ে বসেছিলেন। তারা কেউই এ চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলতে পারলেন না যে, তাদের উদ্বাস্তু হয়েই প্রস্থান করতে হবে। মুসলমানদের স্বতন্ত্র বাসস্থান বলতে অবিভক্ত ভারতের কোন কোন এলাকা বোঝাবে মুসলিম লীগের নেতারা সেটা কখনোই স্পষ্ট করে বলেননি, হতে পারে বলতে সাহসও পাননি। তবে একটা প্রচার তো ছিল, বিশেষ করে প্রভাবশালী আজাদ পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয় স্তম্ভের ওপরে যে মানচিত্রটা ছাপত, তদনুযায়ী, বাংলা ও আসামের পুরোটা নিয়েই গঠিত হবে পূর্ব বাংলা। তেমনটা না ঘটায় সার্বিকভাবে হতাশ হওয়ার কারণ ঘটেছিল অবশ্যই। দেশের স্বাধীনতা যে দেশের মানুষের জন্য এমন উল্লাসহীন হবে সেটা কে কবে ভেবেছিল!

এক কথায় বলতে গেলে, উদ্বাস্তুদশায় কলকাতা ছেড়ে যেতে হতে পারে এটা ছিল কল্পনাতীত। মধ্য-কলকাতার মার্কুইস লেনে নিজেদের বাড়িতে থাকতেন আমাদের এক আত্মীয়-পরিবার। ছুটির দিনে সেখানে অন্যরাও যেতেন, বেশ একটা আনন্দের ঘটনা ঘটত। বাড়িটা ছোটই ছিল, তবু নিজেদের তো। এখন তারা কোথায় গিয়ে পড়বেন এ দুর্ভাবনায় বাড়ির হাসিখুশি ভাবটা মিলিয়ে গেল। কলকাতা শহর ইতোমধ্যেই হিন্দু এলাকা-মুসলমান এলাকায় ভাগ হয়ে গিয়েছিল, হিন্দুপাড়ায় যে মুসলমানরা বংশানুক্রমে বসবাস করতেন দাঙ্গার ধাক্কায় তারা উৎপাটিত হয়ে পড়েছিলেন, দাঙ্গার পরে শান্ত অবস্থা দেখে যারা ফেরত গেছেন। কলকাতা ভারতের দখলে চলে যাবে দেখে তারা পড়লেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। কারও কারও চেষ্টা দাঁড়াল বসতবাড়ি বিক্রি করে দিয়ে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার; সবাই সফল হলেন না, যারা হলেন তারাও দাম পেলেন না উপযুক্ত। ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দাদের সঙ্গে যারা বাড়ি বদলের ব্যবস্থা করতে পারলেন তারা মনে করলেন কপাল ভালো; আর যারা তখনো কলকাতা শহরে পাড়া-ছাড়া হয়ে পড়েছিলেন, তারা ভয় পাওয়া শুরু করলেন বসতবাড়িতে আর ফেরত যাওয়া হবে না ভেবে। 

সবচেয়ে করুণ অবস্থাটা সৃষ্টি হলো কলকাতার উর্দুভাষী বাসিন্দাদের জন্য। আমরা নিজেরাও তেমন একটা ঘটনার সাক্ষী হয়ে গেলাম। খিদিরপুরে আমাদের বাসার যিনি বাড়িওয়ালা তাকে আমরা হাজি সাহেব বলতাম; তারা ওই শহরের অনেককালের বাসিন্দা, পাকিস্তান দাবির পক্ষে তাদের ভেতরে লড়কে লেঙ্গে মনোভাব সংক্রমিত হওয়ার কথা। হয়তো হয়েছিলও। এখন যখন পাকিস্তান একেবারে দোরগোড়ায় এসে হাজির হয়েছে, তখন তারা আবিষ্কার করলেন যে, তারা রয়ে যাবেন পাকিস্তানের বাইরে। তাদের আশা পরিণত হলো আতঙ্কে। আমরা ওই বাসা ছেড়ে চলে এলাম, কিন্তু বাড়িওয়ালাদের অবস্থাটা কেমন দাঁড়াল সেটা আর জানা হয়নি। তবে বেশ কয়েক বছর পরে আমার মেজো ভাই বলেছে, ঢাকায় সে হাজি সাহেবের একমাত্র নাতিকে দেখেছে ট্যাক্সি চালাতে। দূর থেকেই দেখেছে, কাছে গিয়ে বিড়ম্বিত করেনি। বেচারারা স্বপ্ন দেখেছিলেন পাকিস্তানের, আন্দোলনের মুখে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দাঙ্গায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখলেন স্বাধীন পাকিস্তান চলে গেল তাদের নাগালের বাইরে। 

 

২.
চিন্তাভাবনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আব্বা খবর আনলেন যে, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে যারা অপশন দেবেন পূর্ববঙ্গে তারা চাকরি পাবেন। আব্বা যে অপশন দেবেন সেটা ছিল নিশ্চিত। এর মধ্যে ঢাকায় যেসব আত্মীয়স্বজন ছিলেন তাদের কাছে আব্বার পত্রযোগাযোগ শুরু না করার কথা নয়। নিশ্চয়ই সেটা তিনি করেছিলেন। আগস্ট মাসের ১ কী ২ তারিখে আমরা রওনা হলাম ঢাকা অভিমুখে। নেওয়ার মতো খাট-পালঙ চেয়ার-টেবিল যা ছিল তা শিয়ালদহ রেলস্টেশনে ঢাকার উদ্দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল আগেই, আমরা রওনা হলাম একটি ট্যাক্সি ও একটি ট্রাকযোগে। ট্রাকে কাপড়-জামা থালাবাসনসহ অন্য যেসব জিনিসপত্র ছিল সেগুলো গুনে গুনে তোলা হলো; আব্বা লিস্ট করে রাখলেন। মালপত্রের ভেতর বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল বড় এক বস্তা চাল, এবং ছোট একটিতে ডাল। চাল-ডালের ওই সংগ্রহ সঙ্গে নেওয়াটা যে যথার্থ বিচক্ষণতার কাজ ছিল গন্তব্যে পৌঁছার পরে সেটা বুঝতে খুব একটা বিলম্ব ঘটেনি। শিয়ালদহ যাওয়ার পথে ট্রাকটি যাবে আগে আগে, পাহারাদারের মতো, পেছনে ট্যাক্সি–এই রকমের আয়োজন। ট্রাকের সামনে ছোট মামা বসলেন। তিনি তো যাবেনই, আর আমরা যাচ্ছি তো নানাবাড়িতেই। ড্রাইভারের পাশে তার আসন। মামার বাঁয়ে আমি। অন্যরা সবাই গাদাগাদি করে ট্যাক্সিতে। শঙ্কা ছিল পথে হামলা হতে পারে; রায়টের রেশ তো তখনো মুছে যায়নি। তেমন কিছু অবশ্য ঘটেনি। ভিড় ঠেলে ট্রেনে ওঠার পর আমার শুধু এটুকুই মনে আছে আমাদের কামরায় দু-তিনজন যাত্রী নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন হিন্দুস্থান-পাকিস্তান নিয়ে নয়, তাদের ব্যবসার লাভ-লোকসান নিয়ে। কাপড়-জামা দেখে বোঝা যাচ্ছিল তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের; কলকাতায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন পণ্য বেচাকেনা উপলক্ষে। অনুপস্থিত একজন কোনো ফাঁকে তাদের চেয়ে বেশি মুনাফা করে ফেলেছে এটাই মনে হচ্ছিল তাদের জন্য বিশেষ রকমের দুশ্চিন্তার বিষয়; দেশ যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে সে ঘটনা তাদের মোটেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেনি। তারা যে নিরুদ্বিগ্ন তা নন, উদ্বেগ ব্যবসা নিয়ে। 

ট্রেনে আব্বাকে অস্থির দেখিনি, তবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত যে ছিলেন সেটা নিশ্চিত। নতুন রাষ্ট্রে তাদের অফিস ঢাকায় বসবে, নাকি অন্যত্র; থাকার ব্যবস্থা কেমন ও কী ভাবে হবে, সন্তানদের পড়াশোনার হালটা কেমন দাড়াবে, এসব চিন্তা তো থাকবারই কথা; আশু চিন্তাটা ছিল ট্রেনের যাত্রা শেষে গোয়ালন্দের স্টিমারে সবার ঠিক মতো ওঠা নিয়ে। মালপত্র খোয়া যেতে পারে, সেগুলো বহন করার জন্য অদম্য উৎসাহী শ্রমিকরা টানাটানি শুরু করবে করুক; কিন্তু সেগুলো নিয়ে তারা যাতে অদৃশ্য না হয়ে যায় সেদিকে চোখ রাখা চাই। উদ্বেগের জন্য বিষয়ের কোনো অভাব ঘটার কথা নয়। তবে বড় একটা ভরসা ছোট মামা। তিনি তখন অবিবাহিত টগবগে যুবক, চাকরি করতেন রাইটার্স বিল্ডিং-এ, তার অফিস যে ঢাকাতেই থাকবে সেটা জানতে পেরেছেন, এবং আমরা যাচ্ছিও তাদের বাড়িতেই। 

স্টিমারে ঠিকঠাক উঠে, এবং জায়গা করে নিয়ে আনন্দ না পেলেও সবাই স্বস্তি পেলেন। আয়োজনের অতসব ঘনঘটার ভেতরে হয়তো প্রথমবারের মতো পুরোপুরি স্বস্তি। 

গঙ্গার ধারে ছিলাম, গঙ্গা এখন ভিন্নদেশের নদী, আমরা চলেছি আমাদের নিজেদের নদী পদ্মা দিয়ে। স্টিমারে ফার্স্ট সেকেন্ড ইন্টার থার্ড–এসব শ্রেণিবিভাজন ছিল, কিন্তু যাত্রীদের চলাফেরা দেখে মনে হচ্ছিল সবাই সমান হয়ে গেছেন। অভিন্ন নয়, ভিন্ন ভিন্ন ঘাটেই তারা নামবেন, গন্তব্য বিভিন্ন; কিন্তু সবার যাত্রা একই দিকে–স্বাধীনতা অভিমুখে, এরকমের একটা বোধ এগারো বছরের যে কিশোর তখন আমি, সেই কিশোরের মনে দোল খাচ্ছিল। বাইরে বাতাস, ওপরে খোলা আকাশ, স্টিমার চলেছে তর তর করে, রাতের অন্ধকার ভেঙে ফেলে, সার্চ লাইটের তীব্র আলো জ্বালিয়ে। 
দোতলার প্রশস্ত ডেকের এক কোনে কে একজন আসর জমিয়ে বক্তৃতা করছিলেন। তার পরনে মস্ত এক আলখেল্লা, কালো কাপড়ের। মাথায় সুবিন্যস্ত পাগড়ি। হাতে বোধ করি একটি ছড়িও ছিল। মোটাতাজা চেহারা। ভাবলে এখন মনে হয় তিনি বক্তৃতা নয়, ওয়াজ করছিলেন। ছোট মামার অভিজ্ঞতা ছিল স্টিমার ভ্রমণের। স্টিমারে লোকটিকে তিনি আগেও দেখেছেন। মামা তাকে জানতেন পাথর ও তাবিজ বিক্রেতা হিসেবে। কিন্তু সে রাত্রে লোকটি যে অমন বাঙ্ময় হয়ে উঠেছিলেন সেটা তার পাথর ও তাবিজের অব্যর্থ গুণাবলি বর্ণনার জন্য নয়, বোঝা যাচ্ছিল তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রে ধর্মের চর্চা কতটা এবং কীভাবে হওয়া চাই সে বিষয়েই সবাইকে বিনামূল্যে জ্ঞান সরবরাহ করছেন। তার সুর, ভাষা, দেহভঙ্গি–কোনো কিছুই এই খবরটা জানাতে কুণ্ঠিত ছিল না যে, পাকিস্তান আসছে এই খোশ খবরে তিনি উদ্দীপ্ত। এখন বুঝতে পারি নতুন রাষ্ট্রে ধর্মের চর্চা যত বাড়বে তার ব্যবসা যে ততই লকলকিয়ে উঠবে, এই দিব্যজ্ঞানই ছিল তার ওয়াজের ওজস্বিতার অন্তর্নিহিত অনুপ্রেরণা। তার গলার আওয়াজ ওঠানামা করছিল, এবং তিনি উত্তেজিত ছিলেন। হতে পারে পাথর ও তাবিজের তুলনায় বড় কোনো ব্যবসার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছিলেন চোখের সামনে। চলবে... 

শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়ন

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১০:০৮ এএম
শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়ন
বই

শান্তি ও সংঘাত মানবসমাজের এক অনিবার্য বাস্তবতা। আর এ বাস্তবতাকে অনুধাবন করার অন্যতম একাডেমিক গ্রন্থ হলো ‌‘শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়ন’। এই বইয়ে শান্তি ও সংঘাতকে কেবল যুদ্ধ ও সহিংসতার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়; বরং সামাজিক কাঠামো, ক্ষমতার সম্পর্ক, রাজনীতি এবং ন্যায়বিচারের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। শান্তি গবেষণার ক্লাসিক তত্ত্ব থেকে শুরু করে সমসাময়িক বিশ্ব ও বাংলাদেশের বাস্তব উদাহরণ সবকিছুই সহজ, প্রাঞ্জল ও একাডেমিক ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়নের ধারণাগত ভিত্তি, সংঘাতের ধরন ও উৎস, সংঘাত ব্যবস্থাপনা কৌশল, শান্তি, শিক্ষা এবং উন্নয়ন ও মানব নিরাপত্তার সঙ্গে শান্তির সম্পর্কবিষয়ক স্পষ্ট ধারণা লাভ করা যাবে। বাংলাদেশে শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়ন বিষয়ে এটি প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা বই। বইটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য হিসেবে গণ্য।

 

GRAND CORRUPTION

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ১০:০৬ এএম
GRAND CORRUPTION
বই

বইটি আধিপত্য বিষয়ে নজরুলের চিন্তাভাবনার একটি অন্বেষণ। নজরুলের দৃষ্টিতে আধিপত্য কীভাবে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক, জাতিগত, ধর্মীয়, বাগাড়ম্বরপূর্ণ, সামরিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের পাশাপাশি পরিবেশগত রূপে নিজেকে প্রকাশ করে, যার প্রতিটিই অধঃপতনের আন্তঃসংযুক্ত রূপ এবং পরিশেষে সমাজের সবচেয়ে অবমাননাকর দুর্নীতির জন্ম দেয়। বইটি সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের, যার মধ্যে আধিপত্যের আগে অপমানিত ভুক্তভোগীরাও অন্তর্ভুক্ত, তাদের দ্বারা পরিচালিত একটি সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে সামাজিক মুক্তির একটি পথও নির্দেশ করে। এ বিপ্লবের মাধ্যমে যে পরিবর্তনগুলো ঘটবে, তার মধ্যদিয়ে মানবীয় মহত্ত্বের পুনরুত্থানও ঘটবে। বইটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বকে এই প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব নজরুলের কাজের সঙ্গে পরিচয় করানো। যিনি সব ধরনের আধিপত্য থেকে মুক্তির জন্য অটলভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন।

মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা সমাজবোধ ও জীবনবীক্ষা

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম
সমাজবোধ ও জীবনবীক্ষা
বই

সপ্তম পর্ব

উপন্যাসে বিষয়বস্তু, চরিত্র নির্মাণ, সংলাপ, সমাজচেতনার মতো শিল্পের প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। তার উপন্যাসে শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের চমৎকার প্রয়োগ ঘটেছে। কাব্যিক ভাষা, শ্লেষ, যমক, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, উপমা, প্রবাদ,  আঞ্চলিক শব্দ, বিদেশি শব্দ, চিত্রকল্প- এসব যথাযথভাবে ব্যবহার করেছেন। গান ও কবিতার ব্যবহার করে তিনি তার শিল্পসত্তার উচ্চমার্গের পরিচয় দিয়েছেন। নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ যেতে পারে।

অনুপ্রাস: ক. ঘ্যানর ঘ্যানর কেন করছ, অ্যা?, খ. আমার সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করছে, গ. মেহেরুন্নেসার ঠোঁটে তার ঠোঁট লাগালেন, ঘ. উভয়ে উভয়ের ঠোঁটে ঠোঁটে আলিঙ্গন করতে লাগলেন, ঙ. এ এক বিস্ময়কর ঘটনা, চ. নিজের কক্ষে শুয়ে শুয়ে গান শুনছেন রোহিনী, ছ. হু হু করে কান্না আসে, জ. এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি,। 

উপমা: ক. তার মতো ভালো মানুষ দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই। খ. সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো সাহেদের কথা শুনছে। গ. কথাগুলো তীরের ফলার মতো নীলিমার গায়ে যেন বিদ্ধ করছিল, ঘ. মরার মতো ঘরের মেঝেতে পড়ে আছেন, ঙ. লেবু কচলানোর মতো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কচলানো শুরু হলো, চ. বিড়ালের মতো পা ফেলে তার সামনে থেকে বিদায় হচ্ছিল। ছ. আমার সঙ্গে কেন জানি মানুষ সতীনের মতো আচরণ করে।

বিদেশি শব্দ: সান্টিং, জিম, ইয়োগা, সেক্রিফাইস, অনলাইন, র‌্যাব, টিভি স্ক্রিন, ট্যাবলেট, মেডিকেল বোর্ড, অ্যাম্বুলেন্স, ফেসবুক, সেলিব্রেটি, স্মার্টনেস, গোডাইন, লকডাইন, করোনার সিমটম, আয়াতুল কুরসি। 

আঞ্চলিক শব্দ: কাচুমাচু, কাকপক্ষি, টাল, কষিয়ে, গোঙানির শব্দ, লা-লা, লুটোপুটি, নাস্তানাবুদ, তটস্ত, বালামসিবত, ঝিমমেরে,  ধরফর, মেজাজমর্জি, শালা মদখোর, শালা মাগীখোর, ডাল মে কুচ কালা হ্যায়। 

প্রবাদ প্রতীম: ক. গরম ভাতে ঘি পড়ার মতো অবস্থা, খ. এক পা আগায় দুই পা পেছায়, গ. মাইনকায় চিপায় পড়েছ, ঘ. তিক্ততায় সবকিছুই তেতো, ঙ. পুরুষরা এমনই, গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত সে ছিল ধোয়া তুলসীপাতা, চ. দুনিয়ায় নম্র-ভদ্র মানুষের কোনো জায়গা নেই। ছ. পেটের ক্ষুধা কি আর লকডাউন মানে, গোয়েন্দাগিরি লাঠে উঠেছে,  জ. ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে, ব্যবসায়িক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়, ঝ. কিন্তু জীবনের ক্ষতি পোষানো যায় না, হাতির বাচ্চা হাতি, ঞ. অর্থ থাকলে সাত খুন মাফ, ট. বিধির বিধান কে খণ্ডাতে পারে,  ঠ. পয়সা হলেই রূপ পাল্টে যায়, ড. সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে গেছে অর্থ।

রূপক: ক. মোহিনী নামক পোকা, খ. আসলে আমাদের হয়তো জোড়া ছিল না, গ. এসব কথা মুখে আনা পাপ, ঘ. তুমি ছাড়া আর সবকিছুই যে অন্ধকার, ঙ. জোর করে কি আর ভালোবাসা আদায় করা যায়?, চ. তিনি ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন, ছ. জোর করে কি আর ভালোবাসা আদায় করা যায়! জ. ঘোড়ার ঘাস কাটো! ঝ. আমি নাকি তার বাপের মতো, ঞ. যে জীবন একবার নিভে যায় সে জীবনের আলো আর কখনোই জ্বলে না, ট. আনন্দে ফেটে পড়েন আরেফিন, ঠ. তোর চেহারা দেখলেও এখন আমার শরীর জ্বলে, ড. পাবলিক সাপের লেজে পা দিয়েছে।

উৎপ্রেক্ষা: ক. যেন সে জাতির ত্রাতা! খ. বৈরম খানের মুখ থেকে যেন বুলেটের মতো কথা বের হচ্ছে, গ. বেদনার পাহাড় যেন এই দেড় বছরে জমেছে, ঘ. বীনুর গলা না যেন ফাঁটা বাঁশি, ঙ. হাসলে যেন বিল্ডিং কাঁপে।

জীবনচিত্র  : ক. দেখ, তুমি ভুলে যাচ্ছ তোমার একটা সংসার আছে। একটা সংসার ভেঙে আমি সংসার গড়ব, সেটা কোনোদিন হবে না। আমি অতটা আত্মকেন্দ্রিক নই। অতটা স্বার্থপর নই। নিজের সুখটাকে আমি বড় করে দেখি না। আমার কাছে মানবিকতার মূল্য অনেক বেশি। নিজে অনেক সেক্রিফাইস করতে পারি।

খ. কিশোর বয়সে কতজনকেই তো ভালো লাগে। সবাইকে কি জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়া যায়! যে জীবন শুরুই হয়নি, সে জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ কোথায়! তাছাড়া ওর তো একটা সংসার আছে। সেখানে আমি কেন? না না! এ হয় না।

গ. তৈল মিলন তেলবাজিতে ওস্তাদ লোক। তেলবাজি তার নেশা এবং পেশা। এ ছাড়া অর কোনো যোগ্যতা নেই তার। তেলবাজির কারণেই তার আসল নাম ঢাকা পড়েছে। সে নিজেও বাপ-মায়ের দেওয়া নাম ভুলে গেছে।

ঘ. ঘুরেফিরে ওই এক চিন্তা; কীভাবে পত্রিকা চলবে, কোথা এর ফান্ড আসবে? কে বলবে, আমি এটাকে নিজের কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করব না? কে বরলবে, আমি পত্রিকাটিকে একটা পেশাদার হাউস হিসেবে গড়ে তুলতে চাই? সে জন্য সম্পাদককে যত ধরনের সহায়তা করা দরকার তা করব।

গানের ব্যবহার: ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে।’ ‘বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও/ মনের মাঝে চিরদিন তাকে ডেকে নিও’।

কবিতার ব্যবহার: ‘আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করো, পৃথিবী,/ শেষ নমস্কারে অবনত দিনাবসানের বেদিতলে।’

‘বিষাদ বসুধা’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র নির্মাণ, সংলাপ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা, লেখকের নিজস্ব দর্শন এবং রচনাশৈলী- সবকিছু মিলিয়ে অসামান্য শিল্পকর্ম। কালের যাত্রায় উপন্যাসটি দালিলিক প্রমাণ হয়ে থাকবে। মোস্তফা কামাল বিষয়বস্তু নির্বাচন থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে সচেতনতা ও মুনশিয়ানা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। এ ধরনের উপন্যাস লিখতে সাহসের প্রয়োজন হয়, শুধু শুধু শিল্পকুশলী হলেই হয় না। সমাজের স্পর্শকাতর এমন সব বিষয় উপন্যাসের প্রাসঙ্গিকতায় উঠে এসেছে, যা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। সবদিক বিবেচনায় রেখে ‘বিষাদ বসুধা’ সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম, তা স্বীকার করতেই হয়। বাংলা কথাসাহিত্যে ‘বিষাদ-বসুধা’ অসামান্য এক সংযোজন- যা কালের যাত্রায় স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                    চলবে...

ফুটবল সাহিত্য শূন্য আনন্দ

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম
আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬, ০৯:৫২ এএম
শূন্য আনন্দ
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

কয়েক বছর আগে আমি ব্রাজিলের প্রখ্যাত নৃতাত্ত্বিক রবার্তো দা মাত্তার চমৎকার একটি বক্তৃতা শুনেছিলাম। সেই বক্তৃতায় তিনি ব্যাখ্যা করে বলছিলেন, ফুটবলের জনপ্রিয়তা আজও আগের মতোই প্রবল। ফুটবল মানুষের অন্তর্গত বৈধতা, সমতা এবং স্বাধীনতার সহজাত আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে থাকে।

তার যুক্তিটি ছিল চাতুর্যপূর্ণ এবং কৌতূহলোদ্দীপক। তার মতে, মানুষ ফুটবলকে একটি আদর্শ সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখে, যা স্বচ্ছ এবং সহজ আইনের দ্বারা পরিচালিত হয়। সেই আইন সবাই বোঝে ও মানে। আইনের লঙ্ঘন ঘটলে অপরাধী পক্ষকে তাৎক্ষণিক শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। ন্যায়বিচারের এই বিষয়টি ছাড়াও ফুটবলের মাঠ এমন একধরনের সাম্যবাদী জায়গা যা সবধরনের পক্ষপাত এবং কারুর বিশেষ অধিকারকে প্রাধান্য দেয় না। এখানে সাদা দাগ দিয়ে ঘেরা চিহ্নিত ঘাসের ওপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, নিষ্ঠা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং সেগুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে বিচার-বিবেচনা করে দেখে। গোল করা, গ্যালারি থেকে হাততালি পাওয়া বা দর্শকদের কটুবাক্য শোনার ক্ষেত্রে নামধাম, টাকাপয়সা, সামাজিক প্রভাবের কোনো গুরুত্ব নেই। অধিকন্তু, একজন ফুটবল খেলোয়াড় ততটুকুই স্বাধীনতা অনুশীলন করেন যা একটি সমাজ তার সদস্যদের দেয়। সমাজ যদি ভেঙে পড়ে: অর্থাৎ, সবাই যে নিয়ম মেনে চলে তার দ্বারা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা যা খুশি তা-ই করতে পারে।

পরিশেষে, এটি সেই আবেগ যা সারা বিশ্বের মানুষকে স্টেডিয়ামে ভিড় জমাতে, টেলিভিশনের পর্দায় গভীর মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখতে এবং ফুটবলের আদর্শ নিয়ে লড়াই করতে প্ররোচিত করে। এই খেলাটি মানুষকে তার গোপন ঈর্ষা, অবচেতনে পৃথিবীর জন্য স্মৃতিকাতর করে তোলে। এর কোনো কিছুই এখনকার সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রচলিত অবিচার, অসমতা, দুর্নীতি, অরাজকতা এবং সহিংসতায় ক্লিষ্ট নয়। বরং ফুটবল এমন একটি বিশ্বের কথা বলে যা সম্প্রীতি, আইন এবং সমতার প্রতিশ্রুতি দেয়।

প্রশ্ন হলো, সুন্দর এই তত্ত্বটি কি সত্যে পরিণত হতে পারে? যদি সত্যিই তা হতো, কোনো সন্দেহ নেই, ফুটবল প্রলুব্ধকর এবং মানবিক ভবিষ্যতের উপযোগী এরকম সভ্য-সুন্দর অনুভূতি মানুষের সহজাত গভীরতায় লালন করার চেয়ে ইতিবাচক আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু সম্ভবত যা ঘটে তা হলো–সব সময়ের মতোই বাস্তবতা তত্ত্বকে ছাড়িয়ে যায় এবং প্রমাণ করে যে, তত্ত্বটি অসম্পূর্ণ। কারণ তত্ত্বগুলো সবসময় যৌক্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, এমনকি যা অযৌক্তিক উন্মাদনাকে উসকে দেয়, সেসবের প্রস্তাবও দেয়। সমাজে ও ব্যক্তিগত আচরণে, অযৌক্তিকতা, অবচেতন মন এবং বিশুদ্ধ স্বতঃস্ফূর্ততা সবসময়ই এক ধরনের ভূমিকা পালন করে থাকে। এর সবকিছুই একই সঙ্গে অনিবার্য এবং অপরিমেয়।

আর্জেন্টিনা-বেলজিয়াম ম্যাচটি শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট আগে আমি বার্সেলোনার ন্যু ক্যাম্পের একটি আসনে বসে এই লাইনগুলো দ্রুত লিখছি। এখানেই একটু পরে ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচটি শুরু হতে চলেছে। পরিবেশ দারুণ ঝলেমলে: উজ্জ্বল সূর্য, পরিষ্কার আকাশ, হিস্পানি, কাতালান, আর্জেন্টিনা এবং বেলজিয়ামের কিছু পতাকা হাতে চিত্তাকর্ষক বহুবর্ণিল জনতাকে দেখছি আর আতশবাজির শব্দ কানে আসছে। খেলা শুরুর আগে আঞ্চলিক নাচ এবং শরীরচর্চার প্রদর্শনীকে (যা সাধারণত এ ধরনের অনুষ্ঠানে যতটা দেখা যায় তার চেয়ে অনেক উঁচু মানের) ঘিরে এক ধরনের উৎসবমুখর উদ্দাম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অবশ্যই ন্যু ক্যাম্পের নাচ স্টেডিয়ামের বাইরের নাচ আর সাজুগুজু করা তরুণ-তরুণীদের হাততালির তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয় আর আনন্দদায়ক মনে হচ্ছে। এই স্থান এবং বিশ্বকাপের খেলাগুলো এই মুহূর্তে যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী, দক্ষিণ আটলান্টিক বা লেবাননে যা ঘটছে বিশ্বের লাখ লাখ ভক্তের মনে সেই সব ঘটনাকে দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিয়েছে। এই দর্শকরা আগামী দুই ঘণ্টা গ্যালারিতে বসে থেকে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে অংশ নেওয়া আর্জেন্টিনা ও বেলজিয়ামের বাইশ খেলোয়াড়ের বল পাস করা আর গোলপোস্টে শট নেওয়া ছাড়া কিছুই ভাববে না।

সম্ভবত এই অসাধারণ সমসাময়িক ঘটনার ব্যাখ্যা–ফুটবলের প্রতি মানুষের আবেগ এমন এক খেলায় রূপান্তরিত হয়েছে, যাকে সাধারণ মানুষের ধর্ম বা অর্জিত ধর্ম বলা যায়। ফুটবল অনুরাগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা আমাদের যা বোঝাতে চান তার চেয়ে অনেক কম জটিল। এর ব্যাখ্যা খুব সহজ–ফুটবল মানুষকে এমন কিছু দেয় যা তারা অন্য কিছু থেকে খুব কমই পায়: মজা করার, আনন্দ উপভোগ করার, উত্তেজিত হওয়ার, আবেগপ্রবণ হওয়ার এবং এমন কিছু তীব্র অনুভূতিকে অনুভব করার সুযোগ পায় মানুষ যা দৈনন্দিন পরিসরে খুব কমই মেলে। 

আনন্দ পেতে চাওয়া, মজা করা, ভালো সময় কাটানো–এসব অত্যন্ত বৈধ আকাঙ্ক্ষা, যা খাওয়া বা কাজের আকাঙ্ক্ষার মতোই সমান যৌক্তিক অধিকার। নিঃসন্দেহে নানা জটিলতার কারণে ফুটবল আজ বিশ্বের অন্য যেকোনো খেলার চেয়ে অনেক বেশি সফলতার সঙ্গে এই ভূমিকা পালন করছে।

আমরা যারা ফুটবল পছন্দ করি এবং এতে আনন্দ পাই, তারা এর সম্মিলিত বিনোদনমূলক ব্যাপক জনপ্রিয়তায় মোটেও অবাক হই না। কিন্তু অনেকেই আছেন যারা এই বিষয়টি বোঝেন না এবং এর সমালোচনা করেন। তারা একে শোচনীয় মনে করেন, কারণ তাদের মতে ফুটবল গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় থেকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং নিঃস্ব করে তোলে। কিন্তু যারা এমনটা ভাবেন তারা ভুলে যান যে, জীবনে আনন্দ পাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। তারা আরও ভুলে যান যে, বিনোদনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা অত্যন্ত তীব্র ও মনোমুগ্ধকর হলেও এর অভিঘাত ক্ষণস্থায়ী, অনতিক্রমী এবং নিরীহ হয়ে থাকে। ফুটবল এমন একধরনের অভিজ্ঞতা দেয় যেখানে কারণটি (জয়-পরাজয়) অদৃশ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাবও শেষ হয়ে যায়। খেলাধুলা যারা উপভোগ করেন তারা খেলার ধরনটাকেই ভালোবাসেন। সেটা কখনো শারীরিক, ইন্দ্রিয় সংবেদনা এবং তাৎক্ষণিক আবেগের ঊর্ধ্বে চলে যায় না। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, একটি বই বা নাটক স্মৃতির ওপর যতটা ছাপ ফেলে, ফুটবল ততটা ছাপ ফেলে না এবং আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ বা দরিদ্র কোনোটাই করে না। আর এখানেই এর আকর্ষণ: এটি উত্তেজনায় ভরা কিন্তু তা অনেকটাই শূন্য বলা যায়। এ কারণেই বুদ্ধিমান বা বুদ্ধিহীন, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত–সবাই সমানভাবে ফুটবল উপভোগ করতে পারেন। লেখাটা এখনকার মতো এখানেই শেষ করি। রাজা চলে এসেছেন। দলগুলো মাঠে নেমেছে। বিশ্বকাপ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেল। খেলাও শুরু হতে চলেছে। আর লেখালেখি নয়। আসুন, আমরা আনন্দে অবগাহন করি। সূত্র: The Empty Pleasure by Mario Vargas Llosa