সময় কি কখনো থেমে থাকে? হয়তো না। কিন্তু কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যখন মনে হয় মহাকালের ঘড়িটি বুঝি এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ২০২৬ সালের ১৯ জুন, যখন মধ্যাহ্নের প্রখরতা কাটিয়ে আকাশ কিছুটা নুয়ে পড়ছিল, ঠিক দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে বাংলার সাহিত্যাকাশে এক দীর্ঘস্থায়ী ছায়া নেমে এল। আল মুজাহিদী চলে গেলেন। এই প্রস্থান কি কেবল একজন রক্ত-মাংসের মানুষের বিদায়? না, এ যেন এক জীবন্ত মহাফেজখানার কপাট চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাওয়া। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি হয়তো সাধারণ এক বর্ষা-দুপুরের আর্দ্রতা নিয়ে এসেছিল, কিন্তু শব্দপ্রেমীদের হৃদয়ে তা এক গভীর ক্ষত হয়ে খোদাই হয়ে রইল।
আল মুজাহিদী নামটি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন একজন মানুষ, যিনি শব্দের শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে জানতেন। তার প্রয়াণ কেবল একটি ব্যক্তিগত মৃত্যু নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। গোধূলির আলো ম্লান হওয়ার আগেই যেন এক মহাপ্রাণের সূর্য অস্তমিত হলো। মহাকালের রথচক্র যখন সভ্যতার ধূলিকণা মাড়িয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যায়, তখন কিছু মানুষ কেবল সেই ধুলোতেই মিশে যান না; বরং তারা রেখে যান এমন কিছু নাক্ষত্রিক চিহ্ন, যা অনাগত শতাব্দীকেও পথ দেখায়। মুজাহিদী ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাবানদের একজন, যিনি শব্দের সূক্ষ্ম বুননে আকাশ আর মাটিকে এক আশ্চর্য মায়ার সুতায় গেঁথেছিলেন।
তিনি একাধারে ছিলেন শব্দশিল্পী, মননশীল সাংবাদিক, আর শিশুদের জন্য এক চিরন্তন স্বপ্নবাজ জাদুকর।
একজন প্রকৃত কবির কাজ কী? কেবল কি ছন্দ মেলানো? মুজাহিদীয় দর্শনে কবিতা ছিল এক ধরনের আত্মানুসন্ধান। তিনি যখন লিখতেন, তখন মনে হতো তিনি যেন মাটির খুব কাছ থেকে উঠে আসা কোনো আদিম সুরকে আধুনিকতার মোড়কে তুলে আনছেন। সেই উত্তাল সময়ে অনেক কবিই যখন কেবল রাজনৈতিক স্লোগানকে কবিতা বানাতে ব্যস্ত, মুজাহিদী তখন মানুষের অন্তর্গত হাহাকার আর আধ্যাত্মিক সংকটের চিত্র আঁকছিলেন। তার কাছে রাজনীতি আর কবিতা ছিল একে অপরের পরিপূরক–একটি অধিকারের কথা বলে, অন্যটি সেই অধিকারের নৈতিক ভিত্তি গড়ে দেয়।
তার কাব্যসাহিত্যের অন্যতম স্তম্ভ হলো ‘মৃত্তিকা ও মহাকাশ’। এই দুটি শব্দই যেন তার সমগ্র জীবনদর্শনের সারকথা। এখানে মাটি মানে কেবল এই চরাচর পৃথিবী নয়, বরং তা হলো মানুষের নশ্বর শরীরের প্রতীক যে শরীর ধুলো থেকে জন্মে আবার ধুলোতেই বিলীন হয়। আর মহাকাশ? সে তো অসীমতার হাতছানি, যেখানে মানুষের অবিনাশী আত্মা খুঁজে পায় তার পরম ঠিকানা।
দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার সময়ের যে রৈখিক গতির কথা বলেছিলেন, মুজাহিদী তাকে এক বৃত্তাকার ও শাশ্বত সত্তা হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছেন। তার কবিতার চরণে চরণে এই হাহাকার ছিল যে মানুষ কেন কেবল মাটির মায়ায় বন্দি হয়ে তার ডানা দুটোকে ভুলে যায়? কবির ভাষায় বলতে গেলে, মানুষের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আসলে নক্ষত্রের কান্নারই এক একটি বিচ্ছিন্ন অংশ। এই যে ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের দিকে উত্তরণ, এই যে নিজের অস্তিত্বকে মহাবিশ্বের বিশালতার সঙ্গে যুক্ত করা এটাই তো তার দর্শনের মূল সুর। তিনি বিশ্বাস করতেন, আমরা কেবল মাটির মানুষ নই, আমরা নক্ষত্রের সন্তান।
আল মুজাহিদী মানেই ছিল ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর সেই সোনালি দিনগুলোর ঘ্রাণ। দীর্ঘ কয়েক দশক তিনি এই ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনা করেছেন। এই ভূমিকাটি তার কাছে কেবল একটি জীবিকা বা পেশাগত দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি সাহিত্যিক প্রজন্ম গড়ে তোলার এক মহান ব্রত।
কত শত উদীয়মান লেখক যে তার স্নেহের স্পর্শে আর শাসনের কঠোরতায় আজ সাহিত্যের মূল আঙিনায় সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছেন, তার হিসাব মেলা ভার। আজকের দিনে যখন সাংবাদিকতা কেবল ‘ক্লিক’ আর ‘ভিউ’-এর ইঁদুর দৌড়ে ক্লান্ত, যখন সংবাদের সত্যতা গৌণ হয়ে পড়ছে, তখন মুজাহিদীয় সেই সম্পাদনার ধ্রুপদী মানদণ্ড আমাদের বারবার লজ্জিত করে। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, খবরের কাগজের পাতায়ও সাহিত্যের স্থান হতে পারে অতি পবিত্র, যা মানুষের রুচি আর চিন্তা জগৎকে আমূল বদলে দিতে পারে।
তিনি চলে গেছেন সেই রহস্যময় পথে, যে পথের শেষে অনন্তের আহ্বান থাকে। তিনি তো সেই চিরন্তন যাত্রী ছিলেন, যার যাত্রা শুরু হয়েছিল নক্ষত্রের আলোয় আর শেষ হলো এক স্বর্গীয় মহাসংগীতের মূর্ছনায়। বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি এক ধ্রুবতারা হয়ে থাকবেন, যা অন্ধকার ও মেঘাচ্ছন্ন দিনেও আমাদের পথের দিশা দেখাবে। তার প্রয়াণ আমাদের হৃদয়ে এক গভীর হাহাকার রেখে গেলেও তার শব্দরাজি আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি জোগাবে।
আল মুজাহিদী কোনো মৃত সত্তা নন; তিনি তার প্রতিটি ছন্দে, প্রতিটি বাক্যে এবং প্রতিটি দর্শনে আমাদের মধ্যেই আছেন। তিনি বেঁচে থাকবেন প্রতিটি ভোরের সূর্যোদয়ে, প্রতিটি শিশুর হাসিতে এবং প্রতিটি প্রতিবাদী মানুষের বজ্রমুষ্টিতে। মহাকালের বাতায়নে তার শব্দের কারুকাজ চিরকাল অমলিন থাকবে। তিনি শিখিয়ে গেছেন মানুষ মরে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া শুভবোধ আর সৃজনশীলতা সময়কে জয় করে টিকে থাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী। আজ এই শোকাতুর দিনে আমাদের একটাই প্রার্থনা তার সেই আলোকিত আত্মা যেন অনন্ত প্রশান্তি লাভ করে। বিদায় হে শব্দের জাদুকর, তোমার যাত্রা হোক নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রলোকে।