সপ্তম পর্ব
উপন্যাসে বিষয়বস্তু, চরিত্র নির্মাণ, সংলাপ, সমাজচেতনার মতো শিল্পের প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। তার উপন্যাসে শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের চমৎকার প্রয়োগ ঘটেছে। কাব্যিক ভাষা, শ্লেষ, যমক, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, উপমা, প্রবাদ, আঞ্চলিক শব্দ, বিদেশি শব্দ, চিত্রকল্প- এসব যথাযথভাবে ব্যবহার করেছেন। গান ও কবিতার ব্যবহার করে তিনি তার শিল্পসত্তার উচ্চমার্গের পরিচয় দিয়েছেন। নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ যেতে পারে।
অনুপ্রাস: ক. ঘ্যানর ঘ্যানর কেন করছ, অ্যা?, খ. আমার সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করছে, গ. মেহেরুন্নেসার ঠোঁটে তার ঠোঁট লাগালেন, ঘ. উভয়ে উভয়ের ঠোঁটে ঠোঁটে আলিঙ্গন করতে লাগলেন, ঙ. এ এক বিস্ময়কর ঘটনা, চ. নিজের কক্ষে শুয়ে শুয়ে গান শুনছেন রোহিনী, ছ. হু হু করে কান্না আসে, জ. এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি,।
উপমা: ক. তার মতো ভালো মানুষ দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই। খ. সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো সাহেদের কথা শুনছে। গ. কথাগুলো তীরের ফলার মতো নীলিমার গায়ে যেন বিদ্ধ করছিল, ঘ. মরার মতো ঘরের মেঝেতে পড়ে আছেন, ঙ. লেবু কচলানোর মতো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কচলানো শুরু হলো, চ. বিড়ালের মতো পা ফেলে তার সামনে থেকে বিদায় হচ্ছিল। ছ. আমার সঙ্গে কেন জানি মানুষ সতীনের মতো আচরণ করে।
বিদেশি শব্দ: সান্টিং, জিম, ইয়োগা, সেক্রিফাইস, অনলাইন, র্যাব, টিভি স্ক্রিন, ট্যাবলেট, মেডিকেল বোর্ড, অ্যাম্বুলেন্স, ফেসবুক, সেলিব্রেটি, স্মার্টনেস, গোডাইন, লকডাইন, করোনার সিমটম, আয়াতুল কুরসি।
আঞ্চলিক শব্দ: কাচুমাচু, কাকপক্ষি, টাল, কষিয়ে, গোঙানির শব্দ, লা-লা, লুটোপুটি, নাস্তানাবুদ, তটস্ত, বালামসিবত, ঝিমমেরে, ধরফর, মেজাজমর্জি, শালা মদখোর, শালা মাগীখোর, ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।
প্রবাদ প্রতীম: ক. গরম ভাতে ঘি পড়ার মতো অবস্থা, খ. এক পা আগায় দুই পা পেছায়, গ. মাইনকায় চিপায় পড়েছ, ঘ. তিক্ততায় সবকিছুই তেতো, ঙ. পুরুষরা এমনই, গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত সে ছিল ধোয়া তুলসীপাতা, চ. দুনিয়ায় নম্র-ভদ্র মানুষের কোনো জায়গা নেই। ছ. পেটের ক্ষুধা কি আর লকডাউন মানে, গোয়েন্দাগিরি লাঠে উঠেছে, জ. ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে, ব্যবসায়িক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যায়, ঝ. কিন্তু জীবনের ক্ষতি পোষানো যায় না, হাতির বাচ্চা হাতি, ঞ. অর্থ থাকলে সাত খুন মাফ, ট. বিধির বিধান কে খণ্ডাতে পারে, ঠ. পয়সা হলেই রূপ পাল্টে যায়, ড. সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে গেছে অর্থ।
রূপক: ক. মোহিনী নামক পোকা, খ. আসলে আমাদের হয়তো জোড়া ছিল না, গ. এসব কথা মুখে আনা পাপ, ঘ. তুমি ছাড়া আর সবকিছুই যে অন্ধকার, ঙ. জোর করে কি আর ভালোবাসা আদায় করা যায়?, চ. তিনি ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন, ছ. জোর করে কি আর ভালোবাসা আদায় করা যায়! জ. ঘোড়ার ঘাস কাটো! ঝ. আমি নাকি তার বাপের মতো, ঞ. যে জীবন একবার নিভে যায় সে জীবনের আলো আর কখনোই জ্বলে না, ট. আনন্দে ফেটে পড়েন আরেফিন, ঠ. তোর চেহারা দেখলেও এখন আমার শরীর জ্বলে, ড. পাবলিক সাপের লেজে পা দিয়েছে।
উৎপ্রেক্ষা: ক. যেন সে জাতির ত্রাতা! খ. বৈরম খানের মুখ থেকে যেন বুলেটের মতো কথা বের হচ্ছে, গ. বেদনার পাহাড় যেন এই দেড় বছরে জমেছে, ঘ. বীনুর গলা না যেন ফাঁটা বাঁশি, ঙ. হাসলে যেন বিল্ডিং কাঁপে।
জীবনচিত্র : ক. দেখ, তুমি ভুলে যাচ্ছ তোমার একটা সংসার আছে। একটা সংসার ভেঙে আমি সংসার গড়ব, সেটা কোনোদিন হবে না। আমি অতটা আত্মকেন্দ্রিক নই। অতটা স্বার্থপর নই। নিজের সুখটাকে আমি বড় করে দেখি না। আমার কাছে মানবিকতার মূল্য অনেক বেশি। নিজে অনেক সেক্রিফাইস করতে পারি।
খ. কিশোর বয়সে কতজনকেই তো ভালো লাগে। সবাইকে কি জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়া যায়! যে জীবন শুরুই হয়নি, সে জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ কোথায়! তাছাড়া ওর তো একটা সংসার আছে। সেখানে আমি কেন? না না! এ হয় না।
গ. তৈল মিলন তেলবাজিতে ওস্তাদ লোক। তেলবাজি তার নেশা এবং পেশা। এ ছাড়া অর কোনো যোগ্যতা নেই তার। তেলবাজির কারণেই তার আসল নাম ঢাকা পড়েছে। সে নিজেও বাপ-মায়ের দেওয়া নাম ভুলে গেছে।
ঘ. ঘুরেফিরে ওই এক চিন্তা; কীভাবে পত্রিকা চলবে, কোথা এর ফান্ড আসবে? কে বলবে, আমি এটাকে নিজের কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করব না? কে বরলবে, আমি পত্রিকাটিকে একটা পেশাদার হাউস হিসেবে গড়ে তুলতে চাই? সে জন্য সম্পাদককে যত ধরনের সহায়তা করা দরকার তা করব।
গানের ব্যবহার: ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে।’ ‘বন্ধু তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও/ মনের মাঝে চিরদিন তাকে ডেকে নিও’।
কবিতার ব্যবহার: ‘আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করো, পৃথিবী,/ শেষ নমস্কারে অবনত দিনাবসানের বেদিতলে।’
‘বিষাদ বসুধা’ উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র নির্মাণ, সংলাপ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা, লেখকের নিজস্ব দর্শন এবং রচনাশৈলী- সবকিছু মিলিয়ে অসামান্য শিল্পকর্ম। কালের যাত্রায় উপন্যাসটি দালিলিক প্রমাণ হয়ে থাকবে। মোস্তফা কামাল বিষয়বস্তু নির্বাচন থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে সচেতনতা ও মুনশিয়ানা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। এ ধরনের উপন্যাস লিখতে সাহসের প্রয়োজন হয়, শুধু শুধু শিল্পকুশলী হলেই হয় না। সমাজের স্পর্শকাতর এমন সব বিষয় উপন্যাসের প্রাসঙ্গিকতায় উঠে এসেছে, যা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। সবদিক বিবেচনায় রেখে ‘বিষাদ বসুধা’ সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম, তা স্বীকার করতেই হয়। বাংলা কথাসাহিত্যে ‘বিষাদ-বসুধা’ অসামান্য এক সংযোজন- যা কালের যাত্রায় স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। চলবে...