কয়েক বছর আগে আমি ব্রাজিলের প্রখ্যাত নৃতাত্ত্বিক রবার্তো দা মাত্তার চমৎকার একটি বক্তৃতা শুনেছিলাম। সেই বক্তৃতায় তিনি ব্যাখ্যা করে বলছিলেন, ফুটবলের জনপ্রিয়তা আজও আগের মতোই প্রবল। ফুটবল মানুষের অন্তর্গত বৈধতা, সমতা এবং স্বাধীনতার সহজাত আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে থাকে।
তার যুক্তিটি ছিল চাতুর্যপূর্ণ এবং কৌতূহলোদ্দীপক। তার মতে, মানুষ ফুটবলকে একটি আদর্শ সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখে, যা স্বচ্ছ এবং সহজ আইনের দ্বারা পরিচালিত হয়। সেই আইন সবাই বোঝে ও মানে। আইনের লঙ্ঘন ঘটলে অপরাধী পক্ষকে তাৎক্ষণিক শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। ন্যায়বিচারের এই বিষয়টি ছাড়াও ফুটবলের মাঠ এমন একধরনের সাম্যবাদী জায়গা যা সবধরনের পক্ষপাত এবং কারুর বিশেষ অধিকারকে প্রাধান্য দেয় না। এখানে সাদা দাগ দিয়ে ঘেরা চিহ্নিত ঘাসের ওপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, নিষ্ঠা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং সেগুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে বিচার-বিবেচনা করে দেখে। গোল করা, গ্যালারি থেকে হাততালি পাওয়া বা দর্শকদের কটুবাক্য শোনার ক্ষেত্রে নামধাম, টাকাপয়সা, সামাজিক প্রভাবের কোনো গুরুত্ব নেই। অধিকন্তু, একজন ফুটবল খেলোয়াড় ততটুকুই স্বাধীনতা অনুশীলন করেন যা একটি সমাজ তার সদস্যদের দেয়। সমাজ যদি ভেঙে পড়ে: অর্থাৎ, সবাই যে নিয়ম মেনে চলে তার দ্বারা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা যা খুশি তা-ই করতে পারে।
পরিশেষে, এটি সেই আবেগ যা সারা বিশ্বের মানুষকে স্টেডিয়ামে ভিড় জমাতে, টেলিভিশনের পর্দায় গভীর মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখতে এবং ফুটবলের আদর্শ নিয়ে লড়াই করতে প্ররোচিত করে। এই খেলাটি মানুষকে তার গোপন ঈর্ষা, অবচেতনে পৃথিবীর জন্য স্মৃতিকাতর করে তোলে। এর কোনো কিছুই এখনকার সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রচলিত অবিচার, অসমতা, দুর্নীতি, অরাজকতা এবং সহিংসতায় ক্লিষ্ট নয়। বরং ফুটবল এমন একটি বিশ্বের কথা বলে যা সম্প্রীতি, আইন এবং সমতার প্রতিশ্রুতি দেয়।
প্রশ্ন হলো, সুন্দর এই তত্ত্বটি কি সত্যে পরিণত হতে পারে? যদি সত্যিই তা হতো, কোনো সন্দেহ নেই, ফুটবল প্রলুব্ধকর এবং মানবিক ভবিষ্যতের উপযোগী এরকম সভ্য-সুন্দর অনুভূতি মানুষের সহজাত গভীরতায় লালন করার চেয়ে ইতিবাচক আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু সম্ভবত যা ঘটে তা হলো–সব সময়ের মতোই বাস্তবতা তত্ত্বকে ছাড়িয়ে যায় এবং প্রমাণ করে যে, তত্ত্বটি অসম্পূর্ণ। কারণ তত্ত্বগুলো সবসময় যৌক্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, এমনকি যা অযৌক্তিক উন্মাদনাকে উসকে দেয়, সেসবের প্রস্তাবও দেয়। সমাজে ও ব্যক্তিগত আচরণে, অযৌক্তিকতা, অবচেতন মন এবং বিশুদ্ধ স্বতঃস্ফূর্ততা সবসময়ই এক ধরনের ভূমিকা পালন করে থাকে। এর সবকিছুই একই সঙ্গে অনিবার্য এবং অপরিমেয়।
আর্জেন্টিনা-বেলজিয়াম ম্যাচটি শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট আগে আমি বার্সেলোনার ন্যু ক্যাম্পের একটি আসনে বসে এই লাইনগুলো দ্রুত লিখছি। এখানেই একটু পরে ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচটি শুরু হতে চলেছে। পরিবেশ দারুণ ঝলেমলে: উজ্জ্বল সূর্য, পরিষ্কার আকাশ, হিস্পানি, কাতালান, আর্জেন্টিনা এবং বেলজিয়ামের কিছু পতাকা হাতে চিত্তাকর্ষক বহুবর্ণিল জনতাকে দেখছি আর আতশবাজির শব্দ কানে আসছে। খেলা শুরুর আগে আঞ্চলিক নাচ এবং শরীরচর্চার প্রদর্শনীকে (যা সাধারণত এ ধরনের অনুষ্ঠানে যতটা দেখা যায় তার চেয়ে অনেক উঁচু মানের) ঘিরে এক ধরনের উৎসবমুখর উদ্দাম পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অবশ্যই ন্যু ক্যাম্পের নাচ স্টেডিয়ামের বাইরের নাচ আর সাজুগুজু করা তরুণ-তরুণীদের হাততালির তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয় আর আনন্দদায়ক মনে হচ্ছে। এই স্থান এবং বিশ্বকাপের খেলাগুলো এই মুহূর্তে যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী, দক্ষিণ আটলান্টিক বা লেবাননে যা ঘটছে বিশ্বের লাখ লাখ ভক্তের মনে সেই সব ঘটনাকে দ্বিতীয় স্থানে ঠেলে দিয়েছে। এই দর্শকরা আগামী দুই ঘণ্টা গ্যালারিতে বসে থেকে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে অংশ নেওয়া আর্জেন্টিনা ও বেলজিয়ামের বাইশ খেলোয়াড়ের বল পাস করা আর গোলপোস্টে শট নেওয়া ছাড়া কিছুই ভাববে না।
সম্ভবত এই অসাধারণ সমসাময়িক ঘটনার ব্যাখ্যা–ফুটবলের প্রতি মানুষের আবেগ এমন এক খেলায় রূপান্তরিত হয়েছে, যাকে সাধারণ মানুষের ধর্ম বা অর্জিত ধর্ম বলা যায়। ফুটবল অনুরাগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা আমাদের যা বোঝাতে চান তার চেয়ে অনেক কম জটিল। এর ব্যাখ্যা খুব সহজ–ফুটবল মানুষকে এমন কিছু দেয় যা তারা অন্য কিছু থেকে খুব কমই পায়: মজা করার, আনন্দ উপভোগ করার, উত্তেজিত হওয়ার, আবেগপ্রবণ হওয়ার এবং এমন কিছু তীব্র অনুভূতিকে অনুভব করার সুযোগ পায় মানুষ যা দৈনন্দিন পরিসরে খুব কমই মেলে।
আনন্দ পেতে চাওয়া, মজা করা, ভালো সময় কাটানো–এসব অত্যন্ত বৈধ আকাঙ্ক্ষা, যা খাওয়া বা কাজের আকাঙ্ক্ষার মতোই সমান যৌক্তিক অধিকার। নিঃসন্দেহে নানা জটিলতার কারণে ফুটবল আজ বিশ্বের অন্য যেকোনো খেলার চেয়ে অনেক বেশি সফলতার সঙ্গে এই ভূমিকা পালন করছে।
আমরা যারা ফুটবল পছন্দ করি এবং এতে আনন্দ পাই, তারা এর সম্মিলিত বিনোদনমূলক ব্যাপক জনপ্রিয়তায় মোটেও অবাক হই না। কিন্তু অনেকেই আছেন যারা এই বিষয়টি বোঝেন না এবং এর সমালোচনা করেন। তারা একে শোচনীয় মনে করেন, কারণ তাদের মতে ফুটবল গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় থেকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং নিঃস্ব করে তোলে। কিন্তু যারা এমনটা ভাবেন তারা ভুলে যান যে, জীবনে আনন্দ পাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। তারা আরও ভুলে যান যে, বিনোদনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা অত্যন্ত তীব্র ও মনোমুগ্ধকর হলেও এর অভিঘাত ক্ষণস্থায়ী, অনতিক্রমী এবং নিরীহ হয়ে থাকে। ফুটবল এমন একধরনের অভিজ্ঞতা দেয় যেখানে কারণটি (জয়-পরাজয়) অদৃশ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাবও শেষ হয়ে যায়। খেলাধুলা যারা উপভোগ করেন তারা খেলার ধরনটাকেই ভালোবাসেন। সেটা কখনো শারীরিক, ইন্দ্রিয় সংবেদনা এবং তাৎক্ষণিক আবেগের ঊর্ধ্বে চলে যায় না। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, একটি বই বা নাটক স্মৃতির ওপর যতটা ছাপ ফেলে, ফুটবল ততটা ছাপ ফেলে না এবং আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ বা দরিদ্র কোনোটাই করে না। আর এখানেই এর আকর্ষণ: এটি উত্তেজনায় ভরা কিন্তু তা অনেকটাই শূন্য বলা যায়। এ কারণেই বুদ্ধিমান বা বুদ্ধিহীন, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত–সবাই সমানভাবে ফুটবল উপভোগ করতে পারেন। লেখাটা এখনকার মতো এখানেই শেষ করি। রাজা চলে এসেছেন। দলগুলো মাঠে নেমেছে। বিশ্বকাপ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেল। খেলাও শুরু হতে চলেছে। আর লেখালেখি নয়। আসুন, আমরা আনন্দে অবগাহন করি। সূত্র: The Empty Pleasure by Mario Vargas Llosa