অষ্টাদশ পর্ব
ঢাকা তো একটা মফস্বল শহর বৈ নয়, ঢাকায় গিয়ে কোথায় বাসা পাওয়া যাবে, কেমন হবে থাকার ব্যবস্থা, এসব নিয়ে তারা যে আলোচনা করবেন এমন অবস্থাও রইল না। কারণ সবাই ছিলেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং অনেকেরই ঢাকার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক বলতে কিছুই ছিল না। কলকাতায় কিন্তু কেউ কেউ ভালো অবস্থাতেই ছিলেন। কারও ছিল ব্যবসায়, কারও পেশাগত প্রতিষ্ঠা, কেউ কেউ বসবাসের জন্য বাড়ি পর্যন্ত তৈরি করেছেন, আরেক অংশ তেমন সচ্ছল না হলেও গুছিয়ে বসেছিলেন। তারা কেউই এ চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলতে পারলেন না যে, তাদের উদ্বাস্তু হয়েই প্রস্থান করতে হবে। মুসলমানদের স্বতন্ত্র বাসস্থান বলতে অবিভক্ত ভারতের কোন কোন এলাকা বোঝাবে মুসলিম লীগের নেতারা সেটা কখনোই স্পষ্ট করে বলেননি, হতে পারে বলতে সাহসও পাননি। তবে একটা প্রচার তো ছিল, বিশেষ করে প্রভাবশালী আজাদ পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয় স্তম্ভের ওপরে যে মানচিত্রটা ছাপত, তদনুযায়ী, বাংলা ও আসামের পুরোটা নিয়েই গঠিত হবে পূর্ব বাংলা। তেমনটা না ঘটায় সার্বিকভাবে হতাশ হওয়ার কারণ ঘটেছিল অবশ্যই। দেশের স্বাধীনতা যে দেশের মানুষের জন্য এমন উল্লাসহীন হবে সেটা কে কবে ভেবেছিল!
এক কথায় বলতে গেলে, উদ্বাস্তুদশায় কলকাতা ছেড়ে যেতে হতে পারে এটা ছিল কল্পনাতীত। মধ্য-কলকাতার মার্কুইস লেনে নিজেদের বাড়িতে থাকতেন আমাদের এক আত্মীয়-পরিবার। ছুটির দিনে সেখানে অন্যরাও যেতেন, বেশ একটা আনন্দের ঘটনা ঘটত। বাড়িটা ছোটই ছিল, তবু নিজেদের তো। এখন তারা কোথায় গিয়ে পড়বেন এ দুর্ভাবনায় বাড়ির হাসিখুশি ভাবটা মিলিয়ে গেল। কলকাতা শহর ইতোমধ্যেই হিন্দু এলাকা-মুসলমান এলাকায় ভাগ হয়ে গিয়েছিল, হিন্দুপাড়ায় যে মুসলমানরা বংশানুক্রমে বসবাস করতেন দাঙ্গার ধাক্কায় তারা উৎপাটিত হয়ে পড়েছিলেন, দাঙ্গার পরে শান্ত অবস্থা দেখে যারা ফেরত গেছেন। কলকাতা ভারতের দখলে চলে যাবে দেখে তারা পড়লেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়। কারও কারও চেষ্টা দাঁড়াল বসতবাড়ি বিক্রি করে দিয়ে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার; সবাই সফল হলেন না, যারা হলেন তারাও দাম পেলেন না উপযুক্ত। ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দাদের সঙ্গে যারা বাড়ি বদলের ব্যবস্থা করতে পারলেন তারা মনে করলেন কপাল ভালো; আর যারা তখনো কলকাতা শহরে পাড়া-ছাড়া হয়ে পড়েছিলেন, তারা ভয় পাওয়া শুরু করলেন বসতবাড়িতে আর ফেরত যাওয়া হবে না ভেবে।
সবচেয়ে করুণ অবস্থাটা সৃষ্টি হলো কলকাতার উর্দুভাষী বাসিন্দাদের জন্য। আমরা নিজেরাও তেমন একটা ঘটনার সাক্ষী হয়ে গেলাম। খিদিরপুরে আমাদের বাসার যিনি বাড়িওয়ালা তাকে আমরা হাজি সাহেব বলতাম; তারা ওই শহরের অনেককালের বাসিন্দা, পাকিস্তান দাবির পক্ষে তাদের ভেতরে লড়কে লেঙ্গে মনোভাব সংক্রমিত হওয়ার কথা। হয়তো হয়েছিলও। এখন যখন পাকিস্তান একেবারে দোরগোড়ায় এসে হাজির হয়েছে, তখন তারা আবিষ্কার করলেন যে, তারা রয়ে যাবেন পাকিস্তানের বাইরে। তাদের আশা পরিণত হলো আতঙ্কে। আমরা ওই বাসা ছেড়ে চলে এলাম, কিন্তু বাড়িওয়ালাদের অবস্থাটা কেমন দাঁড়াল সেটা আর জানা হয়নি। তবে বেশ কয়েক বছর পরে আমার মেজো ভাই বলেছে, ঢাকায় সে হাজি সাহেবের একমাত্র নাতিকে দেখেছে ট্যাক্সি চালাতে। দূর থেকেই দেখেছে, কাছে গিয়ে বিড়ম্বিত করেনি। বেচারারা স্বপ্ন দেখেছিলেন পাকিস্তানের, আন্দোলনের মুখে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দাঙ্গায়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখলেন স্বাধীন পাকিস্তান চলে গেল তাদের নাগালের বাইরে।
২.
চিন্তাভাবনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আব্বা খবর আনলেন যে, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে যারা অপশন দেবেন পূর্ববঙ্গে তারা চাকরি পাবেন। আব্বা যে অপশন দেবেন সেটা ছিল নিশ্চিত। এর মধ্যে ঢাকায় যেসব আত্মীয়স্বজন ছিলেন তাদের কাছে আব্বার পত্রযোগাযোগ শুরু না করার কথা নয়। নিশ্চয়ই সেটা তিনি করেছিলেন। আগস্ট মাসের ১ কী ২ তারিখে আমরা রওনা হলাম ঢাকা অভিমুখে। নেওয়ার মতো খাট-পালঙ চেয়ার-টেবিল যা ছিল তা শিয়ালদহ রেলস্টেশনে ঢাকার উদ্দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল আগেই, আমরা রওনা হলাম একটি ট্যাক্সি ও একটি ট্রাকযোগে। ট্রাকে কাপড়-জামা থালাবাসনসহ অন্য যেসব জিনিসপত্র ছিল সেগুলো গুনে গুনে তোলা হলো; আব্বা লিস্ট করে রাখলেন। মালপত্রের ভেতর বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল বড় এক বস্তা চাল, এবং ছোট একটিতে ডাল। চাল-ডালের ওই সংগ্রহ সঙ্গে নেওয়াটা যে যথার্থ বিচক্ষণতার কাজ ছিল গন্তব্যে পৌঁছার পরে সেটা বুঝতে খুব একটা বিলম্ব ঘটেনি। শিয়ালদহ যাওয়ার পথে ট্রাকটি যাবে আগে আগে, পাহারাদারের মতো, পেছনে ট্যাক্সি–এই রকমের আয়োজন। ট্রাকের সামনে ছোট মামা বসলেন। তিনি তো যাবেনই, আর আমরা যাচ্ছি তো নানাবাড়িতেই। ড্রাইভারের পাশে তার আসন। মামার বাঁয়ে আমি। অন্যরা সবাই গাদাগাদি করে ট্যাক্সিতে। শঙ্কা ছিল পথে হামলা হতে পারে; রায়টের রেশ তো তখনো মুছে যায়নি। তেমন কিছু অবশ্য ঘটেনি। ভিড় ঠেলে ট্রেনে ওঠার পর আমার শুধু এটুকুই মনে আছে আমাদের কামরায় দু-তিনজন যাত্রী নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিলেন হিন্দুস্থান-পাকিস্তান নিয়ে নয়, তাদের ব্যবসার লাভ-লোকসান নিয়ে। কাপড়-জামা দেখে বোঝা যাচ্ছিল তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের; কলকাতায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন পণ্য বেচাকেনা উপলক্ষে। অনুপস্থিত একজন কোনো ফাঁকে তাদের চেয়ে বেশি মুনাফা করে ফেলেছে এটাই মনে হচ্ছিল তাদের জন্য বিশেষ রকমের দুশ্চিন্তার বিষয়; দেশ যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে সে ঘটনা তাদের মোটেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেনি। তারা যে নিরুদ্বিগ্ন তা নন, উদ্বেগ ব্যবসা নিয়ে।
ট্রেনে আব্বাকে অস্থির দেখিনি, তবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত যে ছিলেন সেটা নিশ্চিত। নতুন রাষ্ট্রে তাদের অফিস ঢাকায় বসবে, নাকি অন্যত্র; থাকার ব্যবস্থা কেমন ও কী ভাবে হবে, সন্তানদের পড়াশোনার হালটা কেমন দাড়াবে, এসব চিন্তা তো থাকবারই কথা; আশু চিন্তাটা ছিল ট্রেনের যাত্রা শেষে গোয়ালন্দের স্টিমারে সবার ঠিক মতো ওঠা নিয়ে। মালপত্র খোয়া যেতে পারে, সেগুলো বহন করার জন্য অদম্য উৎসাহী শ্রমিকরা টানাটানি শুরু করবে করুক; কিন্তু সেগুলো নিয়ে তারা যাতে অদৃশ্য না হয়ে যায় সেদিকে চোখ রাখা চাই। উদ্বেগের জন্য বিষয়ের কোনো অভাব ঘটার কথা নয়। তবে বড় একটা ভরসা ছোট মামা। তিনি তখন অবিবাহিত টগবগে যুবক, চাকরি করতেন রাইটার্স বিল্ডিং-এ, তার অফিস যে ঢাকাতেই থাকবে সেটা জানতে পেরেছেন, এবং আমরা যাচ্ছিও তাদের বাড়িতেই।
স্টিমারে ঠিকঠাক উঠে, এবং জায়গা করে নিয়ে আনন্দ না পেলেও সবাই স্বস্তি পেলেন। আয়োজনের অতসব ঘনঘটার ভেতরে হয়তো প্রথমবারের মতো পুরোপুরি স্বস্তি।
গঙ্গার ধারে ছিলাম, গঙ্গা এখন ভিন্নদেশের নদী, আমরা চলেছি আমাদের নিজেদের নদী পদ্মা দিয়ে। স্টিমারে ফার্স্ট সেকেন্ড ইন্টার থার্ড–এসব শ্রেণিবিভাজন ছিল, কিন্তু যাত্রীদের চলাফেরা দেখে মনে হচ্ছিল সবাই সমান হয়ে গেছেন। অভিন্ন নয়, ভিন্ন ভিন্ন ঘাটেই তারা নামবেন, গন্তব্য বিভিন্ন; কিন্তু সবার যাত্রা একই দিকে–স্বাধীনতা অভিমুখে, এরকমের একটা বোধ এগারো বছরের যে কিশোর তখন আমি, সেই কিশোরের মনে দোল খাচ্ছিল। বাইরে বাতাস, ওপরে খোলা আকাশ, স্টিমার চলেছে তর তর করে, রাতের অন্ধকার ভেঙে ফেলে, সার্চ লাইটের তীব্র আলো জ্বালিয়ে।
দোতলার প্রশস্ত ডেকের এক কোনে কে একজন আসর জমিয়ে বক্তৃতা করছিলেন। তার পরনে মস্ত এক আলখেল্লা, কালো কাপড়ের। মাথায় সুবিন্যস্ত পাগড়ি। হাতে বোধ করি একটি ছড়িও ছিল। মোটাতাজা চেহারা। ভাবলে এখন মনে হয় তিনি বক্তৃতা নয়, ওয়াজ করছিলেন। ছোট মামার অভিজ্ঞতা ছিল স্টিমার ভ্রমণের। স্টিমারে লোকটিকে তিনি আগেও দেখেছেন। মামা তাকে জানতেন পাথর ও তাবিজ বিক্রেতা হিসেবে। কিন্তু সে রাত্রে লোকটি যে অমন বাঙ্ময় হয়ে উঠেছিলেন সেটা তার পাথর ও তাবিজের অব্যর্থ গুণাবলি বর্ণনার জন্য নয়, বোঝা যাচ্ছিল তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রে ধর্মের চর্চা কতটা এবং কীভাবে হওয়া চাই সে বিষয়েই সবাইকে বিনামূল্যে জ্ঞান সরবরাহ করছেন। তার সুর, ভাষা, দেহভঙ্গি–কোনো কিছুই এই খবরটা জানাতে কুণ্ঠিত ছিল না যে, পাকিস্তান আসছে এই খোশ খবরে তিনি উদ্দীপ্ত। এখন বুঝতে পারি নতুন রাষ্ট্রে ধর্মের চর্চা যত বাড়বে তার ব্যবসা যে ততই লকলকিয়ে উঠবে, এই দিব্যজ্ঞানই ছিল তার ওয়াজের ওজস্বিতার অন্তর্নিহিত অনুপ্রেরণা। তার গলার আওয়াজ ওঠানামা করছিল, এবং তিনি উত্তেজিত ছিলেন। হতে পারে পাথর ও তাবিজের তুলনায় বড় কোনো ব্যবসার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছিলেন চোখের সামনে। চলবে...