বিশ্বকাপের নকআউট মানেই নতুন গল্প লেখার মঞ্চ। কখনো পরাশক্তির দাপট, কখনো আবার ছোট দলের বিস্ময়। এবার সেই মঞ্চে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফুটবলের দুই ভিন্ন জগৎ। এক পাশে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্য পাশে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেই ইতিহাস গড়া কেপ ভার্দে। শক্তির বিচারে এটি নিঃসন্দেহে ডেভিড-গোলিয়াথের লড়াই। কিন্তু ম্যাচ শুরুর আগেই এমন উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে যে, মনে হচ্ছে কেপ ভার্দে শুধু মেসির অটোগ্রাফ নিতে নয়, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চ্যালেঞ্জ জানাতেই এসেছে।
আগামীকাল শনিবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শেষ ৩২-এর এই মহারণে মুখোমুখি হবে দুই দল। জয়ী দল জায়গা করে নেবে শেষ ষোলোতে। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকবে অস্ট্রেলিয়া অথবা মিসর।
অভিষেক বিশ্বকাপেই কেপ ভার্দে ইতোমধ্যে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। গ্রুপ পর্বে স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরব; তিন প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই হার এড়িয়েছে তারা। মাত্র দুটি গোল হজম করে নকআউটে ওঠা আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি এখন বিশ্বাস করছে, সবচেয়ে বড় বিস্ময় এখনো বাকি।
সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা গেছে দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেসের কথাতেও। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নির্দ্বিধায় বলেছেন, ‘আমার বিশ্বাস, আমরা আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারাতে পারব। ছোট দেশ হিসেবে সবাইকে চমকে দেওয়াই আমাদের কাজ। আমরা জয়ের জন্যই মাঠে নামব।’
তবে জয়ের স্বপ্ন দেখলেও আর্জেন্টাইন অধিনায়ক মেসির প্রতি তাদের শ্রদ্ধার বিন্দুমাত্র কমতি নেই। ম্যাচের আগে কেপ ভার্দে ফুটবল ফেডারেশন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়কের হাতে তুলে দেবে একটি বিশেষ স্মারক জার্সি। নেভেসের ভাষায়, ‘মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা। তার বিপক্ষে খেলতে পারাটাই আমাদের জন্য গর্বের।’
কেপ ভার্দের সহকারী কোচ উমবেহতো বেতোঁকু বলেছেন, ‘আলবিসেলেস্তেদের মুখোমুখি হতে পারাই আনন্দের বিষয়। তবে পরিসংখ্যান কেবলই তত্ত্ব। ফুটবলে ইতিহাসের অসংখ্য ম্যাচের ফলাফল যেমন দেখিয়েছে, তেমনি প্রমাণ করে যে, মাঠের ভেতরে কী ঘটছে সেটাই আসল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে আমাদের সম্ভাবনা এক শতাংশ বলা হয়েছিল, এখন চার শতাংশ বলা হলেও সেটি আমাদের কাছে গুরুত্বহীন। আমরা অনেক বেশি মনোযোগী আমাদের লক্ষ্য, প্রত্যাশার দিকে।’
মেসিকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা মেসিকে এমন একজন খেলোয়াড় মনে করি, যিনি ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন। তবে আমরা সব সময় প্রতিপক্ষের দলগত পারফরম্যান্সের দিকেই নজর দেই- তারা কী ধরনের সমন্বয় তৈরি করতে পারে বা মেসির জন্য তারা কেমন ফাঁকা জায়গা বের করার চেষ্টা করতে পারে, সেটাই আমাদের ভাবনার বিষয়।’
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এসেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নের আত্মবিশ্বাস নিয়ে। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচেই জয় পেয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল।
টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যে ছয় গোল করে তুখোড় ফর্মে রয়েছেন লিওনেল মেসি। তার সঙ্গে আক্রমণে থাকবেন লাউতারো মার্তিনেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ। মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। চোট কাটিয়ে একাদশে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোরও।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি জানেন, নকআউটে অতীতের পরিসংখ্যান খুব একটা কাজে আসে না। ছোট একটি ভুলও শেষ করে দিতে পারে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন। তাই কেপ ভার্দেকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই বলেই মন্তব্য করেছেন তিনি।
আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দে ম্যাচ ঘিরে উৎসবের শহরে পরিণত হয়েছে মায়ামিও। লাতিন আমেরিকার মানুষের বড় বসতি হওয়ায় শহরটি অনেকটাই আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় ঘরের মতো। ইতোমধ্যে হাজার হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থক সেখানে পৌঁছে গেছেন। অনেকের হাতে টিকিট নেই, তবু প্রিয় দলকে ঘিরে উৎসবের অংশ হতে তারা হাজির হয়েছেন।
তবে গ্যালারির সমর্থন কিংবা পরিসংখ্যান; কোনোটিই কেপ ভার্দেকে ভয় দেখাচ্ছে না। রক্ষণে শৃঙ্খলা আর দলগত লড়াইয়ে ভর করে তারা আরও একটি রূপকথা লিখতে চায়। অন্যদিকে মেসিদের লক্ষ্য একটাই; শিরোপা ধরে রাখার পথে আরেকটি ধাপ পেরিয়ে যাওয়া।
কাগজে-কলমে এটি অসম এক লড়াই। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবার বলেছে, সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলো জন্ম নেয় এমন অসম লড়াই থেকেই। তাই মায়ামির রাতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই– চ্যাম্পিয়নরা কি নিজেদের রাজত্ব অটুট রাখবে, নাকি আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে লিখবে বিশ্বকাপের নতুন রূপকথা?