বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব যত এগোচ্ছে, ফুটবল যেন ততই তার আসল রূপে ধরা দিচ্ছে। কখনো কখনো শেষ মুহূর্তের গোলে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ, কখনো বা আবার কোনো দলের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন; কিংবা টাইব্রেকারের হৃদয়ভাঙার গল্প। রাউন্ড অব বত্রিশ শুরু হতেই এর সবই তো দেখা হয়ে গেল দর্শকদের।
ব্যক্তিগতভাবে বুধবারের তিনটি ম্যাচের কথা আমি কিছুতেই ভুলতে পারছি না। ইংল্যান্ডের রোমাঞ্চকর জয়, বেলজিয়ামের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, মেক্সিকোর আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স—প্রতিটি ম্যাচই ছিল আবেগ, উত্তেজনা আর বিস্ময়ের একেকটি অধ্যায়। এখন মনে হচ্ছে, বিশ্বকাপের প্রকৃত উন্মাদনা কেবল শুরু হলো। ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো ফলই নিশ্চিত নয়, সেটাও আরও একবার পলে পলে অনুভব করলাম আমরা।
গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর বিপক্ষে ইংল্যান্ড তো প্রায় হেরেই গিয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে দুই গোল করে ২-১-এ ম্যাচ জিতে নিল তারা। দুটি গোলই করেছেন হ্যারি কেইন। তিনি আসলে প্রমাণ করেছেন, কেন তিনি এই সময়ের অন্যতম সেরা গোলস্কোরার। কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসির কথা না বললেই নয়। রীতিমতো দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ম্যাচজুড়ে যে আক্রমণগুলো তিনি রুখেছেন, তাতে গোলরক্ষক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠাই পেয়ে গেলেন বলতে হবে। এর খানিক পরেই শুরু হয় সেনেগাল ও বেলজিয়াম ম্যাচ। সেনেগাল ২-০তে এগিয়ে যাওয়া পরও ৩-২-এ ম্যাচটা হারল। এর মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হলো ফুটবলে কোনো কিছুই অসম্ভব না। এখানেই আসলে ফুটবলের আসল আনন্দ। এ জন্যই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলা ফুটবল। আর এবারের বিশ্বকাপ তো বুঝিয়ে দিচ্ছে, দুনিয়া জুড়েই ফুটবলের উন্মাদনা কেবল বাড়ছে। ইকুয়েডরের বিপক্ষে মেক্সিকোর ২-০ গোলের জয় পাওয়া ম্যাচটাও বেশ ভালো ছিল। মেক্সিকোকে দেখে মনে হচ্ছে, এই দলটা অনেকদূর যাবে।
এই তিনটি ম্যাচে আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে- খেলোয়াড়দের ফিজিক্যাল ফিটনেস। কঙ্গোর বিপক্ষে অনেক সময় তো ইংল্যান্ডকে খুব ক্লান্তই মনে হয়েছে। ইংল্যান্ডকে নিয়ে নিজের একটা ভাবনা প্রকাশ না করে পারছি না। এখন পর্যন্ত একবারই তারা বিশ্বকাপ পেয়েছে- ১৯৬৬ সালে। ওই আসরটি বসেছিল ইংল্যান্ডেই। সেবার পরিকল্পনা করে বাজে ট্যাকল করে পেলের বিশ্বকাপ শেষ করে দেওয়া হয়েছিল। পেলে কাঁদতে কাঁদতে সেদিন মাঠ ছেড়েছিলেন। বলেছিলেন- ‘বিশ্ব ফুটবল নোংরা হয়ে গেছে, আমি আর এই ফুটবল খেলব না’। মাঝে মধ্যে মনে হয়, এই অভিশাপেই কি ইংল্যান্ডের এত কাল ধরে শিরোপা খরা কাটছে না? এবারের ইংল্যান্ড দলটা অবশ্য ভালো ছন্দ খুঁজে পেয়েছে বলব। ফলে ইংল্যান্ড অন্তত ফাইনালে খেললে অবাক হব না।
রাউন্ড অব বত্রিশ থেকেই নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির ছিটকে যাওয়াটা আমাকে খুব বেদনা দিয়েছে। ছিটকে যাওয়াদের মধ্যে জাপানের কথা আলাদা করে বলতে হয়। ব্রাজিলের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছে তাদের। তবে খুব লড়াকু ফুটবল উপহার দিয়েছে। আগামী বিশ্বকাপ পর্যন্ত তাদের এই লড়াকু মনোভাব মানুষ মনে রাখবে। এশিয়ান দেশ হিসেবে তাদের নিয়ে আমি গর্বিত।
আগামীকাল সকালের মধ্যেই শেষ ষোলোর সবগুলো ম্যাচের লাইনআপ চূড়ান্ত হয়ে যাবে। অর্থাৎ ৪৮ দলের বিশ্বকাপ নেমে আসবে ১৬ দলে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি হট-ফেবারিট দল ছিটকে গেছে। সামনে হয়তো এই তালিকা আরও লম্বা হবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই না, প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলো দ্রুত ছিটকে যাক। কারণ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স- এই সব দলগুলোর খেলা দেখেই তো আমাদের বেড়ে ওঠা।
দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এখন পর্যন্ত যে পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে এবারও তারা ফাইনাল খেলবে। তাদের সবচেয়ে বড় তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে তো গতবারের তুলনায় আরও বেশি পরিপক্ব এবং আরও বেশি গতিশীল মনে হচ্ছে।
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যে এবার আমি আর্জেন্টিনাকেই এগিয়ে রাখব। গতবার যে দল নিয়ে আর্জেন্টিনা শিরোপা জিতেছে, বলতে গেলে সেই দলটাকেই ধরে রেখেছে তারা। লিওনেল মেসি ৩৯ বছর বয়সেও মাঠে যেভাবে পারফর্ম করছে এবং তার নির্দেশনায় অন্যরা যেভাবে নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছে, তা দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। ব্রাজিল একটু পিছিয়ে। কারণ অতীতে তারা যে শৈল্পিক ফুটবল খেলত, সেই ছন্দটা এখন আর নেই তাদের। একসময় ব্রাজিলের ১১ জনের মধ্যে ১০ জনই থাকত সুপারস্টার। গত কয়েকটি বিশ্বকাপ ধরেই আমরা যার ব্যতিক্রম দেখতে পাচ্ছি। ফলে লাতিন আমেরিকার এই দুই দলের মধ্যে পাল্লাটা আর্জেন্টিনার দিকে বেশি ভারী বলে মনে হচ্ছে।
তবে মনে রাখতে হবে- ফুটবল শেষ পর্যন্ত গোলের খেলা। পরিসংখ্যান, ইতিহাস, র্যাঙ্কিং কিংবা ফেবারিটের তকমা— সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিতে পারে একটি গোল। যে দল নির্ধারিত দিনে নিজেদের সেরাটা খেলতে পারবে, সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারবে, জয়ের হাসিটাও শেষ পর্যন্ত তারাই হাসবে। আপাতত না হয় এই রোমাঞ্চেই আমরা ডুবে থাকি।
লেখক: জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার ও কোচ