ফুটবল মানেই আবেগ, আবার বিতর্কও। আবার ক্ষণিকের ভুল সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের গল্প। এতদিন এই ভুল-সিদ্ধান্তই ছিল খেলাটির অংশ। কিন্তু এখন সেই চিরচেনা ফুটবলে ঢুকে পড়েছে প্রযুক্তির তীক্ষ্ণ চোখ; ভিএআর (VAR)। চলমান বিশ্বকাপ ফুটবলে এটি শুধু একটি প্রযুক্তি নয় বরং ম্যাচের ফল বদলে দেওয়া এক শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশ্বকাপের এই আসরে ভিএআর নিয়ে আলোচনা এখন সবচেয়ে বেশি। কারও কাছে এটি ন্যায়ের রক্ষাকবচ, আবার কারও কাছে খেলার স্বাভাবিক গতি নষ্ট করার একটি মাধ্যম। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আধুনিক ফুটবলে এর প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ভিএআর বা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি হলো এমন একটি সিস্টেম, যেখানে মাঠের সিদ্ধান্ত যাচাই করতে ব্যবহার করা হয় একাধিক ক্যামেরা ও ভিডিও রিভিউ। ম্যাচ চলাকালে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত; যেমন গোল, পেনাল্টি, অফসাইড বা রেড কার্ড; সন্দেহজনক মনে হলে রেফারি ভিএআর রুমে থাকা সহকারীদের সাহায্য নেন।
ভিএআর মূলত চারটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে; গোল বৈধ কি না, পেনাল্টি সিদ্ধান্ত, সরাসরি রেড কার্ড, ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া হয়েছে কি না। ২০১৮ বিশ্বকাপে প্রথম চালু হওয়ার পর থেকে এটি ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে ধরা হয়।
চলমান বিশ্বকাপে ভিএআর আগের যেকোনো আসরের চেয়ে বেশি সক্রিয়। অনেক ম্যাচেই এটি সরাসরি ফল বদলে দিয়েছে। যেমন নকআউটের ম্যাচে জার্মানির সম্ভাব্য জয়সূচক গোল ভিএআর রিভিউয়ের পর বাতিল হয়ে যায় ফাউলের কারণে। সেই ম্যাচে পরে টাইব্রেকারে জয় পায় প্যারাগুয়ে।
আবার অন্য এক ম্যাচে বেলজিয়াম অতিরিক্ত সময়ে ভিএআর রিভিউয়ের মাধ্যমে পেনাল্টি পেয়ে যায় এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শেষ ষোলোতে উঠে যায় বেলজিকরা। কপাল পোড়ে আফ্রিকার দল সেনেগালের। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের এক ম্যাচে ভুল করে অন্য খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানো হয়, যা পরে ভিএআর প্রযুক্তি ধরে ফেলে এবং সংশোধন করা হয়।
সর্বশেষ পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচেও দেখা গেছে এমনটি। শেষ মুহূর্তে ২-২ গোলে সমতা এনেছিল ক্রোয়েশিয়া। উৎসবের আবহে তখন ক্রোয়াট শিবির। তবে ভিএআরে দেখা যায় সেটি ছিল অফসাইডে গোল। শেষ ষোলোতে উঠে যায় রোনালদোর পর্তুগাল, বাদ পড়ে লুকা মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়া। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, ভিএআর শুধু গোল বা অফসাইড নয়; খেলার ন্যায্যতা রক্ষায়ও বড় ভূমিকা রাখছে।
চলমান বিশ্বকাপকে ফিফা বলছে ‘সবচেয়ে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বকাপ’। এখানে শুধু ভিএআর নয়, ব্যবহার হচ্ছে এআই, স্মার্ট বল টেকনোলজি এবং থ্রি ডি প্লেয়ার ট্র্যাকিং। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে খেলোয়াড়দের ভার্চুয়াল মডেল তৈরি করা হচ্ছে, যা দর্শকদের বোঝাতে সাহায্য করছে কেন একটি অফসাইড বা ফাউল সিদ্ধান্ত দেওয়া হলো। অনেক সময় অতি সূক্ষ্ম মিলিমিটার ব্যবধানে অফসাইড ধরা পড়ছে, যা আগে মানবচোখে বোঝা প্রায় অসম্ভব ছিল।
এ ছাড়া বলের ভেতরে থাকা সেন্সর চিপ ব্যবহার করে ‘Connected Ball Technology’ সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল করছে। একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে বলের সঙ্গে কে কখন সংযোগ করেছে, সেটাও এখন ডেটা দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফিফার প্রযুক্তি অংশীদার প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, রেফারিদের হেডসেট ক্যামেরার মাধ্যমে দর্শকরাও এখন রেফারির দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পারছে; যা ফুটবলে এক নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
সবকিছুর পরেও ভিএআর নিয়ে বিতর্ক থেমে নেই। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি খেলার স্বাভাবিক গতি নষ্ট করছে। একটি সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে, ফলে স্টেডিয়ামে উত্তেজনা কমে যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, গোল হওয়ার পর খেলোয়াড়রা উদযাপন শুরু করলেও পরে ভিএআর রিভিউতে সেই গোল বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এতে খেলোয়াড় ও দর্শক; দুপক্ষই মানসিকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। এক বিশেষজ্ঞের মতে, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, অতিরিক্ত ব্যবহার খেলাকে যান্ত্রিক করে তুলতে পারে। ফুটবলের সৌন্দর্য হলো এর অনিশ্চয়তা, আর সেই অনিশ্চয়তা কমে গেলে খেলাটির আবেগও কমে যায়।
লাভ বেশি না ক্ষতি? সমর্থকদের বড় একটি অংশ মনে করে, ভিএআর ফুটবলকে আরও ন্যায্য করেছে। ভুল সিদ্ধান্ত অনেক কমেছে, বড় ম্যাচে অন্যায়ভাবে দল বাদ পড়ার ঘটনা আগের চেয়ে কম দেখা যাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে; ফুটবল কি এখন আর পুরোপুরি মানুষের খেলা? নাকি ধীরে ধীরে এটি প্রযুক্তিনির্ভর এক ডেটা গেমে পরিণত হচ্ছে? একজন কোচের ভাষায়, প্রযুক্তি রেফারিদের সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু খেলায় মানবিক আবেগ ও নিয়ন্ত্রণ এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চলমান বিশ্বকাপ এখন শুধু ২২ জন খেলোয়াড়ের লড়াই নয়। এটি মানুষ বনাম প্রযুক্তির এক সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব। ভিএআর একদিকে ভুল কমাচ্ছে, অন্যদিকে ফুটবলের আবেগে নতুন প্রশ্ন তুলছে। তবুও নিশ্চিতভাবে বলা যায়; ফুটবলের ভবিষ্যৎ আর আগের মতো নেই। প্রযুক্তি এখন শুধু সহায়ক নয় বরং খেলাটির সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান শক্তি। আর এই পরিবর্তনের মাঝেই বিশ্বকাপ লিখে চলেছে নতুন ইতিহাস।