চট্টগ্রাম শহরে এসে খানিকটা খোলা জায়গায় এক ঝোপঝাড়ের ভেতর একটি নকশাদার বা নকশা করা পোকার দেখা পাব, তা ভাবিনি। এ বছরের ৩ আষাঢ় সকালবেলা হাঁটতে গিয়ে চকবাজার এলাকায় হজরত ভোলা শাহ (র.) মাজার প্রাঙ্গণের ছোট পুকুরটার পাড়ে বুনোবেগুন কাকমাছি গাছের পাতায় পোকাটি দেখলাম।
পোকাটির ডানার রং ফ্যাকাশে লাল, এর মধ্যে কালো নকশাদার দাগ আছে। দাগগুলো দেখতে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি স্টার ওয়ার্সের ভিলেন ডার্থ মৌলের মুখের উল্কির মতো। সে কারণেই এ পোকার ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ডার্থ মৌল বাগ। দুই বঙ্গে এর কোনো বাংলা নাম খুঁজে পেলাম না। তাই ইংরেজি নামের সঙ্গে মিল বা তাৎপর্য বজায় রেখে এর বাংলা নামকরণ করা যেতে পারে ‘উল্কি গান্ধি’।
পোকাটি প্রকৃত গান্ধি বা বাগজাতীয় পোকা, যারা বীজ থেকে রস চুষে খায়। এ জন্য কোনো কোনো দেশে এটি বীজের গান্ধিপোকা নামেও পরিচিত। হেমিপ্টেরা বর্গের এ পোকাটির প্রজাতিগত নাম Spilostethus hospes ও গোত্র লাইগেইডি। এ পোকা মূলত এশিয়া, ওশেনিয়া ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়ায় কখনো কখনো এ পোকাকে মিল্কউইড বাগ বলা হয়। কেননা সে দেশে এরা মিল্কউইড গাছের বীজ থেকে দুধ চুষে খায়। তবে আমেরিকায় প্রায় একই রকম দেখতে আরেক প্রজাতির মিল্কউইড বাগ দেখা যায়, যাকে বলে বড় মিল্কউইড বাগ। সেটি ভিন্ন প্রজাতির, কিন্তু এ দুটি পোকাই এক গোত্রের ও খাওয়ার ধরন একই।
পোকাটি বেশ ছোট বা মাঝারি আকারের, তবে উজ্জ্বল রঙের কারণে সহজে চোখে পড়ে। এরা ১০ থেকে ১৩ মিলিমিটার লম্বা হয়। সামনের ডানা ও মাথার রং ফ্যাকাশে কমলা বা লাল। এদের পা ছয়টি, শুঁড় দুটি এবং চোখ দুটি কালো। চোখ দুটির ঠিক পেছনেই থাকে প্রায় ত্রিকোণাকৃতির দুটি কালো দাগ। সেই দাগ দুটির প্রান্তদ্বয় গ্রীবায় ত্রিকোণাকৃতি স্কুটেলামের ওপর যুক্ত করেছে আরেকটি ত্রিকোণ দাগ। ত্রিকোণাকৃতি স্কুটেলামের মতো চাকতিই অন্য সব পোকার মধ্য থেকে সব গান্ধিপোকাকে আলাদাভাবে চেনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তার নিচে দুপাশের দুটি ডানায় তেরছা করে আছে দুটি ফ্যাকাশে চওড়া ব্যান্ডের মতো কালো দাগ ও দুটি গাঢ় কালো ফোটা। ডানার পেছন অংশ কালো। পেটের তলে সব খণ্ডেই রয়েছে আড়াআড়ি কালো দাগ বা ডোরা চিহ্ন। চোখ বড় ও গোলাকার। এদের পিঠের লাল-কালো নকশা সম্ভবত শিকারিদের সতর্কবার্তা দেয় যে তারা বিষাক্ত। আর তাদের কাছে এলে শিকারিরা ধরাশায়ী হবে। তবে লিঙ্গ, পরিবেশ ও খাদ্য ইত্যাদি কারণে এদের নকশা ও রঙের কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।
এর শুঁড় চারটি খণ্ডাংশবিশিষ্ট। এদের মুখগহ্বরে একটি ছিদ্রকারী চঞ্চু থাকে, যা দিয়ে তারা উদ্ভিদের রস চুষে খায়। এরা সাধারণত বর্ধনশীল অপরিপক্ব বীজের দুধরস খেতে বেশি পছন্দ করে। এর ফলে বীজ পুষ্ট হতে পারে না, নষ্ট হয়ে যায়। এদের বিভিন্ন ঘাস, নটেশাক ও ডাঁটার বীজ থেকে এদের রস চুষে খেতে দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় কস্টিক ভাইন, রেড-হেডেড কটন বুশ, সোয়ান প্ল্যান্ট ইত্যাদি গাছ থেকে এদের রস চুষে খাওয়ার কথা জানা গেছে। এরা শুধু বীজ না–পাতা, কাণ্ড, ফল ইত্যাদি থেকেও রস চুষে খায়। এর ফলে সেসব গাছের জীবনীশক্তি ও উৎপাদনশীলতা কমে যায়।
মজার ব্যাপার হলো, এরা পাতায় বসে মিলনের জন্য সঙ্গীকে ডাকতে এক অদ্ভুত আচরণ করে, যা আমরা দেখতে পাই না। এরা পাতার মাধ্যমে কম্পন তৈরি করে নিজের প্রজাতির অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। মিলনের পর স্ত্রী পোকা পাতার ওপর গুচ্ছাকারে ডিম পাড়ে। তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।
বাচ্চাদের দেখতেও বড়দের মতো দেখায়, তবে ওদের ডানা ও জনন অঙ্গ থাকে না। বাচ্চা অবস্থায় ওরা তিন থেকে চার সপ্তাহ কাটায় এবং বড়দের মতোই গাছ, পাতা, ফলের রস খেয়ে বাঁচে। কয়েক দফায় খোলস বদলের পর ছানারা সাবালক হয়। প্রাপ্তবয়স্ক হলে ওদের খোলস শক্ত হয়, পাখা হয়, উড়তে পারে এবং প্রজননের জন্য সঙ্গীকে আহ্বান জানায়। প্রাপ্তবয়স্ক উল্কি গান্ধি ৩০ থেকে ৬০ দিন বাঁচে। তবে এদের জীবনে এক ট্র্যাজেডি আছে। প্রকৃতিতে পুরুষের চেয়ে মেয়ে পোকাই বেশি দেখা যায়। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা বেশ মজার এক তথ্য পেয়েছেন।
গবেষণায় তারা দেখেছেন, পোকাদের জগতে এই একটিমাত্র জনগোষ্ঠীর পোকার পুরুষদের হত্যা করে একটি এন্ডোসিমবায়োটিক বা অন্তঃমিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া। এ কারণেই মেয়ে পোকার সংখ্যা বেড়ে যায়। সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এদের বেশি দেখা যায়।