ফুটবল বিশ্বকাপের মূল পর্বে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ না করলেও দেশের মাটিতে এই মহাযজ্ঞের উন্মাদনা কম নয়। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও। ১১ জুন থেকে শুরু হ্ওয়া এ বিশ্বকপের জন্য দেদার বিক্রি হচ্ছে ফেবারিট দলগুলোর পতাকা ও জার্সি। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, টেলিভিশনের বিক্রি আশানুরূপ হচ্ছে না। তবে নতুন করে যোগ হয়েছে বড় পর্দা তথা প্রজেক্টরের ব্যবসা। অন্যদিকে অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে জার্সি ও পতাকা। এর পর্দা নামবে ১৯ জুলাই।
বেড়েছে পতাকা ও জার্সি বিক্রি
নগরীর বহদ্দারহাট, চকবাজার, ষোলশহর দুই নম্বর গেট এবং মুরাদপুর এলাকায় প্রতিদিন ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকা বিক্রি করেন ওসমান গণি। ফুটপাতে সারা বছর গার্মেন্টসের রিজেক্টেড কাপড় বিক্রেতা ওসমান খবরের কাগজকে জানান, ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই তিনি পতাকা বিক্রি শুরু করেছেন। তিনি মূলত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের জাতীয় পতাকা বেশি রাখেন। এই দুই দেশের পতাকার চাহিদাও বেশি। তবে এবার ইরানের জাতীয় পতাকাও রেখেছেন। বেশ কয়েকটি বিক্রিও করেছেন। এ ছাড়া অতীতে বিশ্বকাপজয়ী বেশ কয়েকটি দলের জাতীয় পতাকাও তিনি রেখেছেন। তবে সেসব দেশের পতাকার তেমন কাটতি নেই বলে জানান তিনি।
নগরীর এম এ আজিজ স্টেডিয়াম মার্কেটের বেশ কয়েকটি দোকানে জার্সি কিনতে আসা ক্রেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, মূলত ভালোবাসা এবং আবেগের কারণে তারা অন্য দেশের জার্সি ও পতাকা কিনছেন। দেশের প্রতি তাদের ভালোবাসার বিন্দুমাত্র কমতি নেই। ক্রেতাদের অভিযোগ, বিক্রেতারা সুযোগ নিচ্ছেন। মানুষের ভালোবাসা এবং আবেগকে জিম্মি করে জার্সি ও পতাকার বাড়তি দাম আদায় করছেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাড়তি দাম আদায়ের এই ঘটনা যেহেতু চার বছর পর একবার ঘটে। তাই প্রশাসনেরও এদিকে খুব একটা নজর থাকে না। দাম বেশি নিলেও তারা প্রিয় দলের জার্সি ও পতাকা কিনতে পিছপা হচ্ছেন না।
এম এ আজিজ মার্কেটের প্লেয়ার্স স্পোর্টসের স্বত্বাধিকারী মো. হাবিবুর রহমান খবরের কাগজকে জানান, বাংলাদেশের মানুষ খেলা অন্তঃপ্রাণ। ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ এলে মানুষের মাঝে উন্মাদনা আরও বেড়ে যায়। তখন তারা প্রিয় দলের জার্সি ও পতাকা কেনেন। এটি হলো ওই ফুটবল টিমের প্রতি ভালোবাসা। গত বছরের তুলনায় এবার জার্সি ও পতাকার বিক্রি বেড়েছে। ভক্তরা তাদের প্রিয় দলের জার্সি ও পতাকা কিনছেন। তবে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকা ও জার্সি। ৩০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দামের মধ্যে যেসব জার্সি রয়েছে তার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। খেলা শুরু হওয়ার পর জার্সি ও পতাকার চাহিদা আরও বেড়েছে। পতাকার দাম নির্ভর করে সাইজের ওপর। ১০০ টাকা থেকে শুরু। যত বড় হয়, দাম তত বাড়ে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার অনলাইনেও প্রচুর পরিমাণে জার্সি ও পতাকা বিক্রি হচ্ছে। তরুণ-তরুণী এবং শিক্ষার্থীরা জার্সি ও পতাকার সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এ ছাড়া ফুটবল বিক্রিও বেড়েছে।
আর্জেন্টিনার সমর্থক মোহাম্মদ হাসিব খবরের কাগজকে জানান, খেলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জার্সির দাম বেড়ে গেছে। তাই তিনি নগরীর কাজির দেউড়ি এলাকায় প্রিয় দল আর্জেন্টিনার জার্সি কিনতে গিয়েও না কিনে ফেরত এসেছেন। তিনি জানান, বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই তিনি জার্সির দাম দেখতে গিয়েছিলেন। যখন খেলা শুরু হবে তখন কিনবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু খেলার শুরুর দিন দোকানে গিয়ে তিনি হতভম্ব। প্রতি জার্সিতে দাম বেড়ে গেছে ২০০ টাকা। খেলা শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ আগেও একদম সাধারণ মানের জার্সির দাম ছিল ২৫০ টাকা। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকায়। আর ৪০০ টাকায় যেসব জার্সি বিক্রি হতো। তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা। ৬০০ টাকার জার্সি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি জার্সিতে দাম বেড়েছে ২০০ টাকা।
তুলনামূলক কমেছে টিভি বিক্রি
বাংলাদেশ ইলেকট্রনিকস বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইকরামুল হক পাটোয়ারী খবরের কাগজকে বলেন, অতীতে ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে টেলিভিশন বাজারে ব্যাপক চাঙাভাব দেখা যেত। সাধারণত বিশ্বকাপ শুরুর এক থেকে দেড় মাস আগে থেকেই টেলিভিশনের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেত। ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে যেমন বিশ্বকাপের উন্মাদনা থাকত, তেমনি নতুন টেলিভিশন কেনার আগ্রহও ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। বিশ্বকাপ শুরু হলেও বাজারে সেই প্রত্যাশিত ক্রেতাসমাগম ও বিক্রির গতি দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, টেলিভিশন ব্যবসা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বর্তমানে অনেক দর্শক মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটারের মাধ্যমে খেলা উপভোগ করছেন। পাশাপাশি পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে একসঙ্গে টেলিভিশনে খেলা দেখার সংস্কৃতিও আগের তুলনায় কমে এসেছে। তবে বড় পর্দা তথা প্রজেক্টরের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে।
ইকরামুল হক পাটোয়ারী আরও বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বাজারে প্রভাব ফেলছে। মানুষের ব্যয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় খরচের বাইরে অনেকেই নতুন টেলিভিশন কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছেন। তার ভাষায়, ‘মানুষের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকলে তারা অবশ্যই ব্যয় করত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ক্রেতারা অনেক বেশি সতর্ক।’
তিনি জানান, এসব কারণের সম্মিলিত প্রভাবে এবারের বিশ্বকাপ মৌসুমে টেলিভিশন বিক্রি অতীতের বিশ্বকাপগুলোর তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা এ খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
বেড়েছে প্রজেক্টরের ব্যবসা
দর্শকরা বড় পর্দায় খেলা দেখতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। শহর থেকে গ্রামে সর্বত্র এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন বেশ ভালোভাবেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। এলাকাভিত্তিক তরুণরা টাকা তুলে প্রজেক্টর ভাড়া করছেন। কেউ কেউ একেবারে কিনে ফেলছেন। যে কারণে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে প্রজেক্টরের চাহিদা বেড়েছে। তবে এই চাহিদার সুযোগও নিচ্ছেন অনেক বিক্রেতা। বাড়তি দাম আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নগরীর রিয়াজুদ্দিন বাজার আমতল সিডিএ মার্কেটের মুনিয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. মজিবুর রহমান খবরের কাগজকে জানান, বিশ্বকাপ উপলক্ষে তাদের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেড়েছে। কিশোর-যুবকরা দলবেঁধে এসে প্রজেক্টর কিনে নিয়ে যাচ্ছে ফুটবল খেলা দেখার জন্য। বিভিন্ন মান এবং দামের প্রজেক্টর রয়েছে। খুবই সাধারণ মানের প্রজেক্টরের দাম ৫ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা দামের প্রজেক্টরও তার কাছে আছে। পাইকারিতে দাম বাড়েনি। চাহিদা বাড়লেও তিনি দাম বাড়াননি বলে জানান।
আরও একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, প্রজেক্টরের চাহিদা বেড়েছে এ কথা সত্য। তবে খেলার ফিকশ্চার দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের মানুষের ঘুমের সময়ে খেলাগুলো পড়েছে। খেলা গভীর রাতে এবং ভোর না হয়ে দিনে কিংবা সন্ধ্যার পর হলে প্রজেক্টরের ব্যবসা আরও বেড়ে যেত। তবু তাদের ব্যবসা জমজমাট। তবে একথা সত্য, কেউ কেউ সুযোগ নিচ্ছে। অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।