ইউরো-বিশ্বকাপ-ইউরো। ২০০৮, ২০১০, ২০১২ সালে ঐতিহাসিক ট্রেবল জয় করে বিশ্ব ফুটবলে নতুন করে নিজেদের আগমনী বার্তা জানান দিয়েছিল স্পেন। কিন্তু ওই সাফল্যের ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে ধরে রাখতে পারেনি লা রোজারা। এরপর প্রতিটি বিশ্বকাপেই ফেবারিট হয়ে মিশনে আসে, কিন্তু ফিরতে হয় শূন্য হাতে। এবারের বিশ্বকাপেও রদ্রি, পেদ্রি, ইয়ামালরা হট ফেবারিট। গ্রুপ পর্বে তাদের পারফরমেন্স ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বগামী হয়েছে। এবার আসল জায়গা অর্থাৎ নকআউট রাউন্ডে নিজেদের মেলে ধরার পালা। এ লক্ষ্যে শেষ বত্রিশ রাউন্ডের ম্যাচে মাঠে নামছে স্পেন। এই মঞ্চে তাদের প্রতিপক্ষ ইউরোপের আরেক লড়াকু ও সমীহ জাগানিয়া দল অস্ট্রিয়া। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে ম্যাচটি শুরু হবে আজ (২ জুলাই) রাত ১টায়। এর মধ্য দিয়ে ১৯৭৮ সালের পর বিশ্বকাপে দীর্ঘ ৪৮ বছর পর মুখোমুখি হচ্ছে দেশ দুটি।
এবারের টুর্নামেন্টে স্পেন ভারসাম্যপূর্ণ ফুটবল খেলে চলেছে। ‘এইচ’ গ্রুপ পর্বে উরুগুয়েকে ১-০ ও সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে হারানোর পাশাপাশি কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র করে তারা গ্রুপ সেরা হয়। গ্রুপ পর্বের কোনো ম্যাচে গোল হজম করেনি তারা। অন্যদিকে রোমাঞ্চকর পথচলায় শেষ বত্রিশে জায়গা করে নিয়েছে রালফ রাংনিকের দল অস্ট্রিয়া। শেষ গ্রুপ ম্যাচে (জে গ্রুপ) আলজেরিয়ার বিপক্ষে নাটকীয় ৩-৩ ড্র করে তারা নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে। পুরো টুর্নামেন্টে তাদের রক্ষণ কিছুটা নড়বড়ে হলেও আক্রমণভাগ দারুণ ছন্দে আছে। স্পেনের ছোট ছোট পাসে নান্দনিক খেলার গুণমুগ্ধ ফুটবল দুনিয়া। আর প্রেসিংনির্ভর ফুটবলে বেশ সুনাম রয়েছে অস্ট্রিয়ার। যে কারণে ম্যাচটিকে বলা হচ্ছে পাসিংয়ের শিল্প বনাম প্রেসিংয়ের ঝড়। এ ক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো প্রেসিং বলতে বোঝায়, প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়ার জন্য তাদের ওপর ক্রমাগত শারীরিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করা।
স্পেন মানেই পায়ের জাদু, বল দখলের রাজত্ব আর ছন্দে ছন্দে আক্রমণ গড়া। ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষকে ঘিরে ফেলার শিল্পে তারা বিশ্বের অন্যতম সেরা। এবারের বিশ্বকাপেও লা রোজরা নিজেদের পরিচিত স্টাইলেই খেলছে। মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণে বৈচিত্র্য এবং রক্ষণে শৃঙ্খলা। সব মিলিয়ে তারা এই ম্যাচে স্বাভাবিকভাবেই ফেবারিট। তবে নকআউটের মঞ্চে ফেবারিট তকমা সব সময় নিরাপত্তা দেয় না। কারণ প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া। রালফ রাংনিকের অধীনে অস্ট্রিয়া এখন আর সাধারণ দল নয়। তাদের ফুটবলে আছে শৃঙ্খলা, আগ্রাসন এবং নিরলস প্রেসিং। প্রতিপক্ষকে সময় না দিয়ে ভুল করাতে বাধ্য করাই যেন তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে সিদ্ধহস্ত তারা।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াইটা হবে মাঝমাঠে। স্পেন চাইবে বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে। অন্যদিকে অস্ট্রিয়া চাইবে সেই নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিতে অবিরাম প্রেসিং দিয়ে। স্পেনের আক্রমণে চোখ থাকবে তারকা লামিনে ইয়ামালের ওপর। তরুণ এই বিস্ময় ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছেন, বড় মঞ্চের চাপ তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। তার সঙ্গে পেদ্রির সৃজনশীলতা এবং অধিনায়ক রদ্রির নিয়ন্ত্রণ স্পেনকে এনে দিতে পারে বড় সুবিধা। অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার ভরসা মার্সেল সাবিজার, কোনার্ড লাইমার ও অভিজ্ঞ মার্কো আরানুতোভিচ। মাঝমাঠে এদের ক্ষিপ্রতা স্পেনকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।
তবে কাগজে-কলমে স্পেন এগিয়ে থাকলেও নকআউট ফুটবলে কোনো সমীকরণই নিশ্চিত নয়। তাই ম্যাচের আগে দুই দলের কোচ ও অধিনায়করা বেশ সতর্ক, তবে আত্মবিশ্বাসীও। স্পেনের কোচ লুইস দ্য ফুয়েন্তে জানিয়েছেন, নকআউট পর্বে ছোট ভুলও বড় মূল্য দাবি করে। তার মতে, বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পাশাপাশি আক্রমণে আরও কার্যকর হতে হবে স্পেনকে। স্পেন কোচ বলেন, ‘আমরা ভালো ফুটবল খেলছি, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করছি। কিন্তু এখন সুযোগ কাজে লাগানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নকআউট ম্যাচে দ্বিতীয় সুযোগ থাকে না।’
স্পেন অধিনায়ক রদ্রিও সতীর্থদের সতর্ক করে বলেছেন, অস্ট্রিয়াকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই, ‘অস্ট্রিয়া খুবই সংগঠিত দল। তারা কঠিন প্রতিপক্ষ এবং কাউন্টার অ্যাটাকে ভয়ংকর হতে পারে। আমাদের ধৈর্য ধরে খেলতে হবে।’
অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিক বলেছেন, তার দল স্পেনকে যথেষ্ট সম্মান করলেও ভয় পাচ্ছে না। তিনি বিশ্বাস করেন, গোছানো ফুটবল খেলতে পারলে চমক দেখানো সম্ভব, ‘স্পেন বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। কিন্তু আমরা এখানে শুধু অংশ নিতে আসিনি। আমরা লড়াই করতে এসেছি। রাংনিক আরও বলেন, অস্ট্রিয়ার খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
অস্ট্রিয়ার অধিনায়ক মার্কো আরানুতোভিচ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলেছেন, তার দল আন্ডারডগ হিসেবে নামলেও লড়াইয়ের মানসিকতা নিয়েই মাঠে নামবে, ‘সবাই স্পেনকে ফেবারিট বলছে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ফুটবল সব সময় কাগজের হিসাব মানে না। আমরা লড়াই করতে প্রস্তুত।’
এখন দেখার বিষয়, স্পেন কি নিজেদের অভিজ্ঞতা ও কৌশল দিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করতে পারবে, নাকি রাংনিকের অস্ট্রিয়া আরেকটি অঘটনের জন্ম দেবে। সেই উত্তর আপাতত সময়ের হাতেই বন্দি।
মুখোমুখি
মোট ম্যাচ: ১৬টি
স্পেনের জয়: ৯টি
ড্র: ৩টি
অস্ট্রিয়ার জয়: ৪টি
গোল
স্পেন: ৩২
অস্ট্রিয়া: ২১
বিশ্বকাপে মুখোমুখি একবার
১১ জুন ১৯৭৮ সালে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে স্পেনকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল অস্ট্রিয়া।