সন্ধ্যা নামতেই যেন আরেক শহরে রূপ নেয় ময়মনসিংহ। বাসার জানালা-দরজা বন্ধ করেও স্বস্তি নেই। কয়েল, স্প্রে কিংবা বৈদ্যুতিক ব্যাট- কোনোটাই মশার দাপট থামাতে পারছে না। দিনেও রেহাই মিলছে না। মশার উৎপাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও। আর সেই চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে।
হাসপাতালের তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পাঁচজন ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন তিনজন। বর্তমানে আটজন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজন পুরুষ ও একটি শিশু। ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে হাসপাতালের ১৩, ১৪, ১৫ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে।
জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত মমেক হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১২৬ জন। এর মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে সংক্রমণ তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জুনে এসে পরিস্থিতির দৃশ্যপট বদলে গেছে। জানুয়ারিতে ভর্তি হন ২২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১ জন, মার্চে ১১ জন, এপ্রিলে ৯ জন ও মে মাসে ২০ জন। কিন্তু জুনেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩ জনে, যা ছয় মাসের মোট রোগীর প্রায় ৪২ শতাংশ। এ ছাড়া শুধু জুনেই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। ২০২৫ সালে মমেক হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ২ হাজার ৯৪৮ জন। প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৯ জন।
নগরজুড়ে মশার রাজত্ব
ময়মনসিংহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে একই অভিযোগ পাওয়া গেছে– মশার উপদ্রব এখন অসহনীয়। সন্ধ্যার পর শিশু, বৃদ্ধ কিংবা কর্মজীবী মানুষ কারও স্বস্তি নেই। শুধু বাসাবাড়ি নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, দোকানপাট- সব জায়গাতেই মশার উৎপাত বেড়েছে।
ভাটিকাশর এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সন্ধ্যার পর ঘরে বসে থাকাই কষ্টকর হয়ে যায়। কয়েল জ্বালাই, স্প্রে করি, তারপরও মশা কমে না। বাচ্চারা রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। সকালে স্কুলে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।’
কাঁচিঝুলি এলাকার গৃহিণী ফরিদা পারভীন বলেন, ‘ড্রেন আর আবর্জনার স্তূপ পরিষ্কার না হওয়ায় মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। ফগিং মেশিনে ওষুধ ছিটানো হলেও তেমন কোনো সুফল দেখা যায় না।’
হামিদ উদ্দিন রোডের বাসিন্দা জাহিদুর রহমান বলেন, ‘সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়াই কঠিন হয়ে যায়। ডেঙ্গুর ভয় এখন প্রতিটি পরিবারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।’
নগরবাসীর অভিযোগের বিপরীতে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের দাবি, নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ড্রেন পরিষ্কার, কাদা-ময়লা অপসারণ ও ঝোপঝাড় পরিষ্কারের কাজ চলমান রয়েছে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এইচ কে দেবনাথ বলেন, শুধু ফগিং মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটালেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাড়ির ছাদ, টব, ফুলের পাত্র বা আশেপাশে কোথাও যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রোকুনুজ্জামান রোকন বলেন, নাগরিকদের সচেতনতা ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশনের মশা নিধন কার্যক্রম চলছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মুহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্তরিকতার সঙ্গে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত রাখতে আমরা সার্বক্ষণিক কাজ করছি।
আজহার/অমিয়/