জন্ম থেকেই দুই পা নেই জান্নাতুল ফেরদৌসের। দুই হাতের ওপর ভর করেই চলতে হয় তাকে। তবুও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ছাড়েননি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার ১৯ বছর বয়সী এই তরুণী। দারিদ্র্য আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন কলেজে পড়াশোনা।
তবে প্রতিদিন প্রায় ৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কলেজে যাওয়া তার জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যাতায়াতে প্রতিদিন খরচ হয় প্রায় ১২০ টাকা, যা দিনমজুর বাবার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। ফলে মাসে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় দিন কলেজে যেতে পারেন জান্নাতুল। বাকি সময়টুকু কাটে ঘরের চার দেওয়ালে একা একা পড়াশোনা করে।
উল্লাপাড়া উপজেলার পূর্ণিমাগাঁতী ইউনিয়নের ভেংরি গ্রামের রাজমিস্ত্রীর সহকারী দরিদ্র পরিবারের সন্তান জান্নাতুল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ২০২৫ সালে ভেংরি দাখিল মাদ্রাসা থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৩ দশমিক ৫৬ অর্জনের পর বর্তমানে হামিদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের মানবিক বিভাগে পড়াশোনা করছেন। কিন্তু তার শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বড় বাধা এখন দারিদ্র্য।
সাহসী জান্নাতুল বলেন, ‘আমি দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে চলাফেরা করি। নিয়মিত কলেজে যেতে খুব কষ্ট হয়। বাবার পক্ষে প্রতিদিন যাতায়াতের খরচ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই অনেক ক্লাস করতে পারি না। যদি একটি তিন চাকার স্কুটি পেতাম, তাহলে প্রতিদিন কলেজে যেতে পারতাম। আমি শুধু পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। ভবিষ্যতে চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।’
মেয়ের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে চোখ ভিজে যায় মা সাহারা খাতুনের। তিনি বলেন, ‘মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে পারি না। অর্থের অভাবে ওর জন্য কিছুই করতে পারছি না। একজন মা হিসেবে এরচেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে!’
বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমি দিনমজুর মানুষ। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। মেয়েটা খুব মেধাবী। ওর ইচ্ছা অনেক বড়, কিন্তু অভাবের কাছে আমি অসহায়। যদি কেউ একটি স্কুটির ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে আমার মেয়েটা নিয়মিত কলেজে যেতে পারত এবং পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত।’
হামিদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘জান্নাতুল অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী একজন শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই তার শেখার আগ্রহ কমাতে পারেনি। কলেজের পক্ষ থেকে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছি।’
দ্য বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান ও পরিবেশকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, ‘এটি শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়, এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়। সবাই মিলে পাশে দাঁড়ালে জান্নাতুলের মতো আরও অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আলোকিত হবে।’
জান্নাতুলের গল্প শুধু একজন শিক্ষার্থীর সংগ্রামের গল্প নয়; এটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, সাহস আর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প। প্রতিদিন দুই হাতের ভরসায় এগিয়ে চলা এই তরুণী সমাজের কাছে খুব বেশি কিছু চান না- শুধু একটি তিন চাকার স্কুটি, যা তাকে নিয়মিত কলেজে পৌঁছে দেবে এবং উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।