গত বছর দেশে ডেঙ্গুর অন্যতম হটস্পটে পরিণত হয়েছিল বরগুনা। এক বছর পেরিয়ে গেলেও ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর চিত্রে তেমন পরিবর্তন আসেনি। শহরের বিভিন্ন ডোবা, ড্রেন ও আবর্জনার স্তূপ এখনো এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল হয়ে আছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, এ বছর আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম হলেও জুলাই-আগস্টকে সামনে রেখে উদ্বেগ রয়েছে।
বরগুনা শহরের প্রাণকেন্দ্র শহিদ স্মৃতি সড়কের পাশে গণপূর্ত বিভাগের একটি পরিত্যক্ত ডোবায় জমে থাকা দূষিত পানি ও আবর্জনার স্তূপে মশার উপদ্রব চোখে পড়ে। আশপাশে অন্তত ২৫টি পরিবার ও কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি কার্যালয় রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনেও ডোবাটি পরিষ্কার করা হয়নি।
সেখানে বসবাসকারী নিরালা বেগম জানান, গত বছর তাদের পরিবারের আট সদস্যের মধ্যে সাতজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। এরপর একাধিকবার জানানো হলেও গত এক বছরে পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা আর আসেননি।
২০২৫ সালে বরগুনা ছিল দেশের অন্যতম ডেঙ্গুর হটস্পট। সে সময় আইইডিসিআরের প্রতিনিধিদল পরিদর্শন শেষে ব্রেটো ইনডেক্স বেশি থাকা এলাকায় লার্ভার উৎস ধ্বংস, নিয়মিত ফগিং, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পানি সংরক্ষণে সতর্কতাসহ কয়েকটি সুপারিশ করে। তবে সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, এসব সুপারিশের অধিকাংশই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ২ হাজার ৯৩২ জন। ৩১ জুলাই সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৬০। শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্ত হন ১ হাজার ৯২৮ জন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ২২৮ জন। বর্তমানে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ২০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। শেষ এক দিনে নতুন আক্রান্ত হয়েছেন আটজন।
বরগুনা পৌর শহরের আমতলার পাড় এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, ‘পৌরসভার সরবরাহ করা পানি পুরোপুরি বিশুদ্ধ নয়। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করলেও সেই পানি ঢেকে রাখেন না।’
বরগুনা জেলা স্বাস্থ্য অধিকার যুব ফোরামের সদস্য জাহিদুল ইসলাম মেহেদী বলেন, ‘নাগরিকদের অসচেতনতার কারণেও ঝুঁকি বাড়ছে। যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা ও দূষিত পানি জমে থাকার প্রবণতা বন্ধ না হলে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হতে পারে।’
চর কলোনি এলাকার বাসিন্দা খান নাঈম বলেন, ‘আমার ছোট ভাই এইচএসসি পরীক্ষার ঠিক আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে পরিবার উদ্বিগ্ন।’
বরগুনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম রিপন বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) বরগুনা পৌরসভা পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির সহ-সমন্বয়ক রিপন মালী বলেন, ‘শুধু প্রশাসনিক ভবন বা কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ড্রেন, ডোবা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিবর্তন না এলে ঝুঁকি থেকেই যাবে।’
সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, স্বাস্থ্য বিভাগের তৎপরতা এবং মানুষের সচেতনতার কারণে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে জুলাই-আগস্টে সবাইকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।’
জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মাইকিং ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম।’