ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে চট্টগ্রাম নগরীর ৮টি ওয়ার্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ বা হটস্পট ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। সিভিল সার্জনের কার্যালয় জানিয়েছে, চলতি বছরে জেলায় ২৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। মারা গেছেন একজন। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কায় চিহ্নিত ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষ মশকনিধন কার্যক্রম, বিটিআই লার্ভিসাইড প্রয়োগ ও নিবিড় নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে চসিক।
নগরীর জালালাবাদ (২ নম্বর ওয়ার্ড), পাঁচলাইশ (৩ নম্বর ওয়ার্ড), উত্তর কাট্টলী (১০ নম্বর ওয়ার্ড), পশ্চিম বাকলিয়া (১৭ নম্বর ওয়ার্ড), দক্ষিণ বাকলিয়া (১৯ নম্বর ওয়ার্ড), পাথরঘাটা (৩৪ নম্বর ওয়ার্ড), দক্ষিণ হালিশহর (৩৯ নম্বর ওয়ার্ড) ও দক্ষিণ পতেঙ্গাকে (৪১ নম্বর ওয়ার্ড) ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড হিসেবে চিহ্নিত করেছে চসিক।
জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ২৯৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে নগরীর ১৮২ জন ও বিভিন্ন উপজেলায় ১১৬ জন। গত বছর একই সময়ে রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছিল ৪৪৫ জন। এদিকে গত বছর এই সময়ের মধ্যে (প্রথম ৬ মাসে) ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছিলেন দুজন। তবে চলতি বছরের ৬ মাসের মধ্যে জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেশি। এই মাসে জেলায় ১২২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে নগরীর ৭৪ জন ও উপজেলার ৪৮ জন।
গত বছর চট্টগ্রাম জেলায় পুরো বছর ৪ হাজার ৮৬৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ২৭ জন। তার আগের বছরগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও প্রাণহানির সংখ্যা ছিল আরও বেশি।
চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরীর মশকনিধন কর্মকাণ্ডের মান বৃদ্ধি করতে ৭ জন পরিদর্শক (মশক নিয়ন্ত্রণ) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে সকাল বেলা মশা নিধনকারী লার্ভিসাইড এবং বিকেলে এডাল্টিসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে। ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে বিজ্ঞানসম্মতভাবে শহরজুড়ে ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, চসিক স্বাস্থ্য বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কর্নার চালু করা হয়েছে। নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে শহরজুড়ে মাইকিং, তথ্যবহুল লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম চলছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি জানিয়েছেন, যেসব ডেঙ্গু পজিটিভ রোগী পাওয়া যাবে তাদের নমুনাগুলো আইইডিসিআরে পাঠাতে হবে। সে ক্ষেত্রে কোন ধরনের ভেরিয়েন্ট দিয়ে এবারের ডেঙ্গুসংক্রমিত হচ্ছে সে বিষয়ে একটা নির্দেশনা পাওয়া যাবে। তখন সেই ভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধে কী কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে ব্যাপারেও একটি নির্দেশনা পাওয়া যাবে।
এদিকে হাসপাতালের মেডিসিন ও শিশু ওয়ার্ডসহ অন্য ওয়ার্ডে আলাদা করে ডেঙ্গু কর্নার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ২০২৩ সালে। বছরটিতে মৃত্যুর হারও ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০২২ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫ হাজার ৪৪৫ জন, মারা যান ৪১ জন। কিন্তু ২০২৩ সালের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। সে সময় রোগটিতে ১৪ হাজার ৮৭ জন আক্রান্ত এবং মারা যান ১০৭ জন। তার পরের বছর ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৩২৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন এবং মারা যান ৪৫ জন। ২০২৫ সালে রোগটিতে ৪ হাজার ৮৬৪ জন আক্রান্ত হন এবং মারা গেছেন ২৭ জন।
নগরীর উত্তর আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, সন্ধ্যা হলেই ঘরের বেলকনির দরজা, জানালা দিয়ে মশারা দলবেঁধে ঘরে ঢোকে। বাচ্চা, বয়োজ্যেষ্ঠসহ সবার জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষাকালে মশার উৎপাত মারাত্মক হারে বেড়ে যায়। তাই আমরা আরও বেশি উদ্বিগ্ন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হতে আমরা কেউই চাই না। এটা মোকাবিলায় এখন থেকেই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরকে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।