ফুটবল সুন্দর। তবে কখনো কখনো বড্ড নিষ্ঠুরও। না হলে বিশ্বকাপের মঞ্চে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদ্রিচকে এভাবে মুখোমুখি দাঁড় করাবে কেন!
রাউন্ড অব বত্রিশের ম্যাচে বাংলাদেশ সময় শুক্রবার (৩ জুলাই) ভোরে মুখোমুখি হবে রোনালদোর পর্তুগাল ও মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়া। নকআউট ম্যাচ হওয়ায় যেকোনো একটি দল চলে যাবে পরের ধাপে। আর অন্য দলটির স্বপ্নযাত্রা থেমে যাবে এখানেই। বিদায় নিতে হবে এবারের আসর থেকে। অর্থাৎ রোনালদো বা মদ্রিচ, যেকোনো একজনকে টরন্টোতে হতে যাওয়া ম্যাচের মধ্য দিয়ে থামতে হবে। সেটি শুধু এবারের বিশ্বকাপের জন্যই নয়। দুজনের বয়সই চল্লিশ ছুঁয়েছে। অর্থাৎ তাদের এবারের থেমে যাওয়া মানে, বিশ্বকাপ মঞ্চ থেকে চিরকালীন বিদায়!
কিন্তু এমন এক বিদায় নির্ধারণ তাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে কেন? রোনালদো ও মদ্রিচ- একই প্রজন্মের দুই অবিশ্বাস্য প্রতিভার ফুটবলার। তবে তারা দুজন কখনোই একে অপরের চির প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে আবির্ভূত হননি। বরং ফুটবল অনুরাগীরা একটা লম্বা সময় তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলতে দেখেছে। স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে সতীর্থ ছিলেন রোনালদো ও মদ্রিচ। একসঙ্গে ২২৩টি ম্যাচ খেলেছেন তারা, চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা পেয়েছেন ৪ বার।
২০১২ থেকে ২০১৮ সাল, মোট ৬ মৌসুম রিয়াল মাদ্রিদে একই ড্রেসিংরুম ভাগ করেছেন দুজন। সেই সময় রিয়ালের সাফল্যে তাদের রসায়নই ছিল বড় অস্ত্র। মদ্রিচের সৃজনশীল পাস আর রোনালদোর নিখুঁত গোল করার ক্ষমতা- দুই মিলে গড়ে উঠেছিল এক দুর্ধর্ষ জুটি। যা নিখাদ ফুটবল অনুরাগীদের হৃদয় কেবলই মোহিত করে গেছে। মাঠের বাইরেও দুজনের সম্পর্ক ছিল দারুণ। সেই দুজনই এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি।
অবশ্য দীর্ঘদিন তারা সতীর্থ হিসেবে খেললেও আগেও মাঠে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নেমেছেন। মোট ১০ বার এমন হয়েছে। এর মধ্যে রোনালদো জিতেছেন ৬ ম্যাচে, মদ্রিচ ৩টিতে। আর একটি ম্যাচ হয়েছে ড্র। এবারের বিশ্বকাপ ম্যাচটিই হয়তো হবে তাদের দ্বৈরথের শেষ অধ্যায়।
রোনালদো ও মদ্রিচ- দুজনই নিজেদের দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অর্জনের প্রতীক। প্রথম জনের বয়স ৪১, পরের জনের ৪০। এই বয়সেও তারা দুজনই নিজ নিজ দলের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম। যদিও শুরুতে দুজনের খেলাতেই বয়সের ভার স্পষ্ট ছিল। পর্তুগাল তো গ্রুপ পর্বে কঙ্গোর বিপক্ষে পয়েন্ট হারিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করে। সেই ম্যাচে রোনালদো ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। তবে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে পরের ম্যাচে জোড়া গোল করে রোনালদো নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি ফিরে এসেছি’। এরপরও অবশ্য গ্রুপে নিজেদের শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার বিপক্ষে জয় তুলে নিতে পারেনি পর্তুগাল। ড্র হয় ম্যাচটি। ফলে ‘কে’ গ্রুপ থেকে রানার্সআপ হিসেবে তাদের দ্বিতীয় ধাপে পা রাখতে হয়েছে।
‘এল’ গ্রুপ থেকে ক্রোয়েশিয়াও গ্রুপ রানার্সআপ হয়েছে। তাদের বেশ কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপে প্রথম ম্যাচে দাঁড়াতেই পারেনি দলটি। এরপর পানামার বিপক্ষে কোনো মতে জয়। পরে ঘানাকে হারিয়ে নিশ্চিত করে নকআউট পর্ব। পানামার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল ক্রোয়েশিয়ার হয়ে মদ্রিচের ২০০তম ম্যাচ। রোনালদো তো আরও আগেই এই মাইলফলক ছুঁয়েছেন। মিডফিল্ডার হলেও ২০১ ম্যাচে মদ্রিচের গোল সংখ্যা ২৯টি। রোনালদো ২৩১ ম্যাচে করেছেন ১৪৫ গোল, যা ফুটবল ইতিহাসেই সর্বোচ্চ।
দুজনই আসলে নিজ নিজ দেশের ফুটবলের প্রতীক হয়ে ওঠা নাম। কখনো কখনো তাদের তারকাখ্যাতির নিচে ঢাকা পড়ে যায় দেশের পরিচয়ও। তারাই হয়ে উঠেন বড় বিজ্ঞাপন। কিন্তু একটা আক্ষেপ আবার দুজনেরই সঙ্গী। এত এত কিছুর পরও বিশ্বকাপ যে জেতা হয়নি। রোনালদো ২০১৬ সালে পর্তুগালকে ইউরো জেতালেও বিশ্বকাপে সেমিফাইনালের বেশি নিয়ে যেতে পারেননি। এবারের আসরে গোল করে বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করার অনন্য নজির গড়েছেন। কিন্তু একটা ট্রফি জিততে না পারলে এসব কৃতিত্বও তো ম্লান হয়ে যাবে।
মদ্রিচ টানা দুবার দলকে টেনে নিয়েছিলেন সেমিফাইনাল পর্যন্ত। সবশেষ আসরে সেমিফাইনালে থামতে হলেও ২০১৮ আসর শেষ করেছিলেন রানার্সআপ হিসেবে। অর্থাৎ দু-দুবার খুব কাছে গিয়েও পারেননি। ফলে এবার অন্তত না পারার আক্ষেপ ঘোচানোর লক্ষ্যেই উত্তর আমেরিকা পাড়ি দিয়েছেন।
সেই লক্ষ্যে আদতে কতদূর পাড়ি দিতে পারবেন মদ্রিচ? তার দল শেষ ষোলোতে যাওয়া মানে রোনালদোর বিদায়। আবার রোনালদোর শেষ ষোলোতে যাওয়া মানে মদ্রিচের বিদায়। আসলে ফুটবল ইতিহাসের দুই মহাতারকার মুখোমুখি লড়াই ঘিরে কঠিন এক বাস্তবতার সামনে ফুটবল অনুরাগীরা।