আকাশে চাঁদ থাকে একটিই, কিন্তু তারা থাকে অনেক। মেসি যদি ফুটবল আকাশের চাঁদ হয়ে থাকেন, তবে তো সেখানে আর কারও চাঁদ হওয়ার সুযোগ নেই। তাহলে এমবাপ্পের অবস্থান কোথায় থাকবে? তিনি তারা। যেভাবে খেলছেন, তাতে মেসির বিদায়ের পর আকাশের চাঁদ হয়তো এমবাপ্পেই হবেন! মেসি খেলছেন শেষ বিশ্বকাপ। এমবাপ্পে আছেন মধ্যগগনে।
বিশ্বকাপ ফুটবলে সবার নজর থাকে শিরোপার দিকে। শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলোকে নিয়ে সবার থাকে বাড়তি আকর্ষণ। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপের আবহ যেন অন্যরকম। সেখানে পরিবর্তনের আভাস। দলগত সাফল্য আড়ালে পড়ে যাচ্ছে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ঝলকানিতে। বিশ্বকাপের সবুজ গালিচায় মেসি হ্যাটট্রিক দিয়ে আসর শুরু করে সব আলো নিজের দিকে করে নিয়েছিলেন। পরে সেখানে ভাগ বসান নিজ নিজ প্রথম ম্যাচে দুটি করে গোল করে এমবাপ্পে-হালান্ড। এরপর সামনে চলে আসেন ত্রিরত্ন। ম্যাচ হয় আর তাদের নামের পাশে গোল লেখা হতে থাকে। একেকটি গোলও দৃষ্টিনন্দন। স্মৃতিপটে ধরে রাখার মতো। গোল্ডেন বলের লড়াইও জমে উঠেছে তাদের মাঝে। ছয় গোল করে মেসি-এমবাপ্পে সমানে সমান। এক গোল কম দিয়ে তাদের ঠিক পেছনেই হালান্ড। মেসি ষষ্ঠ, এমবাপ্পের তৃতীয় এবং হালান্ড প্রথম বিশ্বকাপ খেলছেন।
এই তিনজনের মাঝে আবার এগিয়ে মেসি-এমবাপ্পে। কারণ তারা রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়েই চলেছেন। রেকর্ড গড়ে নিজেদের নিয়ে যাচ্ছেন অনন্য উচ্চতায়। রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলায় শামিল হয়ে এখন তারা একে অপরকে স্পর্শ করছেন, আবার ছাড়িয়ে যাওয়ার মিশনেও নেমেছেন। এই লড়াইটা সামনে চলে এসেছে শেষ বত্রিশে সুইডেনের বিপক্ষে ফ্রান্সের জয়ে এমবাপ্পের দুরন্তপনায়। চোখ ধাঁধানো নৈপুণ্যের সঙ্গে ছিল মনে রাখার মতো দুটি গোল। আরেকটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়েছে। আবার কয়েকটি সুযোগ নষ্ট হয়েছে। ম্যাচে দুই গোল করেই এমবাপ্পে এবারের আসরে প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে চড়ে বসেছেন। যদিও সেখানে আগে থেকেই বসে আছেন ফুটবলের খুদে জাদুকর মেসি। দুজনেরই গোল ছয়টি করে। মেসি অবশ্য একটি ম্যাচ কম খেলেছেন। শেষ বত্রিশে মেসির এখনো মাঠে নামা হয়নি। কেপ ভার্দের বিপক্ষে সেই ম্যাচে মেসি গোল পেলে আবার এমবাপ্পেকে ছাড়িয়ে যাবেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এবারের বিশ্বকাপে মেসি-এমবাপ্পের গোলের লড়াই বেশ ভালোভাবেই জমে উঠবে। কে কাকে ছাড়িয়ে যান, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বিশ্বকাপ এলেই যেন এমবাপ্পেকে গোলের নেশায় পেয়ে বসে। গোলের নেশা তার এতটাই বেড়ে যায় যে, তাকে আটকে রাখাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। দুরন্ত গতি, ড্রিবলিং, ডজ, পাওয়ারফুল শট সবকিছুর সমন্বয় ঘটে তার মাঝে। ২০১৮ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে তিনি গোল করেন চারটি। দল হয় চ্যাম্পিয়ন। পরের আসরে আট গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে জিতে নেন গোল্ডেন বুট। কিন্তু আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও দলকে জেতাতে পারেননি ট্রফি। এবার তার যথারীতি গোলক্ষুধা বিদ্যমান। যারা তার বিপক্ষে খেলতে নামছে, তারাই টের পাচ্ছে! আসর শুরুই করেন সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে। তারপর শুরু করেছেন জোড়া গোলের নামতা পড়া। জোড়া গোল ছাড়া যেন তার বুটজোড়া কথাই বলছে না। চার ম্যাচ খেলে তিন ম্যাচে জোড়া গোলে তার মোট গোল ছয়টি। শুধু গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে তিনি গোল করতে পারেননি। ম্যাচটিতে জ্বলে উঠেছিলেন উসমান দেম্বেলে। তার হ্যাটট্রিকে ফ্রান্স জয়ী হয়েছিল ৪-১ গোলে।
এমবাপ্পের মাথায় কিন্তু তার জোড়া গোল কিংবা মেসির সঙ্গে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ের বিষয়টি তার মাথায় নেই। তার লক্ষ্য দলের জন্য কিছু একটা করা। শিরোপা আবার এনে দেওয়া। সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তার কথায় ফুটে উঠেছিল সে রকমই। ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই তার প্রধানতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ‘আমি জানি আমি কে, কীভাবে খেলি এবং আমার কী করা উচিত। এটা শুধু আমি নয়, আমাদের গোটা দলই জানে তাদের কী করতে হবে। ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলকে সামনে এগিয়ে যাওয়াই মূল লক্ষ্য।’ সুইডেনের বিপক্ষে জয়ের পর তিনি বলেন, ‘নতুন একটি প্রতিযোগিতা শুরু হলো। আমরা ভালো খেলেছি। সামনে আমাদের আরও ভালো করতে হবে।’
শেষ বত্রিশে সুইডেনের বিপক্ষে এমবাপ্পের জোড়া গোলের প্রদর্শনীতে এমবাপ্পে ছয় গোল করে শুধু মেসিকে স্পর্শই করেননি, মোট ১৮ গোল করে জার্মানির ক্লসাকে (১৭ গোল) ছাড়িয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে মেসির ঘাড়ে গরম নিশ্বাস ফেলেছেন। মেসির গোল সর্বোচ্চ ১৯টি। দুজনেই যেভাবে খেলছেন এবং তাদের দল যেভাবে একেকটি ম্যাচের প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করে চলেছে, তাতে করে চলতি আসরেই তাদের কাছ থেকে আরও একাধিক গোল দেখা যাবে। কে জানে তখন মেসিকে এমবাপ্পে ছাড়িয়ে যান কি না কিংবা মেসি নিজেকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান? মেসি যদি নিজেকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান, তবে তা হবে স্বল্প সময়ের জন্য। কারণ তিনি খেলছেন শেষ বিশ্বকাপ। এমবাপ্পে আছেন মধ্যগগনে। বয়স ২৭। ফর্ম ধরে রাখতে পারলে এবং ইনজুরি বাসা না বাঁধলে একাধিক বিশ্বকাপ খেলার হাতছানি তার সামনে। তখন তিনি শুধু মেসিকেই টপকাবেন না, সর্বোচ্চ গোলদাতার সংখ্যাটি অনেকেরই ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাবেন। যা শুধু দেখা যাবে, কিন্তু সহজে স্পর্শ করা যাবে না। ফ্রান্সের হয়ে ইতোমধ্যে তিনি এটি নিজের করে নিয়েছেন। তার বর্তমান গোল ৬১টি। তার পেছনে পড়ে আছেন অলিভার জিরো ৫৭ গোল ও থিয়েরি অরি ৫১ গোল করে। এমবাপ্পে যেভাবে নিজেকে গোল মেশিনে পরিণত করেছেন, তাতে করে জাতীয় দলের হয়েও তিনি গোল করায় নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।