বিশ্বকাপের মঞ্চে নকআউট মানেই ভুলের কোনো সুযোগ নেই। একটিমাত্র ভুল, এক মুহূর্তের অসাবধানতা–আর তাতেই শেষ হয়ে যেতে পারে তিলে তিলে গড়ে তোলা চার বছরের স্বপ্ন। এমনই এক কঠিন পরীক্ষায় শুক্রবার (৩ জুলাই) ভোর ৫টায় কানাডার টরন্টোর বিএমও স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। শেষ বত্রিশের এই মহারণে একদিকে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্নে বিভোর পর্তুগাল, অন্যদিকে ধারাবাহিক সাফল্যের ধারা ধরে রাখতে মরিয়া ক্রোয়েশিয়া।
গ্রুপ পর্বে খুব একটা দাপট দেখাতে পারেনি পর্তুগাল। গ্রুপ ‘কে’-তে রানার্সআপ হয়ে নকআউটে উঠেছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোররা। শুরুতেই কঙ্গোর সঙ্গে ১-১ ড্র করে হতাশ করেছিল রবার্তো মার্টিনেজের দল। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শক্তির জানান দেয় তারা। সেই ম্যাচে জোড়া গোল করেন রোনালদো। শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করলেও আক্রমণে ধার কম ছিল স্পষ্ট।
রানার্সআপ হওয়ায় নকআউটে তুলনামূলক কঠিন প্রতিপক্ষ পেয়েছে পর্তুগাল। সামনে ক্রোয়েশিয়ার বাধা। জিতলে পরের রাউন্ডে প্রতিপক্ষ হবে স্পেন-অস্ট্রিয়া ম্যাচের বিজয়ী সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে স্পেন। ফলে শুরু থেকেই পূর্ণ শক্তি নিয়ে নামতে হবে মার্টিনেজের শিষ্যদের।
ইতিহাস কিছুটা আশাবাদ জোগাচ্ছে পর্তুগালকে। ২০১৬ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের নকআউটে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়েই শিরোপা জয়ের পথে এগিয়েছিল তারা। এ ছাড়া সাম্প্রতিক আট ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে দলটি–পাঁচ জয় ও তিন ড্র। এই সময়ে মাত্র চার গোল হজম করেছে তারা। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া এখন বিশ্বকাপের অন্যতম নির্ভরযোগ্য দল। ২০১৮ সালে রানার্সআপ এবং ২০২২ সালে তৃতীয় হওয়া দলটি এবারও পথচলায় স্বপ্ন দেখছে আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে। যদিও শুরুটা সুখকর ছিল না তাদের। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ৪-২ গোলে হেরে তারা যাত্রা শুরু করেছিল।
কিন্তু এরপর দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায় জ্লাতকো দালিচের শিষ্যরা। পানামাকে ১-০ এবং ঘানাকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে। ঘানার বিপক্ষে অ্যাসিস্ট করে নতুন ইতিহাস গড়েন লুকা মদরিচ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে অ্যাসিস্ট করা খেলোয়াড় তিনি।
মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যান অবশ্য পর্তুগালের পক্ষে কথা বলছে। দুই দলের শেষ ১০ দেখায় সাতবার জিতেছে পর্তুগাল। শেষ ছয় প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের পাঁচটিতেও জয় পর্তুগিজদের। তারকার লড়াইও জমজমাট। একদিকে ৬টি টানা বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম খেলোয়াড় রোনালদো, অন্যদিকে মধ্যমাঠের জাদুকর লুকা মদরিচ। পর্তুগালের আক্রমণে রোনালদোর সঙ্গে থাকবেন ব্রুনো ফের্নান্দেস, ভিতিনহা ও হোয়াও নেভেস। রক্ষণে ভরসা রুবেন দিয়াজ। ক্রোয়েশিয়ার ভরসা অভিজ্ঞ মিডফিল্ড। মদরিচের সঙ্গে থাকবেন মাতেও কোভাসিস ও পিটার সুসিচ। দলটির রক্ষণভাগও যথেষ্ঠ শক্তিশালী।
ম্যাচে জয় নিয়ে উভয় দলের কোচ আশাবাদী। পর্তুগালের কোচ মার্টিনেজ বলেন, ‘গ্রুপ পর্বে আমরা সেরা খেলাটা খেলতে পারিনি। তবে দল উন্নতি করেছে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আমাদের সতর্ক হয়ে খেলতে হবে।’ দলের অধিনায়ক রোনালদো বলেন, ‘ক্রোয়েশিয়া কঠিন প্রতিপক্ষ। বড় মঞ্চে তারা নিজেদের প্রমাণ করেছে। দল হিসেবে খেলতে পারলে আমরা যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে পারি। আমাদের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন এখনো জীবন্ত।’
ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচ বলেন, ‘পর্তুগালের বিপক্ষে খেলতে হলে শতভাগের বেশি দিতে হবে। তাদের আছে রোনালদো। যখন তখন ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে। আমরা শুধু তাদের থামাতে চাইছি না, নিজেদের খেলাটাও খেলতে চাই।’ অধিনায়ক মদরিচ বলেন, ‘পর্তুগাল বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। তাদের দলে অসাধারণ কিছু খেলোয়াড় আছে। তবে আমরা তা নিয়ে চিন্তিত নই। ক্রোয়েশিয়া বারবার নিজেদের প্রমাণ করেছে। বড় ম্যাচ কিভাবে খেলতে তা আমরা জানি।’
সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি নকআউট ম্যাচ নয়; এটি অভিজ্ঞতা, কৌশল এবং মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা। পর্তুগালের আক্রমণশক্তি বনাম ক্রোয়েশিয়ার সংগঠিত ফুটবল–এই লড়াইয়ে সামান্য ভুলও হয়ে উঠতে পারে বিদায়ের কারণ। টরন্টোর রাত তাই সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের আরেকটি স্মরণীয় দ্বৈরথের।