১৯৯৮। ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সোনালি বছর। নিজেদের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের সেই অভিযানের নেপথ্যে ছিল জিনেদিন জিদানের জাদু। ছিল আরেকটি অদৃশ্য শক্তি– কোচ আইমে জাকে ও মাঠে তার বিশ্বস্ত সেনাপতি দিদিয়ের দেশমের অসাধারণ বোঝাপড়া। কোচের দর্শনকে মাঠে বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব ছিল দেশমের কাঁধে। সেই বিশ্বাসের সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে পৌঁছে দিয়েছিল বিশ্বচূড়ায়।
২৮ বছর পর, ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই গল্প আবারও ফিরে এসেছে। এবার কোচের আসনে দেশম, আর তার বিশ্বস্ত অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। মাঠের ভেতরে ও বাইরে তাদের সম্পর্ক, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং পুরো দলকে এক সুতোয় গেঁথে রাখার ক্ষমতা নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে ফরাসিদের। ফ্রান্সের বিশ্বকাপ অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে– এটি একটি বন্ধনের গল্পও।
সবশেষ রাউন্ড ৩২-এর ম্যাচে সুইডেনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে ফ্রান্স। জোড়া গোল করেছেন এমবাপ্পে। কিন্তু ম্যাচের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি ছিল গোলের পর। প্রথম গোল করার সঙ্গে সঙ্গেই এমবাপ্পে ছুটে যান টাচলাইনের দিকে। গিয়ে জড়িয়ে ধরেন দেশমকে, যিনি চার দিন আগে মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে দলে ফিরেছেন। এর পর একে একে দলের বাকি খেলোয়াড়রাও ছুটে এসে দেশমকে ঘিরে ধরেন। স্বতঃস্ফূর্ত সেই আলিঙ্গন ছিল কেবল গোল উদযাপন নয়; ছিল একাত্মতার প্রকাশ, ছিল একজন শোকাহত কোচের পাশে পুরো দলের নিঃশর্ত অবস্থান নেওয়ার প্রতীক।
এই দলটির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে তিনি ইতোমধ্যে ছয়টি গোল করেছেন, করিয়েছেন আরও দুটি। কিন্তু তার অবদান সংখ্যার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। তিনি প্রকাশ্যে কঠিন সময়ে সতীর্থ উসমান দেম্বেলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বারবার বলেছেন, ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি জয়। উচ্চকণ্ঠে বলেছেন, ‘আমি নিশ্চিত যে লিও (মেসি) আরও গোল করবেন। তাই এসব নিয়ে আমি খুব বেশি ভাবি না। আমার মনোযোগ বরং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষদের দিকে এবং আমাদের লক্ষ্য ফাইনাল।’
এমবাপ্পের এই বক্তব্যের পেছনে লুকিয়ে আছে লুসাইলের সেই দুঃসহ স্মৃতি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেও শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি ফ্রান্স। সেই ম্যাচ এমবাপ্পেকে শিখিয়েছিল– একজন খেলোয়াড় যত বড় তারকাই হোক না কেন, একা বিশ্বকাপ জেতা যায় না। চার বছর পর তাই তিনি শুধু গোল করার মিশনে নেই; পুরো দলকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের মিশনে নেমেছেন।
রিয়াল মাদ্রিদে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আচরণের অভিযোগ শুনতে হয়েছে এমবাপ্পেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ‘স্বৈরশাসক’ বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে মাদ্রিন ভক্তরা। সেটা যে কত বড় ভুল সেটাই বিশ্বকাপের প্রমাণ করছেন ফরাসি স্ট্রাইকার। সুইডেন ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে সহজ সুযোগ নষ্ট করার পর মাইকেল অলিসেকে তিনি আবারও খেলায় মনোযোগ দিতে উৎসাহ দেন। শুধু আক্রমণ নয়, রক্ষণেও আগের চেয়ে বেশি দায়িত্ব নিচ্ছেন ফরাসি অধিনায়ক।
দেশমও বারবার তুলে ধরছেন তার অধিনায়কের পরিবর্তিত রূপ, ‘কিলিয়ান জানে কীভাবে রক্ষণ করতে হয়। সে গোলও করে সবার চেয়ে বেশি। আমি প্রথম দিন থেকেই বলেছিলাম, সে একটি মিশনে আছে। যদিও সব সময় আমাকে এটা বলতে শোনো না... এমনকি ফিটনেস ড্রিলেও সে সবার আগে শেষ করত। অনেক আগেই আমি বলেছিলাম, অধিনায়কের ভূমিকা সে পুরোপুরি গ্রহণ করেছে। বাইরে থেকে মানুষ তাকে যেভাবে দেখে, সেটা খুব কম ক্ষেত্রেই তার প্রকৃত ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরে।’
বলাই যায়, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এমবাপ্পেকে যেন থামানোর কেউ নেই। বিপরীতে বিশ্বসেরা তারকার মর্যাদা উপভোগ করলেও তার পা রয়েছে মাটিতেই। ম্যাচ শেষে মাঠের ধারে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় সেটিই আবারও ফুটে উঠেছে, ‘আমি পুরোপুরি জানি সামনে কী আছে, আমি কোথায় আছি এবং আমাকে কী করতে হবে। দলও জানে এখানে আমাদের কী করতে হবে। একটি নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। শুরুটা কঠিন হলেও আজ আমরা ভালো খেলেছি।’
প্রিয় গুরু দেশমকে উৎসর্গ করা উদযাপন নিয়ে এমবাপ্পে বলেন, ‘এটাই এই দলের ডিএনএ। আমরা সবাই একসঙ্গে আছি। কোচ এমন একটি সময় পার করছেন, যা দুর্ভাগ্যবশত জীবনের কোনো না কোনো সময় সবারই আসে। এটা ভীষণ কঠিন। কিন্তু তিনি আমাদের সঙ্গে কখনোই একা থাকবেন না। আমরা তার পাশে থাকব।’ শেষ ষোলোর প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়েকে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নিজের স্বভাবসুলভ হাস্যরসও দেখিয়েছেন এমবাপ্পে, ‘প্যারাগুয়ে? এই মুহূর্তে আমার মনোযোগ শুধু এয়ার কন্ডিশনিং আর ড্রেসিং রুমে।’
সবশেষে দেশম যেন এক বাক্যেই এই ফ্রান্স দলের মানসিকতা তুলে ধরলেন, ‘ওরা একটি মিশনে আছে, আর আমিও ওদের সঙ্গে সেই মিশনে আছি।’ এক কথায়, ১৯৯৮ সালে জাকে ও দেশমের যে বিশ্বাসের বন্ধন ফ্রান্সকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিল, ২০২৬-এ দেশম ও এমবাপ্পের সম্পর্কেও ফুটে উঠছে সেই একই রসায়ন। পার্থক্য শুধু চরিত্রে; গল্পের মূল সুরটি একই– বিশ্বাস, নেতৃত্ব এবং দলকে একসঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার। এখন দেখার বিষয়, ’৯৮-র সেই বন্ধনের পুনর্জন্ম শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে আবারও বিশ্বকাপ ট্রফির কাছে পৌঁছে দিতে পারে কি না।