ঢাকা ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
সোনারগাঁয় ফুটপাত দখল করে পার্কিং করায় ১৪ জনের কারাদণ্ড মুক্তির আগেই বাজিমাত চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থীর বিষয়ে আদালতের রায় দেখে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন আত্মিক প্রশান্তি লাভের দারুণ উপায় ৫৪ বছরে প্রথমবার জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যে সরকার-বিরোধী দল: চিফ হুইপ তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশ যত দ্রুত চাইবে চীন সেভাবে কাজ করবে: রাষ্ট্রদূত ফরিদপুরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত অন্তত ২০ দ্বিতীয় বিয়ে করায় স্বামীকে হত্যা, স্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড ভার্চুয়াল শত্রুতার বলি আমার প্রিয় ঠিকানা হালদা নদীর সব মাছেই মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা বর্তমান কোচিং স্টাফ থাকলে দলে ফিরবেন না পেপে গুয়ে! ঢাবিতে ২৭৭ প্রজাতির ১৭ হাজারের বেশি গাছ আছে বর্ষাকালের ভাইরাল জ্বর বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ১ম পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র ফিনিক্স সামিটে দেশের সেরা জাককানইবি সাইবার সিকিউরিটি ক্লাব এক বছরের সাজা এড়াতে ৯ বছর পলাতক আসামি বরিশালের সাবেক ডিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে ঝাড়ু মিছিল ভূমিরূপ পরিবর্তন অধ্যায়ের ১৪টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ২য় পর্ব, এইচএসসির ভূগোল ১ম পত্র সন্তানের সবচেয়ে বড় যা প্রয়োজন রোনালদোর চেয়েও ছোট! পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে কে এই রহস্যময় রেফারি? ব্যাংককে আকিজ সিমেন্টের বিজনেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত সিলেটে ওসমানী হাসপাতালে ডিউটিরত ইন্টার্ন নার্সিং শিক্ষার্থীদের ওপর ওয়ার্ড বয়দের হামলা এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের চূড়ায় বাগ্‌দান, পরে গ্রেপ্তার দম্পতি রপ্তানি বাড়াতে পণ্যে বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে ঘাটাইল উপজেলায় কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ হাম উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ শিশুর মৃত্যু পেটের আলসারের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা বরিশালে নারী ব্যবসায়ীদের মারধর, ছাত্রদল নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল চুয়েটে স্নাতক প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের অরিয়েন্টেশন সম্পন্ন এ মাসেই ‘শিকার’ শুরু করছেন অপু বিশ্বাস

চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য রপ্তানি বাড়াতে পণ্যে বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম
রপ্তানি বাড়াতে পণ্যে বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে
আবু আহমেদ

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের মান বাড়াতে হবে। চীনের বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে হলে পণ্যের গুণগতমান, পণ্য বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববাণিজ্যে শীর্ষ এই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমানো যথেষ্ট কঠিন। বর্তমানে চীন ৯৮ শতাংশেরও বেশি বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। এই সুবিধার আওতায় চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, পাটজাত দ্রব্য, ফার্মাসিউটিক্যালস ও প্লাস্টিকপণ্য চীনে রপ্তানির পরিমাণ বহু গুণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।...

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বহুমুখী বাণিজ্য রয়েছে। তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি বেড়েই চলেছে। চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্যঘাটতি কমাতে হলে চীনে রপ্তানি বাড়াতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের মান বাড়াতে হবে। চীনের বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে হলে পণ্যের গুণগতমান, পণ্য বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববাণিজ্যে শীর্ষ এই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমানো যথেষ্ট কঠিন। বর্তমানে চীন ৯৮ শতাংশেরও বেশি বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। এই সুবিধার আওতায় চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, পাটজাত দ্রব্য, ফার্মাসিউটিক্যালস ও প্লাস্টিকপণ্য চীনে রপ্তানির পরিমাণ বহু গুণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করতে হবে। বিশেষ করে চামড়া, ফার্মাসিউটিক্যালস, সোলার প্যানেল এবং ইলেকট্রনিক্সের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যগুলোয় চীনা বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে উৎপাদিত পণ্য চীনে রপ্তানি করে ঘাটতি কমানো সম্ভব।

তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যবহৃত সুতা, কাপড়, রাসায়নিক পদার্থ, যন্ত্রাংশ ও যন্ত্রপাতির বড় অংশ আসে চীন থেকে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সড়ক, সেতু এবং অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পেও চীনা যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে চীন থেকে আমদানি ১৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

চীনে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি (আম, কাঁঠাল, জাম) কৃষি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ এবং আইসিটি সেবার রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশে কাঁচামাল, সেমি ফিনিশড ও ফিনিশড পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে। চীনের সঙ্গে আরও বেশি ম্যাচমেকিং, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ এবং প্রাদেশিক বাজারভিত্তিক রপ্তানি কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া চীনের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি এবং মানসম্পর্কিত বাধা দূর করতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। চীনের বাজারে আমাদের পণ্য বাড়ানোর উপায় স্বল্প মূল্যে অধিক মানসম্পন্ন মূল্যসংযোজনভিত্তিক পণ্য রপ্তানি করা।

দেশের সামস্টিক অর্থনীতির সূচকসহ রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী বিরাজমান কঠিন পরিস্থিতির কারণে ভীষণ চাপের মুখে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি-ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার জরুরি।

প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বাজেট উপস্থাপনের পর প্রথম কার্যদিবসে মূল্যসূচকের উল্লেখযোগ্য উত্থান হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম। পাশাপাশি বেড়েছে লেনদেনের গতি। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ১০০ পয়েন্টের ওপরে। লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি।

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তদারকির মান ক্রমাগতভাবে উন্নয়নের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারি আরও জোরদার করা দরকার। বাজেট বাস্তবায়নে উচ্চমূল্যস্ফীতি, কম কর-জিডিপি অনুপাত, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাজেটের আকার বড় হলে রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালঞ্জে হবে। বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহার এবং সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আলোকে বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসার পরিবেশ, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রভৃতি খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারবান্ধব কিছু উদ্যোগের পাশাপাশি করকাঠামোয় আনা পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে বাজেট-পরবর্তী বাজারে ক্রয়চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে বাজেটের পর প্রথম কার্যদিবসেই হয়েছে বড় উত্থান। আর্থিক খাতের ১৬টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে কমেছে পাঁচটির এবং দুটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এ ছাড়া বিমা খাতের ৪৭টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে দাম কমেছে আটটির এবং তিনটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩৫৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। তার আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ১ হাজার ২৩৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। লেনদেন বেড়েছে ১১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বাজেটঘাটতি মেটাতে স্থানীয় ব্যাংকব্যবস্থার পরিবর্তে যথাসম্ভব সুলভ সুদে ও সতর্কতার সঙ্গে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের জন্য নজর দেওয়া যেতে পারে।

পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক ও আস্থাভিত্তিক করতে মূলধন সংগ্রহ সহজীকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা যায়। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। শিল্প, অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং সম্ভাবনাময় ব্যবসা শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করলে আর্থিক খাতের ওপর চাপ বাড়ে। তাই পুঁজিবাজারকে গভীর, বহুমাত্রিক, স্বচ্ছ ও আস্থাভিত্তিক করে উৎপাদনশীল খাত ও সম্ভাবনাময় কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা হবে। ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলো কেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হয় না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত ব্যয়, একই ধরনের কাগজপত্র বারবার দাখিল এবং অনুমোদন ও পরিপালনসংক্রান্ত অস্পষ্টতা ধাপে ধাপে কমানো হবে বলে জানা যায়। বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা অক্ষুণ্ন রেখে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড আরও স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত এবং প্রবৃদ্ধিশীল কোম্পানির জন্য সহায়ক হবে।

দেশি কোম্পানির জন্য আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তের সুযোগ এবং বাছাইকৃত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। অনাবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ সহজ করতে এনআইটিএ হিসাব খোলা ও পরিচালনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে। বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, শেয়ার মূল্যায়ন, ক্রেডিট রেটিং, আইপিও ব্যবস্থাপনা ও রিসার্চ রিপোর্টের মান উন্নত করা হবে। লেনদেনের পর শেয়ার ও অর্থ হস্তান্তর দ্রুত নিরাপদ করতে সেটেলমেন্টের সময় ধাপে ধাপে কমানো হবে। এ কথাও উল্লেখ আছে, পুঁজিবাজারসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত নিষ্পত্তি আদালত গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে, যার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আইনি ক্ষমতা থাকবে। এতে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে এবং বাজারে শৃঙ্খলা শক্তিশালী হবে। এসব উদ্যোগ পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ, অবকাঠামো অর্থায়ন, সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করবে, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, আইসিবি

চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য রপ্তানি বাড়াতে পণ্যে বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম
রপ্তানি বাড়াতে পণ্যে বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে
আবু আহমেদ

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের মান বাড়াতে হবে। চীনের বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে হলে পণ্যের গুণগতমান, পণ্য বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববাণিজ্যে শীর্ষ এই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমানো যথেষ্ট কঠিন। বর্তমানে চীন ৯৮ শতাংশেরও বেশি বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। এই সুবিধার আওতায় চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, পাটজাত দ্রব্য, ফার্মাসিউটিক্যালস ও প্লাস্টিকপণ্য চীনে রপ্তানির পরিমাণ বহু গুণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।...

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বহুমুখী বাণিজ্য রয়েছে। তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি বেড়েই চলেছে। চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্যঘাটতি কমাতে হলে চীনে রপ্তানি বাড়াতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের মান বাড়াতে হবে। চীনের বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে হলে পণ্যের গুণগতমান, পণ্য বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববাণিজ্যে শীর্ষ এই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমানো যথেষ্ট কঠিন। বর্তমানে চীন ৯৮ শতাংশেরও বেশি বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। এই সুবিধার আওতায় চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, পাটজাত দ্রব্য, ফার্মাসিউটিক্যালস ও প্লাস্টিকপণ্য চীনে রপ্তানির পরিমাণ বহু গুণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করতে হবে। বিশেষ করে চামড়া, ফার্মাসিউটিক্যালস, সোলার প্যানেল এবং ইলেকট্রনিক্সের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যগুলোয় চীনা বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে উৎপাদিত পণ্য চীনে রপ্তানি করে ঘাটতি কমানো সম্ভব।

তৈরি পোশাকশিল্পে ব্যবহৃত সুতা, কাপড়, রাসায়নিক পদার্থ, যন্ত্রাংশ ও যন্ত্রপাতির বড় অংশ আসে চীন থেকে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সড়ক, সেতু এবং অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পেও চীনা যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে চীন থেকে আমদানি ১৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

চীনে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি (আম, কাঁঠাল, জাম) কৃষি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ এবং আইসিটি সেবার রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশে কাঁচামাল, সেমি ফিনিশড ও ফিনিশড পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে। চীনের সঙ্গে আরও বেশি ম্যাচমেকিং, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ এবং প্রাদেশিক বাজারভিত্তিক রপ্তানি কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া চীনের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি এবং মানসম্পর্কিত বাধা দূর করতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। চীনের বাজারে আমাদের পণ্য বাড়ানোর উপায় স্বল্প মূল্যে অধিক মানসম্পন্ন মূল্যসংযোজনভিত্তিক পণ্য রপ্তানি করা।

দেশের সামস্টিক অর্থনীতির সূচকসহ রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী বিরাজমান কঠিন পরিস্থিতির কারণে ভীষণ চাপের মুখে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি-ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার জরুরি।

প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বাজেট উপস্থাপনের পর প্রথম কার্যদিবসে মূল্যসূচকের উল্লেখযোগ্য উত্থান হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম। পাশাপাশি বেড়েছে লেনদেনের গতি। দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ১০০ পয়েন্টের ওপরে। লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি।

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তদারকির মান ক্রমাগতভাবে উন্নয়নের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারি আরও জোরদার করা দরকার। বাজেট বাস্তবায়নে উচ্চমূল্যস্ফীতি, কম কর-জিডিপি অনুপাত, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাজেটের আকার বড় হলে রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালঞ্জে হবে। বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহার এবং সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আলোকে বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসার পরিবেশ, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রভৃতি খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারবান্ধব কিছু উদ্যোগের পাশাপাশি করকাঠামোয় আনা পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে বাজেট-পরবর্তী বাজারে ক্রয়চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে বাজেটের পর প্রথম কার্যদিবসেই হয়েছে বড় উত্থান। আর্থিক খাতের ১৬টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে কমেছে পাঁচটির এবং দুটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এ ছাড়া বিমা খাতের ৪৭টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে দাম কমেছে আটটির এবং তিনটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩৫৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। তার আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ১ হাজার ২৩৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। লেনদেন বেড়েছে ১১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বাজেটঘাটতি মেটাতে স্থানীয় ব্যাংকব্যবস্থার পরিবর্তে যথাসম্ভব সুলভ সুদে ও সতর্কতার সঙ্গে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের জন্য নজর দেওয়া যেতে পারে।

পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক ও আস্থাভিত্তিক করতে মূলধন সংগ্রহ সহজীকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা যায়। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। শিল্প, অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং সম্ভাবনাময় ব্যবসা শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করলে আর্থিক খাতের ওপর চাপ বাড়ে। তাই পুঁজিবাজারকে গভীর, বহুমাত্রিক, স্বচ্ছ ও আস্থাভিত্তিক করে উৎপাদনশীল খাত ও সম্ভাবনাময় কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা হবে। ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলো কেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হয় না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত ব্যয়, একই ধরনের কাগজপত্র বারবার দাখিল এবং অনুমোদন ও পরিপালনসংক্রান্ত অস্পষ্টতা ধাপে ধাপে কমানো হবে বলে জানা যায়। বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা অক্ষুণ্ন রেখে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড আরও স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত এবং প্রবৃদ্ধিশীল কোম্পানির জন্য সহায়ক হবে।

দেশি কোম্পানির জন্য আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তের সুযোগ এবং বাছাইকৃত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। অনাবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ সহজ করতে এনআইটিএ হিসাব খোলা ও পরিচালনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে। বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, শেয়ার মূল্যায়ন, ক্রেডিট রেটিং, আইপিও ব্যবস্থাপনা ও রিসার্চ রিপোর্টের মান উন্নত করা হবে। লেনদেনের পর শেয়ার ও অর্থ হস্তান্তর দ্রুত নিরাপদ করতে সেটেলমেন্টের সময় ধাপে ধাপে কমানো হবে। এ কথাও উল্লেখ আছে, পুঁজিবাজারসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত নিষ্পত্তি আদালত গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে, যার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আইনি ক্ষমতা থাকবে। এতে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে এবং বাজারে শৃঙ্খলা শক্তিশালী হবে। এসব উদ্যোগ পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ, অবকাঠামো অর্থায়ন, সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করবে, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, আইসিবি

এল নিনো: জলবায়ুর অস্থিরতা ও বাংলাদেশের ঝুঁকি

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম
এল নিনো: জলবায়ুর অস্থিরতা ও বাংলাদেশের ঝুঁকি
আলম শাইন

প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তা না পারলে জলবায়ু ঘটনাগুলো আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই সেই চাপ হবে তীব্র। জলবায়ুর এ পরিবর্তনকে সামনে রেখে এখন থেকেই কার্যকর অভিযোজন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এর মূল্য আরও বেশি দিতে হবে।...

প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বৈশ্বিক জলবায়ুব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। এ পরিবর্তনকেই ‘এল নিনো’ বলা হয়। এটি কোনো একক অঞ্চলের নয়, বরং সমগ্র পৃথিবীর আবহাওয়াব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পর পর এ পরিস্থিতি দেখা দেয়। তবে এর তীব্রতা সব সময় একরকম থাকে না। কখনো তা স্বাভাবিক মাত্রায় সীমিত থাকে, আবার কখনো তা ‘সুপার এল নিনো’-তে রূপ নেয়। তখন বৈশ্বিক জলবায়ুকে মারাত্মক সংকটে ফেলে দেয়।

পৃথিবীর জলবায়ুব্যবস্থায় দুটি প্রাকৃতিক চক্র রয়েছে; একটি এল নিনো, অন্যটি এর বিপরীত অবস্থা লা নিনা। এই দুটি চক্র দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের কাছে পরিচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই দুটি চক্র বহুলভাবে আলোচিত হচ্ছে। কারণ এই চক্রের আচরণ এখন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ছে, বাতাসের প্রবাহ পরিবর্তিত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বৃষ্টিপাত, খরা, ঝড় ও তাপপ্রবাহের ওপর। ফলে এল নিনো এখন আর শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত একটি সংকেত।

এল নিনোর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নভাবে দেখা যায়। যেমন, দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশে অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়। অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তীব্র খরা নেমে আসে। আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদন কমে যায়। এতে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়। উত্তর আমেরিকায় শীত ও ঝড়ের ধরনেও পরিবর্তন আসে। এই বৈশ্বিক অস্থিরতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয় যে, পৃথিবীর এক প্রান্তে সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়লে তার ঢেউ অন্য প্রান্তেও গিয়ে আঘাত করে।

বাংলাদেশ এই বৈশ্বিক জলবায়ু চক্রের বাইরে নয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও নদীনির্ভর অর্থনীতির কারণে এর প্রভাব এখানে আরও সংবেদনশীল। এল নিনোর সময় বাংলাদেশে বর্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে। কোথাও বৃষ্টি কমে গিয়ে খরার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আবার কোথাও অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হয়। এতে স্থানীয়ভাবে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই অনিশ্চিত আবহাওয়া কৃষি পরিকল্পনাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। এর উৎপাদনের একটি বড় অংশ সময়মতো বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টি সময়মতো না হলে বীজতলা নষ্ট হয়, রোপণ পিছিয়ে যায়, ফলনও কমে আসে। শুধু ধান নয়, পাট, ভুট্টা ও ডালসহ প্রায় সব ফসলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষকের জীবনযাত্রা সরাসরি এর সঙ্গে জড়িত থাকায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর ব্যাপক চাপ পড়ে। বিশেষ করে উৎপাদন খরচ বাড়ে, কিন্তু আয় কমে যায়। ফলে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।

এল নিনোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এটি বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনে। গ্রীষ্মকাল আরও দীর্ঘ ও তীব্র হয়ে ওঠে। হিটওয়েভের সময়কাল বেড়ে যায়। জনস্বাস্থ্য গুরুতর হুমকির মুখে পড়ে। অত্যধিক গরমে শ্রমজীবী মানুষের কাজের সক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে কৃষক, নির্মাণশ্রমিক এবং রিকশা-ভ্যানচালকদের আয়-রোজগার সরাসরি প্রভাবিত হয়।

পানিসংকটও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। নদী-খাল শুকিয়ে যায়। অনেক এলাকায় খাবার পানির অভাব দেখা দেয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলায় এ সমস্যা আরও প্রকট হয়। একই সঙ্গে লবণাক্ততার বিস্তারও বাড়ে। এতে কৃষি ও পানীয় জলের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্বাস্থ্য খাতে এর প্রভাবও কম নয়। গরমজনিত অসুস্থতা বেড়ে যায়। ডিহাইড্রেশন ও হিটস্ট্রোকের ঘটনা বাড়ে। পানিবাহিত রোগও ছড়িয়ে পড়ে। তাতে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে এটি অর্থনৈতিক দিক থেকে রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনো ছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ঘটনা। সেই সময় বিশ্বের বহু দেশে আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। কোথাও অতিবৃষ্টি হয়েছিল। কোথাও তীব্র খরা নেমেছিল। আবার কোথাও অস্বাভাবিক ঝড় আঘাত করেছিল। সেই ধাক্কা শুধু প্রকৃতিতে নয়, অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কৃষি উৎপাদন কমে গিয়েছিল। খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছিল। বিভিন্ন দেশে মানবিকসংকট তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল।

পরবর্তীতে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোও ছিল ভয়ংকর। সেই সময় বৈশ্বিক তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁয়েছিল। অনেক দেশে দাবানলের ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। কৃষি উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। বাংলাদেশেও সে সময় আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। বিশেষ করে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ওঠানামায় তা স্পষ্ট ছিল।

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনোর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে এল নিনো কখন শুরু হবে তা বলা কঠিন হয়ে পড়ছে। কতটা শক্তিশালী হবে তাও অনিশ্চিত। কতদিন স্থায়ী হবে সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব বহুমাত্রিক। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ে। গ্রামীণ আয় কমে গেলে শহরমুখী অভিবাসন বাড়ে। এতে নগর ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। বস্তি সম্প্রসারণ হয়। কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দেয়। সামাজিক বৈষম্যও বাড়তে থাকে।

শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়াও একটি বড় সমস্যা। প্রচণ্ড গরমে মানুষের কাজের গতি কমে যায়। কাজের সময় কমে আসে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পরিবহন খাতেও এর প্রচণ্ড প্রভাব পড়ে।

এ বাস্তবতায় এল নিনোকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি এখন উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত একটি ঝুঁকির কারণ। তাই কৃষিব্যবস্থায় জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি। পানি সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। সেচব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে। আগাম আবহাওয়া পূর্বাভাসকে আরও কার্যকর করতে হবে।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সহযোগিতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশ একা এই ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারে না। সমুদ্রের উষ্ণতা, বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন এবং কার্বন নিঃসরণ–সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই বৈশ্বিক সমন্বয় ছাড়া এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলা করা কঠিন।

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিযোজন। প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তা না পারলে জলবায়ু ঘটনাগুলো আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই সেই চাপ হবে তীব্র। জলবায়ুর এ পরিবর্তনকে সামনে রেখে এখন থেকেই কার্যকর অভিযোজন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি গ্রহণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এর মূল্য আরও বেশি দিতে হবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও 
জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের তাৎপর্য

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:১১ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের তাৎপর্য
গাজীউল হাসান খান

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, লালমনিরহাট বিমানবন্দরের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, মোংলাবন্দর উন্নয়ন কিংবা অন্যান্য কাজে চীন সরকার অত্যন্ত তৎপর হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারেরও কর্মতৎপরতার পরিধি অনেক বেড়ে যাবে। উন্নয়ন ও উৎপাদনের পালে হাওয়া লাগবে বাংলাদেশে। নতুন প্রযুক্তি ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবে তারেক রহমানের সরকার। এই মুহূর্তে তারেক রহমানের দেশপ্রেমের রাজনীতি ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি নিয়ে কারও মনে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই।...

বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক এবং বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী ঘরানার মানুষের মধ্যে এখন সর্বত্রই একটি উৎসাহ ও উদ্দীপনার ভাব পরিলক্ষিত হতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে তরুণ রাজনীতিবিদ ও নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্যসমাপ্ত চীন সফরের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি যেন আবার এক কাঙ্ক্ষিত ছন্দে ফিরছে। আশা-নিরাশার দোলাচল কিংবা রাজনৈতিক ধোঁয়াশা কেটে যেন এক রক্তিম সূর্যোদয়ের প্রত্যাশিত ক্ষণ শুরু হয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, ভবিতব্য বাংলাদেশ এবং তার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এখন যেন ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও ঐতিহাসিকভাবে এক নতুন সঙ্গমস্থলের দিকে ঠেলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আগ পর্যন্ত দেশের জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক শক্তি অত্যন্ত সংশয়ের মধ্যে ছিল–শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবেন তারেক রহমান? বাংলাদেশ কী তার ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারবে? মুক্ত হতে পারবে আধিপত্যবাদের নিগড় থেকে? বাংলাদেশের আকাশ, জলসীমা ও ভূখণ্ড কী মুক্ত হতে পারবে ষড়যন্ত্রকারীদের আগ্রাসন এবং আধিপত্যের হাত থেকে? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় থেকেই দিগন্তে জমে ওঠা অবিশ্বাসের কালো মেঘ ক্রমে ক্রমে অপসারিত হতে শুরু করেছে। এখন তিস্তাসহ বাংলাদেশের অভিন্ন নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার এক অপর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের আদিগন্ত নীলাকাশ ও জলরাশি আর অরক্ষিত থাকবে না। এ দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি কিংবা সমৃদ্ধির জন্য রচিত হবে এক নতুন সম্ভাবনাময় মহাসড়ক। সে পথ ধরে একদিন সমাধান হতে পারে প্রতিবেশী মায়ানমারের সঙ্গে প্রায় সাড়ে চার দশক স্থায়ী বিতাড়িত রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের নিজ বাসভূমিতে ফিরে যাওয়া কিংবা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সমস্যা। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ও উন্নয়নের কৌশলগত মিত্র চীন এবং তার প্রবীণ ও বিচক্ষণ নেতা শি জিনপিং এবং বাংলাদেশের অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতা তারেক রহমানের মধ্যে যে বৃহত্তর সমঝোতা ও মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছে তা একদিন এ অঞ্চলের ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও সমৃদ্ধির গতিপথ বদলে দেবে বলে ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে।

চীনের বহুমুখী সাহায্য-সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনশীল খাতে রপ্তানি উন্নয়ন এলাকার অগ্রগতি দ্রুত এগোবে বলে ইতোমধ্যে একটি স্বচ্ছ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের পর পরই চীনের ১২টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে প্রায় সাড়ে নয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। মোংলা বন্দরকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। দীর্ঘদিন কোনো অপশক্তির কারণে ঝুলে থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনার আশ্বাসও দিয়েছেন চীনের নেতারা। এসব ব্যাপারে বাইরের দেশের হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না বলে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে চীন সরকার। তাতে বাংলাদেশের সমস্যাসংকুল সেচব্যবস্থা, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও নাব্য বৃদ্ধি এবং নদীভাঙন রোধ করার কাজ দ্রুত অগ্রসর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি স্বস্তির ভাব সৃষ্টি হয়েছে। আবার আলো ফুটেছে বাংলাদেশের অরক্ষিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। চীনের ২৪টি প্রস্তাবিত জে টেন সিই-মাল্টিরোল কমব্যাট জঙ্গিবিমান বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার শুভ সূচনা করবে। এর পাশাপাশি চীনের দ্রুততম ও বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি এবং কারখানা নির্মাণ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে বলে জনগণের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য আস্থার ভাব সৃষ্টি করেছে। অরক্ষিত না হলেও তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রতিরক্ষার দেশ বাংলাদেশে এখন তুরস্কের বিভিন্ন ড্রোনপ্রযুক্তি ও অস্ত্র নির্মাণের কর্মসূচি নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা যেতে পারে। শেখ হাসিনার বিগত দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে চরম হতাশা সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখন দ্রুত কেটে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন আর কোনো বহিঃশক্তির আধিপত্য চলবে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া, তাঁবেদারির রাজনীতি ও নতজানু কোনো নীতির অস্তিত্ব এই গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর ‘নতুন বাংলাদেশে’ খুঁজে পাওয়া এখন কঠিন হবে বলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তির বিশ্বাস।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এখন বহু কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে, যা তার সফরের আগ পর্যন্ত ধারণা করা যায়নি। তারেক রহমানের চীন সফর এক নতুন রাজনৈতিক দিগন্তের সূচনা করেছে। চীন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রস্তাবে এত দ্রুত এগিয়ে আসবে তা আগে অনুধাবন করা যায়নি। তা ছাড়া তারেক রহমান সাহেবের অন্তরে লালিত ধ্যান-ধারণা, কর্মপরিকল্পনা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা নিয়েও বিশেষ কারও কোনো স্বচ্ছ বা বদ্ধমূল ধারণা ছিল না। বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল, ক্ষমতায় দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য তারেক রহমান যে কারও দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। কিন্তু তার চীন সফরের পর সে ধারণা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক শক্তি আবার দ্রুত পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠছে। তারা তারেক রহমানের ভেতর শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়া ও পরলোকগত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছেন। সে কারণে তারা বিভিন্ন দ্বিধাদ্বন্দ্ব, দুর্নীতি, সংশয় ও মতবিরোধ কাটিয়ে দ্রুত শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাসনামলের মতো একটি অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছেন। এটি একটি অত্যন্ত শুভ লক্ষণ বলে বিবেচিত হচ্ছে এখন। ক্ষমতাসীন বিএনপি এ স্প্রিরিটটি ধরে রাখতে পারলে দেশ শাসনে তাদের কোনো সংশয় বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা উচিত হবে না। বিএনপির উচিত ক্রমবর্ধমান উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অগ্রাধিকারমূলক আর্থ-রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া। সাধারণ মানুষের মধ্যে ঝিমিয়ে পড়া দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা জাগিয়ে তোলা। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাদের হারাবার কিছু নেই। কারণ তাদের কাছে এখন একটি স্বাধীন বাংলাদেশ আছে। এ দেশকে সর্বতোভাবে রক্ষা করতে হবে। প্রাগঐতিহাসিক কাল থেকেই এ বাংলা কখনো কারও কোনো পরাভব মানেনি। বারবার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পতাকা উড়িয়েছে এবং সবসময় তাকে উড্ডীন রাখার সংগ্রামে নিঃসংকোচে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে গেছে।

ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রদারণের দিকে দৃষ্টি রেখে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশের মধ্যে যে অভিন্ন বাণিজ্য করিডর স্থাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন তা নিয়ে এখন সর্বত্রই খোলামেলাভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ করিডরের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সম্ভাবনা ও সমস্যা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কথাবার্তা হচ্ছে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ১২ লক্ষাধিক সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষের বাংলাদেশের বিতাড়ন নিয়ে। প্রস্তাবিত চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ বাণিজ্য করিডর বাস্তবায়ন যেমন বিভিন্ন বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মায়ানমারের সামরিক জান্তা, আরাকানের মুক্তিসংগ্রামীদের রাখাইন রাজ্য দখল ও সেখান থেকে বিভিন্ন সময়ে বিতাড়িত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়গুলো সমাধান করাও অত্যন্ত আবশ্যক। মায়ানমারের সামরিক জান্তার স্বার্থ রক্ষায় রাশিয়া, আমেরিকা ও ভারত সরকার অনেক কাজ করে থাকে। চীন সরকারও মায়ানমারের সামরিক জান্তা এবং সংগ্রামরত আরাকান আর্মির মধ্যে অনেক কাজ করেছে। কিন্তু জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ভারত মায়ানমারের বিরাজমান বিশাল সমস্যার আজও কোনো সমাধান দিতে পারেনি। একথা ঠিক যে, মায়ানমারের ওপর প্রতিবেশী চীনের প্রভাব অপরিসীম কিন্তু তারা এ ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রসর হতে পেরেছে তা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিতাড়নের বিষয়টি প্রায় সাড়ে চার দশক যাবৎ থেমে থেমে চলছে। কিন্তু আরাকান আর্মির (রাখাইন রাজ্য) বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও তা তাদের অর্থনীতিসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে সামনে এগোতে পারছে না। এখন চীনের ওপর এ বিশাল সমস্যা সমাধানের বিষয়টি অনেকখানি নির্ভর করছে। নতুবা চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিন থেকে মায়ানমারের মান্দালয় এবং এমনকি ইয়াংগুন হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর কিংবা রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত প্রস্তাবিত বাণিজ্য করিডর স্থাপন কতটুটু সম্ভব হবে? মায়ানমারের সামরিক জান্তা কিংবা আরাকান আর্মির সঙ্গে কথাবার্তা না বলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিশ্চয়ই বাণিজ্য করিডর স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে এতদূর এগোননি। কারণ বিবাদমান জান্তা ও মুক্তিগামী আরাকান আর্মিকে এ প্রস্তাবিত করিডরে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ তার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে যা করণীয় আছে তা সার্বিক ও আন্তরিকভাবে করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

চীনকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা কিংবা মিরসরাই রপ্তানি উন্নয়ন এলাকায় উৎপাদন কার্যক্রমের জন্য যে এলাকা বা জমি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে উন্নয়নের কাজ খুব শিগগিরই শুরু হচ্ছে। তাতে আশা করা যায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, লালমনিরহাট বিমানবন্দরের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, মোংলাবন্দর উন্নয়ন কিংবা অন্যান্য কাজে চীন সরকার অত্যন্ত তৎপর হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারেরও কর্মতৎপরতার পরিধি অনেক বেড়ে যাবে। উন্নয়ন ও উৎপাদনের পালে হাওয়া লাগবে বাংলাদেশে। নতুন প্রযুক্তি ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করবে তারেক রহমানের সরকার। এই মুহূর্তে তারেক রহমানের দেশপ্রেমের রাজনীতি ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি নিয়ে কারও মনে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। তার নেতৃত্বের প্রতি বর্তমানে যে আস্থা ও বিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে তাতে তারেক রহমানের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে আর কোনো বাধা রইল না। তার প্রতি জনগণের রাজনৈতিক সমর্থন আরও শক্তিশালী হলো।

লেখক: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। 
একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা 
[email protected]

রাজস্ব আদায়ের বাস্তবভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ জরুরি

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম
আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
রাজস্ব আদায়ের বাস্তবভিত্তিক টার্গেট নির্ধারণ জরুরি
মো. হেলাল উদ্দিন

সমুদয় রাজস্ব আয় চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ে। উন্নয়ন যতটুকু হচ্ছে তা দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্নভাবে ধারকর্জ করে। এ কারণে প্রতি বছর রাজস্বের একটা বিরাট অংশ চলে যায় ঋণের সুদ গুনতে। এ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে বিরাট আকারের কথিত টার্গেট কমিয়ে আনতে পারে।...

দেশ পরিচালনা এবং জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে কর আদায় আবশ্যক। এই কর সাধারণত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আহরণ করে থাকে। এবারের বাজেটে কর আদায়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আদায় করবে ৬ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অবশিষ্ট টাকা আসবে নন-এনবিআর আর নন-ট্যাক্স রেভিনিউ থেকে।

বিগত অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু এ পর্যন্ত ৪ লাখ কোটি টাকাও আদায় করা সম্ভব হয়নি। এ বছরের রাজস্ব আদায়ের জন্য যে টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে তার পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। অথচ কীভাবে, অর্থাৎ কোন জাদুবলে এ টার্গেট অর্জন করা হবে, তা বোধ্যগম্য নয়।

গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলাম একজন ব্যবসায়ী ও ব্যবসাবান্ধব অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার জন্য। এর আগেও একজন ব্যবসায়ীকে অর্থমন্ত্রী করা হয়েছিল। কিন্তু জাতির অত্যন্ত দুর্ভাগ্য তিনি কোনো প্রকার ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন করতে পারেননি। এবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের সময় একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীকে অর্থমন্ত্রী করায় দেশের ব্যবসায়ী সমাজ আশ্বস্ত হয়। ধারণা করা হয়েছিল, একজন ব্যবসাবান্ধব অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সুখ-দুঃখের কথা বুঝবেন অর্থাৎ প্রকৃত ব্যবসাবান্ধব করনীতি গ্রহণ করবেন। এতে করে একদিকে যেমন সরকারের কর আদায়ের বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও হয়রানিমুক্ত পরিবেশে কর প্রদানের মাধ্যমে তাদের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাচ্ছন্দ্যে পরিচালনা করতে পারবেন।

এই মুহূর্তে জাতীয় অর্থনীতিতে একটা মন্দাবস্থা বিরাজ করছে। ইরান যুদ্ধের কারণে সরকার জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব শিল্প-বাণিজ্যের ওপর পড়ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং ব্যবসা তথা এসএমই খাত তাদের ব্যবসার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বভাবতই বেসরকারি শিল্প ব্যবসার কর্মচারীরাও অতিরিক্ত বেতন-ভাতা দাবি করবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের পক্ষে এই অর্থের জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এর মাধ্যমে শিল্পব্যবসার অঙ্গনে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি উদ্ভবের আশঙ্কা রয়েছে।

সাধারণত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তিনটি খাত থেকে রাজস্ব আদায় করে থাকে। এগুলো হলো–আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর। এগুলো নিয়মিত পরিসরে আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্নভাবে জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে রাজস্ব আয় করে থাকে।

দেখা গেছে, বিগত বছরগুলোতে আমদানি শুল্ক আদায়ের পরিমাণ স্থির অবস্থায় রয়েছে। এজন্য সরকার অবশিষ্ট দুটি খাত অর্থাৎ ভ্যাট ও আয়কর আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে চাচ্ছে। এ লক্ষ্যে গত ২৪ জুন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী জানান–মুদি, প্রসাধনী দোকানসহ ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যাট ও করের আওতায় আনা হবে। উল্লেখ্য, ভ্যাটের মূলনীতি হলো ভ্যাট প্রদান করবে ভোক্তা। ব্যবসায়ীরা কালেক্টরের ভূমিকায় থাকবে। আমাদের প্রশ্ন অর্থ মন্ত্রী ক্ষুদ্র এবং অতিক্ষুদ্র ব্যবাসায়ীরা কীভাবে ভোক্তার কাছ থেকে ভ্যাট এবং কর আদায় করবে তা আমাদের বোধগম্য নয়। আর এখানে কতইবা রাজস্ব আদায় হবে তার সঠিক পরিসংখ্যান কি রাজস্ব বোর্ডের কাছে আছে? ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সময় ভ্যাট প্রবর্তন করা হয়। তখন বলা ছিল হাটবাজারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হবে না। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটি ভ্যাট আদায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এবারের বাজেটে আয়কর এবং ভ্যাটের পরিধি বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান এনবিআরের যে জনবল এবং দক্ষতার অভাব রয়েছে তাতে কোনো ক্রমেই ট্যাক্স ও ভ্যাটের আওতা বিস্তৃত করা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি না। এ ধরনের প্রসঙ্গ এলেই এনবিআর প্রথম অভিযোগ করে–১. তাদের জনবল স্বল্পতা, ২. যথাসময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ ছাড় না দেওয়া, ৩. দক্ষ জনবল না থাকায় অটোমেশন চালু করা যাচ্ছে না। এগুলো তাদের পুরোনো অভিযোগ। জনবলসংকট দূর করার জন্য বাংলাদেশে অনেক স্বনামধন্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অনার্সে অধ্যায়নরত ইন্টার্নশিপ করছে, এমন ছাত্রদের দিয়ে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যন্ত আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করা যায়। দক্ষ জনবলের অভাবে অটোমেশন চালু করা যাচ্ছে না।  আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় সুপরিয়র সার্ভিসের জন্য বিসিএস বাধ্যতামূলক। প্রশ্ন থাকে যে, সারা পৃথিবি এখন ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেন শুরু করেছে। এর জন্য আইন সংশোধন করে স্বনামধন্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যেমন–বুয়েট, ব্র্যাক, নর্থসাউথ, ইস্টওয়েস্টসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আইটিতে পারদর্শী ছাত্রছাত্রীদের বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি সুপিরিয়র সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সেই সঙ্গে আইটি-সংক্রান্ত পদে পদায়ন করা যেতে পারে। এই বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আহরণ করার জন্য যে দক্ষতা, সততা, মানবিকতা দরকার তা যদি না থাকে তাহলে এ অর্থসংগ্রহ করা যাবে কি না তার অনিশ্চয়তা ও সংশয় থেকেই যাবে।

ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন, এখন থেকে অর্থবছরের আয়কর ও ভ্যাট রিটার্নের অর্থবছরের ৬ মাসের মধ্যে অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করবেন। পরবর্তী ৬ মাসে যাচাইবাছাই করে এনবিআরের বা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কর্মকর্তার কোনো দাবি থাকলে ওই ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। ভ্যাট ও আয়করদাতাকে বছরান্তে সার্টিফিকেট দিতে হবে। যেমনভাবে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রে বছরান্তে দেয় বিল পরিশোধের সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। এতে অতীতের কোনো ভূতুড়ে কথিত বকেয়া কর এসএমই খাতের ব্যবসায়ীদের কাছে দাবি করতে পারে না। তেমনিভাবে পরবর্তীতে কোনো কারণেই অডিট অথবা অর্থ ডকসের নামে ভ্যাট ও করদাতার কাছে অর্থাৎ নতুন করদাতা ও এসএমই খাতের ব্যবসায়ীদের কাছে পূর্ববর্তী অর্থ দাবি না করে করব্যবস্থাকে মানবিক করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আমাদের দেশে ভ্যাট প্রথা চালুর সময় এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, বিদ্যমান আবগারি শুল্ক ও বিক্রয় কর উঠিয়ে দিয়ে আধুনিক করব্যবস্থা হিসেবে ভ্যাটের প্রচলন করা হলো। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে যে ভ্যাট আদায় করা হয়, তা স্রেফ বিক্রয় কর। বিগত সরকারগুলো তাদের দেওয়া অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হয়ে এ ভ্যাট চালু করেছিল। ব্যবসায়ীরাও সরকারের রাজস্ব আদায়ে সহযোগিতা করতে তা মেনে নিয়েছিল। প্রথমে প্যাকেজ ভ্যাট অর্থাৎ দোকান পর্যায়ে বাৎসারিক একটি নির্দিষ্ট হারে এবং পরে বেচাকেনার হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করে এ ভ্যাট আদায়ের প্রস্তাব করা হলে ব্যবসায়ীরা তা মেনে নেয়। সরকার এ সময় বলেছিল, এসএমই খাতের ব্যবসাগুলোকে এর আওতামুক্ত রাখা হবে। বছরে ৩ কোটি টাকা বিক্রি পর্যন্ত দোকান ব্যবসায়ীদের থেকে ভ্যাট আদায় করা হবে না। প্রথমে সেই অঙ্গীকার মেনে চললেও বর্তমানে তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এখন দৈনিক ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা বিক্রি হলেও সেসব দোকান ব্যবসা থেকে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে।

দেশে মোট ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ৮ লাখ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা আদায় হয়েছে ভ্যাট থেকে। এর মধ্যে এলটিইউ-ভুক্ত ১০৯টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৬০ শতাংশ ভ্যাট প্রদান করে। বড় ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান প্রদান করে ৯৮ শতাংশ। এখানে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ বিস্তর। এটা বন্ধ করা গেলে রাজস্ব আদায়ের জন্য সারা দেশের ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করজালে প্রবেশ করানোর প্রয়োজন হয় না। এতে বিশাল সংখ্যক ব্যবসায়ী যে হয়রানির শিকার হবে তাতে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে পারে। যেহেতু গত দুই বছর এফবিসিসিআই প্রশাসক কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে, সেহেতু এবার বাজেটে ব্যবসায়ীদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে।

সরকার কর আদায় করে মূলত দেশের উন্নয়নের স্বার্থে। সাধারণ কথায় বলা হয়, কর আদায়ের মাধ্যমে সরকারের আয়ের একটা অংশ পরিচালন খাতে ব্যয় করার পর অবশিষ্ট টাকা উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। অথচ সমুদয় রাজস্ব আয় চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ে। উন্নয়ন যতটুকু হচ্ছে তা দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্নভাবে ধারকর্জ করে। এ কারণে প্রতি বছর রাজস্বের একটা বিরাট অংশ চলে যায় ঋণের সুদ গুনতে। এ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে বিরাট আকারের কথিত টার্গেট কমিয়ে আনতে পারে।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ও সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

বাজেটে ঘাটতি ঘাটতির বাজেট

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
বাজেটে ঘাটতি ঘাটতির বাজেট
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

কর ব্যবস্থাপনা দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কর ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ে। কর ব্যবস্থাপনা অবশ্যই নীতিমালার নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করবে, পক্ষপাতিত্ব বা ক্ষমতাবানদের সুবিধা দেওয়া যাবে না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বর্তমান প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা সমীচিন হবে।...

আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্সের সবজান্তা শরিক চ্যাট জিপিটির কাছে জানতে না চেয়েও বলা যায়, ২০২৬-২৭-এর বাজেটকে ঘিরে কথার ফুলঝুরি এবার ‘বাজেটঘাটতি’ নিয়েই ঝরেছে বেশি। তীব্র টানাটানির অর্থনীতির সংসারে সবাইকে স্বস্তি দিতে, এক চিলতে হাসি ও প্রত্যাশা প্রাপ্তির পদাবলি শুনতে ও শোনাতে সময় গড়িয়ে ৩০ জুনে যে লাউ সেই কদু বিশাল ঘাটতির বাজেট পাসে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হবেই। মহামান্য রাষ্ট্রপতি অর্থ বিল ও অর্থ আইনে সানুগ্রহ স্বাক্ষর দান করলে বাজেট কার্যকর হয়ে যাবে। তবে এবারের বাজেট বাস্তবায়ন পারঙ্গমতার ওপর নির্ভর করবে এর উদ্দেশ্য বিধেয় পূরণ। নতুন নির্বাচিত সরকার। খাদের কিনারা থেকে নিমজ্জমান অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হবে, হাতে সময় কম। ঘরে-বাইরে সমস্যারা সর্বত্র। জনগণের প্রত্যশা পাহাড়সমান। সাধ ও সাধ্যের মধ্যে যেন যোজন যোজন দূরত্ব। তার পরও বড় বাজেট, ব্যয়ের তো বটেই। ব্যয় করতে গেলে আয় লাগবে। বাড়ন্ত ব্যয় নিজের আয় না থাকলে ধারকর্জ করে বাস্তবায়ন করা যাবে, তবে সেই ধারকর্জের টাকা শোধ করতে গেলে আবার আয়ের বাজেটেই বাড়বে টান। সে কারণে মিডিয়ায় সবাই বলছে আয় তো হবে না, তা জেনেও কেন আয়ের বাজেট বাড়ানো হচ্ছে? তা দেখিয়ে কি বেশি ব্যয় করার চেষ্টা, যা করা হয়েছে বিগত দেড় দশকে। এবারের ব্যয় আগের মতো লুটপাটের ইচ্ছে নিয়ে নয়, থাকবে নেগেটিভ অথবা পজিটিভলি প্রত্যাশা পূরণের প্রয়াস।

সোজাসাপ্টা ভাষায় বলা যায়, ব্যয়ের বাজেট বাস্তবায়নে আয়ের জোগান বা সংস্থানে যতটুকু কম পড়ে সেটাই ঘাটতি বাজেট। আর বাজেট বাস্তবায়নে ব্যয়ের যে বরাদ্দ দেওয়া আছে তা পূরণে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা যতটুকু অপূরণীয় থাকে সেটাকে বাজেটের ঘাটতি বলা যায়।

প্রকৃতপক্ষে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয় রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি হিসেবে, এটি করা হয় জনগণের অর্থনীতিকে চাঙ্গা, গতিশীল, কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সহনশীল করার জন্য। ভাবখানা এই–আমি যদি ব্যয় না করি তাহলে অর্থনীতিতে সম্পদ ও সেবা সৃষ্টি হবে না, উৎপাদন ও সরবরাহের চাহিদা, গণ-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে না। সরকারের এ প্রত্যয় ও পরিকল্পনায় এটাও কাজ করে যে অর্থনীতি সচল হলে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং রাজস্ব আয় বাড়ানোর দ্বারা অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য কমানো সহজতর হবে। সব সরকারের লক্ষ্য থাকে অর্থনীতিতে আয়-ব্যয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা এবং পরস্পর পরিপূরক ভূমিকা পালন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রাক্কলনের সময় তিনটি বিষয় সামনে দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে এসেছে–১. ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হবে। কেননা, অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়লে বেকারত্ব বাড়বে, দ্রব্যমূল্য সবার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রকারান্তরে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে খরা দেখা দেবে, ব্যয় করার সক্ষমতা কমে যাবে। এটি একটি ঘূর্ণায়মান প্রক্রিয়া। ২. দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির প্রধান পুঁজি সরবরাহ খাত ব্যাংক ও পুঁজিবাজার যথা ভূমিকার স্থানে নেই, পুঁজি পাচার হয়ে গেছে, যা ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ব্যাংক ও বিনিয়োগ খাতকে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিয়ে হলেও এর চলতশক্তি বজায় রাখা বা বাড়ানো। ৩. কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে ভবিষ্যতের জন্য টেকসই ও খাদ্য নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করা। মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটানো, গণমুখী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে জনস্বাস্থ্যসেবাকে গণস্বাস্থ্য অভিমুখীকরণের দ্বারা স্বাস্থ্য খাতের উপযোগিতায় যে ক্ষরণ তা রোধ করা। অর্থনীতির সব খাতকে মূল ভরকেন্দ্রে শামিল করতে খাতভিত্তিক সৃজনশীল উদ্যোগ নেওয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ খাতগুলোকে ক্ষেত্রবিশেষে সুশাসন, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীল করে তোলা।

এই তিন লক্ষ্যমাত্রা পরিপালনে সরকারকে বড় ব্যয়ের বাজেট বানাতে হয়েছে আর সিম্পল বা গাণিতিক সূত্রে রাজস্ব আয়ের বাজেট বড় হতেই হয়েছে। বিস্তর সমালোচনা হতেই পারে আয় ব্যয়ের এই যোজন যোজন ফারাক কমানো হবে কীভাবে, যা না হলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না, আয়ের পালে বাতাস বইবে না। তাই সরকারকে আয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে দৃঢ়চিত্ত ও প্রতিশ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাধীনতার ৫৩ বছরের মাথায় চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের মর্মবাণী তিনটি–

১. পাবলিক মানি আয়-ব্যয়ে ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণ, চাকরিসহ সব নাগরিক সুবিধা সৃষ্টিতে বৈষম্য কমাতে হবে, ২. সর্বত্র সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়াবে, ৩. দেশ অর্থনীতি ও জাতিকে স্বনির্ভর, স্বাবলম্বী হতে হবে। কেননা, বহিরাগত পক্ষ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে দুর্বল বলয়ে দেখতে বা রাখতে চাচ্ছে। স্বাধীনতার জন্য রক্ত দেওয়া জাতির দেশ বাংলাদেশ কারও ট্রাপে না পড়ে বরং কীভাবে এর থেকে উত্তরণ ঘটানো যায় সেটা দেখতে হবে। একটাই বিকল্প–নিজেকে স্বাবলম্বী করে তোলা, টেকসই করে তোলা, লাগসই প্রযুক্তি পানির আধার তৈরিতে খাল কাটায় কর্মসংস্থান, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দিয়ে সবার পারচেজিং পাওয়ার বাড়ানো। মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে দেশের ও বাইরের চাকরিতে ঢোকার পথ তৈরিতে দৃঢ়চিত্ত পদক্ষেপ সৃষ্টি প্রয়োজন হবে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকারের দ্বারা রক্তক্ষরণ সৃষ্টিকারী পথ-পন্থাগুলোকে ক্রমশ উধাও করা।

দারিদ্র্য হ্রাস এবং সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্য কমানো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, পারত পক্ষে নিরসনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সম্পদের পুনর্বণ্টন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা মূলত করব্যবস্থা ও কল্যাণমূলক নীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কর ও ব্যয়ের প্রভাবকে সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে।

দারিদ্র্য মানুষের শত্রু, এটি মানুষকে অপমানিত ও অমানবিক করে তোলে। দারিদ্র্য সরকারগুলোর জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব হলো জীবনের মৌলিক চাহিদার অভাব। বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রচেষ্টা মূলত শিক্ষাকে কেন্দ্র করে হয়েছে, যা অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়েছে। দারিদ্র্যের কারণ হিসেবে দেখা যায় দুর্নীতি, দুর্বল শাসন, ঋণের বোঝা, বেকারত্ব, কম উৎপাদনশীলতা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিশ্বায়ন, অকার্যকর সরকারি নীতি এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণের অভাব।

করব্যবস্থা দারিদ্র্য দূরীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: ব্যক্তিগত ও সরকারি খাতের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে এর ভূমিকা অপরিসীম। দারিদ্র্য এমন একটি বিষয় যা প্রতিটি রাষ্ট্রের সরকারের বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। এজন্য সরকারের নীতি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টেকসই জীবিকা অর্জনে সহায়তা করার দিকে মনোযোগী হওয়া। এ দৃষ্টিভঙ্গি হলো সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করা একটি সুসংগঠিত ও সমন্বিত দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে।

নীতিনির্ধারকরা যদি সত্যিই দারিদ্র্য দূর করতে এবং দরিদ্র জনগণের জীবনমান উন্নত করতে চান, তবে তাদের কর ও স্থানান্তর ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে দরিদ্ররা বিশেষত অতিদরিদ্ররা অতিরিক্ত করভার বহন না করে এবং যথাযথ সুবিধা পায়।

সরকারকে কর ও স্থানান্তর ব্যবস্থা এমনভাবে নকশা করতে হবে যাতে দরিদ্রদের আয় বা ভোগ কর-পরবর্তী সময়ে আগের চেয়ে কম না হয়। সংক্ষেপে, রাজস্বনীতি দরিদ্রদের কল্যাণ উন্নত করবে, তাদের দারিদ্র্যে ঠেলে দেবে না বা বঞ্চনা বাড়াবে না। এখনো একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, জনসেবা (যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য) নিশ্চিত করতে দরিদ্র দেশগুলোকে আরও বেশি কর সংগ্রহ করতে হবে এবং তা প্রগতিশীল ও ন্যায়সঙ্গত উপায়ে করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর করনীতি অনেক সময় অভিজাতদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে ভ্যাটের মতো পশ্চাদগামী করের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। তাই কর ব্যবস্থাপনা দারিদ্র্য দূরীকরণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কর ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে, যাতে কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ে। কর ব্যবস্থাপনা অবশ্যই নীতিমালার নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করবে, পক্ষপাতিত্ব বা ক্ষমতাবানদের সুবিধা দেওয়া যাবে না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বর্তমান প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারকে বিদ্যমান আইনগুলো পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা সমীচিন হবে।

লেখক: ঘাটতি বাজেট বিশ্লেষক